সাআদাত হাসান মান্টোর ‘কালী সালোয়ার’ (কালা সালওয়ার) দেহব্যবসা কিংবা দারিদ্র্যের কোনো গতানুগতিক করুণ সুর নয়; এটি একজন প্রান্তিক নারীর সামাজিক একাকীত্ব, অপূর্ণ আকাঙ্ক্ষা এবং শহরের পাষাণ যান্ত্রিকতার গল্প। আম্বালা থেকে দিল্লিতে এসে ওঠা গণিকা সুলতানার প্রতিদিনের বিবর্ণ জীবনকে কেন্দ্র করে গল্পটি আবর্তিত হয়। ধর্মীয় আচার, পরনের পোষাক কিংবা দৈনন্দিন বেঁচে থাকার টানাপোড়েন—সবকিছু কীভাবে জীবনের কাছে এক নিষ্ঠুর ও অদ্ভুত খেলায় পরিণত হয়, মান্টো তা দেখিয়েছেন চরম বাস্তবতার সাথে।
‘কালী সালোয়ার’ বিশ্লেষন
আম্বালা সেনাছাউনিতে সুলতানার দিন ভালোই কাটছিল। সেখানে খদ্দেরদের আনাগোনা ছিল, আয়-রোজগারও কম ছিল না। কিন্তু সঙ্গী খোদা বখশের প্ররোচনায় ভালো উপার্জনের আশায় সে দিল্লিতে নতুন ডেরায় আসে। দিল্লির লালকুয়ার এলাকার এই নতুন জীবন সুলতানার মোহভঙ্গ ঘটায়। সামনে দিয়ে একের পর এক কুলি, ঠেলাগাড়ি আর ধোঁয়া ওড়ানো ইঞ্জিন চলে যায়, কিন্তু তার দরজায় খদ্দেরের দেখা মেলে না।
গল্পটিতে মহররমের প্রসঙ্গটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। মহররম ঘনিয়ে এলে চারপাশের অন্যান্য নারীরা যখন কালো পোশাক পরা শুরু করে, তখন সুলতানার ভেতরেও শোকের পোশাক ‘কালী সালোয়ার’ বা কালো সালোয়ার পরার আকুল ইচ্ছা জাগে। অথচ তার কাছে প্যান্টলুন বা সালোয়ার বানানোর মতো সামান্য অর্থও নেই। ধর্মীয় অনুভূতি বা শোক পালনের চেয়েও এখানে বড় হয়ে ওঠে বেঁচে থাকার হীনমন্যতা। চারপাশের সমাজে নিজেকে খাপ খাইয়ে নেওয়ার এই ব্যাকুলতা মান্টো তুলে ধরেছেন অত্যন্ত সংবেদনশীলভাবে।
ঠিক এই হতাশাজনক পরিস্থিতিতে গল্পে আবির্ভাব ঘটে শঙ্করের। শঙ্কর চরিত্রটি যেন শহরের এক বাস্তববাদী ছায়া। সে টাকা দিয়ে নারীসঙ্গ কেনে না; বরং সম্পর্কের আদান-প্রদানকে দেখে অন্য এক কোণ থেকে। সুলতানা যখন তার কাছে কালো সালোয়ারের আকুতি জানায়, শঙ্কর তাকে নগদ অর্থ না দিয়ে এক অদ্ভুত বিনিময়ের প্রস্তাব দেয়। সে সুলতানার কান থেকে তার প্রিয় রুপোর দুলজোড়া চেয়ে নেয় এবং পরিবর্তে মহররমের প্রথম দিনেই একটি কুচকুচে কালো সালোয়ার এনে দেয়।
গল্পের ট্র্যাজিক পরিণতি ঘটে একদম শেষ বাক্যে। শঙ্কর সুলতানার রুপোর দুল নিয়ে পাশের বাড়ির আরেক নারী মুক্তারকে দেয়, আর মুক্তারের কালো সালোয়ারটি নিয়ে এসে দেয় সুলতানাকে। যখন সুলতানা আনন্দিত মনে নতুন কালো সালোয়ারটি পরে বেলকনিতে গিয়ে দাঁড়ায়, তখন সে দেখে নিচে মুক্তার দাঁড়িয়ে আছে—তার কানে সুলতানার সেই রুপোর দুল জোড়া ঝলমল করছে।
এখানে মান্টো দেখিয়েছেন, অবহেলিত ও প্রান্তিক মানুষদের জগতে কোনো নতুন কিছু যুক্ত হয় না। অভাবের সংসারে কেবল একই জিনিস হাতবদল হয়। একজনের শোকের জামা অন্যজনের কানের দুলে পরিণত হয়, কিন্তু আলটিমেটলি কারো ভাগ্য বদলায় না।
‘কালী সালোয়ার’ (গল্পের বাংলা অনুবাদ)
মূল: সাআদাত হাসান মান্টো
আম্বালায় সুলতানার দিনকাল বেশ ভালোই কাটছিল। সেখানে ক্যানটনমেন্টে গোরা সৈন্যরা আসত। দু-চার টাকায় কাজ হয়ে যেত, মাস শেষে ভালোই হাতে জমে থাকত। কিন্তু খোদা বখশ তাকে ফিসফিস করে বোঝাল, “দিল্লি চল। সেখানে বড় বড় লোক থাকে, কারবার জমে উঠবে।”
সুলতানা সরল বিশ্বাসে আম্বালার আস্তানা গুটিয়ে দিল্লির লালকুয়ারে চলে এসেছিল। কিন্তু এখানে এসে সে পড়ল মহা বিপদে। তিন মাস হয়ে গেল, হাতে জমানো টাকা শেষ, অথচ ঘরের ভাড়া জোগাড় করাই দায়।
সামনে রেললাইন। সারাদিন ধরে কয়লার ধোঁয়া উড়ে এসে বেলকনিতে জমে। ধোঁয়ার কালচে আস্তরণ যেমন সুলতানার বারান্দায় জমছিল, তেমনি জমছিল তার মনেও। খোদা বখশ সারাদিন পীর-ফকিরের দরগায় ঘুরে বেড়ায়, যদি কোনো বুজরুগের দোয়ায় তাদের ভাগ্য খোলে! কিন্তু দোয়ায় পেট ভরে না।
একদিন বিকেলে সুলতানা বিষণ্ণ মনে আয়নার সামনে বসে ছিল। সামনেই মহররম। গলির অন্য মেয়েরা—আনোয়ারী, মুক্তার—সবাই মহররমের জন্য নতুন কালো কাপড় বানিয়েছে। কারণ শোকের এই দিনে সবাইকে কালো পোশাকে বের হতে হবে। কিন্তু সুলতানার কাছে আছে কেবল একটা পুরনো কালা কুর্তা। কালো সালোয়ার কেনার মতো টাকা তার কাছে একানাও নেই।
সে খোদা বখশকে বলেছিল, “খোদা বখশ, যেকোনোভাবে আমাকে পাঁচটা টাকা দাও। অন্তত এক গজ সালোয়ারের কাপড় তো কিনি!”
খোদা বখশ জীর্ণ থলেটা ঝেড়ে উত্তর দিয়েছিল, “আমার কাছে যে একটা ফুটো পয়সাও নেই সুলতানা! নizamুদ্দিন আউলিয়ার দরগায় গিয়েছি, ধুনির ছাই মেখে বসে থেকেছি, তবু ভাগ্যের চাকা ঘুরল না।”
সুলতানা দীর্ঘশ্বাস ফেলে চুপ করে গিয়েছিল।
এমন সময় দরজায় খটখট শব্দ হলো। খোদা বখশ দরগায় গেছে, এ সময় কে এলো? সুলতানা পর্দা সরিয়ে দেখল, দরজায় দাঁড়িয়ে এক অদ্ভুত লোক। পরনে সাধারণ জামা-পাজামা, চোখে এক ধরণের কৌতুকময় দৃষ্টি।
লোকটি ভেতরে ঢুকে সোজা খাটের ওপর গিয়ে বসল। নাম বলল—শঙ্কর।
সুলতানা পেশাদার ভঙ্গিতে বলল, “কী চাও? আগে বলে রাখি, এখানে বাকিতে কিছু হয় না।”
শঙ্কর হেসে উঠল। তার হাসিতে কোনো অপরাধবোধ ছিল না। সে বলল, “আমি এখানে টাকা দিতে আসিনি। আর বাকি-নগদের হিসাবও আমি করি না।”
সুলতানা অবাক হয়ে বলল, “তাহলে কেন এসেছ?”
“এমনি। তোমার ঘরের দরজা খোলা ছিল, ঢুকে পড়লাম। ভালো লাগলে থাকব, না লাগলে চলে যাব।”
সুলতানা ক্ষুব্ধ হতে চেয়েছিল, কিন্তু শঙ্করের শান্ত ও আত্মবিশ্বাসী ভঙ্গির সামনে সে যেন কেমন অসাড় হয়ে গেল। সে শঙ্করের পাশে এসে বসল। লোকটার মধ্যে কেমন একটা জাদু ছিল, কোনো কৃত্রিমতা নেই।
কথা প্রসঙ্গে সুলতানা নিজের কষ্টের কথা বলে ফেলল। বলল মহররমের কথা, তার কালো সালোয়ার না থাকার আকুলতার কথা।
শঙ্কর সুলতানার দিকে তাকাল। তারপর তার চোখ গেল সুলতানার কানের রুপোর দুল দুটোর দিকে। সাধারণ দুল, কিন্তু কারুকাজ সুন্দর।
শঙ্কর বলল, “মহররমের কত দিন বাকি?”
“এই তো, আর তিন দিন।”
“ঠিক আছে। মহররমের প্রথম দিন সকালে তুমি তোমার কালো সালোয়ার পেয়ে যাবে।”
সুলতানা বিশ্বাস করতে পারল না। “তুমি দেবে? কিন্তু তুমি তো টাকা দেবে না বললে!”
শঙ্কর উঠে দাঁড়াল। হাসতে হাসতে বলল, “টাকা দেব না, কিন্তু সালোয়ার পাবে। তবে শর্ত একটা—তোমার কানের এই দুল জোড়া আমাকে দিতে হবে।”
সুলতানা চমকে উঠল। “এ তো খোদা বখশের দেওয়া দুল! আমি এটা কীভাবে দেব?”
“তাহলে সালোয়ারের আশা ছেড়ে দাও,” শঙ্কর দরজার দিকে পা বাড়াল।
সুলতানা একটু ভাবল। দুল দুটো পুরনো হয়ে গেছে, তাছাড়া এখন মহররমের কালো সালোয়ারটাই তার কাছে সবচেয়ে বড় অভাব। সে কানে হাত দিয়ে দুল দুটো খুলে শঙ্করের হাতে তুলে দিল।
শঙ্কর দুল দুটো পকেটে পুরে হেসে বলল, “মহররমের সকালে তৈরি থেকো।” সে চলে গেল।
পরদিন খোদা বখশ দরগা থেকে ফিরে এলো খালি হাতে। সে জানলও না কানের দুলের কথা। সুলতানার বুকের ভেতর দুরুদুরু কাঁপন—শঙ্কর কি সত্যিই আসবে? নাকি তাকে ঠকিয়ে দুল জোড়া নিয়ে কেটে পড়ল?
মহররমের প্রথম দিন সকাল। শহরের বাতাস ভারি হয়ে এসেছে। সুলতানা বিষণ্ণ মনে বারান্দায় গিয়ে দাঁড়াল। ঠিক তখনই সিঁড়িতে পায়ের শব্দ পাওয়া গেল।
দরজা খুলতেই দেখা গেল শঙ্কর দাঁড়িয়ে আছে। তার হাতে খবরের কাগজে মোড়া একটা প্যাকেট।
শঙ্কর প্যাকেটটি সুলতানার দিকে গড়িয়ে দিয়ে বলল, “নাও, তোমার সালোয়ার। একদম নতুন, ধোয়া।”
সুলতানা খবরের কাগজ খুলে দেখল—কুচকুচে কালো কাপড়ের একটা সিল্কের সালোয়ার! তার চোখ খুশিতে চকচক করে উঠল। সে শঙ্করকে ধন্যবাদ দিতে যাবে, কিন্তু শঙ্কর ততক্ষণে সিঁড়ি দিয়ে নেমে চলে যাচ্ছে। সে আর পেছনে তাকাল না।
সুলতানা তড়িঘড়ি করে নিজের পুরনো কালা কুর্তাটা পরল, তার নিচে নতুন কালো সালোয়ারটি গলিয়ে নিল। আয়নায় নিজেকে দেখে তার মনে হলো, এতদিনে সে চারপাশের আর আট দশটা সাধারণ মানুষের মতো হতে পেরেছে। মহররমের শোকে সে-ও এখন শরিক।
আনন্দ ধরে রাখতে না পেরে সে দৌড়ে বারান্দায় গেল। নিচে গলির মোড়ে অন্যান্য মেয়েরা জমা হয়েছে।
সুলতানা ওপর থেকে ঝুঁকে দেখতে গেল প্রতিবেশী মুক্তারকে। মুক্তারও মহররমের শোকের পোশাক পরে বের হয়েছে।
কিন্তু নিচে তাকাতেই সুলতানা স্তব্ধ হয়ে গেল। তার শরীরের রক্ত যেন এক মুহূর্তে হিম হয়ে জমাট বেঁধে গেল।
নিচে দাঁড়িয়ে থাকা মুক্তারের কানের দিকে চোখ যেতেই সুলতানা চিনতে পারল—মুক্তারের কানে ঝুলে আছে ঠিক সেই রুপোর দুল জোড়া, যা সে দু-দিন আগে শঙ্করের হাতে তুলে দিয়েছিল!
সুলতানা বারান্দার রেলিং শক্ত করে ধরে নিচের দিকে তাকিয়ে রইল। তার পরনে শঙ্করের এনে দেওয়া কালো সালোয়ার, আর নিচে মুক্তারের কানে তার নিজের দুল। সে বুঝতে পারল, শঙ্কর এই সালোয়ারটি কোথা থেকে এনেছে, আর তার দুল জোড়া কোথায় গেছে। শূন্য চোখ দুটো মেলে সে কেবল নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে রইল।
