টোবা টেক সিং – সাদাত হাসান মান্টো | রেখতা-উর্দু সাহিত্য । আমার সংস্কৃতি সিরিজ

সাআদাত হাসান মান্টোর ‘টোবা টেক সিং’ কেবল দেশভাগের রাজনৈতিক ইতিহাস নয়; এটি রাষ্ট্রীয় সীমানা নির্ধারণের নামে কোটি কোটি মানুষের স্মৃতিকাতরতা ও শিকড় উপড়ে ফেলার এক অবান্তর ট্র্যাজেডির দলিল। লাহোরের এক উন্মাদাগারের পাগলদের অসংলগ্ন কথোপকথনকে কেন্দ্র করে লেখা এই গল্পে মান্টো রাজনীতি ও আমলাতন্ত্রের দেউলিয়াত্বকে বুড়ো আঙুল দেখিয়েছেন। মানচিত্রের কাল্পনিক রেখা কীভাবে সাধারণ মানুষের মানসিক স্থৈর্য এবং নিজস্ব ভূমির পরিচয়কে ধূলিসাৎ করে দেয়, তা মান্টো গভীর মানবিক স্পর্শে ফুটিয়ে তুলেছেন।

‘টোবা টেক সিং’ বিশ্লেষণ

দেশভাগের কয়েক বছর পর ভারত ও পাকিস্তান উভয় দেশের সরকার সিদ্ধান্ত নেয় যে উন্মাদাগারে বন্দী থাকা হিন্দু-শিখ এবং মুসলিম পাগলদেরও ধর্মীয় ভিত্তিতে অদলবদল করা হবে। মান্টো এই রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তকে উন্মাদনার সর্বোচ্চ শিখর হিসেবে দেখিয়েছেন। যেখানে সুস্থ বলে দাবি করা রাজনীতিকেরা দেশকে খণ্ড-বিখণ্ড করছেন, সেখানে পাগলদের সাধারণ প্রশ্নগুলোর জবাব দেওয়ার মতো সক্ষমতা রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার ছিল না।

গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র বিশেন সিং—যাকে সবাই তার গ্রামের নামে ‘টোবা টেক সিং’ বলেই চেনে। গত পনেরো বছর ধরে সে দাঁড়িয়ে আছে, কখনো বসেনি বা ঘুমায়নি। তার একটাই মাত্র ব্যাকুল প্রশ্ন—‘টোবা টেক সিং’ কোথায়? ভারতে, নাকি পাকিস্তানে? কিন্তু অফিসার, সহবন্দী বা আত্মীয়—কেউই তাকে সুনির্দিষ্ট জবাব দিতে পারে না। কারণ কৃত্রিম কাটাতাঁারের সীমানা কীভাবে পৈতৃক ভিটে, বাতাস আর শৈশবের স্মৃতিকে ভাগ করে দেয়, তা বুঝতে সুস্থ মস্তিষ্কের লোকগুলোও ব্যর্থ।

গল্পের চূড়ান্ত মুহূর্তটি ঘটে ভারত-পাকিস্তান সীমান্তে ওয়াগাহ পারাপারের সময়। বিশেন সিং যখন বুঝতে পারে যে তার আদরের গ্রাম টোবা টেক সিং পাকিস্তানেই রয়ে গেছে, কিন্তু তাকে জোর করে ভারতে পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে, সে হাঁটতে অস্বীকার করে। সে কোনো পক্ষের সীমানায় না গিয়ে দুই দেশের মধ্যবর্তী একটি বেওয়ারিশ ভূখণ্ডে দাঁড়িয়ে থাকে।

মান্টোর এই শেষ দৃশ্যটি দক্ষিণ এশীয় সাহিত্যের সবচেয়ে ক্ষমতাশালী রূপক। যে জমিতে কোনো কাটাতাঁারের লাল ফিতে নেই, কোনো নির্দিষ্ট রাষ্ট্রীয় পতাকা নেই—সেই নো ম্যানস ল্যান্ডের ওপর বিশেন সিং ঢলে পড়ে। দুই দেশের অসার জাতীয়তাবাদের মুখে থুথু ফেলে সে প্রমাণ করে, তার আসল ঠিকানা কোনো রাষ্ট্রীয় মানচিত্র নয়; তার ঠিকানা কেবল তার নিজের ভিটেমাটি।

‘টোবা টেক সিং’ (গল্পের বাংলা অনুবাদ)

মূল: সাআদাত হাসান মান্টো

দেশভাগের দুই-তিন বছর পর হিন্দুস্তান আর পাকিস্তান সরকারের মনে হলো, কয়েদিদের মতো পাগলদেরও আদান-প্রদান করা দরকার। অর্থাৎ হিন্দুস্তানের উন্মাদাগারে যেসব মুসলিম পাগল আছে তাদের পাঠাতে হবে পাকিস্তানে, আর পাকিস্তানের উন্মাদাগারে থাকা হিন্দু ও শিখ পাগলদের তুলে দিতে হবে হিন্দুস্তানের হাতে।

খবরটা লাহোরের উন্মাদাগারে পৌঁছাতেই এক হুলস্থুল পড়ে গেল। এক মুসলিম পাগল, যে গত সাত বছর ধরে নিয়মিত ‘পাকিস্তান জিন্দাবাদ’ আর ‘পাকিস্তান মুর্দাবাদ’ জাতীয় পত্রিকা পড়ত, সে এক বন্ধুকে শুধাল, “ভাই, এই পাকিস্তানটা কোথায়? হিন্দুস্তানে, নাকি অন্য কোথাও?”

বন্ধুটা গম্ভীর হয়ে উত্তর দিল, “কেন, যেখানে হাতবোমা তৈরি হয়, সেই জায়গাটা!”

আরেক পাগল গাছে উঠে গিয়ে ঘোষণা দিল, “আমি ভারত বা পাকিস্তান কোনো দেশেই থাকব না! আমি এই গাছের ডালেই জীবন কাটাব।”

এইসব পাগলামির মাঝে এক প্রবীণ শিখ কয়েদি ছিলেন, নাম বিশেন সিং। জমিদার ঘরের লোক, কিন্তু পনেরো বছর আগে মাথাটা খারাপ হয়ে যাওয়ার পর পরিবারের লোকেরা তাকে এখানে রেখে গিয়েছিল। পনেরো বছরে বিশেন সিং কখনো বসেনি, শুয়ে পড়েনি, এমনকি এক মুহূর্তের জন্যও ঘুমায়নি। সে অলসভাবে দাঁড়িয়ে থাকত। সারাক্ষণ এক অদ্ভুত অসংলগ্ন বুলি আওড়াত, “ওপড় দি গুড়গুড় দি অ্যানেক্স দি ধিয়ানা দি মুং দি ডাল অব দি লালটেন…”

বিশেন সিংয়ের কেবল একটাই চিন্তা ছিল। সে যার কাছেই যেত, ধীরস্বরে একটা প্রশ্নই জিজ্ঞেস করত, “টোবা টেক সিং কোথায়? হিন্দুস্তানে, নাকি পাকিস্তানে?”

কেউ বলত পাকিস্তানে, কেউ বলত হিন্দুস্তানে। আবার কেউ বলত, “এখনও তৈরি হয়নি, মানচিত্র আঁকা হচ্ছে।”

বিশেন সিং মাথা নেড়ে আবার নিজের সেই অদ্ভুত বুলি বিড়বিড় করত। টোবা টেক সিং ছিল তার নিজ গ্রাম, যেখানে তার জমিজমা, ঘরবাড়ি ছিল। প্রতি মাসে তার আত্মীয়স্বরা তাকে দেখতে আসত, কিন্তু দেশভাগের পর থেকে কেউ আর আসেনি।

একদিন তার পুরনো বন্ধু ফজল দিন দেখা করতে এলো। ফজল দিন তাকে জড়িয়ে ধরে বলল, “বিশেন সিং, আমি তোমার গ্রাম টোবা টেক সিং থেকে এসেছি। তোমার পরিবারের সবাই কুশলে হিন্দুস্তানে চলে গেছে। আমি তাদের সাহায্য করেছিলাম।”

বিশেন সিং ব্যাকুল হয়ে জিজ্ঞেস করল, “টোবা টেক সিং কোথায় ফজল দিন? হিন্দুস্তানে, নাকি পাকিস্তানে?”

ফজল দিন ইতস্তত করে বলল, “কেন, টোবা টেক সিং তো ওখানেই আছে… যেখানে ছিল। মানে পাকিস্তানে।”

বিশেন সিং অসন্তোষ প্রকাশ করে আবার নিজের সেই চিরচেনা বুলি আওড়াতে শুরু করল। সে বুঝতে পারল না, কীভাবে তার প্রিয় গ্রাম এক রাতে অন্য একটা দেশে পরিণত হয়ে গেল।

অবশেষে অদলবদলের দিন এলো। তীব্র শীতের রাত। লাহোর থেকে পাগলদের বাসে করে ওয়াগাহ সীমান্তে নিয়ে যাওয়া হলো।

সীমান্তের পরিবেশ ছিল চরম বিশৃঙ্খল। হাঁকডাক, কান্নাকাটি, আর পুলিশদের হুটোপুটি। অনেক পাগল বাস থেকে নামতেই চাইল না। যারা নামল, তারা ঠাণ্ডায় কাঁপতে কাঁপতে চিৎকার করতে লাগল। কাগজপত্রে সই করে এক এক করে পাগল পার করে দেওয়া হচ্ছিল।

বিশেন সিংয়ের নাম যখন ডাকা হলো, সে হেঁটে গিয়ে রেজিস্ট্রি অফিসারকে জিজ্ঞেস করল, “টোবা টেক সিং কোথায়? হিন্দুস্তানে, না পাকিস্তানে?”

অফিসার হেসে বলল, “পাকিস্তানে! তোমার গ্রাম পাকিস্তানে পড়ে গেছে।”

কথাটা শুনেই বিশেন সিং থমকে গেল। সে পেছনে ঘুরে উল্টো দৌড় দিতে চাইল। কিন্তু হিন্দুস্তানি ও পাকিস্তানি সিপাইরা তাকে ধরে ফেলল।

“ওপারে যাও! তোমাকে ভারতে যেতে হবে!” সিপাইরা নির্দেশ দিল।

বিশেন সিং গর্জে উঠল, “টোবা টেক সিং এখানে! যেখানে আমি দাঁড়িয়ে আছি, এটাই টোবা টেক সিং! আমি কোথাও যাব না!”

অফিসাররা তাকে বোঝানোর চেষ্টা করল, কিন্তু বিশেন সিং একচুল নড়ল না। পনেরো বছর ধরে দাঁড়িয়ে থাকা তার দুটো পা যেন মাটির ভেতর শিকড় গেড়ে বসেছে। সিপাইরা অনেক টানাটানি করল, ধাক্কাধাক্কি করল, কিন্তু তাকে বিন্দুমাত্র সরানো গেল না। তার বিশাল দেহাংশ পাহাড়ের মতো অটল হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। সে এক অদ্ভুত প্রতীক হয়ে রইল, যাকে কেউ পরাজিত করতে পারছিল না।

যেহেতু সে কোনো সহিংসতা করছিল না, তাই অফিসাররা তাকে আপাতত দুই দেশের মাঝখানের ফাঁকা জমিতেই দাঁড়িয়ে থাকতে দিল। অদলবদলের বাকি কাজ চলতে লাগল।

ভোর হওয়ার ঠিক মুখটিতে, সূর্য যখন উঠেনি কিন্তু চারপাশ ফর্সা হয়ে আসছে, তখন বিশেন সিংয়ের গলা থেকে এক ভয়ানক, বুকফাটা আর্তচিৎকার ভেসে এলো।

কর্মকর্তারা, সিপাইরা ছুটে এলো।

পনেরো বছর ধরে একনাগাড়ে দাঁড়িয়ে থাকা সেই লোকটা, যে কখনো মাটিতে শুয়ে পড়েনি, সে এখন উপুড় হয়ে পড়ে আছে।

ওদিকে কাটাতাঁারের ওপাশে ভারত, অন্যদিকে একই কাটাতাঁারের ওপাশে পাকিস্তান। মাঝখানের নামহীন, রাষ্ট্রহীন একফালি নো ম্যানস ল্যান্ডের জমিতে মুখ থুবড়ে পড়ে আছেন টোবা টেক সিং।