সাআদাত হাসান মান্টোর ‘হাতক’ (অপমান) কেবল পেশাদার শরীর বিক্রির গল্প নয়; এটি একজন প্রান্তিক নারীর সুপ্ত আত্মসম্মানবোধ এবং মানবিক মর্যাদার এক অসামান্য উন্মোচন। বোম্বাই শহরের ঘিঞ্জি গলিতে বাস করা গণিকা সুগন্ধীর প্রতিদিনের জীবনের আড়ালে জমে থাকা ভালোবাসা আর প্রত্যাখ্যানের অভিজ্ঞতাকে কেন্দ্র করে গল্পটি আবর্তিত হয়। সমাজের সবচেয়ে নিচুতলায় থাকা একজন নারীও যখন অবহেলার চাবুক খেয়ে নিজের ভেতরের সত্তাকে নতুন করে আবিষ্কার করে, মান্টো তা দেখিয়েছেন চরম সাহসিকতা ও নিখুঁত মনস্তাত্ত্বিক কায়দায়।
‘হাতক’ বিশ্লেষণ
সুগন্ধী বোম্বাইয়ের এক সাধারণ যৌনকর্মী। তার চরিত্রটি অন্যান্য দশটা পেশাদার নারীর মতো রুক্ষ বা আবেগহীন নয়; সে ভালোবাসতে চায়, মানুষকে আপন করে নিতে চায়। তার কাছে আসা পুরুষদের সে নিজের সমস্ত আবেগ দিয়ে আঁকড়ে ধরে, এমনকি নিজের কষ্টের উপার্জিত টাকাও উঠিয়ে দেয় তাদের হাতে। মাধোর মতো সুবিধাভোগী পুলিশ সদস্য বছরের পর বছর সুগন্ধীর এই নরম মনের ফায়দা তুলে তাকে শোষণ করে গেছে।
গল্পের মোড় ঘোরে এক গভীর রাতে। দালাল রামলাল তাকে এক ধনীর মোটরে নিয়ে যায়। সুগন্ধী সেজেগুজে গভীর আগ্রহ নিয়ে গাড়ির জানালার কাছে দাঁড়ায়। কিন্তু গাড়ির ভেতরের লোকটা টর্চের আলো তার মুখে ফেলে এক চরম ঘৃণার ভঙ্গি করে বলে ওঠে—‘ফুঃ!’ আর গাড়ি হাঁকিয়ে চলে যায়। এই একটাই তুচ্ছ বর্জন সুগন্ধীর অস্তিত্বের মূলে প্রচণ্ড আঘাত হানে। জীবনের হাজারো অপমানের চেয়ে এই নিরুত্তাপ প্রত্যাখ্যানটা তার সুপ্ত আত্মসম্মানবোধকে হঠাৎ জাগিয়ে তোলে।
সুগন্ধী বুঝতে পারে, এতদিন সে পুরুষদের চোখে কোনো মানুষ ছিল না; সে ছিল কেবল কেনাবেচার একটা সস্তা উপাদান। ঘরে ফিরে সে তার অতীত জীবনের সমস্ত কৃত্রিমতা আর পুরুষদের তোলা ছবিগুলো গুঁড়িয়ে দেয়। রাতে যখন মাধো বরাবরের মতো টাকা চাইতে ঘরে ঢোকে, তখন সুগন্ধীর ভেতর জমে থাকা বছরের পর বছর ক্ষোভ আর অপমান এক আগ্নেয়গিরির মতো ফেটে পড়ে। সে মাধোকে লাথি মেরে ঘর থেকে বের করে দেয়।
গল্পের শেষ দৃশ্যে সুগন্ধী তার একমাত্র সঙ্গী, এক খোসপাঁচড়া ওঠা ন্যাংটো কুকুরকে জড়িয়ে ধরে বিছানায় শুয়ে পড়ে। সমাজের সমস্ত ‘সুস্থ ও ভদ্র’ মানুষের ভণ্ডামি আর শোষণের মুখে থুথু ফেলে সুগন্ধী তার ভালোবাসা সঁপে দেয় এক অবলা পশুর কাছে। মান্টো এখানে দেখিয়েছেন যে, সমাজের তলায় পড়ে থাকা মানুষেরও একটা আত্মমর্যাদা থাকে, আর সেই মর্যাদা জেগে উঠলে শোষকের চাবুক মুহূর্তের মধ্যে ভোঁতা হয়ে যায়।
‘হাতক’ (গল্পের বাংলা অনুবাদ)
মূল: সাআদাত হাসান মান্টো
সুগন্ধীর স্বভাবটাই এমন ছিল—যে পুরুষই তার কাছে আসত, তাকে সে নিজের সমস্ত হৃদয় দিয়ে ভালোবেসে ফেলত। ভালোবাসার এই অদ্ভুত তাড়নাই তাকে অন্য আর দশটা যৌনকর্মীর চেয়ে আলাদা করে রেখেছিল। সে ভাবত, কামনার বিনিময়ে শুধু টাকা নেওয়াটা কোনো জীবনের কাজ হতে পারে না; তার ভেতর যে রক্ত-মাংসের মানুষটা আছে, তাকেও তো কাউকে দেওয়ার আছে।
তার ঘরের দেয়ালে চারটি ছবি টাঙানো ছিল। চারজন চার ভিন্ন মেজাজের পুরুষ, যাদের সে বিভিন্ন সময়ে ভালোবেসেছিল। তাদের মধ্যে অন্যতম ছিল মাধো—পুলিশের এক সাধারণ কনস্টেবল। মাধো যখনই বোম্বাইয়ে আসত, সুগন্ধীর ঘরে উঠত, তার টাকায় খেত-পড়ত, আর যাওয়ার সময় সুগন্ধীর জমানো টাকা থেকে কয়েকটা নোট পকেটে পুরে নিয়ে যেত। সুগন্ধী তাতেই খুশি থাকত, সে ভাবত মাধো অন্তত তার আপনজন।
সেদিন রাতে মাধো এসে শুয়েছিল। রাত প্রায় দুটো, এমন সময় দরজায় টোকা পরল। রামলাল দালাল এসেছে।
রামলাল নিচু গলায় বলল, “সুগন্ধী, তাড়াতাড়ি তৈরি হয়ে নে। বাইরে শেঠজি মোটরে বসে আছে। অনেক মোটা টাকা মিলবে।”
সুগন্ধীর শরীর ক্লান্ত ছিল, কিন্তু রামলালের পীড়াপীড়িতে সে উঠতে বাধ্য হলো। সে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে একটু পাউডার মাখল, শাড়িটা গুছিয়ে পরে গায়ে একটু সুবাস ছড়িয়ে নিল। বিছানায় শুয়ে থাকা মাধোর দিকে এক নজর তাকাল—মাধো অঘোরে ঘুমাচ্ছে। সে মনে মনে ভাবল, জলদি কাজ সেরে ফিরে এসে মাধোর পাশে শুলেই হবে।
সুগন্ধী নিচে নেমে এলো। রাস্তার একপাশে একটা কালো চকচকে গাড়ি দাঁড়িয়ে ছিল। রামলাল তাকে ইশারা করে গাড়ির জানালার কাছে যেতে বলল।
সুগন্ধী বুকে কিছুটা আশা আর কৌতূহল নিয়ে গাড়ির দরজার কাছে গিয়ে দাঁড়াল। গাড়ির গ্লাসে একটু হেলে সে মিষ্টি একটা হাসি দেওয়ার চেষ্টা করল।
ঠিক তখনই ভেতর থেকে শেঠজি এক হাত বের করে একটা জ্বলন্ত টর্চের আলো সরাসরি সুগন্ধীর মুখের ওপর ফেলল। আলোর তীব্রতায় সুগন্ধীর চোখ ধাঁধিয়ে গেল।
সে শেঠজির মুখের দিকে তাকাল। শেঠজির মুখে চরম বিরক্তি ও ঘৃণার ছাপ। শেঠজি টর্চটা বন্ধ করে মুখ ঘুরিয়ে এক তীব্র বিদ্রূপের গলায় বলে উঠল, “উফ… ফুঃ!”
পরমুহূর্তেই গাড়ির ইঞ্জিন গর্জে উঠল আর গাড়িটা অন্ধকারে মিলিয়ে গেল।
সুগন্ধী রাস্তার মাঝখানে পাথরের মতো দাঁড়িয়ে রইল। তার পুরো শরীর যেন এক মুহূর্তে অবশ হয়ে গেল। কত লোক তার কাছে এসেছে, কত লোক তাকে ব্যবহার করেছে, কিন্তু এভাবে কেউ কখনো তার মুখের ওপর থুথু ফেলে চলে যায়নি। ঐ একটা শব্দ—”ফুঃ!”—সুগন্ধীর মাথার ভেতরে হাতুড়ির মতো পিটতে লাগল।
সে ধীরে ধীরে হেঁটে তার ঘরে ফিরে এলো। তার মনে হলো সে কোনো মানুষ নয়, যেন পচা কোনো বস্তু যা দেখে লোকটা নাক সিঁটকে চলে গেল। সে ঘরে ঢুকে আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। পাউডার মাখা মুখটা তার কাছে বিকট মনে হলো। যে মুখটাকে এতদিন সে সুন্দর ভাবত, সেই মুখটাই এখন তার কাছে সবচেয়ে ঘৃণার জিনিস হয়ে উঠল।
সে এক ঝটকায় দেয়াল থেকে চার পুরুষ মানুষের ছবিগুলো টেনে ছিঁড়ে ফেলল। প্রসাধনীর কৌটো, পাউডারের চাট্টি তুলে জানালা দিয়ে বাইরে ফেলে দিল। তার মনে হলো এতদিন ধরে সে একটা মিথ্যার মধ্যে বাস করছিল।
ঠিক এমন সময় বিছানা থেকে মাধো ধড়ফড় করে উঠে বসল। সে হাই তুলতে তুলতে বলল, “কী রে সুগন্ধী, কী পেলি? দে, জলদি দে, পাঁচটা টাকা দে তো, একটা কাজ আছে।”
সুগন্ধী ঘুরে দাঁড়াল। তার চোখে এখন আর কোনো প্রেম নেই, ভালোবাসার কোনো ছায়াও নেই। সেখানে জ্বলছে এক মারাত্মক হিংস্র আগুন।
সে মাধোর দিকে কয়েক পা এগিয়ে গেল।
মাধো অবাক হয়ে বলল, “এমন করে তাকাচ্ছিস কেন? টাকা দিবি না?”
সুগন্ধী আচমকা চিল-চিৎকার করে উঠল, “টাকা? কিসের টাকা? তুই কে রে টাকা চাওয়ার? বের হ আমার ঘর থেকে! এখনই বের হ!”
মাধো ভয় পেয়ে গেল। সে কখনো সুগন্ধীর এই রূপ দেখেনি। সে তোতলাতে তোতলাতে বলল, “আরে… কী হলো তোর? তুই তো আমাকে ভালোবাসিস…”
“ভালোবাসি?” সুগন্ধী এক বিকট হাসি হাসল, “তোর মতো ভিখারিকে? যে পরজীবী অন্যের উপার্জনে বেঁচে থাকে? বের হ, নইলে এই মুহূর্তে চাবুক দিয়ে তোর পিঠের চামড়া তুলে নেব!”
সে মাধোর ট্রাঙ্ক আর জামাকাপড় উঠিয়ে ঘর থেকে বাইরে ছুঁড়ে ফেলে দিল। মাধো কোনোমতে নিজের জিনিসপত্র কুড়িয়ে নিয়ে একপ্রকার দৌড়ে গলি দিয়ে পালিয়ে গেল।
ঝড় থেমে যাওয়ার পর ঘরে নেমে এলো এক অখণ্ড নীরবতা। সুগন্ধী হাঁপাচ্ছিল। ঘরে এখন কেউ নেই—কোনো পুরুষ নেই, কোনো দালাল নেই, কোনো শেঠজি নেই।
ঠিক তখনই খাটের তলা থেকে একটা শব্দ শোনা গেল। সুগন্ধীর পোষা নোংরা, খোসপাঁচড়া ওঠা ন্যাংটো কুকুরটা মুখ বের করে তার দিকে লেজ নাড়তে লাগল।
সুগন্ধী কুকুরটার দিকে তাকাল। তার চোখ দুটো জলে ভরে এলো। সে মাটির ওপর বসে পড়ে কুকুরটাকে টেনে নিজের কোলে তুলে নিল। পরম মমতায় তার গায়ে হাত বোলাতে বোলাতে সে তাকে নিয়েই বিছানায় গিয়ে শুলো।
পশুটাকে নিজের বুকের সাথে জড়িয়ে ধরে সুগন্ধী চোখ বুজল। অবশেষে সে এমন একজনকে খুঁজে পেয়েছে, যে তাকে কোনো শর্ত বা বিচার ছাড়া ভালোবাসে।
