ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের প্রাচীন ও অপ্রচলিত রাগের ভাণ্ডারে পা রাখলে এমন কিছু বিরল রত্নের দেখা মেলে, যা সাধারণ মেহফিলে খুব বেশি শোনা না গেলেও তাদের আভিজাত্য এবং সাঙ্গীতিক গভীরতা দিয়ে যেকোনো প্রাজ্ঞ শ্রোতাকে মুগ্ধ করতে সক্ষম। তেমনই একটি সুপ্রাচীন, মার্জিত এবং ঐতিহাসিক রাগ হলো ‘রাগ দেবশাখ’ (বা সংক্ষেপে রাগ দেবশাক)। ঐতিহ্যগতভাবে এটি কানাড়া পরিবারের একটি অন্যতম প্রাচীনতম সদস্য হিসেবে বিবেচিত হয়। আবার অনেক প্রাচীন গ্রন্থে একে বিলাবল এবং কাফী অঙ্গের এক অপূর্ব সাঙ্গীতিক মিলনস্থল হিসেবেও বর্ণনা করা হয়েছে। দিনের প্রথম প্রহরে ভোরের আলো যখন ফুটতে শুরু করে, তখন দেবশাখ রাগের ধ্বনি পরিবেশের মধ্যে এক অদ্ভুত গুরুগম্ভীর অথচ আধ্যাত্মিক শুভ্রতার সঞ্চার করে।
ইতিহাস ও রাগের পরিচয়
‘দেবশাখ’ শব্দটির আক্ষরিক অর্থ বিশ্লেষণ করলে এর মধ্যে এক প্রকার ঐশ্বরিক বা দেবসুলভ আভিজাত্যের স্পর্শ পাওয়া যায়। প্রাচীন ধ্রুপদ সঙ্গীতের যুগে এবং বৈষ্ণব পদাবলী কিংবা মোগল দরবারের প্রারম্ভিক সঙ্গীত চর্চায় এই রাগের বহুল ব্যবহার ছিল। পরবর্তীকালে দরবারি কানাড়া বা আদানার মতো চঞ্চল ও জনপ্রিয় কানাড়া রূপগুলোর ভিড়ে দেবশাখ রাগটি কিছুটা অপ্রচলিত ও বিরল হয়ে পড়ে।
সঙ্গীত শাস্ত্রের প্রাচীন গ্রন্থগুলোতে এটিকে কখনো বিলাবল ঠাটের, আবার কখনো কাফী বা খামাজ অঙ্গের প্রভাবে বিশ্লেষণ করা হয়েছে। তবে আধুনিক হিন্দুস্তানি সঙ্গীত পদ্ধতিতে অধিকাংশ পণ্ডিত এটিকে বিলাবল ঠাট অথবা কাফী ঠাটের সংমিশ্রণে গড়ে ওঠা কানাড়া অঙ্গের রাগ হিসেবেই গণ্য করেন। দেবশাখ রাগের ভেতরের ভাবটি চপলতামুক্ত, স্থির এবং গভীর ভক্তি রসে পরিপূর্ণ।
রাগের শাস্ত্রীয় পরিচয়
- ঠাট: বিলাবল ঠাট (তবে এতে কানাড়া অঙ্গের প্রভাবে কোমল নিখাদ এবং কোমল গান্ধারের সূক্ষ্ম কাজ দেখা যায়)।
- জাতি: ঔড়ব-সম্পূর্ণ বা ষাড়ব-সম্পূর্ণ (আরোহণে সাধারণত গান্ধার ও ধৈবত বক্রভাবে ব্যবহৃত বা বর্জিত হয়)।
- বাদী স্বর: ম (মধ্যম)।
- সমবাদী স্বর: স (ষড়্জ)।
- বর্জিত স্বর: আরোহণে প্রথানুসারে গান্ধার (গ) স্বরটি বর্জিত বা বক্র।
- ব্যবহৃত স্বর: শুদ্ধ ঋষভ (র), কোমল ও শুদ্ধ গান্ধার (গ/জ্ঞ), মধ্যম (ম), পঞ্চম (প), শুদ্ধ ধৈবত (দ), কোমল ও শুদ্ধ নিখাদ (ন/ণ) এবং ষড়্জ (স)।
- সময়: দিনের প্রথম প্রহর (সকাল ৬টা থেকে ৯টার মধ্যবর্তী সময়)।
- প্রকৃতি: অত্যন্ত গম্ভীর, প্রাজ্ঞ, ভক্তিমূলক এবং প্রশান্তিতে ভরা।
স র ম প, ম প ণ দ প, ম প গ ম র সগায়কি ও কারিগরি বৈশিষ্ট্য
রাগ দেবশাখের আসল রূপ ফুটে ওঠে এর বিশেষ স্বরচলন এবং মধ্যম স্বরের প্রক্ষেপণের ওপর। এটি কানাড়া পরিবারের রাগ হওয়া সত্ত্বেও এতে অন্যান্য কানাড়া রাগের মতো কোমল স্বরের অত প্রাবল্য থাকে না, বরং বিলাবল অঙ্গের প্রফুল্লতা এবং কানাড়ার গম্ভীরতার একটি চমৎকার ব্যালেন্স দেখা যায়।
১. মধ্যমের প্রাধান্য: বাদী স্বর ‘মধ্যম’ হওয়ার কারণে দেবশাখের সমস্ত সুরবিস্তার মধ্যমকে ঘিরেই আবর্তিত হয়। স র ম প চলনে ঋষভ থেকে সরাসরি মধ্যমে লাফ দেওয়া এবং মধ্যমে কিছু সময় স্থির থাকা এই রাগের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য।
২. কানাড়া অঙ্গের স্পর্শ: অবরোহণে যখন ম প গ ম র স রূপটি নেওয়া হয়, তখন কানাড়া পরিবারের সেই পরিচিত অনবদ্য দোলাটি অত্যন্ত স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
৩. দুই নিখাদ ও গান্ধারের কাজ: শাস্ত্রজ্ঞদের বিশেষ চাল অনুযায়ী এতে অল-শুদ্ধ স্বরের পাশাপাশি অবরোহে কোমল নিখাদ ও কোমল গান্ধারের সূক্ষ্ম প্রয়োগ করা হয়, যা ভোরবেলার আবহে এক ব্যাকুল কোমলতা এনে দেয়।
ধ্রুপদ এবং ধামার গায়কিতে রাগ দেবশাখের গাম্ভীর্য সবচেয়ে চমৎকারভাবে ধরা পড়ে। এছাড়া প্রাচীন খেয়াল বন্দিশে ভোরবেলার ভক্তিভাব প্রকাশ করতে প্রবীণ ওস্তাদরা এই রাগে বন্দিশ পরিবেশন করতেন।
সুর চিকিৎসায় ব্যবহার
সঙ্গীত চিকিৎসার (Music Therapy) দিক থেকে বিবেচনা করলে, রাগ দেবশাখ ভোরের স্নিগ্ধ আলোয় মানুষের মনকে শান্ত এবং মনোযোগকে একমুখী করতে সাহায্য করে। ভোরের প্রহরে যখন শরীর ও মন নতুন দিনের কাজের জন্য তৈরি হয়, তখন এই রাগের গম্ভীর ও ভক্তিময় ধ্বনি মানসিক দুশ্চিন্তা ও আলস্য দূর করে এক ধরণের ইতিবাচক আত্মবিশ্বাস তৈরি করে।
সম্পর্কিত রাগের তালিকা
- রাগ সুহা কানাড়া: কানাড়া অঙ্গের আরেকটি গম্ভীর রূপ; দেবশাখের চেয়ে সুহাতে কাফী ঠাট ও কোমল স্বরের প্রাবল্য অনেক বেশি।
- রাগ সুঘরাই: দেবশাখের খুব কাছাকাছি থাকা রাগ; এতেও শুদ্ধ ধৈবত ও মধ্যমের প্রাধান্য দেখা যায়, তবে এর গায়কি কিছুটা আলাদা।
- রাগ আলহাইয়া বিলাবল: বিলাবল অঙ্গের মৌলিক রূপ; দেবশাখে বিলাবলের এই প্রফুল্ল রূপেরই একটি শান্ত ও কানাড়া-মিশ্রিত প্রকাশ ঘটে।
- রাগ নায়কী কানাড়া: কানাড়া পরিবারের সুকোমল রূপ; দেবশাখের তুলনায় নায়কী অনেক বেশি বৈরাগ্যময় ও রাতভিত্তিক রাগ।
উপসংহার
রাগ দেবশাখ হলো ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের অতীত আভিজাত্যের এক অটুট দলিল। সাধারণ চটুল সুরের বাইরে গিয়ে যারা শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের ব্যাকরণগত বিশুদ্ধতা এবং প্রাচীন ধ্রুপদী ঐতিহ্যকে অনুধাবন করতে চান, তাদের কাছে দেবশাখ এক অনন্য সুরের আকর। ভোরের নিস্তব্ধতায় যখন দেবশাখের ‘স র ম প’-র সুদৃঢ় আহ্বান বাতাসে ভেসে আসে, তখন তা মুহূর্তের মধ্যে মনকে এক অপার্থিব গুরুগম্ভীর শান্তিতে ভরিয়ে তোলে।