ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের কানাড়া অঙ্গের রূপময় পরিবারে পা রাখলে এমন কিছু বিরল ও মার্জিত রাগের দেখা মেলে, যা একদিকে কানাড়ার রাজকীয় গাম্ভীর্য ধরে রাখে, আবার অন্যদিকে সারং বা বিলাবল অঙ্গের মিষ্টি চপলতায় শ্রুতিমধুর হয়ে ওঠে। তেমনই এক অনন্য, সুরময় এবং অভিজাত প্রাচীন সৃষ্টি হলো ‘রাগ সুঘরাই’ (বা সংক্ষেপে রাগ সুঘরাই কানাড়া)। ‘সুঘরাই’ শব্দটির লোকায়ত ও ঐতিহাসিক অর্থ বিশ্লেষণ করলে পাওয়া যায়—যা সুগঠিত, চতুর, সুগৃহিণীসুলভ দক্ষতায় ভরা কিংবা সুবিন্যস্ত। সাঙ্গীতিক দিক থেকেও এই রাগটি ঠিক তেমনই; বিভিন্ন স্বরের নিখুঁত ভারসাম্য এবং কানাড়া অঙ্গের মার্জিত প্রয়োগের কারণে একে সুরশাস্ত্রের এক অনন্য নিদর্শন মনে করা হয়।
ইতিহাস ও রাগের পরিচয়
ঐতিহাসিক বিচারে রাগ সুঘরাইকে কাফী ঠাটের অন্তর্গত একটি অন্যতম সুপ্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী রাগ হিসেবে গণ্য করা হয়। বৈচিত্র্যের দিক থেকে এতে একই সাথে কানাড়া অঙ্গের আভিজাত্য এবং সারং অঙ্গের সজীবতার এক অপূর্ব সাঙ্গীতিক সংলাপ দেখা যায়। সঙ্গীত শাস্ত্রের প্রবীণ পণ্ডিতদের মতে, কানাড়া পরিবারের বড় ভাই ‘দরবারী কানাড়া’-র মতো এতে মন্দ্র সপ্তকের ভারী শোক বা অত গভীর বেদনার ছাপ নেই, বরং সুঘরাইতে রয়েছে এক ধরণের মিষ্টি প্রফুল্লতা, লাবণ্য ও প্রেমের আকুলতা।
সঙ্গীত শাস্ত্রে বিভিন্ন আঞ্চলিক ও ঘরানায় এটি ‘সুঘরাই’, ‘সুঘরাই কানাড়া’ কিংবা ‘সুঘরাই কাফি’ নামেও পরিচিত।
রাগের শাস্ত্রীয় কাঠামো
- ঠাট: কাফী ঠাট।
- জাতি: ঔড়ব-সম্পূর্ণ (আরোহণে পাঁচটি এবং অবরোহণে সাতটি স্বর ব্যবহৃত হয়)।
- বাদী স্বর: ম (মধ্যম)।
- সমবাদী স্বর: স (ষড়্জ)।
- বর্জিত স্বর: আরোহণে সাধারণত ঋষভ (র) এবং ধৈবত (দ) স্বর দুটি বর্জিত বা বক্রভাবে অলঙ্কৃত হয়।
- ব্যবহৃত স্বর: শুদ্ধ ঋষভ (র), কোমল ও শুদ্ধ গান্ধার (গ/জ্ঞ), মধ্যম (ম), পঞ্চম (প), শুদ্ধ ধৈবত (দ), কোমল নিখাদ (ন) এবং ষড়্জ (স)।
- সময়: রাত্রির দ্বিতীয় প্রহর (রাত ৯টা থেকে ১২টার মধ্যবর্তী সময়)।
- প্রকৃতি: প্রফুল্ল, মিষ্টি, কিছুটা চঞ্চল অথচ কানাড়া অঙ্গের আভিজাত্যে ভরা।
আরোহণ: স গ ম প, ণ দ প, ণ স
(অনেকে সারং অঙ্গের প্রভাবে স র ম প, ণ স চলনেও আরোহণ করে থাকেন)
অবরোহণ: র্স ণ দ প, ম প, গ ম র স
প্রধান স্বরসংগতি (পকড়):
স র ম প, ম প ণ দ প, ম প গ ম র স
গায়কি ও কারিগরি বৈশিষ্ট্য
সুঘরাই রাগের প্রধান কারিগরি জটিলতা ও মাধুর্য লুকিয়ে আছে এর অঙ্গ-মিশ্রণ এবং স্বর প্রক্ষেপণের ওপর। এটি প্রধানত কাফী ঠাটের রাগ হলেও এর অবরোহে শুদ্ধ ধৈবতের (দ) বিশেষ কাজ একে কানাড়া পরিবারের অন্যান্য সদস্য থেকে স্পষ্ট পৃথক করে।
১. মধ্যম স্বরের প্রাধান্য: বাদী স্বর ‘মধ্যম’ হওয়ায় রাগের বিস্তার মূলত মধ্য ও তারা সপ্তককে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়। স র ম প সংগীতিতে ঋষভ থেকে সরাসরি মধ্যমে লাফ দেওয়া সুঘরাইয়ের অন্যতম প্রধান চাবিকাঠি।
২. শুদ্ধ ধৈবতের প্রয়োগ: সুহা কানাড়া বা দেবশাখের সাথে সুঘরাইয়ের বড় পার্থক্য তৈরি করে এর শুদ্ধ ধৈবত। অবরোহে র্স ণ দ প চলনে স্পষ্ট শুদ্ধ ধৈবতের মিষ্টি স্পর্শ রাগে সারং ও কাফির অপূর্ব ছায়াপাত ঘটায়।
৩. গান্ধারের কাজ: এতে অবরোহে কোমল গান্ধারের ব্যবহার হলেও কানাড়ার মতো তাতে ভারী আন্দোলন বা অন্দোলিত গমক দেওয়া হয় না; বরং অতি সূক্ষ্ম ও সোজাভাবে গ ম র স টুকরোটি নিয়ে ষড়্জে ফিরে আসা হয়।
ধ্রুপদ, ধামার এবং বিলম্বিত ও দ্রুত খেয়াল—উভয় ধারাতেই রাগ সুঘরাই চমৎকারভাবে জমে ওঠে। সেতার, সরোদ কিংবা বাঁশিতে রাতের দ্বিতীয় প্রহরে এই রাগের তান ও গতি মেহফিলে এক প্রফুল্ল আনন্দের সঞ্চার করে।
সুর চিকিৎসায় ব্যবহার
সঙ্গীত চিকিৎসার (Music Therapy) দৃষ্টিকোণ থেকে, রাগ সুঘরাইয়ের চপল অথচ শান্ত সুরতরঙ্গ মানুষের ক্লান্তি ও মানসিক অবসাদ দূর করতে বিশেষ ভূমিকা রাখে। সারাদিনের কাজের চাপ শেষে রাতের দ্বিতীয় প্রহরে যখন মস্তিষ্ক শিথিল হতে চায়, তখন এই রাগের মধ্যম ও পঞ্চমের ভারসাম্যপূর্ণ চলন মানুষের মেজাজকে উৎফুল্ল রাখতে এবং পজিটিভ এনার্জি ফিরিয়ে আনতে সাহায্য করে।
সম্পর্কিত রাগের তালিকা
- রাগ সুহা কানাড়া: সুঘরাইয়ের সবচেয়ে কাছের আত্মীয়; তবে সুহাতে অবরোহে কোমল ধৈবত ব্যবহৃত হয়, যেখানে সুঘরাইতে ব্যবহৃত হয় শুদ্ধ ধৈবত।
- রাগ দেবশাখ: ভোরের রাগ হলেও সুঘরাইয়ের সাথে এর স্বরগত ব্যাপক সামঞ্জস্য রয়েছে; তবে দেবশাখে বিলাবল অঙ্গের প্রাবল্য অনেক বেশি।
- রাগ নায়কী কানাড়া: কাফী ঠাটেরই আরেকটি রূপ; তবে নায়কী অনেক বেশি ব্যাকুল, করুণ ও গম্ভীর মেজাজের।
- রাগ বৃন্দাবনী সারং: সারং অঙ্গের প্রভাবে সুঘরাইয়ের আরোহণে কখনো কখনো বৃন্দাবনী সারং-এর মতো চপল রূপ ভেসে ওঠে।