ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের বিশাল চত্বরে প্রভাতকালীন রাগগুলোর মধ্যে অন্যতম সুপরিচিত, প্রফুল্ল এবং সর্বজনসমাদৃত একটি ধ্রুপদী রূপ হলো ‘রাগ আলহাইয়া বিলাবল’ (বা সংক্ষেপে রাগ আলহাইয়া)। সাধারণ শ্রোতা থেকে শুরু করে উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের প্রথম পাঠ নেওয়া শিক্ষার্থী—সকলের কাছেই এই রাগটি অত্যন্ত প্রিয়। বিলাবল ঠাটের মূল প্রতিনিধি রাগ ‘শুদ্ধ বিলাবল’ হলেও আধুনিক শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের আসরে মূল শুদ্ধ বিলাবলের চেয়ে আলহাইয়া বিলাবলের পরিবেশনাই সবচেয়ে বেশি শোনা যায়। দিনের শুরুতে ভোরের স্নিগ্ধ সূর্যালোকে যে এক প্রফুল্লতা, নতুন আশার আলো এবং আত্মবিশ্বাসের জাগরণ ঘটে, এই রাগের সুরতরঙ্গ যেন ঠিক সেই সুরটিকেই ফুটিয়ে তোলে।
সঙ্গীত শাস্ত্রে বিভিন্ন আঞ্চলিক ও ঘরানায় এটি ‘আলহাইয়া বিলাবল’, ‘আলহাইয়া’ কিংবা কেবল ‘বিলাবল’ নামেও ব্যাপকভাবে পরিচিত।
বিলাবল পরিবারের নামকরণ এবং মৌলিক কাঠামোর শিকড় লুকিয়ে রয়েছে প্রাচীন শাস্ত্রীয় ব্যাকরণে। পশ্চিমা সঙ্গীতের ‘মেজর স্কেল’ (Major Scale)-এর সাথে আমাদের বিলাবল ঠাটের স্বরগুলোর হুবহু মিল রয়েছে, যেখানে মূলত সমস্ত স্বরই শুদ্ধভাবে ব্যবহৃত হয়। তবে ‘শুদ্ধ বিলাবল’ গাওয়ার সময় সামান্য অসাবধানতায় অন্যান্য রাগের ছায়া চলে আসার ঝুঁকি থাকে বলে সুরসাধকেরা এতে কোমল নিখাদের এক অতি সূক্ষ্ম বক্র প্রয়োগ যুক্ত করে ‘আলহাইয়া বিলাবল’-এর রূপ দেন।
এই সামান্য পরিবর্তনের ফলেই রাগটির মিষ্টতা ও বৈচিত্র্য বহুলাংশে বৃদ্ধি পায়। করুণ বা বিরহ রসের বদলে এই রাগের মূল রস হলো বীর, অদ্ভুত এবং শান্ত রস—যা মনকে এক ধরনের মানসিক শক্তি ও আনন্দ দান করে।
রাগের শাস্ত্রীয় কাঠামো
- ঠাট: বিলাবল ঠাট।
- জাতি: ষাড়ব-সম্পূর্ণ (আরোহণে মধ্যম স্বরটি সাধারণত বর্জিত বা বক্রভাবে এড়ানো হয় এবং অবরোহণে সাতটি স্বরই ব্যবহৃত হয়)।
- বাদী স্বর: ধ (ধৈবত)।
- সমবাদী স্বর: গ (গান্ধার)।
- বর্জিত স্বর: আরোহণে মধ্যম (ম) স্বরটি প্রথানুসারে সরাসরি ব্যবহৃত হয় না।
- ব্যবহৃত স্বর: শুদ্ধ ঋষভ (র), শুদ্ধ গান্ধার (গ), শুদ্ধ মধ্যম (ম), শুদ্ধ পঞ্চম (প), শুদ্ধ ধৈবত (দ), শুদ্ধ নিখাদ (ন), কোমল নিখাদ (ণ – কেবল অবরোহে বক্রভাবে) এবং ষড়্জ (স)।
- সময়: দিনের প্রথম প্রহর (সকাল ৬টা থেকে ৯টার মধ্যবর্তী সময়)।
- প্রকৃতি: অত্যন্ত প্রফুল্ল, আনন্দদায়ক, প্রসংন্ন ও উজ্জ্বল।
আরোহণ: স র গ র, গ ম প, দ ণ দ প, নি ধ র্স
অবরোহণ: র্স নি ধ প, ম গ, র স
প্রধান স্বরসংগতি (পকড়):
গ প ধ নি র্স, র্স নি ধ প, দ ণ দ প, ম গ, র সগায়কি ও কারিগরি বৈশিষ্ট্য
আলহাইয়া বিলাবলের আসল সৌন্দর্য ও কারিগরি দক্ষতা লুকিয়ে রয়েছে কোমল নিখাদের (ণ) বক্র প্রয়োগ এবং ‘গ-ম-রে-সা’ চালের ওপর।
১. কোমল নিখাদের অনবদ্য কাজ: এই রাগে কোমল নিখাদ সরাসরি ব্যবহৃত হয় না। অবরোহে পঞ্চমে নামার আগে
দ ণ দ প (ধৈবত-কোমল নিখাদ-ধৈবত-পঞ্চম) বাক্যাংশে অতি সূক্ষ্মভাবে কোমল নিখাদের স্পর্শ দেওয়া হয়। এই ছোট্ট বক্র টুকরোটিই আলহাইয়া বিলাবলকে অন্যান্য বিলাবল রূপ থেকে আলাদা চেনার প্রধান উপায়।২. আরোহে মধ্যম বর্জনের নিয়ম: আরোহণে সাধারণত মধ্যম এড়াতে
স র গ র, গ ম প বা গ প ধ নি র্স চলন নেওয়া হয়।৩. ধৈবত ও গান্ধারের জোর: বাদী স্বর ‘ধৈবত’ এবং সমবাদী ‘গান্ধার’ হওয়ায় সুরের কাজ প্রধানত মধ্য ও তারা সপ্তকে বিস্তার লাভ করে।
ধ্রুপদ, ধামার, খেয়াল, এমনকি সুগম সঙ্গীত ও রবীন্দ্রসঙ্গীতেও আলহাইয়া বিলাবলের সুরের বিপুল ব্যবহার রয়েছে (যেমন—রবীন্দ্রনাথের বিখ্যাত গান ‘জাগিয়ে দাও আপনা মাঝে’)। উপরে যুক্ত করা পরিবেশনাগুলোতে শিল্পীদের কণ্ঠে এই রাগের সরল অথচ অলঙ্কৃত সুরবিন্যাস অত্যন্ত স্পষ্টভাবে উপলব্ধি করা যায়।
সুর চিকিৎসায় ব্যবহার
সঙ্গীত চিকিৎসা (Music Therapy)-র গবেষণায় দেখা গেছে যে, সকালে আলহাইয়া বিলাবল রাগের অল-শুদ্ধ স্বরের প্রক্ষেপণ মানুষের ভেতরের অলসতা ও বিষণ্নতা (Depression) দূর করতে দারুণ কাজ করে। এর ইতিবাচক সুরতরঙ্গ মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা বাড়াতে, মনকে চাপমুক্ত রাখতে এবং এক নতুন উদ্দীপনা সঞ্চার করতে সাহায্য করে।
সম্পর্কিত রাগের তালিকা
- রাগ শুদ্ধ বিলাবল: বিলাবল ঠাটের মূল ভিত্তি; যেখানে কোমল নিখাদের কোনো ব্যবহার থাকে না, সব স্বরই সোজা শুদ্ধভাবে লাগানো হয়।
- রাগ দেবগিরি বিলাবল: বিলাবল অঙ্গের আরেকটি মার্জিত রূপ; যেখানে আরোহে সামান্য কানাড়া বা আসাবরী অঙ্গের ছায়া দেখা যায়।
- রাগ যমনী বিলাবল: রাগ যমন এবং বিলাবলের অপূর্ব মেলবন্ধনে তৈরি রাগ, যেখানে তীব্র মধ্যম ও শুদ্ধ মধ্যম উভয়ের কাজ থাকে।
- রাগ সুখিয়া বিলাবল: বিলাবল অঙ্গেরই একটি স্নিগ্ধ রূপ; যা আলহাইয়ার মতোই প্রফুল্ল মেজাজ বহন করে।
রাগ আলহাইয়া বিলাবল হলো ভোরের আলোয় উদ্ভাসিত ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের এক চিরপ্রফুল্ল সুরছবি। জটিল বা ভারাক্রান্ত ব্যাকরণের বদলে এর সরল, উজ্জ্বল ও প্রাঞ্জল সুরপ্রক্ষেপণ যেকোনো সাধারণ শ্রোতাকেও অনায়াসে সুরের মায়ায় বাঁধতে পারে। ভোরের মিষ্টি বাতাসে যখন আলহাইয়া বিলাবলের ‘গ প ধ নি র্স’-র তান প্রতিধ্বনি ছড়িয়ে দেয়, তখন তা চারপাশের পরিবেশকে এক অপার্থিব আনন্দ ও শুভ্রতায় ভরিয়ে তোলে।
সোর্স ও প্রামাণ্য রেফারেন্স
১. ভাতখণ্ডে সঙ্গীত শাস্ত্র (অংশ ২ ও ৩) — পণ্ডিত বিষ্ণুনারায়ণ ভাতখণ্ডে।
২. রাগ প্রবীণ ও রাগ বিজ্ঞান — পণ্ডিত বিনায়ক রাও পটবর্ধন।
৩. ভারতীয় সঙ্গীতকোষ — বিমলকান্ত রায় চৌধুরী।
৪. আইটিসি সঙ্গীত রিসার্চ একাডেমি (SRA) আর্কাইভ — বিলাবল ঠাট ও আলহাইয়া বিলাবল স্বর বিশ্লেষণ।