ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের মেহফিলে ঋতুভিত্তিক ও সময়ভিত্তিক জোড়-রাগের নান্দনিক সংমিশ্রণ চিরকালই এক অদ্ভুত আকর্ষণের জন্ম দিয়েছে। প্রভাতলগ্নের আলোকোজ্জ্বল প্রফুল্লতা এবং বর্ষাগমের সুগম্ভীর মেঘাচ্ছন্ন অবয়ব যখন একই সুরের ক্যানভাসে এসে মেলে, তখন সৃষ্টি হয় এক বিরল, স্নিগ্ধ ও পরম আভিজাত্যময় জোড়-রাগ—‘রাগ বিলাবল-মালহার’ (বা সংক্ষেপে ‘বিলাবল-মালহার’)। নাম থেকেই স্পষ্টভাবে অনুমেয় যে, এটি উত্তর ভারতীয় উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের দুটি সুপ্রাচীন ও পরম মহিমান্বিত অঙ্গ—প্রাতঃকালীন বিলাবল এবং বর্ষাগমের জলদস্যাম মালহার অঙ্গের সুনিপুণ সাঙ্গীতিক সংমিশ্রণ।
সঙ্গীত শাস্ত্রে প্রথা ও প্রামাণ্য গ্রন্থে এটি ‘বিলাবল মালহার’, ‘বিলাবল-মালহার’ বা ‘বিলম্বিত বিলাবল-মালহার’ নামেও বহুল সমাদৃত।
ইতিহাস ও রাগের পরিচয়
শাস্ত্রীয় সঙ্গীত গবেষক ও প্রখ্যাত সঙ্গীতকারদের মতে, রাগ বিলাবল-মালহার কোনো একক মৌলিক জনক রাগ নয়; এটি মূলত বিলাবল ও কাফী ঠাটের সীমান্তে অবস্থানকারী একটি অত্যন্ত সুসংহত ও আভিজাত্যপূর্ণ জোড়-রাগ (Jod-Raga)। দিনের প্রথম প্রহরের স্ফটিকস্বচ্ছ রাগ বিলাবলের নিষ্কলুষ অল-শুদ্ধ স্বরবিন্যাসের মধ্যে বর্ষার প্রখ্যাত মালহার অঙ্গের (বিশেষ করে ‘সুর মালহার’ বা ‘মিঞাঁ কি মালহার’-এর বক্র চলন ও কোমল নিখাদ) অতি সূক্ষ্ম স্পর্শ ঘটিয়ে প্রাচীন সুরসাধকগণ এই রূপটির উদ্ভাবন করেছিলেন।
বিলাবল রাগের প্রাতঃকালীন স্নিগ্ধ শুভ্রতার সাথে যখন মালহারের মেঘলা বাতাসের সুগম্ভীর আর্তি ও বারিপাতের অনুরণন যুক্ত হয়, তখন এতে ভক্তি ও বৈরাগ্যের পাশাপাশি এক অনাবিল প্রশান্তি ফুটে ওঠে। এর প্রধান রস হলো ভক্তিরস, শান্ত রস এবং প্রসন্ন রস।
রাগের শাস্ত্রীয় কাঠামো
- ঠাট: বিলাবল ঠাট (তবে অবরোহণে মালহার অঙ্গের কোমল নিখাদ থাকার কারণে কাফী-বিলাবল মিশ্র অঙ্গ হিসেবেও গণ্য হয়)।
- জাতি: সম্পূর্ণ-সম্পূর্ণ (আরোহণ এবং অবরোহণ—উভয় ক্ষেত্রেই সাতটি স্বর ব্যবহৃত হয়)।
- বাদী স্বর: ধ (শুদ্ধ ধৈবত) বা প (শুদ্ধ পঞ্চম—ঘরানাভেদে)।
- সমবাদী স্বর: গ (শুদ্ধ গান্ধার) বা স (ষড়্জ)।
- বর্জিত স্বর: কোনো স্বর বর্জিত নয়।
- ব্যবহৃত স্বর: শুদ্ধ ঋষভ (র), শুদ্ধ গান্ধার (গ), শুদ্ধ মধ্যম (ম), শুদ্ধ পঞ্চম (প), শুদ্ধ ধৈবত (দ), শুদ্ধ নিখাদ (ন – আরোহে) এবং কোমল নিখাদ (ণ – অবরোহে অতি সূক্ষ্মভাবে)।
- সময়: বর্ষা ঋতুতে দিনের প্রথম প্রহর (সকাল ৬টা থেকে ৯টা); তবে অন্যান্য ঋতুতেও ভোরের শান্ত প্রহরে গীত হতে পারে।
- প্রকৃতি: অত্যন্ত স্নিগ্ধ, শুভ্র, গম্ভীর, প্রফুল্ল ও আধ্যাত্মিক ভাবাপন্ন।
আরোহণ (বিলাবল অঙ্গ প্রাধান্য): স র গ ম প, ধ নি র্স
অবরোহণ (মালহার অঙ্গ প্রাধান্য): র্স ণ ধ প, ম প, g m r s
প্রধান স্বরসংগতি (পকড়):
গ র, গ প, ধ নি র্স, র্স ণ ধ প, m p g m r s
গায়কি ও কারিগরি বৈশিষ্ট্য
রাগ বিলাবল-মালহারের আসল কারিগরি দক্ষতা ও নান্দনিক সৌন্দর্য লুকিয়ে রয়েছে প্রাতঃকালীন বিলাবলের শুভ্র ভাব রক্ষা করে তাতে মালহারের গম্ভীর ছোঁয়া ফুটিয়ে তোলার ওপর।
১. আরোহণে বিলাবল ও অবরোহণে মালহার: আরোহণে স্পষ্ট বিলাবলের মতো শুদ্ধ নিখাদ স্পর্শ করে তারা সপ্তকের ষড়্জে যাওয়া হয় (গ ম প ধ নি র্স)। কিন্তু অবরোহণে নামার সময় সরাসরি বিলাবলের শুদ্ধ অবরোহ না নিয়ে মালহার অঙ্গের প্রখ্যাত র্স ণ ধ প এবং m p g m r s (পঞ্চম থেকে গান্ধারের বক্র মীড়) প্রয়োগ করে ষড়্জে নামা হয়।
২. প্রাতঃকালীন আলোর সাথে সজল মেঘের মেলবন্ধন: এই রাগে বিলাবলের উজ্জ্বল প্রফুল্লতা যেন মেঘলা ভোরের নরম আলোকে নির্দেশ করে, আর অবরোহী মালহার তান সেই আলোয় ঝরে পড়া প্রথম পশলা বৃষ্টির অভিজ্ঞতা সৃষ্টি করে।
৩. ধৈবত ও পঞ্চমের ভারসাম্য: বাদী-সমবাদী স্বরের সুসংহত ব্যবহারে প্রাতঃকালের মেজাজ ক্ষুণ্ন না করে বর্ষার গাম্ভীর্য ফুটিয়ে তোলাই গায়কের মূল পরীক্ষা।
ধ্রুপদ, ধামার এবং প্রথাগত প্রাতঃকালীন খেয়াল বন্দিশে বিলাবল-মালহারের মাধুর্য চমৎকারভাবে ধরা পড়ে। সেতার, সরোদ, বাঁশি ও সারেঙ্গীতে ভোরের স্নিগ্ধ প্রহরে এই রাগের আলাপ আসরে এক অপূর্ব শুভ্র ও আভিজাত্যপূর্ণ শান্ত পরিবেশের জন্ম দেয়। ওপরের সংযুক্ত ভিডিওগুলোতে প্রখ্যাত সুরসাধকদের কণ্ঠে ও যন্ত্রে এই রাগের অনবদ্য বিস্তার সরাসরি উপভোগ করা যায়।
সম্পর্কিত রাগের তালিকা
- রাগ শুদ্ধ বিলাবল: বিলাবল ঠাটের মূল খাঁটি রূপ; এতে মালহারের মতো কোনো অবরোহী কোমল নিখাদ বা বক্র মীড় থাকে না।
- রাগ আলহাইয়া বিলাবল: প্রাতঃকালীন বিলাবলের মূল শাখা; এতে অবরোহে কোমল নিখাদ থাকলেও তা মালহারের মতো ভারী চরণে ব্যবহৃত হয় না।
- রাগ মিঞাঁ কি মালহার: মালহার পরিবারের মূল সুগম্ভীর রাগ; বিলাবল-মালহারের চেয়ে এর মেজাজ অনেক বেশি ভারী ও মধ্যরাত্রির উপযোগী।
- রাগ বাহার-মালহার: বসন্ত ও বর্ষার সংমিশ্রণে গঠিত অত্যন্ত চপল ও প্রফুল্ল জোড়-রাগ।
রাগ বিলাবল-মালহার হলো ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের সেই অনন্য সৃষ্টি, যা ভোরের শুভ্র আলোকরেখাকে বর্ষার স্নিগ্ধ বারিপাতের সাথে মিলিয়ে দেয়। প্রাতঃকালের পবিত্রতা আর বর্ষার সুগম্ভীর ব্যাকুলতা এখানে এসে এক পরম সমান্তরালে দাঁড়িয়েছে। মেঘলা ভোরে যখন সেতারের তারে কিংবা শিল্পীর কণ্ঠে বিলাবল-মালহারের ‘গ র, গ প, র্স ণ ধ প, m p g m r s’-র মায়াবী তান ভেসে আসে, তখন তা মুহূর্তের মধ্যে মনকে এক অনাবিল, সজল ও পবিত্র সুরলোকে নিয়ে যায়।
সোর্স ও প্রামাণ্য রেফারেন্স
১. ক্রমিক পুস্তক মালিকা (খণ্ড ২ ও ৪) — পণ্ডিত বিষ্ণুনারায়ণ ভাতখণ্ডে।
২. রাগ প্রবীণ ও রাগ বিজ্ঞান — পণ্ডিত বিনায়ক রাও পটবর্ধন।
৩. Raganidhi (Vol 1-4) — বি. সুব্বা রাও (প্রখ্যাত সঙ্গীত তাত্ত্বিক)।
৪. আইটিসি সঙ্গীত রিসার্চ একাডেমি (SRA) আর্কাইভ — বিলাবল ও মালহার অঙ্গের জোড়-রাগ বিশ্লেষণ।