হিন্দুস্তানি শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের প্রভাতী ভুবনে বৈরাগ্য এবং আশাপূর্ণ ব্যাকুলতার এক অনবদ্য মেলবন্ধন হলো ‘রাগ যোগিয়া আসাবরী’ (বা সংক্ষেপে যোগিয়া আসাবরী)। নাম থেকেই স্পষ্ট যে, এটি প্রাতঃকালীন যোগিয়া (জোগিয়া) অঙ্গ এবং সুপ্রসিদ্ধ আশাবরী (আসাবরী) অঙ্গের সুনিপুণ সংমিশ্রণে গঠিত একটি পরম আভিজাত্যপূর্ণ ও ভাবগম্ভীর জোড়-রাগ (Jod-Raga)।
যোগিয়া রাগের বৈরাগ্যময় সান্যাসি মেজাজের সাথে যখন আসাবরীর করুণ ও আশাবোঝাই ব্যাকুল সুরচ্ছটা যুক্ত হয়, তখন প্রাতঃকালীন মেহফিলে তৈরি হয় এক অপূর্ব আধ্যাত্মিক আবহ।
ইতিহাস ও রাগের পরিচয়
শাস্ত্রীয় সঙ্গীত গবেষক ও প্রখ্যাত ওস্তাদদের মতে, রাগ যোগিয়া আসাবরী প্রাতঃকালীন ভৈরব ও আসাবরী ঠাটের সীমান্তে অবস্থানকারী একটি অতি মনোহর জোড়-রাগ। যোগিয়া রাগের মূল আরোহী কাঠামোকে অক্ষুণ্ণ রেখে অবরোহণে আসাবরী অঙ্গের রূপায়ণ ঘটানোই এই রাগের মূল চাবিকাঠি।
ভোরের উদীয়মান শুভ্র আলোয় যখন তানপুরের সুরের ওপর এই রাগের বিস্তার ঘটে, তখন শ্রোতার মনে বৈরাগ্য, ভক্তি এবং চরম আত্মনিবেদনের সুর জাগরিত হয়। এর মূল রস হলো করুণ, ভক্তি এবং শান্ত রস।
রাগের শাস্ত্রীয় কাঠামো
- ঠাট: ভৈরব ও আসাবরী ঠাটের সংমিশ্রণ।
- জাতি: ঔড়ব-সম্পূর্ণ (আরোহণে পাঁচ স্বর, অবরোহণে সাতটি স্বর)।
- বাদী স্বর: ম (শুদ্ধ মধ্যম)।
- সমবাদী স্বর: স (ষড়্জ)।
- বর্জিত স্বর: আরোহণে গান্ধার (গ) ও নিখাদ (ন) বর্জিত।
- ব্যবহৃত স্বর: কোমল ঋষভ (ঋ/r), কোমল গান্ধার (জ্ঞ/g – অবরোহে আসাবরী অঙ্গে), শুদ্ধ মধ্যম (ম/M), শুদ্ধ পঞ্চম (প/P), কোমল ধৈবত (ধা/d) এবং কোমল নিখাদ (ণ/n)।
- সময়: প্রাতঃকাল (দিনের ১ম প্রহর — ভোর ৫টা থেকে সকাল ৮টা)।
- প্রকৃতি: অত্যন্ত সুগভীর, ব্যাকুল, করুণ ও বৈরাগ্যপ্রধান।
আরোহণ (যোগিয়া অঙ্গ প্রাধান্য):
স ঋ ম প, ধ র্স(S r M P, d S’)
অবরোহণ (আসাবরী অঙ্গ প্রাধান্য):
র্স ণ ধ প, ম জ্ঞ ঋ স(S’ n d P, M g r S)
প্রধান স্বরসংগতি (পকড়):
স ঋ ম প, ধ্ ণ ধ্ প, ম জ্ঞ ঋ, ঋ স(S r M P, d n d P, M g r, r S)
গায়কি ও কারিগরি বৈশিষ্ট্য
১. আরোহণে যোগিয়া ও অবরোহণে আসাবরী: আরোহণে মূল যোগিয়ার মতো
স ঋ ম প, ধ র্স স্বরপ্রক্ষেপণ নেওয়া হয়, যেখানে গান্ধার ও নিখাদ সম্পূর্ণ বর্জিত। কিন্তু অবরোহণে নামার সময় মূল যোগিয়া থেকে সরে এসে আসাবরী অঙ্গের কোমল নিখাদ ও কোমল গান্ধার স্পর্শ করে র্স ণ ধ ণ ধ প, ম জ্ঞ ঋ স গ্রহণ করা হয়।২. দুই অঙ্গের ভারসাম্য: আরোহী যোগিয়ার সন্যাসি আকুতির পর অবরোহী আসাবরীর কোমল গান্ধারের (g) সুমিষ্ট মীড় রাগটিতে এক অনাবিল আশাপূর্ণ করুণ রস ফুটিয়ে তোলে।
৩. প্রসঙ্গ ও বিস্তার: বিলম্বিত ও মধ্যালয়ের খেয়াল বন্দিশ এবং সেতার, সানাই ও সারেঙ্গীর আলাপচারিতায় এই রাগের সৌন্দর্য অসাধারণভাবে বিকশিত হয়।
সম্পর্কিত রাগের তালিকা
- রাগ যোগিয়া: ভৈরব ঠাটের মূল করুণ ও বৈরাগ্যপ্রধান প্রাতঃকালীন রাগ।
- রাগ আসাবরী: আসাবরী ঠাটের জনক রাগ; যার অবরোহী অঙ্গের প্রয়োগ এতে ঘটে।
- রাগ কালকাটি যোগিয়া: যোগিয়া রাগের প্রাচীন ও উপ-শাস্ত্রীয় আঞ্চলিক রূপ।
- রাগ দেবগান্ধার: আসাবরী ও ভৈরব অঙ্গের নিকটবর্তী আরেকটি প্রাতঃকালীন রাগ।
সোর্স ও প্রামাণ্য রেফারেন্স
১. Raganidhi (Vol 1-4) — বি. সুব্বা রাও (Music Academy, Madras)।
২. ক্রমিক পুস্তক মালিকা (খণ্ড ২ ও ৩) — পণ্ডিত বিষ্ণুনারায়ণ ভাতখণ্ডে।
৩. Hindustani Raga Index & SRA Archives — যোগিয়া ও আসাবরী অঙ্গের জোড়-রাগ বিশ্লেষণ।
আরও দেখুন:
- রাগ কালকাটি যোগিয়া | অসুরের সুরলোকযাত্রা সিরিজ
- রাগ ভৈরব (বা ভায়রোঁ) | অসুরের সুরলোকযাত্রা সিরিজ
- অসুরের সুরলোকযাত্রা সিরিজ সূচি [ গান খেকো ]