ইসলাম ও মুসলিম সিরিজ

আমাদের আলেম সমাজ কি মুসলিমদের পক্ষে না বিপক্ষে? । ইসলাম ও মুসলিম সিরিজ

আমাদের আলেম সমাজ কি মুসলিমদের পক্ষে না বিপক্ষে

যাঁরা মনে করেন কোনো আলেম বা বুজুর্গ রাগ হলে তাঁর বেহেশত হাতছাড়া হয়ে যেতে পারে, দয়া করে এমন কোনো লোক আমার এই লেখাটি পড়বেন না। কারণ আমার এই লেখাটি কোনো গীবত নয়, বরং এটি এক হাকিকত-সন্ধানী ‘দাওয়াতে ইলম’। এই লেখা কেবল তাঁদেরই জন্য—যাঁরা অন্ধ ভয়, অন্ধবিশ্বাস ও কুসংস্কারমুক্ত হয়ে নিখাদভাবে ইসলাম ও মুসলিম উম্মাহকে ভালোবাসেন। অন্ধ আলেম-পূজারী বা ব্যক্তিপূজারীদের জন্য এই খোলামেলা আলোচনা নয়।

রসুলুল্লাহ (সা:)-এর জমানায় ‘আলেম সমাজ’ নামে পৃথক কোনো পেশাদার গোষ্ঠী না থাকলেও পরবর্তী সময়ে, বিশেষত রাজনৈতিক নানা অনুঘটক ও সামাজিক স্বার্থের প্রভাবে, একটি পেশাদার আলেম সমাজের উত্থান ও প্রতিষ্ঠা ঘটে। এই পেশাদার আলেম সমাজ নিজেদের দায়িত্ব ব্যাখ্যা করতে গিয়ে সদম্ভে দাবি করে থাকেন যে—তারা মুসলিম উম্মাহর দুনিয়া ও আখিরাত—উভয় জাহানের কল্যাণের জন্য দিকনির্দেশনা প্রদান করেন এবং ধর্মের যাবতীয় রুসুমাত ও শরয়ী বিধান শুদ্ধভাবে পালনে সাহায্য করেন। তাদের এই স্বঘোষিত দাবির মূল ভিত্তি ধরা হয় সেই চিরন্তন কোরআনী আর্জিকে: “রাব্বানা আতিনা ফিদ্দুনিয়া হাসানা, ওয়া ফিল আখিরাতি হাসানা”—অর্থাৎ প্রথমে দুনিয়াবি জীবনে সঠিক পথের নির্দেশনার মাধ্যমে ‘হাসানা’ বা কল্যাণ অর্জন, এবং অতঃপর আখিরাতের নাজাত ও কামিয়াবি লাভ। কিন্তু অত্যন্ত আফসোস ও হতাশার সাথে লক্ষ্য করতে হয়, ইতিহাস ও বাস্তবতার কষ্টিপাথরে বিচার করলে দেখা যায়, তারা নিজেদের এই দুটি দায়িত্বের একটিও সহীহভাবে পালন করতে পারেননি।

প্রথমে যদি তাদের দ্বিতীয় দায়িত্ব—অর্থাৎ আখিরাতের নাজাত ও বিশ্বাসের নিরাপত্তার ভূমিকার দিকে তাকাই, তবে সেখানে চরম ব্যর্থতার এক করুণ চিত্র ফুটে ওঠে। আখিরাতে মুক্তির জন্য দ্বীনের মূল নির্যাসটিই নৈতিকতা, আমল এবং আত্মশুদ্ধিকেন্দ্রিক। কিন্তু আমাদের এই পেশাদার আলেম সমাজ কি সাধারণ মানুষের মধ্যে সেই উন্নত নৈতিক চরিত্র গঠনে সামান্যতম অবদান রাখতে পেরেছেন? উত্তর হলো, না। আজ সমাজে সুদ, ঘুষ ও দুর্নীতিগ্রস্ত উপার্জনের হারামে-সামান দিয়ে একের পর এক বিশাল মসজিদ ও মাদরাসা গড়ে উঠছে, কিন্তু আলেম সমাজ সেই হারাম মাল ও অর্থ বয়কট করা বা আটকানোর কোনো সৎ সাহস দেখাতে পারছেন না; বরং তারা সেই হারাম মেহনতের অর্থের ওপর ভর করেই আয়েশ করছেন। সমাজের একটি বড় অংশ আজ উগ্রতা ও জাজবাতি জঙ্গিবাদী মানসিকতায় নিমজ্জিত হচ্ছে, কিন্তু দ্বীনী শিক্ষার মিম্বার থেকে উগ্রতার এই বিস্তার রোখার মতো কোনো সুস্থ ও দূরদর্শী উদ্যোগ তাদের নেই। ‘ওয়াজ মাহফিল’-এর মতো পবিত্র দ্বীনী প্ল্যাটফর্মগুলোকে আজ রূপান্তর করা হয়েছে কুরুচিপূর্ণ গালিগালাজ, ব্যক্তিগত আক্রোশ মেটানো, গীবত ও মাযহাবী বিভেদ ছড়ানোর কারখানায়, যা বন্ধ করতে তারা সম্পূর্ণ ব্যর্থ। তার চেয়েও ভয়াবহ ও লজ্জাষ্কর সত্য হলো—তাদের একাংশের অকর্মণ্যতা ও বিকৃতির কারণে আজ পবিত্র মসজিদ ও মাদরাসাগুলোর মতো স্থানগুলো শিশু নির্যাতন ও বলাৎকারের কেন্দ্রে পরিণত হচ্ছে, যা রোধে প্রাতিষ্ঠানিক কোনো কঠোর পদক্ষেপ চোখে পড়ে না।

একই সাথে, আখিরাতের ইমানি আকীদার ওপর বুদ্ধিবৃত্তিক আক্রমণের মুখোমুখি দাঁড়িয়েও আলেমদের এই ব্যর্থতা আজ আরও নগ্ন হয়ে ফুটে উঠেছে। অতীতে ইসলামের ওপর আক্রমণ চালাত মূলত নাস্তিক ও ভিন্নধর্মী গোষ্ঠীগুলো। আলেম সমাজ তখন তাদের ঢালাওভাবে মিথ্যুক বা শত্রু আখ্যা দিয়ে এবং গালিগালাজ করে সাধারণ মুসলমান ঈমান রক্ষার একটি বাহ্যিক বয়ান তৈরি করে রাখতেন। কিন্তু বর্তমান যুগে এই সংকটের মাত্রা ভিন্ন রূপ ধারণ করেছে। আজ ইসলামের মৌলিক আকীদার বিরুদ্ধে সরাসরি প্রশ্ন তুলছেন ও আক্রমণ করছেন ‘সাবেক মুসলিম’ (Ex-Muslims) বা ইসলাম ত্যাগকারীরা। তারা কাঠামোর ভেতর থেকে উঠে এসে শাস্ত্রীয় ও যুক্তিভিত্তিক নানাবিধ খটকা ও প্রশ্ন ছুড়ে দিচ্ছেন। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, এই নতুন ও তীব্র বুদ্ধিবৃত্তিক চ্যালেঞ্জের মুখে আলেম সমাজ আজ প্রায় বাক্যহারা ও হিরান-পেরেশান। তারা যৌক্তিক, ইলমি ও প্রজ্ঞাপূর্ণ জবাব দেওয়ার বদলে কেবল গালিগালাজ, ব্যক্তিগত আক্রমণ ও ফতোয়াবাজির পুরোনো অভ্যাসে আটকে আছেন। অথচ সাধারণ মুসলমান থেকে শুরু করে আলেম সমাজ—সবাই ভেতরের সত্যটি অনুধাবন করতে পারছেন যে, এই ইলমি লড়াই কোনো গালাগালি বা হিংস্রতা দিয়ে জেতা সম্ভব নয়। ‘ইলহাদ’ (নাস্তিকতা) এবং ‘এক্স-মুসলিম’ সংক্রান্ত এই বুদ্ধিবৃত্তিক সংকটের সমাধান কেবল গভীর পড়াশোনা, বস্তুনিষ্ঠ যুক্তি ও তর্ক-বিতর্কের মাধ্যমেই সম্ভব। আর এই প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্বটি যার ওপর সবচেয়ে বেশি বর্তায়, সেই পেশাদার আলেম সমাজ নৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক—উভয় দিক থেকেই তা পালন করতে পুরোপুরি ব্যর্থ হচ্ছেন।

এবার আসা যাক তাদের প্রথম এবং সবচেয়ে বড় দায়িত্বটির বিষয়ে—অর্থাৎ উম্মাহর দুনিয়াবি কল্যাণ ও হাসানা সাধন। বাস্তব অর্থে, দুনিয়াবি বিষয়ে দিকনির্দেশনা দেওয়ার এই স্বঘোষিত দাবিটি পেশাদার আলেম সমাজের করাটাই নীতিগতভাবে চরম অন্যায্য ও অযৌক্তিক। কারণ একজন ‘আলেমে দ্বীন’ বা শরীয়তের বিষয়ে অবশ্যই পণ্ডিত হতে পারেন। কিন্তু তিনি বর্তমান পৃথিবীর জটিল সমাজব্যবস্থা (আলিমে ইজতিমা), আধুনিক সভ্যতা (আলিমে হাদারা), সাহিত্য (আলিমে আদব), মৌলিক দর্শন (আলিমে ফালসাফা), বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি (আলিমে ইলম), আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তি (আলিমে তাকনোলজিয়া) কিংবা ভূ-রাজনীতি (আলিমে সিয়াসা)—এর কোনোটিরই বিশেষজ্ঞ বা প্রকৃত জ্ঞানচর্চাকারী নন। এসব আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞানের বিষয়ে প্রাতিষ্ঠানিক মাদরাসা সিলেবাসে তাদের পড়াশোনা অত্যন্ত নগণ্য এবং তাদের অর্জিত ধারণা খুবই সীমিত। ফলে জ্ঞানের মৌলিক নীতি ও নীতিশাস্ত্র (Knowledge Principles) অনুযায়ী, পার্থিব এসব ক্ষেত্রে কোনো প্রকার মতামত, সিদ্ধান্ত বা নির্দেশনা দেওয়ার মতো নূন্যতম প্রাতিষ্ঠানিক কর্তৃত্ব (Authority) আলেম সমাজের নেই। বিশেষজ্ঞজ্ঞান ছাড়া এসব জটিল বিষয়ে সিদ্ধান্ত দিতে গেলে সেই সিদ্ধান্ত ভুল হওয়াটাই স্বাভাবিক ও অনিবার্য। কিন্তু বাস্তবতার চরম পরিহাস হলো—নূন্যতম যোগ্যতা না থাকা সত্ত্বেও বিশ্বপ্রপঞ্চ ও আধুনিক যুগের যাবতীয় আবিষ্কার নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়ার এক তীব্র ও উদগ্র আগ্রহ এই পেশাদার আলেম সমাজের মধ্যে সর্বদা কাজ করে।

এই অনধিকার চর্চা ও অন্ধ আগ্রহের মাশুল দিতে গিয়ে দুনিয়াবি কল্যাণ সাধনের নামে আলেম সমাজ বারবার সাধারণ মুসলিমদের এমন সব ভ্রান্ত, অসার ও সংকীর্ণ পথে ঠেলে দিয়েছেন, যার ফলে মুসলিম বিশ্ব যুগে যুগে জ্ঞান-বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও উন্নতির দৌড়ে মারাত্মকভাবে পিছিয়ে পড়েছে। চিকিৎসা, তথ্যপ্রযুক্তি, শিক্ষা কিংবা যোগাযোগের ক্ষেত্রে যখনই কোনো নতুন উদ্ভাবন বা বৈজ্ঞানিক অগ্রগতি সামনে এসেছে, তারা তাৎক্ষণিকভাবে নিজেদের সীমিত ধারণার ওপর ভর করে ও ধর্মের দোহাই দিয়ে বাধা সৃষ্টি করেছেন এবং মুসলিমদের অংশ গ্রহণে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছেন। কিন্তু বড়ই আশ্চর্যের বিষয় হলো, যখন কালক্রমে সেই উদ্ভাবন সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকে পড়েছে এবং তারা নিজেরাও তার সুবিধা ভোগ করতে শুরু করেছেন, তখন রাতারাতি ফতোয়া বদলে সেগুলোকে আবার ‘জায়েজ’ বানিয়ে নিয়েছেন।

ঐতিহাসিকভাবে বারবার লক্ষ্য করলে সত্যটি পরিষ্কার হয়ে যায় যে, আলেম সমাজ কখনই মুসলিম উম্মাহকে প্রগতির পথে পরিচালিত করতে পারেননি; বরং সভ্যতার প্রতিটি যুগসন্ধিক্ষণে সঠিক সিদ্ধান্তের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে ইতিহাসের সঠিক পক্ষে (Right side of history) অবস্থান নিতে তারা নির্মমভাবে ব্যর্থ হয়েছেন।

সেজন্যই আমার মন মাঝে মাঝে প্রশ্ন করে—আমাদের এই আলেম সমাজ কি আসলেই আমাদের তথা সাধারণ মুসলিমদের পক্ষে, নাকি কোনো নাদান দোস্তের মতো বিপক্ষে কাজ করছেন? তারা যদি সত্যিই উম্মাহর পক্ষে হয়ে থাকেন, তবে দ্বীন ও দুনিয়ার ক্ষেত্রে বারবার আমাদের এত বড় ক্ষতি করার কারণ কী?

অথচ তাদের প্রতি সাধারণ মুসলিম হিসেবে আমাদের যে দায়িত্ব, তা আমরা যথাযথভাবে পালন করে থাকি। আমরা প্রতিনিয়ত আমাদের কষ্টার্জিত মালের জাকাত, ফিতরা দেওয়ার পাশাপাশি নানাবিধ পন্থায় তাঁদের মাদরাসা ও প্রতিষ্ঠানে অর্থ সাহায্য করে থাকি। সমাজে তাঁদের প্রতি বিশেষ ‘ইহতিরাম’ (শ্রদ্ধা) ও তাকরীম প্রদর্শন করি। কিন্তু আফসোস! তাঁদের এই সুদীর্ঘ দায়িত্বহীনতা ও ঐতিহাসিক ভুল নিয়ে প্রশ্ন তুললে বা হিসাব চাইলে তারা অমনি ‘আগ-বগোলা’ হয়ে ওঠেন কেন?

আমার এই লেখার মূল উদ্দেশ্য হলো—ঐতিহাসিক তথাকথিত ফতোয়া ও ঘটনাপ্রবাহের মাধ্যমে বস্তুনিষ্ঠভাবে তুলে ধরা, কীভাবে এই পেশাদার আলেম সমাজ ইলমি কর্তৃত্ব ছাড়া সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিয়ে যুগের পর যুগ মুসলমানদের প্রগতি, বিজ্ঞানচর্চা ও সামাজিক অগ্রগতিতে চরম বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। এই বাধা ও ঐতিহাসিক ভুলের সংখ্যা এত বিপুল যে একক কোনো লেখায় তার পূর্ণাঙ্গ চিত্র তুলে ধরা অসম্ভব; তবুও সেই সুদীর্ঘ ব্যর্থতার একটি বস্তুনিষ্ঠ দলিল পাঠকের সামনে উপস্থাপন করার চেষ্টা করছি।

 

Table of Contents

তথ্য ও জ্ঞানের সর্বজনীনতার বিরুদ্ধে অবস্থান: প্রিন্টিং প্রেস ও ছাপাখানা বর্জন

ইউরোপে ১৪৪০-এর দশকে গুটেনবার্গ প্রেস আবিষ্কারের পর তথ্য ও জ্ঞানচর্চার জগতে যে অভাবনীয় সামাজিক বিপ্লব ঘটেছিল, আলেম সমাজের তীব্র প্রতিরোধের কারণে মুসলিম বিশ্ব তা থেকে প্রায় আড়াইশ বছর সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে থাকে।

উসমানীয় (অটোমান) সাম্রাজ্যে রাজকীয় নিষেধাজ্ঞা ও মৃত্যুদণ্ডের ফতোয়া (১৪৮৫–১৭২৭)

উসমানীয় সাম্রাজ্যে ছাপাখানা প্রবেশ না করতে দেওয়ার মূল কারিগর ছিলেন সুলতান দ্বিতীয় বায়েজিদ, পরবর্তীতে সুলতান প্রথম সেলিম এবং উসমানীয় সাম্রাজ্যের তৎকালীন শায়খুল ইসলাম ও প্রধান মুফতিমণ্ডলী। ১৪৮৫ সালে তৎকালীন শায়খুল ইসলামের সরাসরি ফতোয়ার ওপর ভিত্তি করে সুলতান দ্বিতীয় বায়েজিদ রাজকীয় ফরমান (আদেশ) জারি করেন, যার মাধ্যমে আরবি বর্ণমালায় প্রস্তুতকৃত যেকোনো বই মুদ্রণযন্ত্রে ছাপা আইনত সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়। এর তিন দশক পর, ১৫১৫ সালে সুলতান প্রথম সেলিম এই নির্দেশিকাকে আরও বেশি কঠোর ও সহিংস রূপ দেন। নতুন ফতোয়া জারি করে ঘোষণা করা হয়—যান্ত্রিক প্রেসে যদি কোনো ইসলামিক বই কিংবা পবিত্র কুরআনের কপি মুদ্রণ করা হয়, তবে সেই অপরাধে মুদ্রণকারীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হবে।

এই চরমপন্থী নিষেধাজ্ঞার পেছনে তারা বেশ কিছু অদ্ভুত ও সংকীর্ণ যুক্তি দাঁড় করিয়েছিলেন। প্রথমত, পেশাদার ক্যালিগ্রাফার ও হস্তলেখকদের রুজি-রোটি নষ্ট হওয়ার সামাজিক আশঙ্কা। দ্বিতীয়ত, ছাপাখানার কালি, প্রেস মেটাল ও কাগজ প্রক্রিয়াজাতকরণে অপবিত্র উপাদানের স্পর্শ লাগার কাল্পনিক ভয়। এবং তৃতীয়ত, পবিত্র আসমানী বাণী কোনো যান্ত্রিক ধাতব ডিভাইসের চাপে ছাপা হওয়াকে তারা অলৌকিকতা ও শ্রদ্ধাবোধের পরিপন্থী বা ধর্মীয় অবমাননা মনে করতেন।

মিশরের আল-আজহার ও উলামা পরিষদের প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিরোধ (১৭৯৮–১৮২০ এর দশক)

মিশরে ফরাসি অভিযান এবং পরবর্তীতে আধুনিকীকরণ প্রক্রিয়ার সময়েও আল-আজহারের আলেমরা ছাপাখানা গ্রহণের বিরোধিতা অব্যাহত রাখেন। আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্যেষ্ঠ উলামা পরিষদ এবং কায়রোর প্রবীণ সুফি শায়খগণ এই বাধার মূল নেতৃত্বে ছিলেন। ১৭৯৮ সালে নেপোলিয়ন বোনাপার্টের ফরাসি বাহিনী যখন মিশরে প্রথম প্রাতিষ্ঠানিক ছাপাখানা নিয়ে আসে, তখন আল-আজহারের আলেমরা একে ‘কাফেরদের তৈরি অনৈসলামিক যন্ত্র’ আখ্যা দিয়ে সাধারণ জনগণকে তা সম্পূর্ণ বয়কট করার নির্দেশ দেন।

পরবর্তীতে ১৮২০-এর দশকে মিশরের আধুনিক শাসক মুহাম্মদ আলী পাশা রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে ‘বুলাক প্রেস’ (Bulaq Press) প্রতিষ্ঠা করে সরকারিভাবে বই ছাপা শুরু করেন। কিন্তু তৎকালীন প্রবীণ ফকীহগণ রাজকীয় আদেশের বিরুদ্ধে গিয়ে কড়া ফতোয়া দেন যে—কুরআন ও হাদিসের বাণী যান্ত্রিক প্রেসে চাপ দিয়ে তৈরি করা শরীয়তসম্মত হতে পারে না। তাদের মতে, কেবল মানুষের হাত দিয়ে লেখা হস্তলিখিত পাণ্ডুলিপিই ইসলামিক মর্যাদা ও পবিত্রতা ধারণ করতে সক্ষম।

ভারতীয় উপমহাদেশে ফারঙ্গি মহল ও দেওবন্দী আলেমদের বয়কট আন্দোলন (১৮ থেকে ১৯ শতক)

ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির আমলে ভারতীয় উপমহাদেশে ধাতব টাইপ সংবলিত আধুনিক প্রিন্টিং প্রেস (Movable Metal Type Press) চালু হলে এখানকার আলেম সমাজও এর বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে ওঠেন। এই বিরোধিতায় অগ্রভাগে ছিলেন লখনউয়ের বিখ্যাত ফারঙ্গি মহল একাডেমির মোল্লা নিজামুদ্দিন সেহালভী এবং ১৮৫০-এর দশকের প্রথাগত কাতিব (হস্তলেখিকা) ও মুফতি সমাজ।

১৮ শতকের শেষের দিকে যখন ভারতে টাইপ প্রেস প্রথম প্রসার লাভ করে, তখন ফারঙ্গি মহলের প্রখ্যাত আলেমরা আনুষ্ঠানিকভাবে সিদ্ধান্ত নেন যে তাদের ঐতিহ্যবাহী কোর্স ‘দরসে নিজামী’-র কোনো কিতাব বা শরীয়তের বই এই ধাতব টাইপ প্রেসে ছাপা যাবে না। তারা অভিযোগ তোলেন যে, টাইপ প্রেসে ধাতব হরফ সাজানোর সময় আরবি বর্ণগুলোর আকৃতি বিকৃত হয় এবং এতে পবিত্র ক্যালিগ্রাফির ঐতিহ্য নষ্ট হয়। ফলে তারা টাইপ প্রেসে ছাপা কুরআন ও হাদিসের বই বর্জনের ডাক দেন। পরবর্তীতে যুগের চাপে আলেমগণ এই কঠোর অবস্থান থেকে কিছুটা শিথিল হতে বাধ্য হন, তবে তারা আধুনিক টাইপ প্রেসের বদলে কেবল ‘লিথোগ্রাফি’ বা পাথর-ছাপার অনুমোদন দেন—কারণ লিথোগ্রাফিতে হাতে লেখা ক্যালিগ্রাফির অবিকল প্রতিলিপি নেওয়া সম্ভব ছিল।

মরক্কো ও মাগরেব অঞ্চলে আধ্যাত্মিক বরকত বিনষ্টের ফতোয়া (১৯ শতকের শেষভাগ)

উত্তর আফ্রিকার মরক্কো ও সংলগ্ন মাগরেব অঞ্চলেও ছাপাখানার প্রবেশ প্রতিরোধ করতে ধর্মীয় কর্তৃত্ব ব্যবহার করা হয়েছিল। এই বাধার পেছনে মূল ভূমিকায় ছিল আল-কারাওইয়িন বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিকহ কাউন্সিল (Fez Ulema) এবং কাদিরিয়া ও তিজানিয়া তরিকার সুফি প্রধানগণ।
তাদের চরম বিরোধিতার কারণে ১৮ ১৯৬৫ সাল পর্যন্ত সমগ্র মরক্কোতে ইউরোপ থেকে যেকোনো ধরনের আধুনিক ছাপাখানা আমদানির ওপর কঠোর রাষ্ট্রীয় ও ধর্মীয় নিষেধাজ্ঞা বলবৎ ছিল। ফেজের আলেমদের যুক্তি ও ফতোয়া ছিল—ইউরোপীয় খ্রিষ্টানদের তৈরি যান্ত্রিক ডিভাইসে যদি পবিত্র ধর্মগ্রন্থ ছাপা হয়, তবে তার ভেতর থেকে আসমানী বরকত ও আধ্যাত্মিক গুণাবলী (Spiritual blessing) চিরতরে নষ্ট হয়ে যাবে।

নতুন তথ্যমাধ্যম ও যোগাযোগের প্রযুক্তির ওপর ‘পাপের সরঞ্জাম’ আখ্যাদান

যোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তির নানা মাধ্যম হিসেবে যখনই রেডিও, মাইক, টেলিভিশন, ক্যামেরা বা ভিডিও প্রযুক্তির উদ্ভাবন ঘটেছে, প্রথাগত আলেম সমাজ সেগুলোকে প্রাথমিক পর্যায়ে সততার সাথে গ্রহণ করার বদলে ‘শয়তানের কাজ’ বা ‘হারাম’ বলে ফতোয়া জারি করেছেন।

রেডিও প্রযুক্তির বিরোধিতা (১৯৩০–১৯৯০ এর দশক)

সৌদি আরবে “শয়তানের যাদু” আখ্যাদান:

১৯৩১ সালে সৌদি আরবের বাদশাহ আবদুল আজিজ যখন দেশটির প্রশাসনিক ও যোগাযোগ ব্যবস্থা আধুনিকীকরণের অংশ হিসেবে প্রথম ওয়্যারলেস ও রেডিও নেটওয়ার্ক চালুর উদ্যোগ নেন, তখন তৎকালীন প্রধান কাজী শেখ আবদুল্লাহ ইবনে হাসান আল-শেখ এবং নজদের প্রবীণ আলেমরা এর বিরুদ্ধে কড়া অবস্থান নেন। তারা এই প্রযুক্তিকে “বিদআত” এবং সরাসরি “শয়তানের যাদু” বলে ফতোয়া দেন। তাদের ফতোয়ার মূল ভিত্তি ছিল—বাতাসে অদৃশ্য তরঙ্গের মাধ্যমে মানুষের কণ্ঠস্বর এক স্থান থেকে অন্য স্থানে স্থানান্তর করা কোনো স্বাভাবিক বিষয় নয়, এটি শরীয়তের দৃষ্টিতে শয়তানের কারসাজি ছাড়া সম্ভব হতে পারে না।

ইয়েমেনে জাইদি আলেমদের আইনি নিষেধাজ্ঞা:

১৯৩১ থেকে ১৯৪৮ সালের মধ্যবর্তী সময়ে ইয়েমেনের জাইদি শিয়া প্রধান ও শাসক ইমাম ইয়াহিয়া মুহাম্মদ হামিদুদ্দিন এবং দেশটির প্রথাগত আলেমরা রেডিও প্রযুক্তির বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় অবস্থান নেন। তাদের আদেশে ইয়েমেনের ভূখণ্ডে রেডিও যন্ত্র রাখা, বিক্রি করা কিংবা রেডিও শোনা আইনত সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়। আলেমদের আশঙ্কা ছিল, রেডিওর মাধ্যমে পশ্চিমা খ্রিষ্টান সংস্কৃতির প্রভাবে ইয়েমেনি মুসলিম সমাজের ধর্মীয় নৈতিকতা বিনষ্ট হবে। কোনো সাধারণ নাগরিকের বাড়িতে রেডিও সেট পাওয়া গেলে তার জন্য কঠোর কারাদণ্ডের শাস্তি কার্যকর করা হতো।

ভারতীয় উপমহাদেশে ‘পাপ ও বিনোদনের সরঞ্জাম’ ফতোয়া:

উপমহাদেশে অল ইন্ডিয়া রেডিও চালুর পর দেওবন্দী ও বারেলভি ঘরানার শীর্ষ আলেমদের পক্ষ থেকে এর বিরুদ্ধে লিখিত ফতোয়া প্রকাশিত হয়। প্রখ্যাত ফকীহ মাওলানা আশরাফ আলী থানভী এবং জমিয়তে ওলামায়ে হিন্দের প্রথম সভাপতি কাজী মুফতি কেফায়াতুল্লাহ দেহলবী রেডিওকে “আলাতুল লাহ্ব-ওয়াল-লা’ইব” অর্থাৎ পাপ ও অনৈসলামিক বিনোদনের সরঞ্জাম হিসেবে ফতোয়া দেন। ১৯৩৮ সালে অল ইন্ডিয়া রেডিও কর্তৃপক্ষ যখন রেডিওর মাধ্যমে ইসলামী আলোচনা ও ধর্মীয় খুতবা সম্প্রচারের প্রস্তাব দেয়, তখন দারুল উলুম দেওবন্দের ফতোয়া বিভাগ থেকে তা সরাসরি প্রত্যাখ্যান করা হয়; কারণ পাপের সাথে যুক্ত কোনো মাধ্যমে দ্বীনের প্রচারও তারা অগ্রহণযোগ্য মনে করতেন।

আফগানিস্তানে রেডিও সম্প্রচার বন্ধের নির্দেশ:

আধুনিক ইতিহাসে রেডিওর ওপর চরম আঘাত আসে তালেবান শাসনের আমলে। ১৯৯৬ সালে ক্ষমতা দখলের পর মোল্লা মোহাম্মদ ওমারের নেতৃত্বে তালেবান সুপ্রিম কাউন্সিল রাষ্ট্রীয় প্রচারমাধ্যম ‘রেডিও আফগানিস্তান’ সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেয়। তালেবান সরকারের ফতোয়া ছিল, সাধারণ রেডিও সম্প্রচার, খবর ও সঙ্গীত পরিবেশন শরীয়তবিরোধী, যা মুসলিমদের ঈমান ধ্বংসের কাজ করে।

 

লাউডস্পিকার ও মাইক্রোফোনের বিরোধিতা (১৯৩০–১৯৬০ এর দশক)

ভারত ও পাকিস্তানে “নামাজ বাতিলের” ফতোয়া:

১৯৩৭-৩৮ সালের দিকে যখন উপমহাদেশের বিভিন্ন মসজিদে প্রথম মাইক আনা হয়, তখন মাওলানা আশরাফ আলী থানভী, দারুল উলুম দেওবন্দের ফতোয়া বিভাগ এবং বারেলভি মতবাদের প্রবর্তক আহমেদ রেজা খানের অনুসারীরা মাইকের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। তারা লিখিত ফতোয়া জারি করে ঘোষণা করেন যে, মাইকের মাধ্যমে বের হওয়া শব্দ মানুষের মূল সরাসরি কণ্ঠ নয়, বরং এটি যন্ত্র থেকে উৎপন্ন প্রতিধ্বনি। ফলে মাইকের আওয়াজ শুনে রুকু বা সিজদায় গেলে মুক্তাদীদের নামাজ বাতিল বা ফাসিদ হয়ে যাবে। আশরাফ আলী থানভী মাইককে ‘আলাতুল লাহ্ব’ বা পাপাচারের যন্ত্র হিসেবে চিহ্নিত করে মসজিদে এর প্রবেশ নিষিদ্ধের দাবিতে পৃথক পুস্তিকা রচনা করেন।

সৌদি আরবের হারাম শরীফে মাইক স্থগিতকরণ:

১৯৪০-এর দশকে মক্কার ঐতিহাসিক হারাম শরীফ এবং রিয়াদ কেন্দ্রীয় মসজিদে যখন প্রথম লাউডস্পিকার বসানোর সরকারি পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়, তখন সৌদি আরবের তৎকালীন গ্র্যান্ড মুফতি শেখ মুহাম্মদ ইবনে ইব্রাহিম আল-শেখ এবং নজদি উলামারা এর বিরুদ্ধে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেন। তাদের ফতোয়া ছিল, বিদ্যুতের মাধ্যমে কণ্ঠ বর্ধিত করা মূলত মহান আল্লাহর দেওয়া স্বাভাবিক কণ্ঠস্বরের রূপ পরিবর্তনের শামিল এবং এটি মসজিদে বিদআত ছড়ায়। আলেমদের এই শক্ত বাধার কারণে কয়েক বছর সৌদি আরবের প্রধান প্রধান মসজিদগুলোতে মাইক স্থাপন স্থগিত রাখতে হয়েছিল।

মিশর ও ইন্দোনেশিয়ায় বিদআত ও ঘুমের ব্যাঘাতের আপত্তি:

মিশরের ঐতিহ্যবাহী আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রবীণ ফকীহগণ মিনারে উঠে খালি গলায় আজান দেওয়ার ঐতিহ্য রক্ষায় সোচ্চার হন। তারা ফতোয়া দেন যে, যন্ত্রের সাহায্যে আজান দিলে সুন্নাত আদায় হবে না, উপরন্তু বিকট শব্দের কারণে মাইক ব্যবহারের মাধ্যমে অসুস্থ মানুষের ঘুমের ব্যাঘাত ঘটবে। অন্যদিকে, ১৯৩৬ সালে ইন্দোনেশিয়ার সর্ববৃহৎ ধর্মীয় সংগঠন নাহদলাতুল ওলামা (NU)-র সুরাবায়া সম্মেলনে শীর্ষ কিয়াই বা আলেমগণ মাইকে জুমার খুতবা দেওয়া ও নামাজ পড়ানো অনৈসলামিক এবং শরীয়তবিরোধী বলে চূড়ান্ত ফতোয়া জারি করেন।

টেলিভিশন প্রযুক্তির বিরোধিতা (১৯৫৮–২০০১)

সৌদি আরবে রক্তক্ষয়ী সংঘাত ও টিভি টাওয়ারে আক্রমণ:

১৯ ১৯৬৫ সালে বাদশাহ ফয়সাল যখন রিয়াদ ও জেদ্দায় প্রথম সরকারি টেলিভিশন স্টেশন চালুর সিদ্ধান্ত নেন, তখন দেশটির প্রবীণ উলামা সমাজ এর বিরুদ্ধে চরম তোলপাড় সৃষ্টি করে। তৎকালীন প্রধান মুফতি শেখ মুহাম্মদ ইবনে ইব্রাহিম ফতোয়া দেন যে, টিভিতে জীবন্ত প্রাণীর ছবি ও ভিডিও প্রদর্শন করা ইসলামে সরাসরি হারাম। আলেমদের এই ফতোয়ায় উস্কানি পেয়ে ১৯৬৫ সালের সেপ্টেম্বরে শাহজাদা খালিদ ইবনে মুসাইদের নেতৃত্বে এক সংক্ষুব্ধ ধর্মীয় জনতা নবনির্মিত রিয়াদ টিভি টাওয়ারে সশস্ত্র আক্রমণ ও ভাঙচুর চালায়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সাথে গোলাগুলিতে শাহজাদা খালিদ নিহত হন, যা পরবর্তীতে ১৯৭৫ সালে বাদশাহ ফয়সাল আততায়ীর হাতে নিহত হওয়ার অন্যতম পরোক্ষ কারণ ছিল।

উপমহাদেশে টিভিকে “অশ্লীলতার মাধ্যম” ঘোষণা:

পাকিস্তান ও ভারতে টেলিভিশন চালুর পর প্রখ্যাত দেওবন্দী ও মওদূদীপন্থী আলেমদের কাছ থেকে বই ও ফতোয়ার মাধ্যমে এর প্রাতিষ্ঠানিক বিরোধিতা আসে। পাকিস্তানের তৎকালীন গ্র্যান্ড মুফতি মুহাম্মদ শফী “কশফুর রিবাহ আন ফাতাওয়াত তাসবীর” ও “টেলিভিশন কা শরয়ী হুকুম” নামক গ্রন্থে ফতোয়া দেন যে, ভিডিও মূলত স্থির ছবিরই আধুনিক রূপ, তাই ঘরে টেলিভিশন রাখা ও দেখা কবিরা গুনাহ। জামায়াতে ইসলামীর প্রতিষ্ঠাতা মাওলানা আবুল আলা মওদূদী এবং দেওবন্দী মুফতিগণ ফতোয়া দেন যে, টেলিভিশন মানুষের ঘরে বেপর্দা নারী, গান-বাজনা এবং অশ্লীলতা ডেকে আনে, যা কোনো দ্বীনদার মুসলিমের জন্য রাখা জায়েজ নয়।

আফগানিস্তানে জনসম্মুখে টিভি ধ্বংসের দৃশ্যপট:

১৯৯৬ সালে তালেবান আফগানিস্তানের ক্ষমতা দখলের পর দেশে টিভি সম্প্রচার ও ভিডিও দেখা পুরোপুরি বেআইনি ঘোষণা করে। তালেবানের ধর্মীয় পুলিশ কাবুলের ঘরে ঘরে অভিযান চালিয়ে হাজার হাজার টেলিভিশন সেট, ভিএইচআর ও ভিডিও ক্যাসেট বাজেয়াপ্ত করে এবং সেগুলো প্রকাশ্যে ভেঙে গাছে ঝুলিয়ে রেখে শাস্তি প্রদর্শন করত। তালেবানের ফতোয়া ছিল, প্রাণীর ভিডিও তৈরি করা সরাসরি সৃষ্টিকর্তাকে চ্যালেঞ্জ জানানোর শামিল।

ইরানে টিভি সম্প্রচার বন্ধের ঘটনা:

১৯৫৮ সালে ইরানে যখন প্রথম বেসরকারি টেলিভিশন স্টেশন চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়, তখন ইরানের সর্বপ্রধান শিয়া ধর্মীয় কর্তৃপক্ষ (মারজা-ই তাকলিদ) গ্র্যান্ড আয়াতুল্লাহ হোসাইন বোরুজের্দি এবং কোমের আলেমরা এর বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানান। বোরুজের্দির ফতোয়া ছিল, টেলিভিশন মূলত অনৈসলামিক বাহাই সম্প্রদায় ও পশ্চিমা সংস্কৃতির প্রচারক হিসেবে কাজ করবে। আলেমদের আপত্তির মুখে বাধ্য হয়ে শাহ সরকার বেশ কিছুদিন ধর্মীয় নগরী ক্বোমে টিভি সম্প্রচার পুরোপুরি বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়।

স্থির চিত্র ও আলোকচিত্র (ফটোগ্রাফি) বর্জন (১৯০০–২০০১)

উপমহাদেশে ফটো ও ছবির ওপর হারামের ফতোয়া:

ক্যামেরা আবিষ্কারের পর থেকে প্রাণীর ছবি তোলা নিয়ে উপমহাদেশের দেওবন্দ ও বারেলভি ঘরানার শীর্ষ আলেমগণ সবচেয়ে কঠোর অবস্থান নেন। মাওলানা আশরাফ আলী থানভী, আহমেদ রেজা খান বারেলভী এবং মুফতি মুহাম্মদ শফী অভিন্ন ফতোয়া দেন যে—হাতে আঁকা ছবির সাথে ক্যামেরায় তোলা স্থির ছবির শরীয়তগত কোনো পার্থক্য নেই, দুটোই প্রাণীর প্রতিচ্ছবি বা ‘তাসবীর’ তৈরির কবিরা গুনাহ। মুফতি শফী তাঁর গ্রন্থে ফতোয়া দেন যে, কেবল হজ বা আইনি বাধ্যবাধকতার বাইরে সাধারণ স্মৃতি ধরে রাখতে বা শখে ছবি তোলা সম্পূর্ণ হারাম। তারা হাদিস উদ্ধৃত করে প্রচার করেন, ছবিযুক্ত ঘরে রহমতের ফেরেশতা প্রবেশ করে না।

সৌদি আরবে ক্যামেরাকে “সৃষ্টিকর্তার সাথে সাদৃশ্য” আখ্যা:

সৌদি আরবের তৎকালীন প্রধান মুফতি শেখ মুহাম্মদ ইবনে ইব্রাহিম ছবি তোলার বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নেন। পরবর্তীতে দেশটির সর্বপ্রধান গ্র্যান্ড মুফতি শেখ আবদুল আজিজ ইবনে বাজ ধারাবাহিকভাবে ফতোয়া দেন যে, ক্যামেরা দিয়ে আলোর প্রতিফলনে ছবি তৈরি করাও নির্মাতার নিজস্ব কাজ এবং তা মহান আল্লাহর সৃষ্টির রূপ দেওয়ার চেষ্টার সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ। ফলে এটি সম্পূর্ণ হারাম। বাধ্যতামূলক আইডেন্টিটি কার্ড ছাড়া সাধারণ নাগরিকদের ব্যক্তিগত প্রয়োজনে ক্যামেরা ব্যবহার নিষিদ্ধ ছিল।

মিশর ও আফগানিস্তানে ক্যামেরার ওপর কঠোরতা:

মিশরে ক্যামেরার সূচনালগ্নে আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ের শায়খ সেলিম আল-বিশ্রীসহ প্রবীণ ফকীহগণ ফতোয়া দেন যে, ক্যামেরায় তোলা ছবি মূলত পুতুল বা মূর্তিপূজার আধুনিক রূপান্তর। অন্যদিকে, ১৯৯৬ সাল থেকে আফগানিস্তানের তালেবান সরকার যেকোনো জীবন্ত প্রাণীর ছবি তোলা সম্পূর্ণ বেআইনি ঘোষণা করে। তারা সংবাদপত্র, ম্যাগাজিন ও বই থেকে সমস্ত প্রাণীর ছবি কেটে ফেলে বা কালি দিয়ে ঢেকে দেওয়ার কড়া ফতোয়া প্রয়োগ করেছিল।

ভিডিও রেকর্ডিং ও মুভি ধারণ (১৯৭০–২০০১)

উপমহাদেশে ওয়াজ মাহফিলের ভিডিওতে নিষেধাজ্ঞা:

অ্যানালগ ও ডিজিটাল প্রযুক্তিতে ভিডিও ধারণ সহজ হওয়ার পর দেওবন্দী ফকীহগণ এর বিরুদ্ধে কড়া লিখিত নির্দেশনা দেন। পাকিস্তানের প্রখ্যাত মুফতি ওয়ালী হাসান টোঙ্কি এবং দারুল উলুম দেওবন্দের ফতোয়া বিভাগ থেকে ব্যাখ্যা দেওয়া হয়—ভিডিও প্রযুক্তি মূলত প্রতি সেকেন্ডে ২৪টি বা তার বেশি স্থির ছবিরই সমষ্টি। সুতরাং ক্যামেরায় স্থির ছবি তোলা যে কারণে হারাম, ভিডিও রেকর্ড করাও ঠিক একই কারণে হারাম। এমনকি ১৯৯০ ও ২০০০-এর দশকে যখন মোবাইল ও ডিজিটাল ক্যামেরায় ওয়াজ মাহফিল রেকর্ড শুরু হয়, তখন মাদরাসাগুলো থেকে ফতোয়া জারি করা হয় যে, ইসলাম প্রচারের কাজেও ভিডিওর মতো অনৈসলামিক মাধ্যম গ্রহণ করা নাজায়েয।

সৌদি আরব ও আফগানিস্তানে ভিডিও ক্যামেরা বাজেয়াপ্তকরণ:

সৌদি আরবের গ্র্যান্ড মুফতি শেখ ইবনে বাজ ভিডিও রেকর্ডিংকে ‘প্রাণীর অনৈতিক রূপায়ন’ বলে ফতোয়া দেন। এর ফলে ১৯৮০ ও ৯০-এর দশকে দেশটিতে ব্যক্তিগত সামাজিক অনুষ্ঠান বা ভ্রমণের উদ্দেশ্যে ভিডিও ক্যামেরা সাথে রাখা আইনত দণ্ডনীয় ছিল এবং ধর্মীয় পুলিশ (হায়া) মানুষের ভিডিও ক্যামেরা বাজেয়াপ্ত করত। আর আফগানিস্তানে তালেবান সরকার ভিডিও রেকর্ডিং, ভিএইচআর ক্যাসেট রাখা এবং বিয়ে বা পারিবারিক অনুষ্ঠানে ভিডিও করাকে কঠোর শাস্তিযোগ্য ও কারাদণ্ডযোগ্য অপরাধ হিসেবে কার্যকর করেছিল।

 

আধুনিক শিক্ষা ও ভাষা চর্চার ওপর ‘কুফরি’ ও ‘ঈমান ধ্বংসের’ অপবাদ

পশ্চিমা বা আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থা ও ইংরেজি ভাষা শেখার বিরুদ্ধে আলেম সমাজ কেবল ফতোয়াবাজিই করেননি, বরং একাধিক দেশে সশস্ত্র বিপ্লব ও সামাজিক বয়কটের ডাক দিয়ে মুসলিম সমাজকে আধুনিক জ্ঞানচর্চা থেকে বহু বছর দূরে সরিয়ে রেখেছেন।

ভারতবর্ষে শাহ আব্দুল আজীজ ও লখনউয়ের ফকীহ সমাজ (১৮০৩–১৮৫০ এর দশক)

ভারতবর্ষে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির প্রভাব বৃদ্ধির পর ফতোয়া ও সামাজিক প্রতিরোধের মাধ্যমে ইংরেজি ও আধুনিক শিক্ষার বিরোধিতা শুরু হয়। এর মূল নেতৃত্বে ছিলেন শাহ ওয়ালিউল্লাহ দেহলভীর জ্যেষ্ঠ পুত্র শাহ আব্দুল আজীজ মুহাদ্দিসে দেহলভী এবং লখনউয়ের প্রখ্যাত ফারঙ্গি মহল মাদরাসার প্রবীণ ফকীহমণ্ডলী। ১৮০৩ সালে শাহ আব্দুল আজীজ ভারতবর্ষকে ‘দারুল হরব’ (যুদ্ধের দেশ) ঘোষণা করার পর আলেম সমাজ ফতোয়া দেন যে, ইংরেজদের ভাষা বা ইংরেজি শিক্ষা গ্রহণ করা কাফেরদের সাথে ঘনিষ্ঠতা তৈরির শামিল, যা একজন মুসলিমের ঈমানের জন্য চরম হুমকিস্বরূপ। তৎকালীন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি পরিচালিত স্কুলগুলোতে বাইবেল পাঠের উপস্থিতি দেখিয়ে আলেমদের পক্ষ থেকে ফতোয়া জারি করা হয় যে, নিজেদের সন্তানদের ইংরেজি স্কুলে পাঠানো তাদের ঈমান ধ্বংস করারই নামান্তর।

বাংলা অঞ্চলে হাজী শরীয়তুল্লাহ ও ফরায়েজী আন্দোলনের প্রতিরোধ (১৮২০–১৮৮০ এর দশক)

বাংলা অঞ্চলে ইংরেজি শিক্ষা ও ব্রিটিশ শিক্ষাব্যবস্থার বিরুদ্ধে সবচেয়ে সংগঠিত ও প্রাক-রাজনৈতিক প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন ফরায়েজী আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা হাজী শরীয়তুল্লাহ, তাঁর পুত্র দুদু মিয়া, বাঁশের কেল্লাখ্যাত বিপ্লবী নেতা তিতুমীর এবং তৎকালীন প্রথাগত মোল্লা সমাজ। ফরায়েজী আন্দোলনের মাধ্যমে আলেমগণ ইংরেজিকে “কাফেরদের ভাষা” হিসেবে ঘোষণা করেন এবং সাধারণ মুসলিমদের জন্য সরকারি ইংরেজি স্কুলে যাওয়া ও ইংরেজ পরিচালিত আদালতে কাজ করা সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করেন। তারা ফতোয়া দেন যে ইংরেজি শিখলে মানুষ নাস্তিক বা খ্রিষ্টান হয়ে যায়। এই ধর্মীয় ও সামাজিক নিষেধাজ্ঞার প্রত্যক্ষ পরিণতিতে ১৮৮১ সালের প্রথম আদমশুমারি পর্যন্ত বাংলার মুসলিম সমাজ ইংরেজি ও আধুনিক প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিল।

উত্তর ভারতে আলিগড় আন্দোলন ও স্যার সৈয়দ আহমদের যুগের বিরোধিতা (১৮৬৪–১৮৯০ এর দশক)

১৮ শতকের শেষভাগে স্যার সৈয়দ আহমদ খান যখন পিছিয়ে পরা মুসলিমদের ইংরেজি ও আধুনিক বিজ্ঞান শেখানোর জন্য ‘আলিগড় আন্দোলন’ শুরু করেন, তখন তৎকালীন উপমহাদেশের প্রায় সর্বস্তরের ঐতিহ্যবাহী আলেম সমাজ তাঁর বিরুদ্ধে একাট্টা হয়ে কঠোর অবস্থান নেন। এই বিরোধিতার অগ্রভাগে ছিলেন মৌলভী আলী বখশ, দারুল উলুম দেওবন্দের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা মাওলানা রশিদ আহমদ গাঙ্গুহী এবং মক্কা-মদীনার চার মাযহাবের প্রবীণ গ্র্যান্ড মুফতিগণ। স্যার সৈয়দ আহমদ খান মুসলিমদের ইংরেজি শেখানোর আধুনিক উদ্যোগ গ্রহণ করলে আলেমগণ তাকে ‘কাফের’ ও ‘দাহরিয়া’ (নাস্তিক) ঘোষণা করে ফতোয়া জারি করেন। এমনকি মৌলভী আলী বখশ নিজে মক্কায় গিয়ে তৎকালীন শীর্ষ গ্র্যান্ড মুফতিদের থেকে লিখিত ফতোয়া সংগ্রহ করে আনেন, যেখানে স্পষ্ট বলা হয়—ইংরেজি শিক্ষা প্রবর্তনকারী স্যার সৈয়দ ও তার সমর্থকদের প্রতিষ্ঠিত স্কুলগুলো বিনাশযোগ্য এবং এতে মুসলিম সন্তানদের অংশ নেওয়া সম্পূর্ণ হারাম।

আফগানিস্তানে রাজা আমানুল্লাহ খানের সংস্কার বিরোধী আন্দোলন ও উলামাদের বিদ্রোহ (১৯২৪–১৯২৯)

আফগানিস্তানে রাজা আমানুল্লাহ খান যখন দেশে আধুনিক ইংরেজি ও পশ্চিমা ধাঁচের স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন, তখন আফগান আলেম সমাজ চরম সশস্ত্র বিদ্রোহের ডাক দেয়। এই বিরোধিতার নেতৃত্ব দেন মোল্লা-ই-লং (আবদুল রশিদ) এবং খোস্ত ও কান্দাহারের প্রবীণ পশতুন আলেম পরিষদ। ১৯২৪ সালে রাজা আমানুল্লাহ কাবুলে ছেলে ও মেয়েদের জন্য আধুনিক ইংরেজি মাধ্যম স্কুল চালু করলে এবং শিক্ষক হিসেবে বিদেশি শিক্ষক নিয়োগ দিলে আলেম সমাজ এটিকে “কুফরি শাসন” বলে ঘোষণা করেন। আলেমদের উস্কানিমূলক ফতোয়া ও প্রচারণার ওপর ভিত্তি করে ১৯২৪ সালে খোস্ত বিদ্রোহ এবং পরবর্তীকালে ১৯২৮-২৯ সালে ব্যাপক সশস্ত্র বিপ্লব ঘটে। এর ফলে রাজা আমানুল্লাহ সিংহাসনচ্যুত হতে বাধ্য হন এবং দেশে চালু হওয়া আধুনিক ইংরেজি স্কুলগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয়।

 

চিকিৎসাবিজ্ঞান, অস্ত্রোপচার ও জীবন রক্ষাকারী প্রযুক্তির বিরোধিতা

রোগ নিরাময় ও মুমূর্ষু মানুষের জীবন বাঁচাতে আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের প্রতিটি নতুন আবিষ্কার ও জীবনরক্ষাকারী প্রযুক্তিকে প্রথাগত আলেম সমাজ খোদায়ী তাকদীরের ওপর হস্তক্ষেপ, শয়তানের কাজ কিংবা শরীয়ত বিরোধী বলে অপবাদ দিয়েছেন।

শল্যচিকিৎসা (মেডিকেল অপারেশন), অ্যানাস্থেশিয়া ও অঙ্গব্যবচ্ছেদ (১৮২৭–১৯৫০ এর দশক)

মিশরে কায়রোর আবু জাবাল মেডিকেল স্কুলে ১৮২৭ সালে আধুনিক চিকিৎসার জনক ড. অ্যান্টোইন ক্লাট (Clot Bey) যখন মেডিকেল শিক্ষার্থীদের সামনে একটি মৃতদেহে প্রথম অস্ত্রোপচার দেখাচ্ছিলেন, তখন আল-আজহারের এক ছাত্র ও আলেম ‘আল্লাহর সৃষ্টির অবমাননা’ ও ‘লাশের পবিত্রতা নষ্টের’ অভিযোগ তুলে ছোরা নিয়ে ড. ক্লাটের ওপর সরাসরি সশস্ত্র হামলা চালান এবং তাকে হত্যার চেষ্টা করেন।

একইভাবে ১৮৩০-এর দশকে উসমানীয় সাম্রাজ্যের ইস্তাম্বুলে সামরিক চিকিৎসা অনুষদে শায়খুল ইসলাম ফতোয়া দেন যে জীবিত বা মৃত মানুষের শরীর কাটা সম্পূর্ণ হারাম। তারা হাদিস উদ্ধৃত করে বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্জিক্যাল ল্যাব বন্ধ করে দেন, যার ফলে চিকিৎসাবিদ্যার শিক্ষার্থীদের মানুষের লাশের বদলে মোমের তৈরি মডেল বা ছাগল-ভেড়ার অঙ্গ কেটে প্রাথমিক চিকিৎসা ও অপারেশন শিখতে হতো।

ভারতীয় উপমহাদেশেও ১৮৩৫ সালে কলকাতা মেডিকেল কলেজে এবং পরবর্তীতে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে লখনউয়ের ফারঙ্গি মহল ও দেওবন্দী ফকীহগণ চিকিৎসাবিদ্যার জন্য অঙ্গব্যবচ্ছেদ ও ময়নাতদন্ত বর্জনের ফতোয়া দেন। বিংশ শতাব্দীর শুরুতে অপারেশনের পূর্বে রোগীকে ক্লোরোফর্ম বা ইথার দিয়ে অ্যানাস্থেশিয়া করাকে “ইচ্ছাকৃতভাবে মানুষের বুদ্ধিমত্তা ও চেতনা হরণ” আখ্যা দিয়ে মদপানের মতো গুনাহ বলে ফতোয়া দেওয়া হয়। পাশাপাশি গ্যাংগ্রিন বা পচে যাওয়া অঙ্গ কেটে বাদ দেওয়াকে ‘মুছলাহ’ বা শরীরের রূপ বিকৃতি দাবি করে তারা কড়া ফতোয়া জারি করেছিলেন।

এক্স-রে মেশিন ও আল্ট্রাসাউন্ডের ওপর অপবাদ (১৮৯০–১৯৯০ এর দশক)

১৮৯৫ সালে এক্স-রে প্রযুক্তি উদ্ভাবনের পর উসমানীয় সাম্রাজ্য ও মধ্যপ্রাচ্যের আলেমগণ ফতোয়া দেন যে, এক্স-রে মেশিনের সাহায্যে মানুষের চামড়ার ভেতরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ দেখা ‘সতর’ বা ঢেকে রাখার গোপনীয়তা নষ্ট করে। বিশেষ করে নারী রোগীদের এক্স-রে করানোকে সরাসরি জেনা বা চরম বেপর্দার শামিল আখ্যা দেওয়া হতো।

উপমহাদেশে আহমেদ রেজা খান বারেলভী, দেওবন্দ ফতোয়া বিভাগ এবং মুফতি মুহাম্মদ শফী ফতোয়া দেন যে এক্স-রে ফিল্মে ফুটে ওঠা হাড়ের অবয়বও এক ধরণের ‘তাসবীর’ বা নিষিদ্ধ প্রতিচ্ছবি। জীবন-মৃত্যুর চরম সংকট ছাড়া সাধারণ পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য এক্স-রে করানো নাজায়েয বলে প্রচার করা হয়। আফগানিস্তান ও উপজাতীয় সীমান্ত অঞ্চলে প্রথাগত আলেমগণ এক্স-রে মেশিনকে “শয়তানের চোখ” (Eye of the Devil) বা কাফেরদের যাদু বলে অপবাদ দেন এবং সাধারণ গ্রামবাসীদের হুমকি দেন যে এক্স-রে করালে মানুষের ঈমান ও প্রজনন ক্ষমতা নষ্ট হয়ে যাবে।

পরবর্তীতে ১৯৭০ থেকে ১৯৯০-এর দশকে এক্স-রে ও আল্ট্রাসাউন্ডের মাধ্যমে গর্ভের সন্তানের সুস্থতা ও লিঙ্গ নির্ধারণ শুরু হলে মক্কার ইসলামিক ফিকহ একাডেমি এবং মদিনা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রবীণ আলেমগণ এটিকে কুরআনের সূরা লোকমানের ৩৪ নম্বর আয়াতের অদৃশ্যের জ্ঞানের (গায়েব) ওপর হস্তক্ষেপের শামিল বলে ফতোয়া দিয়েছিলেন।

অর্গান ডোনেশন ও ট্রান্সপ্লান্টেশন (অঙ্গদান ও অঙ্গ প্রতিস্থাপন) বর্জন (১৯৫০–২০০০ এর দশক)

আধুনিক শল্যচিকিৎসার অন্যতম অলৌকিক আবিষ্কার অঙ্গ প্রতিস্থাপনের বিরুদ্ধে প্রখ্যাত সালাফি হাদীস বিশারদ শেখ নাসিরুদ্দিন আল-আলবানি এবং শেখ আব্দুল আজিজ আল-রাজহী ফতোয়া দেন যে, অঙ্গদান বা প্রতিস্থাপন সম্পূর্ণ হারাম। তাদের যুক্তি ছিল, মানুষ তার শরীরের মালিক নয়; ফলে জীবিত অবস্থায় অঙ্গ দান করা বা মৃত্যুর পর অঙ্গ দানের অসিয়ত করার শরয়ী অধিকার কারও নেই।

মিশরে ১৯৫০ থেকে ১৯৮০-র দশকে গ্র্যান্ড মুফতি শায়খ হাসনাইন মখলুফ ও আজহারি আলেমগণ মৃত ব্যক্তির চোখ বা কর্নিয়া কেটে অন্ধ মানুষের চোখে বসানোকে মৃতদেহের আত্মমর্যাদার চরম লঙ্ঘন বলে ফতোয়া দেন, যার ফলে কায়রোর আই ব্যাংকে কর্নিয়া সংগ্রহ দীর্ঘদিন বন্ধ থাকে।

দক্ষিণ এশিয়ায় দারুল উলুম দেওবন্দ, বারেলভি ফতোয়া বোর্ড এবং পাকিস্তানের মুফতি ওয়ালী হাসান টোঙ্কি ফতোয়া দেন যে, মানুষের অঙ্গ বিক্রি বা ফ্রিতে দান করা সমানভাবে হারাম। তারা চিকিৎসকদের ঘোষিত ‘ব্রেন ডেথ’ (Brain Death)-কে শারীরিক মৃত্যু হিসেবে গ্রহণ না করে অঙ্গ সংগ্রহকে সরাসরি “হত্যাকাণ্ড” বলে আখ্যা দেন। ১৯৮০-র দশকে ওআইসি ফিকহ একাডেমি এবং সৌদি সুপ্রিম উলামা পরিষদ অঙ্গ প্রতিস্থাপনকে পশ্চিমাদের ‘জৈব-প্রযুক্তিগত আগ্রাসন’ আখ্যা দিয়ে দীর্ঘদিন আইনি সুযোগ তৈরিতে বাধা বজায় রাখে, যার ফলে হাজার হাজার মুমূর্ষু রোগী সময়মতো চিকিৎসা না পেয়ে মারা যান।

রক্তদান ও ব্লাড ব্যাংক (Blood Transfusion) বিরোধিতা (১৯৪০–১৯৭০ এর দশক)

জরুরি চিকিৎসায় রক্ত সঞ্চালন ও ব্লাড ব্যাংক প্রতিষ্ঠার প্রারম্ভিক যুগে দারুল উলুম দেওবন্দের ফতোয়া বিভাগ এবং আল-আজহারের প্রবীণ ফকীহমণ্ডলী তীব্র বিরোধিতা করেন। তারা কুরআনের আয়াত উদ্ধৃত করে ফতোয়া দেন যে রক্ত হলো ‘নাজাসাত’ বা অপবিত্র নিসৃত বর্জ্য। এই অপবিত্র রক্ত অন্য সুস্থ মানুষের রগে প্রবেশ করানো এবং ব্লাড ব্যাংকে রক্ত জমিয়ে রাখা শরীয়তের দৃষ্টিতে অনৈসলামিক ও হারাম বলে প্রচার করা হয়।

মানব দুগ্ধ ব্যাংক বা হিউম্যান মিল্ক ব্যাংক (Human Milk Bank) প্রতিরোধ (১৯৮০–২০২০ এর দশক)

অকালজাত (Premature) এবং চরম অসুস্থ যেসব নবজাতক শিশু মায়ের বুকের দুধ থেকে বঞ্চিত হয়, তাদের জীবন বাঁচাতে বিশ্বজুড়ে গড়ে ওঠা ‘হিউম্যান মিল্ক ব্যাংক’ বা ‘ব্রেস্ট ফিডিং মিল্ক ব্যাংক’ ধারণার বিরুদ্ধে আলেম সমাজ তীব্র ধর্মীয় বাধা তৈরি করেন। আন্তর্জাতিক ফিকহ একাডেমি এবং মধ্যপ্রাচ্য ও উপমহাদেশের আলেমগণ ফতোয়া দেন যে, অচেনা কোনো নারীর সংগৃহীত দুধ ব্যাংক থেকে কিনে শিশুকে খাওয়ালে ভবিষ্যতে ‘রেজাআত’ বা ‘দুগ্ধ-সম্পর্কীয় ভাই-বোন’ (Milk Kinship) নির্ধারণ করা অসম্ভব হয়ে পড়বে, যার ফলে অজান্তে ভাই-বোনের মধ্যে বিয়ের মতো শরীয়তবিরোধী ঘটনা ঘটতে পারে।

২০১৯-২০২০ সালে বাংলাদেশে যখন জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও মাতুয়াইল শিশু মাতৃস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটে (ICMH) মুমূর্ষু ও মাতৃহীন শিশুদের বাঁচানোর জন্য দেশের প্রথম ‘হিউম্যান মিল্ক ব্যাংক’ চালুর সমস্ত প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়, তখন কট্টরপন্থী আলেমদের তীব্র বিরোধিতা, আইনি নোটিশ ও ফতোয়ার মুখে প্রকল্পটি স্থগিত করতে বাধ্য হয় সরকার। আলেমদের এই বিরোধিতার কারণে প্রতি বছর শত শত অকালজাত ও অসুস্থ শিশু প্রাকৃতিকভাবে মায়ের দুধের অভাবে মৃত্যুর ঝুঁকিতে পড়ছে।

পোলিও ও করোনা টিকা (COVID-19 Vaccine) বিরোধিতা (২০২০–২০২১)

করোনা মহামারি চলাকালে ২০২০-২০২১ সালে বিশ্বজুড়ে বৈশ্বিক টিকাদান কর্মসূচি শুরুর পর মুম্বাইয়ের ‘রাজা একাডেমি’, কাশ্মীরের মুফতি নাজির আহমেদ, মরক্কোর সাঈদ আল-কামালি, মিশরীয় ওয়াজদি ঘনিম, ইন্দোনেশিয়ার আচেহ উলামা পরিষদ (MPU) এবং নাইজেরিয়ার সুপ্রীম কাউন্সিল ফতোয়া ও অপপ্রচার ছড়িয়ে দেয় যে—টিকার মধ্যে শূকরের জিলেটিন আছে, এটি মানুষের ডিএনএ বিকৃত করে এবং এটি মুসলিমদের প্রজনন ক্ষমতা ধ্বংসের জন্য পশ্চিমাদের ষড়যন্ত্র।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে মুফতি কাজী মোহাম্মদ ইব্রাহীম প্রচার করেন যে করোনা টিকা দিলে “পুরুষের গলার আওয়াজ মেয়েদের মতো হয়ে যায়” এবং “নারীদের মুখে দাড়ি গজায়”। তিনি বিল গেটস ও ইসরায়েল কর্তৃক টিকার মাধ্যমে ‘মাইক্রোচিপ’ বসানোর অপপ্রচার চালান এবং শিশুদের ইপিআই টিকাসহ সকল টিকা বর্জনের ডাক দেন (যার জেরে পরবর্তীতে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে তিনি গ্রেপ্তার ও কারাদণ্ডে দণ্ডিত হন)।

একইভাবে হাফেজ মাওলানা আবরারুল হক আসিফ করোনা মহামারিকে অমুসলিমদের ভুয়া প্রোপাগান্ডা দাবি করে টিকা নেওয়া ও মাস্ক পরাকে ঈমানের দুর্বলতা বলেন। মুফতি তারেক মনোয়ার দাবি করেন করোনা অমুসলিমদের ধ্বংস করতে এসেছে, তাই টিকা নেওয়া মূলত পশ্চিমা ফার্মা কোম্পানিগুলোর ব্যবসা। মাওলানা আব্দুর রাজ্জাক বিন ইউসুফ ছোঁয়াচে রোগের বৈজ্ঞানিক ধারণাকে পুরোপুরি অস্বীকার করে মাস্ক পরা ও টিকা নেওয়াকে আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল নষ্ট করার শামিল বলেন। গ্রামপর্যায়ের বহু পীর ও স্থানীয় আলেম জুমার খুতবায় প্রচার করেন যে ভ্যাকসিনে শূকরের চর্বি রয়েছে এবং এটি নিলে মানুষ বন্ধ্যা হয়ে যাবে। যদিও পরিস্থিতির চাপে পরবর্তীতে হাথাজারী ও ইসলামিক ফাউন্ডেশন সরকারের সাথে মিল রেখে টিকার পক্ষে অবস্থান নিতে বাধ্য হয়েছিল।

 

অর্ধেকেরও বেশি জনগোষ্ঠীকে বন্দি রাখার চক্রান্ত: নারী শিক্ষা ও কাজের বিরোধিতা

একটি সমাজের সামগ্রিক অগ্রগতি ও বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার প্রধান চালিকাশক্তি হলো সেই সমাজের নারী সমাজ। কিন্তু প্রথাগত আলেম সমাজ যুগ যুগ ধরে অনমনীয় ফতোয়া ও সামাজিক চাপ প্রয়োগের মাধ্যমে নারীদের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা, অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতা এবং মৌলিক অধিকার রুদ্ধ করে পুরো সমাজকে পঙ্গু ও অবরুদ্ধ করে রেখেছেন।

নারী শিক্ষার প্রাতিষ্ঠানিক প্রসারে বৈশ্বিক প্রতিরোধ (১৮৭০–২০০১)

ভারতবর্ষে ১৯ শতকের শেষভাগে স্যার সৈয়দ আহমদ খান যখন মুসলিম নারীদের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার প্রসারে স্কুলের প্রস্তাব উত্থাপন করেন, তখন তৎকালীন আলেম সমাজ একাট্টা হয়ে একে ‘বেহায়াপনা’ এবং ‘ঈমান ধ্বংসের চক্রান্ত’ হিসেবে অপবাদ দেন। প্রখ্যাত দেওবন্দী আলেম মাওলানা আশরাফ আলী থানভী তাঁর বহুল পঠিত গ্রন্থ ‘বেহেশতী জেওর’—এ নারীদের কেবল ঘরে আবদ্ধ থেকে নির্দিষ্ট কিছু ধর্মীয় প্রাথমিক পাঠ ও গৃহস্থালি কাজ শেখার অনুমতি দেন। নারীদের ঘরের বাইরে স্কুলে পাঠানো, ইংরেজি ভাষা শেখা কিংবা বিজ্ঞান পড়ার অধিকারকে তিনি কঠোরভাবে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন।

বাংলা অঞ্চলে ১৯০৯ সালে বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন যখন ভাগলপুরে এবং পরবর্তীতে ১৯১১ সালে কলকাতায় ‘সাখাওয়াত মেমোরিয়াল গার্লস স্কুল’ প্রতিষ্ঠা করে মুসলিম মেয়েদের শিক্ষার সংগ্রাম শুরু করেন, তখন স্থানীয় আলেম ও মোল্লা সমাজ তাঁর বিরুদ্ধে মারাত্মক সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। বেগম রোকেয়াকে ‘ধর্মদ্রোহী’ ও ‘ইসলামের শত্রু’ বলে চরম অপপ্রচার চালানো হয়। যেসকল অভিভাবক তাদের মেয়েদের স্কুলে পাঠানোর সাহস দেখাতেন, আলেম সমাজ তাদের ‘কাফের’ ঘোষণা করার পাশাপাশি সামাজিকভাবে পুরোপুরি বয়কট (Boycott) করার হুমকি দিতেন।

আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে ১৯২৪ সালে আফগানিস্তানের আধুনিকমনা শাসক রাজা আমানুল্লাহ খান যখন দেশে মেয়েদের জন্য প্রথম আধুনিক স্কুল চালু করেন, তখন প্রথাগত পশতুন আলেমদের উস্কানিতেই দেশজুড়ে সশস্ত্র বিদ্রোহ ঘটে এবং নারী শিক্ষা কেন্দ্রগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয়। পরবর্তীতে ১৯৯৬ সালে তালেবান আফগানিস্তানের ক্ষমতা দখলের পর আলেমদের ফতোয়ার ভিত্তিতে মেয়েদের সমস্ত স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় পুরোপুরি নিষিদ্ধ ও বন্ধ করে দেওয়া হয়। অন্যদিকে ১৯০৭ সালে ইরানে সাংবিধানিক বিপ্লবের (Constitutional Revolution) সময় সংবিধানে মেয়েদের প্রাথমিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব উঠলে প্রখ্যাত শিয়া আলেম শেখ ফজলুল্লাহ নুরীসহ অন্য উলামারা এর তীব্র বিরোধিতা করেন এবং মেয়েদের প্রারম্ভিক কয়েকটি স্কুলে ভাঙচুর চালান।

বাংলাদেশে নারীদের চাকরি ও অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতার বিরুদ্ধে প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিরোধ

বাংলাদেশে নারীদের প্রাতিষ্ঠানিক কর্মসংস্থান, বিশেষ করে গার্মেন্টস, এনজিও, ব্যাংক কিংবা করপোরেট অফিসে কাজ করা এবং অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতা অর্জনের বিরুদ্ধে কট্টরপন্থী আলেম সমাজ দীর্ঘদিন ধরে ধর্মীয় নিষেধাজ্ঞা ও সামাজিক বাধা তৈরি করে আসছেন।

হেফজাতে ইসলাম বাংলাদেশের সাবেক আমির ও দারুল উলুম হাথাজারীর সাবেক মহাপরিচালক আহমদ শফী প্রকাশ্যে নারীদের ঘরের বাইরে কাজ করার কঠোর বিরোধিতা করেন। তিনি গার্মেন্টস বা অফিসে নারীদের কর্মসংস্থানকে “জেনা ও বেহায়াপনার পথ” হিসেবে আখ্যা দেন। তাঁর মতে, নারীর মূল কাজ কেবল ঘরের ভেতরে স্বামী ও সন্তানের সেবা করা; নারীরা চাকরি করতে বাইরে বের হলে পুরুষদের আকর্ষণ করে এবং সমাজে ব্যভিচার ছড়ায়। তিনি নারীদের উচ্চতর পদে চাকরি করা বা পুরুষদের সাথে কাজ করা সম্পূর্ণ হারাম ঘোষণা করেন।

আহলে হাদিস বা সালাফি ধারার প্রখ্যাত বক্তা আব্দুর রাজ্জাক বিন ইউসুফ একাধিক জনসভায় প্রকাশ্যে ঘোষণা করেন যে, “নারীদের চাকরি করা জেনারেটরের মতো হারাম।” তাঁর মতে, নারীর উপার্জিত অর্থে কোনো প্রকার বরকত থাকে না এবং যে পুরুষরা তাদের স্ত্রী বা কন্যাদের চাকরি করতে বাইরে পাঠায়, তারা শরীয়তের দৃষ্টিতে ‘দাইয়ুস’—যা অনুযায়ী তারা কখনো জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না।

বিতর্কিত আলেম মুফতি কাজী মোহাম্মদ ইব্রাহীম প্রচার করেন যে, এনজিও, ব্যাংক ও করপোরেট অফিসে নারীদের চাকরি দেওয়া মূলত মুসলিম পারিবারিক প্রথা ধ্বংসের এক সুদূরপ্রসারী চক্রান্ত। সমাজে বিবাহবিচ্ছেদ বা ডিভোর্স বাড়ার পেছনে নারীদের অর্থনৈতিক স্বাধীনতাকে দায়ী করে তিনি নারীদের সমস্ত বাইরের চাকরি ছেড়ে ঘরে অবস্থান করার আহ্বান জানান।

একইভাবে দেওবন্দী বক্তা মাওলানা নুরুল ইসলাম ওলিপুরী ও মুফতি তারেক মনোয়ার ফতোয়া দেন যে, পুরুষ ও নারী একসাথে কাজ করার (Co-working) পরিবেশ শরীয়তের দৃষ্টিতে অবৈধ এবং সেখান থেকে অর্জিত অর্থ হারাম। তারা দাবি করেন, নারীরা চাকরি শুরু করায় পুরুষরা কর্মহীন হয়ে পড়ছে, যার ফলে সমাজের স্বাভাবিক অর্থনৈতিক ও পারিবারিক ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে।

২০১৩ সালে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ তাদের ঐতিহাসিক শাপলা চত্বরের ১৩ দফা দাবির মাধ্যমে রাষ্ট্রীয়ভাবে নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা বন্ধ করা এবং গার্মেন্টসসহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠানে নারীদের নাইট শিফটে কাজ নিষিদ্ধ করার প্রাতিষ্ঠানিক ফতোয়াভিত্তিক দাবি সরকারের কাছে পেশ করে।

অর্থনৈতিক মুক্তি ও সামাজিক সংস্কারে বাধা: ভূমি সংস্কার বর্জন

কৃষকদের মুক্তি, সামন্তবাদী শোষণ উচ্ছেদ এবং সমাজে অর্থনৈতিক বৈষম্য দূর করার লক্ষ্যে যখনই বিভিন্ন দেশে রাষ্ট্রীয়ভাবে ভূমি সংস্কার (Land Reform) কিংবা উদ্বৃত্ত জমি দরিদ্র কৃষকদের মধ্যে বণ্টনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, প্রথাগত আলেম সমাজ ভূ-স্বামীদের পক্ষে অবস্থান নিয়ে সেই প্রগতির পথ চিরতরে রুদ্ধ করে দিয়েছেন।

পাকিস্তানে আইনি ফতোয়ার মাধ্যমে ভূমি সংস্কার নিষিদ্ধকরণ (১৯৮৯–১৯৯০)

পাকিস্তানে ভূমি সংস্কারকে ধর্মীয় ও আইনিভাবে স্তব্ধ করে দেওয়ার পেছনে মূল ভূমিকা পালন করেছিল বিচারপতি তাজুদ্দীন হাসনাত, প্রখ্যাত ফকীহ মুফতি মুহাম্মদ তাকী উসমানীসহ অন্য প্রবীণ আলেম কাজীরা, পাশাপাশি রাজনৈতিক দল হিসেবে জামায়াতে ইসলামীর প্রতিষ্ঠাতা মাওলানা আবুল আলা মওদূদী এবং জামিয়াত উলামা-ই-ইসলাম (JUI)।

১৯৮৯ সালে পাকিস্তানের সুপ্রিম কোর্টের ‘শরীয়ত অ্যাপেলেট বেঞ্চ’-এ বিখ্যাত কিসলবাশ ট্রাস্ট বনাম পাকিস্তান সরকার মামলায় মুফতি তাকী উসমানীসহ প্রবীণ আলেম কাজীরা ৩-২ ভোটে ফতোয়াভিত্তিক চূড়ান্ত রায় ঘোষণা করেন। রায়ে বলা হয়—সরকার কর্তৃক আইন করে ভূ-স্বামীদের জমির সর্বোচ্চ সীমা (Ceiling) নির্ধারণ করা এবং মালিকের অনিচ্ছায় উদ্বৃত্ত জমি অধিগ্রহণ করে দরিদ্র কৃষকদের মধ্যে বণ্টন করা সম্পূর্ণ ইসলামবিরোধী (Un-Islamic)।

এই রায়ে মুফতি তাকী উসমানীর মূল যুক্তি ছিল: শরীয়তের দৃষ্টিতে হালালভাবে অর্জিত সম্পত্তি ১ একর হোক কিংবা ১০,০০০ একর হোক—মালিকের সম্মতি ছাড়া রাষ্ট্র তা জোর করে কেটে নিয়ে অন্যকে দিলে তা শরীয়তের নীতি অনুযায়ী ‘ঘাসব’ বা অন্যায় দখলের শামিল। আলেমদের দেওয়া এই ঐতিহাসিক সংবিধিবদ্ধ রায়ের চরম পরিণতিতে পাকিস্তানে আজ পর্যন্ত ভূমি সংস্কার আইন পুরোপুরি নিষিদ্ধ হয়ে আছে, যা দেশটির সামন্তবাদী পীর-জমিদার প্রথা ও রাজনৈতিক বৈষম্যকে টিকিয়ে রাখতে প্রধান অনুঘটক হিসেবে কাজ করছে।

ইরানে শাহের ‘শ্বেত বিপ্লব’ ও খোমেনির রক্তক্ষয়ী আন্দোলন (১৯৬৩)

ইরানে ১৯৬৩ সালে শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভী যখন দেশে ‘শ্বেত বিপ্লব’ (White Revolution)-এর মাধ্যমে বিশাল ভূ-স্বামীদের জমি বাজেয়াপ্ত করে ভূমিহীন দরিদ্র কৃষকদের মধ্যে বণ্টন শুরু করেন, তখন তৎকালীন শিয়া উলামা সমাজ এর বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে বিদ্রোহ ঘোষণা করে। এই আন্দোলনের মূল নেতৃত্বে ছিলেন আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনি এবং ক্বোম ও মাশহাদের শিয়া উলামা পরিষদ।

আয়াতুল্লাহ খোমেনি শাহের এই ভূমি সংস্কার নীতিকে “আমেরিকান ষড়যন্ত্র” এবং “ইসলামী শরীয়তবিরোধী আইন” বলে ফতোয়া জারি করেন। আলেমদের সবচেয়ে বড় ক্ষোভের কারণ ছিল—ভূমি সংস্কারের আওতায় ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও মাদরাসা পরিচালনার মূল আর্থিক উৎস ‘ওয়াকফ সম্পত্তি’ রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণে নেওয়া হচ্ছিল। খোমেনির এই ফতোয়া ও পরবর্তী সময়ে তাঁকে গ্রেপ্তারের জেরে ১৯৬৩ সালের জুনে ইরানজুড়ে রক্তক্ষয়ী দাঙ্গা (যা খোরদাদ ১৫-এর দাঙ্গা নামে পরিচিত) সংঘটিত হয়, যা মূলত প্রথাগত শিয়া আলেমদের রাজনৈতিক ক্ষমতা ও সামন্তবাদী ব্যবস্থার সুরক্ষার লড়াই ছিল।

মিশর, ইরাক ও সিরিয়ায় জমি বাজেয়াপ্তকরণের বিরুদ্ধে ফতোয়া (১৯৫০–১৯৬০ এর দশক)

মিশরে ১৯৫২ সালে বাদশাহি পতনের পর সামরিক শাসক জামাল আবদেল নাসের সামন্তবাদী পাশাদের (Pashas) জমি বাজেয়াপ্ত করতে ভূমি সংস্কার আইন পাশ করলে আল-আজহারের ঐতিহ্যবাদী ফকীহগণ এর বিরুদ্ধে কড়া ফতোয়া দেন। তাদের ফতোয়া ছিল—মালিকের স্বেচ্ছায় সম্মতি ও উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ ছাড়া সরকারের জমি কেড়ে নেওয়া এবং বন্টন করা অনৈসলামিক নীতিমালার পরিপন্থী।

একইভাবে ১৯৫৮ সালের পর ইরাক ও সিরিয়ায় সমাজতান্ত্রিক ধারার ভূমি সংস্কার নীতি গ্রহণ করা হলে প্রখ্যাত শিয়া মারজা আয়াতুল্লাহ মহসিন আল-হাকিম এবং সুন্নি উলামা পরিষদ জমি বাজেয়াপ্তকরণের বিরুদ্ধে ফতোয়া জারি করেন। আয়াতুল্লাহ মহসিন আল-হাকিম ফতোয়া দেন যে, রাষ্ট্রীয় শক্তিতে ভূ-স্বামীদের কাছ থেকে জোর করে কেড়ে নেওয়া জমিতে নামাজ পড়া এবং ফসল ফলানো শরীয়তের দৃষ্টিতে সম্পূর্ণ হারাম।

আধুনিক অর্থব্যবস্থা, ব্যাংকিং ও পুঁজিবাজার বর্জন (১৯ শতক–বিংশ শতাব্দী)

শিল্প বিপ্লবের পর বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও পুঁজি গঠনের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে যখন আধুনিক ব্যাংকিং ব্যবস্থা, বীমা (Insurance) এবং জয়েন্ট-স্টক কোম্পানি বা শেয়ারবাজারের আবির্ভাব ঘটে, তখন উসমানীয় সাম্রাজ্যের শেষভাগের শায়খুল ইসলামগণ এবং উপমহাদেশের প্রথাগত আলেম সমাজ তা ঢালাওভাবে বয়কট করেন।

তারা আধুনিক ইন্স্যুরেন্স বা বীমা ব্যবসাকে ‘জুয়া’ ও ‘অনির্দিষ্টতা’ আখ্যা দিয়ে সম্পূর্ণ হারাম ফতোয়া দেন এবং কাগজের নোট বা পেপার মানি ব্যবহারের বিরুদ্ধে অবস্থান নেন। পাশাপাশি শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করাকে সুদের কারবার দাবি করে তারা মুসলিমদের আধুনিক অর্থব্যবস্থা থেকে দূরে থাকার আহ্বান জানান। প্রাতিষ্ঠানিক আলেম সমাজের এই প্রযুক্তিগত ও অর্থনৈতিক অন্ধত্বের ফলে বৈশ্বিক ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্পায়ন ও আধুনিক পুঁজিবাজারে মুসলমানরা অন্যান্য জাতির চেয়ে শত বছর পিছিয়ে পড়ে।

শেষ কথা

উপরের এই বিস্তারিত ঐতিহাসিক দলিল, ফতোয়া ও ঘটনাপ্রবাহ অত্যন্ত পরিষ্কারভাবে প্রমাণ করে যে, রসুলুল্লাহ (সা:)-এর জমানার বহু পরে রাজনৈতিক অনুঘটক ও স্বার্থের টানে গড়ে ওঠা এই পেশাদার আলেম সমাজ তাদের স্বঘোষিত দুটি প্রধান দাবির একটিও পূরণ করতে পারেনি।

আখিরাতের নাজাত ও বিশ্বাসের হিফাজতের ক্ষেত্রে তাদের চরম ব্যর্থতা আজ দিনের আলোর মতো স্পষ্ট। একদিকে তারা সাধারণ মুসলিমদের মাঝে নৈতিক চরিত্র গঠন ও হারাম উপার্জনের বয়কট নিশ্চিত করতে পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছেন; উল্টো হারাম মালের ওপর দাঁড়িয়ে ওয়াজের মিম্বারগুলোকে গীবত, কুরুচিপূর্ণ গালিগালাজ ও মাযহাবী ফিতনা ছড়ানোর কারখানায় পরিণত করেছেন। অন্যদিকে, আধুনিক জামানায় এসে সাবেক মুসলিম (Ex-Muslims) ও নাস্তিকদের উত্থাপিত গভীর ইলমি ও আকীদাগত খটকাগুলোর কোনো প্রজ্ঞাপূর্ণ জবাব দিতে না পেরে তারা আজ বাক্যহারা ও হিরান-পেরেশান। যুক্তি ও তর্ক দিয়ে মোকাবিলা করার বদলে কেবল ব্যক্তিগত গালিগালাজ আর ফতোয়াবাজির পুরোনো অভ্যাসে আটকে থেকে তারা উম্মাহর ঈমানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুরোপুরি অসমর্থ হয়েছেন।

একইভাবে, উম্মাহর দুনিয়াবি জীবনের ‘হাসানা’ ও প্রগতির বিষয়ে মতামত দেওয়ার কোনো ইলমি কর্তৃত্ব বা অথরিটি না থাকা সত্ত্বেও, তারা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে নিজেদের সীমাবদ্ধ চিন্তাভাবনাকে দ্বীনের নামে সাধারণ মানুষের ওপর জোরপূর্বক চাপিয়ে দিয়েছেন। ইতিহাসের প্রতিটি মোড়ে ও যুগসন্ধিক্ষণে—তা ছাপাখানা থেকে শুরু করে রেডিও, টিভি, মাইক, ক্যামেরা, ভিডিও, ইংরেজি ও আধুনিক শিক্ষা, মেডিকেল অপারেশন, এক্স-রে, অঙ্গদান, হিউম্যান মিল্ক ব্যাংক, পোলিও ও করোনা টিকা, নারী শিক্ষা, নারীদের কর্মসংস্থান কিংবা ভূমি সংস্কারের মতো চরম সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রগতির পদক্ষেপই হোক না কেন—তারা প্রগতির পক্ষে অবস্থান নেওয়া তো দূরের কথা, কখনোই ‘ইতিহাসের সঠিক পক্ষে’ (Right side of history) গিয়ে দাঁড়াতে পারেননি।

আর সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হলো, যে আবিষ্কারকে তারা শুরুতে ‘হারাম’, ‘কুফরি’ কিংবা ‘শয়তানের যাদু’ আখ্যা দিয়ে চরম প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন, কয়েক দশক পার হতেই নিজেদের রুটিন কাজ ও সুবিধার স্বার্থে রাতারাতি ফতোয়া বদলে সেটিকে আবার ‘জায়েজ’ বানিয়ে সানন্দে কোলে টেনে নিয়েছেন।

আমাদের মতো সাধারণ মুসলিমরা তাঁদের প্রতি নিয়মিত জাকাত, ফিতরা ও ইহতিরামের কোনো কমতি না রাখলেও, কোনো নাদান দোস্তের মতো আলেম সমাজের এই দ্বিচারিতা, অনধিকার চর্চা ও অদূরদর্শিতার খেসারত গুণতে গিয়ে পুরো মুসলিম উম্মাহ আজ দ্বীনী নৈতিকতা, বিশ্বপ্রপঞ্চের প্রগতি, বিজ্ঞানচর্চা ও বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় শত শত বছর পেছনে পড়ে রইল।

শেয়ার করুন: Facebook X WhatsApp LinkedIn

প্রেস ডেস্ক, সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর এর অফিস

কুমারখালী, কুষ্টিয়ার মানুষের পাশে থেকে ইতিহাস, রাজনীতি, প্রযুক্তি ও উন্নয়ন নিয়ে লেখালেখি।

সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সম্পাদক, কুষ্টিয়া জেলা আওয়ামী লীগ। ইতিহাস, রাজনীতি, প্রযুক্তি ও উন্নয়ন নিয়ে লেখালেখি।

যোগাযোগ

কুমারখালী, কুষ্টিয়া, বাংলাদেশ
+৮৮০ ১XXX-XXXXXX
info@sufifaruq.com

© ২০২৬ সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।