ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের প্রাচীন ও অন্যতম গম্ভীর রাগগুলোর মধ্যে ‘রাগ গৌরী’ একটি বিশেষ স্থান দখল করে আছে। হিন্দুস্তানি শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে গৌরী রাগের বেশ কয়েকটি প্রকারভেদ বা রূপ দেখতে পাওয়া যায়। গায়কী ও ঘরানার ভিন্নতা অনুযায়ী এটি ভৈরব, মারওয়া এবং পূরবী— এই তিনটি ভিন্ন ঠাটেই গাওয়া হয়ে থাকে। তবে আজ আমরা আলোচনা করব পূরবী ঠাটের অন্তর্গত রাগ গৌরী নিয়ে, যা তার গভীর আবেগ ও করুণ রসের জন্য সঙ্গীত রসিকদের কাছে অত্যন্ত সমাদৃত।
রাগ গৌরীর পরিচয়, বিশেষত্ব ও ইতিহাস পূরবী ঠাটের অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় এই রাগের স্বরবিন্যাস বেশ স্বতন্ত্র। নিচে এর তাত্ত্বিক পরিচয় তুলে ধরা হলো:
- ঠাট: পূরবী (Poorvi Thaat)
- জাতি: ষাড়ব-সম্পূর্ণ (আরোহণে ৬টি এবং অবরোহণে ৭টি স্বর)। তবে অনেক পণ্ডিতের মতে এটি সম্পূর্ণ-সম্পূর্ণ জাতির রাগ, কারণ আরোহণে অনেক সময় কোমল ধা-র ব্যবহার দুর্বলভাবে করা হয়।
- আরোহণ: সা রে গ মা প, নি র্সা
- অবরোহণ: র্সা নি ধ প, মা গ, মা রে গ রে সা
- পকড়: রে গ মা প, মা গ, মা রে গ রে সা
- বাদী স্বর: কোমল ঋষভ (রে)।
- সমবাদী স্বর: পঞ্চম (প)।
- ব্যবহৃত স্বর: ঋষভ (রে) এবং ধৈবত (ধা) কোমল; মধ্যম (মা) তীব্র/কড়ি; বাকি সমস্ত স্বর (সা, গা, প, নি) শুদ্ধ।
- সময়: দিনের চতুর্থ প্রহর বা গোধূলি লগ্ন (সন্ধ্যাকাল)। এটি একটি সান্ধ্যকালীন ‘সন্ধিপ্রকাশ রাগ’ (যে রাগ দিন ও রাতের মিলনলগ্নে গাওয়া হয়)।
- প্রকৃতি: অত্যন্ত গম্ভীর, করুণ এবং ভক্তিভাব পূর্ণ।
সংশ্লিষ্ট বা রিলেটেড রাগসমূহ পূরবী ঠাটের অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় স্বভাবতই এর সাথে রাগ শ্রী (Shree) এবং রাগ পূরবী (Poorvi)-এর বেশ মিল পাওয়া যায়। তবে একজন দক্ষ শিল্পী অতি নিপুণভাবে এদের মধ্যে পার্থক্য তৈরি করেন:
- রাগ শ্রী থেকে পার্থক্য: শ্রী রাগে ‘রে’ এবং ‘পা’ (ঋষভ ও পঞ্চম)-এর ওপর খুব বেশি জোর দেওয়া হয় (মীড় দিয়ে)। কিন্তু গৌরীতে ‘সা-রে-গা-মা’ এবং অবরোহণে ‘মা-রে-গা-রে-সা’ চলনটি বেশি প্রাধান্য পায়, যা একে শ্রী থেকে আলাদা করে।
- রাগ পূরবী থেকে পার্থক্য: পূরবী রাগে তীব্র মধ্যমের (মা) সাথে শুদ্ধ মধ্যমেরও (শুদ্ধ মা) একটি বিশেষ ব্যবহার রয়েছে। কিন্তু গৌরী রাগে কেবল তীব্র মধ্যমই ব্যবহৃত হয় এবং বাদী স্বর ‘রে’ হওয়ায় এর ঝোঁক বা ভরকেন্দ্র পূরবীর চেয়ে কিছুটা ভিন্ন হয়।
রাগ গৌরী (পূরবী ঠাট) অত্যন্ত ধীর ও বিলম্বিত লয়ে গাওয়ার উপযোগী একটি রাগ। দিনান্তের ক্লান্তি, একাকীত্ব এবং সৃষ্টিকর্তার প্রতি আত্মসমর্পণের যে শান্ত-করুণ রস, তা এই রাগের স্বরবিন্যাসের মধ্য দিয়ে চমৎকারভাবে ফুটে ওঠে। কোমল রে এবং কড়ি মা-এর সংমিশ্রণ এই রাগে এক অদ্ভুত বিষাদময় আবেশ তৈরি করে। এই রাগের চলন সাধারণত মন্দ্র (নিচের) এবং মধ্য সপ্তকে বেশি সুন্দরভাবে ফুটে ওঠে।
আধুনিক যুগে রাগ গৌরী এককভাবে খুব বেশি শোনা না গেলেও, অন্যান্য রাগের মিশ্রণ হিসেবে (যেমন: ললিত গৌরী, ভৈরব গৌরী, চৈত্রি গৌরী) এটি বেশ জনপ্রিয়। পূরবী ঠাটের গৌরী রাগ শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের এক অমূল্য রত্ন, যা গোধূলি লগ্নের বিষাদ ও মাধুর্যকে সুরের তুলিতে নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তুলতে সক্ষম।



