আগমনী গান | অসুরের সুরলোকযাত্রা সিরিজ

শরতের শিশিরস্নাত ভোর, শিউলি ফুলের স্নিগ্ধ সুবাস এবং নদীর তীরে কাশফুলের শুভ্র সমারোহের সাথে সনাতন বাঙালির যে আবহমান আবেগ জড়িয়ে আছে, তার অন্তর্নিহিত সুরধারাটি হলো ‘আগমনী গান’। বাংলা সাহিত্য ও লোকসঙ্গীতের সুবিশাল মানচিত্রে শাক্ত পদাবলির এক অত্যন্ত করুণ, মর্মস্পর্শী এবং বাৎসল্য রসে সিক্ত শাখা হলো এই আগমনী গীতধারা। অষ্টাদশ ও উনবিংশ শতাব্দীতে বাংলার নিভৃত পল্লীতে জন্ম নেওয়া এই সঙ্গীতরীতি কেবল পূজাপার্বণ বা দেবস্তুতির কোনো প্রথাগত গণ্ডিতে আবদ্ধ থাকেনি; বরং তা স্বর্গীয় দেবলোককে মর্ত্যের বাঙালি গৃহস্থালির ধুলোমাটির আঙিনায় নামিয়ে এনে ঈশ্বর ও মানুষের মধ্যকার যাবতীয় দূরত্বের অবসান ঘটিয়েছে।

দেবী দুর্গা এখানে নিখিল বিশ্বের মহাশক্তি কিংবা ‘মহিষাসুরমর্দিনী’ অপেক্ষা অনেক বেশি পরিচিত আমাদের ঘরের আদরের বালিকা কন্যা ‘উমা’ বা ‘গৌরী’ হিসেবে। আগমনী গান মূলত বাঙালির সেই চিরন্তন পারিবারিক আখ্যান, যেখানে ঐশ্বরিক পরাক্রমের বদলে মাতৃহৃদয়ের সীমাহীন আকুলতা এবং এক কন্যার প্রতি গভীর মমতায় অশ্রু বিসর্জনই প্রধান হয়ে উঠেছে।

পৌরাণিক আখ্যান ও মর্ত্যের লৌকিক রূপান্তর

আগমনী গানের পৌরাণিক প্রেক্ষাপট গড়ে উঠেছে শিব-পার্বতী আখ্যান এবং বাংলার সুপ্রাচীন লৌকিক সংস্কারের এক নিবিড় মনস্তাত্ত্বিক মেলবন্ধনের ওপর ভিত্তি করে। শাস্ত্রীয় পুরাণ অনুযায়ী, গিরিরাজ হিমালয় ও রানী মেনকার পরম আদরের কন্যা উমা বা পার্বতী। উমার বিয়ে হয়েছে শ্মশানচারী, সর্বত্যাগী, ভাঙড় ও নিরাসক্ত বৃদ্ধ শিবের সঙ্গে। বাপের বাড়ির ধনধান্য ও রাজসিক সুখের বিপরীতে উমাকে প্রতিনিয়ত সহ্য করতে হয় কৈলাসের অভাব-অনটন, দারিদ্র্য ও নিদারুণ প্রতিকূল পরিবেশ। নিয়ম অনুযায়ী, বছরের ৩৬২ দিন উমা কৈলাসে স্বামীর ঘরে অবস্থান করেন, আর শরৎকালের শারদোৎসবের মাত্র তিনটি দিন (সপ্তমী, অষ্টমী ও নবমী) তিনি বাপের বাড়ি মর্ত্যে আসার অনুমতি পান।

আগমনী গানের মূল অলৌকিকত্ব হলো, এটি পৌরাণিক মহাদেবীকে এক নিমেষে বাঙালি মধ্যবিত্ত বা প্রাক-আধুনিক যৌথ পরিবারের কনিষ্ঠা কন্যারূপে রূপান্তরিত করেছে। কৈলাস থেকে বাপের বাড়িতে মেয়ের ফেরা নিয়ে মাতা মেনকার যে সীমাহীন উৎকণ্ঠা, সারা বছর পথ চেয়ে থাকা এবং স্বামী হিমালয়ের প্রতি ব্যাকুল অনুনয়—তা-ই আগমনী গানের মূল কাব্যিক আধার। এই গানে দেবী দুর্গার অসুর বধের কোনো হুংকার নেই, দশ হাতে অস্ত্র ধারণের কোনো আস্ফালন নেই; আছে কেবল এক বিবাহিতা দরিদ্র কন্যার জন্য মায়ের বুক ফাটা আর্তনাদ। যখন মেনকা বলেন, ‘গিরিরাজ, গৌরী আমার এসেছে কি?’, তখন তা আর হিমালয় রাজকন্যার গল্প থাকে না, তা হয়ে ওঠে প্রতিটি বাঙালি মায়ের নাড়ির টান।

অষ্টাদশ শতাব্দীর সমাজবাস্তবতা ও বাৎসল্য রসের মনস্তত্ত্ব

আগমনী গানের সর্বপ্রধান রস হলো বাৎসল্য রস, যা তৎকালীন বাংলার চরম নিষ্ঠুর সমাজবাস্তবতার বুক চিরে জন্ম নিয়েছিল। অষ্টাদশ শতাব্দীতে বাংলা এক ভয়াবহ রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল। মোগল সাম্রাজ্যের পতন, বর্গিদের বর্বরোচিত আক্রমণ, ছিয়াত্তরের মন্বন্তরের মতো ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ এবং ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শোষণে বাংলার জনজীবন যখন বিপর্যস্ত, ঠিক সেই ঘোর অমানিশায় মানুষ একজন ত্রাতা হিসেবে মাতৃশক্তির আরাধনা শুরু করে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, শাক্ত সাধকরা মহাশক্তিকে কেবল ত্রাতা হিসেবে না দেখে তাকে নিজের ঘরের কন্যা হিসেবে কল্পনা করে এক অদ্ভুত মানসিক আশ্রয় খুঁজে পান।

তৎকালীন হিন্দু সমাজে ‘গৌরীদান’ বা বাল্যবিবাহের নির্মম প্রথা ব্যাপকভাবে প্রচলিত ছিল। আট বা নয় বছর বয়সী কন্যাদের গৌরীদান প্রথায় দূরবর্তী অজানা গ্রামে, অনেক ক্ষেত্রে বয়স্ক বা কুলীন পাত্রের সাথে বিয়ে দিয়ে পাঠিয়ে দেওয়া হতো। তখনকার দিনে যাতায়াতের সুব্যবস্থা না থাকায় এবং সামাজিক কঠোর অনুশাসনের কারণে বিবাহিত কন্যারা সহজে বাপের বাড়ি আসতে পারত না। মমায়েরা সারা বছর পথ চেয়ে বসে থাকতেন—কখন তাঁদের দুধের শিশু কন্যাটি বাপের বাড়িতে একটু হাসিমুখ নিয়ে ফিরে আসবে।

শ্বশুরালয়ের দারিদ্র্য, সতীন-জ্বালা, শাশুড়ির গঞ্জনা এবং স্বামীর উদাসীনতা নিয়ে মায়েদের যে তীব্র অন্তর্দাহ, তা মেনকার জবানীতে আগমনী পদের ছত্রে ছত্রে ফুটে উঠেছে। উমা যখন বাপের বাড়িতে পা রেখে মা মেনকাকে জড়িয়ে ধরে অশ্রুপাত করেন এবং শিবের চরম দারিদ্র্যের কথা বর্ণনা করেন, তখন তা প্রাক-আধুনিক বাংলার ঘরে ঘরে বাল্যবিবাহের যাতনায় ক্লিষ্ট কন্যা ও মায়ের এক অশ্রুসিক্ত সামাজিক দলিলে পরিণত হয়।

কালজয়ী পদকর্তা ও তাঁদের সাহিত্যিক প্রজ্ঞা

আগমনী গানকে একটি সুসংহত সাহিত্যিক ও সাঙ্গীতিক রূপ দেওয়ার পেছনে অষ্টাদশ ও উনবিংশ শতাব্দীর কয়েকজন কিংবদন্তি সাধক ও পদকর্তার অসামান্য অবদান রয়েছে। এঁদের কাব্যপ্রজ্ঞা ও সুরের গভীরতা আগমনী গানকে লোকায়ত হৃদয়ের খুব কাছাকাছি নিয়ে গিয়েছিল।

শাক্ত পদাবলির দিশারী সাধক কবি রামপ্রসাদ সেনের হাত ধরেই আগমনী গান এক পরম আত্মিক ও মানবিক উচ্চতায় পৌঁছায়। রামপ্রসাদ নিজের ব্যক্তিগত জীবনের দারিদ্র্য ও যাতনাকে আগমনী গানের মধ্যে এমনভাবে মিশিয়ে দিয়েছিলেন যে, তাঁর রচিত মেনকার বিলাপগুলো হয়ে উঠেছিল বাংলার আপামর জনসাধারনের মনের কথা। তাঁর ‘রামপ্রসাদী’ সুরে উমার প্রতি বাৎসল্য ও ভক্তির অনন্য মিশ্রণ দেখা যায়। রামপ্রসাদের ধারায় পরবর্তীকালে সবচেয়ে শক্তিশালী পদকর্তা হিসেবে আবির্ভূত হন সাধক কমলাকান্ত ভট্টাচার্য। বর্ধমান মহারাজের সভাকবি হওয়া সত্ত্বেও কমলাকান্তের পদে রাজকীয় আভিজাত্যের বদলে গ্রামীণ আবেগ, বাৎসল্য রসের গভীরতা ও মাতৃস্নেহের আর্দ্রতা ছিল অত্যন্ত তীব্র। তাঁর রচিত ‘কবে যাবে গিরিরাজ গৌরী আনিতে’ পদটি আগমনী ধারার এক অমর সৃষ্টি।

উনবিংশ শতাব্দীতে এই ধারাকে আরও নাট্যিক ও জনপ্রিয় করে তোলেন রূপকার দাশরথি রায় বা দাশু রায়। পাঁচালি ও আগমনী গীতি রচনায় দাশু রায়ের জুড়ি ছিল না। তাঁর পদে অনুপ্রাস, চমকপ্রদ শব্দালঙ্কার এবং সংলাপধর্মী নাট্যিকতা আগমনী গানকে সাধারণ মানুষের মুখে মুখে ফিরতে সাহায্য করে। পরবর্তীকালে নীলকণ্ঠ মুখোপাধ্যায়, রাম বসু এবং দেওয়ান রামকমল সেনের মতো পদকর্তাগণ এই ধারায় করুণ রস ও ভক্তির এক অপূর্ব স্নিগ্ধতা যুক্ত করেন। এমনকি পর্তুগিজ বংশোদ্ভূত কবিয়াল অ্যান্টনি ফিরিঙ্গিও এই আগমনী গানের আকর্ষণে মুগ্ধ হয়ে অসাধারণ কিছু পদ রচনা করে বাংলা লোকসংস্কৃতির ইতিহাসে অমর হয়ে আছেন।

সাঙ্গীতিক ব্যাকরণ, সুরকাঠামো ও গায়কী

আগমনী গানের নিজস্ব সাঙ্গীতিক ব্যাকরণ ও সুরপ্রক্ষেপণ রীতি রয়েছে, যা এটিকে অন্যান্য লোকগান থেকে সম্পূর্ণ আলাদা একটি শাস্ত্রীয়-লৌকিক গাম্ভীর্য প্রদান করেছে। যদিও এটি মূলগতভাবে শাক্ত গীতিপর্যায়ের অন্তর্ভুক্ত, তবুও এর গায়কী লোকায়ত এবং লঘু-শাস্ত্রীয় সুরের এক অপূর্ব সমন্বয়ে গঠিত।

আগমনী গানের প্রধান ভিত্তি হলো ‘মালসী’ এবং ‘রামপ্রসাদী’ সুর। মহালয়া ও শরতের প্রাতঃকালে গীত এই গানগুলোতে প্রধানত প্রাতঃকালীন রাগ-রাগিণীর প্রভাব সুস্পষ্ট। ভৈরব, ভৈরবী, তোড়ী, রামকেলি, মালকোষ এবং খাম্বাজ রাগের কোমল স্বরপ্রক্ষেপণ এই গানগুলোতে ব্যবহৃত হয়, যা শ্রোতার হৃদয়ে এক ধরনের স্নিগ্ধতা, আকুলতা ও আধ্যাত্মিক বিষাদ জাগিয়ে তোলে। গানের অলঙ্করণে দীর্ঘ টান, মীড় এবং গমকের ব্যবহার বাৎসল্য রসবোধকে আরও নিবিড় করে। বাদ্যযন্ত্র হিসেবে মূলত বাঁশি, এস্রাজ, খোল, করতাল, একতারা ও দোতারা ব্যবহৃত হয়, যা গ্রামবাংলার মাটির গন্ধকে সুরের সাথে মিশিয়ে দেয়।

আগমনী ও বিজয়া: আনন্দ ও বিষাদের চিরন্তন দ্বৈতসত্তা

শাক্ত পদাবলিতে আগমনী এবং বিজয়া হলো একই মুদ্রার দুই পিঠ। এই দুটি ধারা মিলে উমার আগমন ও বিদায়ের এক সম্পূর্ণ করুণ কাব্যগাঁথা তৈরি করে। আগমনী গানে উমার মর্ত্যে আসার আনন্দ, বাপের বাড়িতে পদার্পণ এবং মা মেনকার পরম বাৎসল্য রসের উদযাপন ঘটে। কিন্তু এই আনন্দের মাঝেই লুকিয়ে থাকে এক অজানা আতঙ্ক, কারণ মেনকা জানেন মাত্র তিন দিন পরেই দশমীর দিন উমাকে আবার কৈলাসে ফিরে যেতে হবে।

সপ্তমী ও অষ্টমীর আনন্দের পর নবমীর রাত থেকেই মেনকার বুক কেঁপে ওঠে। ‘ওরে নবমী নিশি, না হইও রে অবসান’—এই আর্তনাদের মধ্য দিয়ে আগমনীর সুর বিজয়ার বিষাদে পরিণত হয়। যে সুর আগমনীতে মিলন ও বাৎসল্য আনন্দের দোলা দিয়ে শুরু হয়, বিজয়া দশমীতে গিয়ে তা-ই সজল অশ্রু, হাহাকার ও চিরন্তন বিদায়ের করুণ রসে সিক্ত হয়। মেনকার এই কান্না আসলে পৃথিবীর সকল মায়ের কান্না, যারা তাদের কন্যাকে বিয়ের পর শ্বশুরবাড়ি বিদায় দেওয়ার সময় অনুভব করেন।

আধুনিক সংস্কৃতি ও শারদীয় চেতনায় আগমনী

কালের বিবর্তনে সমাজ বদলেছে, বাল্যবিবাহ প্রথা বিলুপ্ত হয়েছে, আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি হয়েছে; কিন্তু আগমনী গানের মনস্তাত্ত্বিক ও আবেগিক আবেদন বাঙালি সংস্কৃতিতে বিন্দুমাত্র ম্লান হয়নি। আধুনিক যুগে আগমনী গান ধর্মীয় উপাসনার গণ্ডি পেরিয়ে সম্পূর্ণ রূপে একটি সর্বজনীন সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যে পরিণত হয়েছে।

বিশ শতকে কাজী নজরুল ইসলাম শাক্ত পদাবলি ও আগমনী গানের এই ধারাকে এক নতুন প্রাণশক্তি দান করেন। তাঁর রচিত ‘জাগো দশপ্রহরণধারিণী’ কিংবা ‘যাও যাও গিরিরাজ’ গানগুলো আগমনী ধারায় নতুন যুগের সূচনা করে। মহালয়ার পুণ্য লগ্নে ভোরে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের অনবদ্য চণ্ডীপাঠ ও বাণীকুমার রচিত গীতি-আলেখ্য ‘মহিষাসুরমর্দিনী’-র সম্প্রচার শুরু হওয়ার সাথে সাথে রেডিওর বুক চিরে যখন আগমনী গানের সুর ভেসে আসে, তখন ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সমগ্র বাঙালি জাতি এক অদ্ভুত আত্মিক শিহরণ অনুভব করে।

আগমনী গান কেবল প্রাচীন শাক্ত পদাবলির কোনো শুষ্ক ঐতিহাসিক অধ্যায় নয়; এটি বাঙালি জাতির মনস্তাত্ত্বিক আবেগ, বাৎসল্য প্রেম ও সামাজিক ইতিহাসের সবচেয়ে জীবন্ত দলিল। স্বর্গীয় দেবত্বকে মর্ত্যের রক্ত-মাংসের সম্পর্কে রূপান্তর করে আগমনী গান প্রমাণ করেছে যে, ঈশ্বরকে কেবল দূর আকাশের কোনো ভয়ংকর মহাশক্তি হিসেবে নয়, বরং ঘরের পরম আদরের সন্তান ‘উমা’ হিসেবেও পরম মমতায় হৃদয়ে ধারণ করা যায়।

 

 

কিছু আগমনী গান:

শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বহু কালজয়ী সাধক, কবি ও গীতিকার আগমনী গান রচনা করেছেন, যা বাঙালির শারদীয় আবেগের অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়েছে। বাংলা লোকসংস্কৃতি ও শাক্ত পদাবলির ইতিহাসে সবচেয়ে প্রামাণ্য ও বিখ্যাত কয়েকটি আগমনী গানের তালিকা নিচে দেওয়া হলো:

  • কবে যাবে গিরিরাজ গৌরী আনিতে: শাক্ত পদকর্তা কমলাকান্ত ভট্টাচার্যের লেখা এটি অন্যতম শ্রেষ্ঠ আগমনী পদ। কন্যা উমাকে কৈলাস থেকে মর্ত্যে ফিরিয়ে আনার জন্য স্বামী হিমালয়ের প্রতি মা মেনকার আকুল অনুনয় ও অভিমান এই গানে অত্যন্ত জীবন্ত হয়ে উঠেছে।

  • গিরি এবার আমার উমা এলে: সাধক রামপ্রসাদ সেনের রচিত এই গানটিতে বাৎসল্য রসের চরম প্রকাশ ঘটেছে। উমা এলে সমাজ বা শিবের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে তাকে আর কৈলাসে ফেরত না পাঠানোর যে জেদ মা মেনকা করেছেন, তা তৎকালীন বাংলার প্রতিটি মায়ের মনের কথা হয়ে ধরা দিয়েছে।

  • গিরিবর, আর তো আমি সহিতে নারি: এটিও রামপ্রসাদ সেনের এক অমর সৃষ্টি। দীর্ঘ এক বছর কন্যার মুখ না দেখতে পাওয়ার কারণে মেনকার অন্তরের তীব্র হাহাকার এবং শিবের চরম দারিদ্র্য নিয়ে মায়ের দুশ্চিন্তা এই পদের ছত্রে ছত্রে ফুটে উঠেছে।

  • যাও যাও গিরি আনিতে গৌরী: বিংশ শতাব্দীতে কাজী নজরুল ইসলামের লেখা এই গানটি আগমনী ধারায় এক নতুন মাত্রা যোগ করেছিল। মেনকার জবানিতে লেখা এই গানে ভৈরব রাগের প্রভাব এবং শাস্ত্রীয় সুরের নিখুঁত বুনন রয়েছে, যা নজরুলের শাক্ত ভক্তির এক অনন্য নিদর্শন।

  • বাজলো তোমার আলোর বেণু: আধুনিক যুগের আগমনী গানের কথা উঠলে এই গানটির নাম সর্বাগ্রে আসে। বাণীকুমারের অনবদ্য রচনা এবং পঙ্কজ কুমার মল্লিকের সুরে এই গানটি মূলত ‘মহিষাসুরমর্দিনী’ গীতি-আলেখ্যের অংশ। মহালয়ার ভোরে রেডিওতে সুপ্রীতি ঘোষের কণ্ঠে গীত এই গানটি ছাড়া আধুনিক বাঙালির দুর্গাপূজার সূচনা যেন অসম্পূর্ণ থেকে যায়।

  • জাগো দুর্গা, জাগো দশপ্রহরণধারিণী: এটিও বাণীকুমার রচিত এবং পঙ্কজ কুমার মল্লিকের সুরারোপিত ‘মহিষাসুরমর্দিনী’ অনুষ্ঠানের অন্যতম কালজয়ী গান। শিল্পী দ্বিজেন মুখোপাধ্যায়ের গম্ভীর ও উদাত্ত কণ্ঠে গীত এই গানটি অসুরদলনীর আগমনী বার্তার সবচেয়ে জনপ্রিয় রূপ।

 

সোর্স ও প্রামাণ্য রেফারেন্স

১. বাংলার শাক্ত পদাবলি — প্রমথনাথ বিশী।

২. বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস (খণ্ড ২ ও ৩) — ড. অসিতকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়।

৩. রামপ্রসাদ ও শাক্ত পদাবলি — ড. অমলেন্দু বসু।

৪. বাঙালির পূজা-পার্বণ ও লোকসংস্কৃতি — বিনয় ঘোষ।

৫. শাক্ত পদাবলি ও আগমনী-বিজয়া — ড. সুকুমার সেন।

 

আরও দেখুন: