বাংলাদেশের ক্রিকেটে পাকিস্তানের ভূমিকা!

ওডিআই ও টি-টোয়েন্টিতে ‘বাংলাওয়াশ’ আর টেস্টে পাকিস্তানকে ঐতিহাসিক পরাজয়ের স্বাদ দেখানোর পর এ দেশের কিছু জন্মসূত্রে ‘দিলসে পাকিস্তানি’র বুকফাটা আর্তনাদ আর চোখ দিয়ে গড়িয়ে পড়া করুণা এখন বিভ্রান্তির নতুন ফাঁদ পেতেছে। তাদের সেই চেনা মুখস্থ ক্যাসেট বাজছে— “বাংলাদেশ ক্রিকেটের অগ্রগতিতে নাকি পাকিস্তানের বিশাল অবদান!” অথচ ইতিহাস একটু ওল্টালেই ভেসে ওঠে অবহেলা, বর্ণবাদ, ঔদ্ধত্য, ষড়যন্ত্র আর ঘোর অকৃতজ্ঞতার এক কুৎসিত ইতিহাস।

৭১-পূর্ব ক্রিকেটীয় বর্ণবাদ ও শোষণ

বাংলাদেশের ক্রিকেটে পাকিস্তানের তথাকথিত ‘অবদান’ খুঁজতে হলে আগে ১৯৭১ পূর্ববর্তী অধ্যায় দেখতে হবে। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের বিশ্বমানের প্রতিভাবান ক্রিকেটারদের আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সুযোগ না দিয়ে বছরের পর বছর বেঞ্চে বসিয়ে রাখা হতো। আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ক্রিকেটার রাকিবুল হাসানকে পাকিস্তান জাতীয় দলের দ্বাদশ ব্যক্তি (12th man) বানিয়ে রাখা হয়েছিল। ১৯৭১ সালের ফেব্রুয়ারিতে ঢাকা স্টেডিয়ামে (বর্তমান শের-ই-বাংলা/বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়াম) আন্তর্জাতিক দলের বিরুদ্ধে পাকিস্তান দলের হয়ে খেলার সময় রাকিবুল হাসান তার ব্যাটে ‘জয় বাংলা’ স্টিকার লাগিয়ে মাঠে নেমে পাকি শোষণের বিরুদ্ধে ঐতিহাসিক প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন। পাকিস্তানি ক্রিকেট বোর্ডের চোখে বাঙালি চিরকালই ছিল তথাকথিত ‘দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক’।

১৯৮০-র ইমরান খান ও ঔদ্ধত্যের সূচনা

স্বাধীনতার পর ১৯৮০ সালে জিয়াউর রহমানের আমলে পাকিস্তান দল ‘ওমর কোরেশী একাদশ’ নামে ঢাকায় প্রথম খেলতে আসে। দলের অধিনায়ক ইমরান খান (ইমরান খান নিয়াজি— যার স্বজাতি ও মিয়াওয়ালীর পারিবারিক গোত্র ১৯৭১ সালে বাঙালি গণহত্যার অন্যতম মূল কারিগর জেনারেল এ এ কে নিয়াজি) স্বাধীন বাংলাদেশের মাটিতে পা রেখেই বাঙালি জাতিকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে বলেছিল, ‘নমস্তে!’ শুধু তা-ই নয়, চট্টগ্রামের মাঠে তাদের চরম অপেশাদার ও ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণে ক্ষুব্ধ হয়ে স্টেডিয়ামের দর্শকরা গ্যালারি ছেড়ে মাঠে নেমে প্রতিবাদ জানাতে বাধ্য হয়েছিল। তারা এ দেশে খেলতে এসেছিল ক্রিকেটীয় ভালোবাসায় নয়, কেবল নামমাত্র খরচে পকেট ভারী করতে।

হাসিবুল হাসান শান্তর ক্যারিয়ার ধ্বংসের চক্রান্ত

ঢাকা লিগে পাকিস্তানিদের অবদান আসলে কী ছিল? ১৯৯০-এর দশকের শেষভাগে ঢাকা প্রিমিয়ার লিগে খেলার সময় পাকিস্তানের ক্রিকেটার জহুর এলাহী ব্যাট দিয়ে আঘাত করে জাতীয় দলের সেরা পেসার হাসিবুল হাসান শান্তর বাঁ হাঁটু গুঁড়িয়ে দেয়। বাংলাদেশের তৎকালীন সবচেয়ে সম্ভাবনাময় পেস আক্রমণের ধারকে এভাবে মাঠেই পঙ্গু করে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু বিসিবি তাদের বিরুদ্ধে কোনো কঠোর ব্যবস্থা তো নেয়ইনি, উল্টো পরের মৌসুমেও ওই পাকি খেলোয়াড় এ দেশে খেলে গেছে নির্বিঘ্নে।

ম্যাচ ফিক্সিংয়ের বিষবৃক্ষ ও ঢাকা লিগের সিন্ডিকেট

ঢাকা লিগে পাকিস্তানিরা শুধুই টাকা কামাতে আসত। ১৯৯০-এর দশকে বিচারপতি কাইয়ুম কমিশনের তদন্তে পাকিস্তানের জাতীয় ক্রিকেট দল যে ফিক্সিংয়ের আখড়া হিসেবে প্রমাণিত হয়েছিল, সেই কলঙ্কিত ফিক্সিংয়ের বীজ তারা ঢাকা প্রিমিয়ার লিগেও ছড়িয়ে দেয়। আসা-যাওয়ার প্লেন ভাড়া আর থাকা-খাওয়ার চুক্তিতে খেলতে এসে তারা পরবর্তী মৌসুমে আরও ২-৩ জন সস্তা পাকি খেলোয়াড়কে সাথে নিয়ে আসত নিজস্ব সিন্ডিকেট তৈরি করতে।

সাকিব-ওয়াহাব রিয়াজ ও সুশীলদের ‘অতিথি পরায়নতা’

২০১৫ সালে মিরপুর টেস্টে সাকিব আল হাসানের সঙ্গে ওয়াহাব রিয়াজের অনভিপ্রেত আচরণ কিংবা রামিজ রাজা ও আকিব জাভেদদের বছরের পর বছর ধরে বাংলাদেশ ক্রিকেটকে ছোট করে কথা বলা— সবই একই মানসিকতার ধারাবাহিকতা। সাকিব যখন আঙুল তুলে ওয়াহাব রিয়াজের চোখ রাঙানির কড়া জবাব দিলেন, তখন এ দেশের একদল ‘পাকি-প্রেমিক’ সুশীল কাঁদতে বসলেন— “বাংলাদেশ তো অতিথি পরায়ন!” ঘরের মাঠে অতিথি সেজে এসে যদি কেউ অভদ্রতা আর ঔদ্ধত্য দেখায়, তাকে মাঠেই সঠিক জবাব দেওয়াই ক্রিকেটীয় ও জাতীয় ব্যক্তিত্বের পরিচয়।

আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ক্রিকেটীয় ব্ল্যাকমেইল

২০১২ এশিয়া কাপের ফাইনালে বিতর্কিত আম্পায়ারিং ও সিদ্ধান্ত, কিংবা পরবর্তীতে ২০১৭ সালে বাংলাদেশে দ্বিপক্ষীয় সিরিজ খেলতে আসার বিনিময়ে পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ডের (পিসিবি) অনৈতিকভাবে লাখ লাখ ডলার (প্রায় ৩ লাখ ডলার) দাবি করা— এসবই প্রমাণ করে পাকিস্তানের কাছে বাংলাদেশ ক্রিকেট কখনোই সহযোগিতা পায়নি, পেয়েছে কেবল বাণিজ্যিক শোষণ, ঈর্ষা আর ব্ল্যাকমেইল।
আজ যখন টাইগাররা মাঠে ব্যাটে-বলে পাকিদের তুলোধুনা করে মাঠ ছাড়ে, তখন তাদের পুরনো তোষামোদকারীরা কেঁদে বুক ভাসায়। ইতিহাস স্পষ্ট: বাংলাদেশের ক্রিকেটের যা কিছু অর্জন, তা এ দেশের ক্রিকেটারদের রক্ত-ঘাম আর কোটি সমর্থকদের প্রার্থনার ফসল; কোনো পাকিদের করুণা বা অবদানের ফল নয়।

মন্তব্য করুন