উত্তরবঙ্গের পলিমাটি, নদীনালা আর বিস্তৃত প্রান্তরজুড়ে ধ্বনিত ভাওয়াইয়া গান বাংলাদেশের লোকসঙ্গীত ঐতিহ্যের এক পরম সুরময়, ভাবগম্ভীর ও আবেগঘন সৃষ্টি। মূলত বৃহত্তর রংপুর অঞ্চল এবং ভারতের পশ্চিমবঙ্গের কোচবিহার ও জলপাইগুড়ি জেলাকে এই কালজয়ী লোকগীতির প্রধান জন্মস্থান ও প্রাণকেন্দ্র হিসেবে গণ্য করা হয়। নিজস্ব সুরলালিত্য, অনন্য গীতরীতি এবং কণ্ঠের বিশেষ ‘ভাঙা টান’ বা অলঙ্করণের কারণে এটি অন্যান্য লোকসঙ্গীত ধারা থেকে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র। ভৌগোলিক ও উপভাষাগত বৈশিষ্ট্যের কারণে উত্তরবঙ্গের মেঠো জীবনের মানুষের স্বাভাবিক উচ্চারণ ও আবেগ ছাড়া ভাওয়াইয়ার প্রকৃত সুররসের পূর্ণ প্রকাশ ঘটানো বেশ কঠিন।

উৎপত্তি ও নামকরণের পটভূমি
ভাওয়াইয়া শব্দের উৎপত্তি ও ঐতিহাসিক বিকাশ নিয়ে গবেষক ও সঙ্গীততাত্ত্বিকদের মধ্যে কয়েকটি চমৎকার অভিমত রয়েছে।
প্রথমত, গানগুলোর গভীর ভাবোচ্ছ্বাস ও ব্যাকুল প্রেমাবেগের কারণে ‘ভাব’ শব্দ থেকেই ‘ভাওয়াইয়া’ কথাটির উৎপত্তি বলে ধরা হয়। অন্যমতে, উত্তরবঙ্গের প্রান্তিক ও উদাসী লোকশিল্পী বা ‘বাউদিয়া’ সম্প্রদায়, যাঁরা প্রকৃতির কোলে বাউলভাভে গান গেয়ে ঘুরে বেড়াতেন, তাঁদের নাম থেকেই ‘ভাওয়াইয়া’ শব্দের উদ্ভাবন ঘটেছে। এছাড়া চারণভূমির নিচু ও ঢেউখেলানো কাশবন বা ‘ভাওয়া’ অঞ্চলজুড়ে মোষ তাড়িয়ে নিয়ে যাওয়ার সময় গাওয়া গান থেকেও এর নামকরণ হতে পারে বলে অনেকে মনে করেন।
ভাওয়াইয়া মূলত সাধারণ মানুষের জীবনসংগ্রাম, প্রেম, বিচ্ছেদ ও প্রকৃতির নিখাদ সুরচ্ছবি। মাহুত (হাতির চালক), মইশাল (মহিষের রাখাল) এবং গাড়োয়ান (গরুর গাড়ির চালক)—এই কর্মজীবী মানুষগুলোই ভাওয়াইয়া প্রণয়গীতির মূল নায়ক। দীর্ঘ পথ পরিক্রমায় কিংবা নির্জন প্রান্তর অতিক্রমের সময় তাঁদের অন্তরের একাকীত্ব, বিরহ ও বিচ্ছেদের সুরই ভাওয়াইয়ার প্রধান উপজীব্য হয়ে উঠেছে।
ভাওয়াইয়ার শ্রেণিবিভাগ ও প্রকৃতি
সাঙ্গীতিক কাঠামো, সুরের গতি ও ভাবরসের ভিত্তিতে ভাওয়াইয়া গানকে মূলত দুটি প্রধান ধারায় ভাগ করা হয়, যার পাশাপাশি এক বিশেষ সংমিশ্রিত রূপও বিদ্যমান।
দীর্ঘ বা করুণ ভাওয়াইয়া হলো এই ধারার মূল ভাবসম্পদ। ধীর গতি ও দীর্ঘ টানের এই গানগুলোতে নর-নারীর, বিশেষত নবযৌবনাদের প্রেমপ্রীতি, গভীর ব্যাকুলতা ও বিরহবেদনার আবেদন গভীরভাবে প্রকাশিত হয়। মহিষের গাড়ি বা গরুর গাড়ি চলাচলের সময় চাকার একটানা দুলুনির সাথে কণ্ঠের সুর ভেঙে ভাঙিয়া যে বিশেষ তান বা ভাঙা টান দেওয়া হয়, তা-ই এই গানের প্রাণ। ‘ওকি গাড়িয়াল ভাই’, ‘যে জন প্রেমের ভাব জানে না’, ‘কোন দ্যাশে যান মইশাল বন্দুরে’ কিংবা ‘নউতোন পিরিতির বড় জ্বালা’ এই ধারার অত্যন্ত জনপ্রিয় ও অমর কিছু গান।
অন্যদিকে চটকা গান হলো চটুল, হাস্যরসাত্মক ও দ্রুত তালের রঙ্গগীতি। গ্রাম্য ‘চট’ (যার অর্থ তাড়াতাড়ি) শব্দটির রূপান্তর হিসেবে ‘চটকা’ নামের উৎপত্তি। দীর্ঘ ভাওয়াইয়ার ব্যাকুলতার বিপরীতে চটকা গানে চপল গতি ও হাসিকৌতুকের ছলে স্বামী-স্ত্রীর আশা-আকাঙ্ক্ষা, পারিবারিক মনোমালিন্য, সংসার জীবনের খিটখিট ও সামাজিক ঘাত-প্রতিঘাতের চিত্র তুলে ধরা হয়। ‘ওরে পতিধন বাড়ি ছাড়িয়া না যান’, ‘পানিয়া মরা মোক মারিলু রে’ কিংবা ‘ওরে কাইনের ম্যায়ার ঠসক বেশি’ চটকা ধারার অন্যতম শ্রেষ্ঠ উদাহরণ।
এই দুই মূল ধারা ছাড়াও দীর্ঘ ভাওয়াইয়ার করুণ টান এবং চটকার দ্রুত তালের সংমিশ্রণে অপর এক বিশেষ মধ্যম গতির গান গড়ে উঠেছে, যা লোকসমাজে ক্ষীরোল গান নামে পরিচিত। এছাড়া লোকায়ত প্রেমানুভূতির পাশাপাশি ‘ফান্দে পড়িয়া বগা কান্দে রে’ কিংবা ‘ছাড় রে মন ভবের খ্যালা’-র মতো গভীর আধ্যাত্মিক ও তত্ত্বভিত্তিক ভাওয়াইয়া গানও সমানভাবে সমাদৃত।
বাদ্যযন্ত্র ও পরিবেশন শৈলী
ভাওয়াইয়া গানের প্রধান ও অপরিহার্য বাদ্যযন্ত্র হলো দোতারা। দোতারার মিষ্টি সুর ও বিশেষ ছন্দের সাথে কণ্ঠের করুণ বা চটুল টানের মেলবন্ধন না ঘটলে ভাওয়াইয়ার মূল মেজাজ ফুটে ওঠে না। এছাড়া গানের তাল ও সুরের সঙ্গত রক্ষায় বাঁশি, সারিন্দা, ঢোল, খোল, জুড়ি ও মন্দিরা ব্যবহার করা হয়।
প্রখ্যাত ব্যক্তিত্ব ও সংরক্ষকগণ
ভাওয়াইয়া গানকে আঞ্চলিক গণ্ডি পেরিয়ে বিশ্বমঞ্চে অনন্য মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করার পেছনে প্রবাদপ্রতীম লোকসঙ্গীত শিল্পী আব্বাসউদ্দীন আহমদ-এর অবদান সর্বাগ্রে স্মরণীয়। তাঁর কণ্ঠে ‘ওকি গাড়িয়াল ভাই’ বা ‘ফান্দে পড়িয়া বগা কান্দে রে’ রেকর্ড হওয়ার পর তা সমগ্র বাংলায় আলোড়ন সৃষ্টি করে।
পরবর্তীতে তাঁর সুযোগ্য কন্যা ফেরদৌসী রহমান এবং পুত্র মোস্তফা জামান আব্বাসী ভাওয়াইয়া গানকে শাস্ত্রীয় ও আধুনিক সঙ্গীতালয়ে সুপ্রতিষ্ঠিত করার ধারা বজায় রাখেন। পাশাপাশি একেএম আবদুল আজিজ, মহেশ চন্দ্র রায়, রাখাল চন্দ্র রায় এবং পরবর্তী প্রজন্মের বহু গুণী লোকশিল্পী ভাওয়াইয়ার প্রচার ও প্রসারে অসামান্য ভূমিকা পালন করে আসছেন।

ভাওয়াইয়া কেবল উত্তরবঙ্গের লোকসঙ্গীত নয়, এটি নদীমাতৃক বাংলার বিরহী আত্মা ও সরল জীবনের এক চিরন্তন সুরধারা। দোতারার ঝঙ্কার, উত্তরীয় উপভাষার মাধুর্য এবং মেঠো পথের বাঁকে ছড়িয়ে থাকা করুণ টানের মধ্য দিয়ে ভাওয়াইয়া গান আজও বাঙালি সমাজ ও লোকসংস্কৃতির হৃদয়ে পরম মমতায় প্রজ্জ্বলিত হয়ে আছে।
সোর্স ও প্রামাণ্য রেফারেন্স:
১. বাংলাদেশের লোকসংগীত ও লোকসংস্কৃতি — বাংলা একাডেমি।
২. ভাওয়াইয়া: ইতিহাস ও সংগ্রাহক — ড. আশরাফ সিদ্দিকী।
৩. উত্তরবঙ্গের লোকসঙ্গীত ও ভাওয়াইয়া ঐতিহ্য — আঞ্চলিক সংস্কৃতি গবেষণা কেন্দ্র, রংপুর।
৪. জাতীয় লোকসঙ্গীত ও লোকনাট্য আর্কাইভ — বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি।
আরও দেখুন
