ইসলাম ও মুসলিম সিরিজ

দরসে নিজামীর রূপরেখা, পাঠ্যক্রম ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর রূপান্তর | ইসলাম ও মুসলিম সিরিজ

দারুল উলুম দেওবন্দ

উপমহাদেশের ইসলামি শিক্ষাব্যবস্থা ও মাদ্রাসাকাঠামোর আলোচনায় ‘দরসে নিজামী’ একটি কেন্দ্রীয় নাম। অষ্টাদশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে ভারতের লখনউয়ের বিখ্যাত ফিরিঙ্গি মহল শিক্ষাকেন্দ্রের প্রখ্যাত পণ্ডিত মোল্লা নিজামুদ্দিন সেহালভী (মৃত্যু: ১৭৪৮ খ্রিষ্টাব্দ) এই বিশেষ পাঠ্যক্রমটি প্রণয়ন করেন। তৎকালীন মুঘল আমলের সামাজিক, বিচারিক ও রাজনৈতিক প্রয়োজনীয়তা মাথায় রেখে প্রণীত এই পাঠ্যক্রমটি পরবর্তীতে কেবল মুঘল ভারতে নয়, বরং বিংশ ও একবিংশ শতাব্দীতে এসে দেওবন্দী ও কওমী ধারাভিত্তিক মাদ্রাসাসমূহেরও মূল শিক্ষাদণ্ড হিসেবে বহাল থাকে।

 

কওমি মাদ্রাসা
কওমি মাদ্রাসা

 

Table of Contents

দরসে নিজামীর ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও মূল উদ্দেশ্য

মোল্লা নিজামুদ্দিন যখন এই সিলেবাস তৈরি করেন, তখন ভারতে মুঘলদের কেন্দ্রীয় শাসনব্যবস্থা বিদ্যমান ছিল। সে সময় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মূল লক্ষ্য ছিল দুটি:

১. রাজকীয় প্রশাসন, রাজস্ব বিভাগ, বিচার ব্যবস্থা ও কূটনৈতিক কাজের জন্য দক্ষ আমলা, কাজী, মুফতি ও রাষ্ট্রীয় কর্মকর্তা তৈরি করা।

২. সুফি ও ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব তৈরি করা যারা সমাজে নৈতিক ভিত্তি প্রদান করবেন।

তৎকালীন রাষ্ট্রীয় প্রশাসনিক ভাষা ছিল ফার্সি এবং বিচারিক বা ধর্মীয় ভিত্তি ছিল আরবি। ফলে দরসে নিজামীর মূল নকশায় ধর্মীয় গ্রন্থাবলীর পাশাপাশি প্রচুর পরিমাণে যুক্তিবিদ্যা (মানতিক), গ্রীক দর্শন (হিকমাত বা ফালসাফা), গণিত, জ্যোতির্বিদ্যা, অলঙ্কারশাস্ত্র (বালাগাত) এবং ফার্সি ভাষা ও সাহিত্য অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। একে বলা হতো ‘মা’কূলাত’ (যুক্তি ও বোধনির্ভর শাস্ত্র) এবং ‘মানকূলাত’ (ঐতিহ্য ও বিবরণনির্ভর শাস্ত্র)-এর এক অনন্য মেলবন্ধন।

 

কওমি মাদ্রাসা
কওমি মাদ্রাসা

দরসে নিজামীর মূল ১২টি বিষয়, বিস্তারিত পাঠ্যক্রম ও গ্রন্থকার তালিকা

অষ্টাদশ শতাব্দীতে লখনউয়ের ফিরিঙ্গি মহলের প্রখ্যাত আলিম মোল্লা নিজামুদ্দিন সেহালভী (মৃত্যু: ১৭৪৮ খ্রিষ্টাব্দ) প্রবর্তিত ‘দরসে নিজামী’ পাঠ্যক্রমটি প্রধান ১২টি জ্ঞানশাখায় বিভক্ত ছিল। মুঘল ভারতের আমলাতান্ত্রিক, বিচারিক ও ধর্মীয় প্রশাসনিক প্রয়োজন মেটাতে প্রণীত এই বিস্তৃত নেসাবে পঠিত কিতাবসমূহ এবং সেগুলোর রচয়িতা বা গ্রন্থকারদের পূর্ণাঙ্গ শাস্ত্রভিত্তিক পরিচয় নিচে বিস্তারিত উপস্থাপন করা হলো:

১. নাহু ও ছরফ (আরবি ব্যাকরণ ও রূপমূলতত্ত্ব)

আরবি ভাষার ব্যাকরণগত সঠিকতা, শব্দমূল তৈরি এবং জটিল বাক্যের গঠন কাঠামোগতভাবে অনুধাবনের জন্য প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে এই শাস্ত্রগুলো অত্যন্ত গভীরভাবে পড়ানো হতো।

ছরফ (Morphology / রূপমূলতত্ত্ব)

  • মিযানুস ছরফ ও মুন্শাইব: প্রাথমিক আরবি শব্দ রূপান্তরের প্রবেশদ্বারস্বরূপ এই দুটি ফার্সি ও আরবি টেক্সট। প্রথাগতভাবে এর রচয়িতা হিসেবে সাকাকী বা অজ্ঞাত আলিমদের নাম উল্লেখ করা হয়।
  • ছরফে মীর: রচয়িতা—মির সাইয়্যেদ শরীফ জুরজানী (১৩৩৯–১৪১৩ খ্রিষ্টাব্দ)। ফার্সি ভাষায় রচিত আরবি রূপমূলতত্ত্বের আকর গ্রন্থ।
  • পাঞ্জগেঞ্জ: রচয়িতা—মির সাইয়্যেদ শরীফ জুরজানী। শব্দ রূপান্তরের পাঁচটি মূলনীতি নিয়ে আলোচনা।
  • ফুছুলে আকবারী: রচয়িতা—কাজী সাইয়্যেদ শাহ আকবার আলী জৌনপুরী। ছরফ শাস্ত্রের উচ্চতর তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ।
  • আশ-শাফিয়া: রচয়িতা—ইবনুল হাজিব আল-মালিকী (১১৮৫–১২৪৯ খ্রিষ্টাব্দ)। শব্দ গঠন ও ধ্বনিতত্ত্বের ওপর ক্লাসিক্যাল আরবি টেক্সট।

নাহু (Syntax / বাক্যরীতি)

  • নাহভে মীর: রচয়িতা—মির সাইয়্যেদ শরীফ জুরজানী। ফার্সি ভাষায় প্রণীত প্রাথমিক বাক্যরীতির কিতাব।
  • মিয়াতু আমেল: রচয়িতা—শেখ আবদুুল কাহের আল-জুরজানী (মৃত্যু: ১০৭৮ খ্রিষ্টাব্দ)। আরবি ব্যাকরণের ১০০টি عامل বা বাক্যের নিয়ন্ত্রক উপাদানের বিশ্লেষণ।
  • শারহে মিয়াতু আমেল: রচয়িতা—মোল্লা জামী (১৪১৪–১৪৯২ খ্রিষ্টাব্দ) অথবা প্রখ্যাত ব্যাখ্যাকার গণ। ‘মিয়াতু আমেল’-এর বিশদ ব্যাখ্যা।
  • হেদায়াতুন্নাহু: প্রথাগতভাবে এর রচয়িতা হিসেবে আল্লামা সিরাজুদ্দীন উছমান আল-চিশতী বা আল্লামা ইবনে বাহাউদ্দীনের নাম পাওয়া যায়।
  • আল-কাফিয়া: রচয়িতা—ইবনুল হাজিব আল-মালিকী। নাহু শাস্ত্রের বিশ্ববিখ্যাত মূল পাঠ (মেতন)।
  • শারহে মোল্লা জামী (আল-ফুওয়াইদুল জিয়াঈয়্যাহ): রচয়িতা—আবদুর রহমান জামী (মোল্লা জামী)। ইবনুল হাজিবের ‘কাফিয়া’-র সুবিখ্যাত ও জটিল ব্যাখ্য গ্রন্থ।

 

২. মানতিক (যুক্তিবিদ্যা / Logic)

মা’কূলিয়াৎ বা যুক্তিভিত্তিক চিন্তা শাণিত করার জন্য অ্যারিস্টটলীয় বা এরিস্টটল-উত্তর প্রাক-আধুনিক ইসলামী যুক্তিবিদ্যার ব্যাপক চর্চা ছিল।

  • আস-সুগরা ও আল-কুবরা: রচয়িতা—মির সাইয়্যেদ শরীফ জুরজানী। ফার্সি ভাষায় লিখিত যুক্তিবিদ্যার প্রাথমিক ধারণার সংক্ষেপ।
  • ঈছাগোজী (Isagoge): রচয়িতা—অ্যাছীরুদ্দীন আল-আবহারী (মৃত্যু: ১২৬৫ খ্রিষ্টাব্দ)। পোর্ফিরির যুক্তিবিদ্যা থেকে অনূদিত ও সম্পাদিত পাঁচ সার্বজনীন ধারণা।
  • মিরাকাত: রচয়িতা—মীর আবুল ফাতাহ তাফতাজানী বা সাইয়্যেদ আবদে আলী জৌনপুরী।
  • আত-তাহযীব (তাহযীবুল মানতিক ওয়াল কালাম): রচয়িতা—আল্লামা সা’দুদ্দীন তাফতাজানী (১৩২২–১৩৯০ খ্রিষ্টাব্দ)।
  • শারহে তাহযীব: রচয়িতা—মোল্লা জালালুদ্দীন দাওয়ানী (১৪২৭–১৫০২ খ্রিষ্টাব্দ)।
  • আল-কুতবী: রচয়িতা—কুতবুদ্দীন আল-রাযী (মৃত্যু: ১৩৬৬ খ্রিষ্টাব্দ)। নাজমুল দ্বীন আল-কাতিবীর ‘আশ-শামসিয়্যাহ’-এর বিখ্যাত ব্যাখ্যা।
  • মীর কুতবী: রচয়িতা—মির সাইয়্যেদ শরীফ জুরজানী। কুতবুদ্দীন রাযীর ‘আল-কুতবী’-র ওপর হাশিয়া (টীকা)।
  • সুপার চরম ও সাল্লামুল উলূম:
    • সাল্লামুল উলূম (মূল পাঠ): রচয়িতা—মোল্লা মহিব্বুল্লাহ বিহারী (মৃত্যু: ১৭০৭ খ্রিষ্টাব্দ)। মুঘল ভারতের অন্যতম শীর্ষ যুক্তিবিদ।
    • মোল্লা হাছান (ব্যাখ্যা গ্রন্থ): রচয়িতা—মোল্লা হাসান লখনউভী। ‘সাল্লামুল উলূম’-এর জটিল ব্যাখ্যা।

 

৩. ফালসাফা বা হিকমাত (গ্রীক দর্শন ও প্রকৃতিবিজ্ঞান)

বিশ্বজগৎ, পদার্থ, গতি ও আত্মার অস্তিত্ব সংক্রান্ত গ্রীক ও ইবনে সীনা-পরবর্তী ফার্স-আরব দর্শনের পাঠ এতে অন্তর্ভুক্ত ছিল।

  • মেইবযী (শারহে হিদাায়াতুল হিকমাত):
    • মূল পাঠ (হেদায়াতুল হিকমাত): রচয়িতা—অ্যাছীরুদ্দীন আল-আবহারী।
    • ব্যাখ্যা গ্রন্থ (মেইবযী): রচয়িতা—কাজী আমীর হুসাইন আল-মেইবযী (মৃত্যু: ১৫০৪ খ্রিষ্টাব্দ)।
  • আছ-ছদরা (শারহে হেদায়াতুল হিকমাত): রচয়িতা—মোল্লা ছদরা (ছদরেদ্দীন শিরাজী, ১৫৭১–১৬৪০ খ্রিষ্টাব্দ)। ফার্সি-পারস্য দর্শনের বিখ্যাত দার্শনিক ও ইশরাকী ধারার প্রবক্তা।
  • আশ-শামসে বাযগো: রচয়িতা—মোল্লা মাহমুদ জৌনপুরী (১৫৮৫–১৬৫২ খ্রিষ্টাব্দ)। মুঘল আমলের ভারতের শীর্ষ দার্শনিক ও বিজ্ঞানী।

 

৪. বালাগাত ও ফাসাহাত (অলঙ্কারশাস্ত্র ও নান্দনিকতা)

আরবি ভাষা ও সাহিত্যের নাতিনাত দীর্ঘ ও সুসংগত রূপ অনুধাবন এবং কুরআনের অলঙ্কার অনুধাবনের বিদ্যা।

  • তাখলীছুল মিফতাহ (মূল পাঠ): রচয়িতা—কাযী জালালুদ্দীন আল-কযভীনী (১২৭১–১৩৩৮ খ্রিষ্টাব্দ)।
  • মুখতাছারুল মা’আনী: রচয়িতা—আল্লামা সা’দুদ্দীন তাফতাজানী। ‘তাখলীছুল মিফতাহ’-এর সংক্ষেপ ব্যাখ্যা।
  • মুত্বাওওয়াল: রচয়িতা—আল্লামা সা’দুদ্দীন তাফতাজানী। ‘তাখলীছুল মিফতাহ’-এর সুবিস্তৃত আকর ব্যাকরণ ও অলঙ্কার ব্যাখ্যা।

 

৫. রিয়াজিয়াত ও হাইয়াত (গণিত ও জ্যোতির্বিদ্যা)

দেওয়ানী হিসাব, জমির পরিমাপ, উত্তরাধিকার বণ্টন এবং কিবলা ও সময় নির্ধারণের প্রাক-আধুনিক বিজ্ঞান।

গণিত ও জ্যামিতি (Mathematics & Geometry)

  • খুলাছাতুল হিছাব: রচয়িতা—বাহাউদ্দীন আল-আমিলী (১৫৪৭–১৬২১ খ্রিষ্টাব্দ)। মুঘল ও সাফাবী আমলের বিখ্যাত গণিতজ্ঞ।
  • তাকরীৰে উকলীদুস: রচয়িতা—নাসীরুদ্দীন আত-তুসী (১২০১–১২৭৪ খ্রিষ্টাব্দ)। ইউক্লিডের জ্যামিতির আরবি সংস্করণ ও সম্পাদনা।

জ্যোতির্বিদ্যা (Astronomy)

  • তাশরীহুল আফলাক: রচয়িতা—বাহাউদ্দীন আল-আমিলী। গোলকীয় জ্যোতির্বিদ্যা সংক্রান্ত গ্রন্থ।
  • রিসালায়ে কুশজিয়া: রচয়িতা—আলাউদ্দীন আলী ইবনে মুহাম্মদ আল-কুশজী (১৪০৩–১৪৭৪ খ্রিষ্টাব্দ)।
  • বিস্ত বাবু: রচয়িতা—নাসীরুদ্দীন আত-তুসী। অ্যাস্ট্রোল্যাব বা জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক যন্ত্র ব্যবহার সংক্রান্ত ২০টি অধ্যায়।

 

৬. ফিকহ (ইসলামি আইনশাস্ত্র)

মুঘল ভারতের কাজী, মুফতি ও প্রশাসন পরিচালকদের জন্য হানাফী আইনি ব্যবস্থার প্রয়োগিক পাঠ।

  • নূরুল ইজাহ: রচয়িতা—হাসান ইবনে আম্মার আল-শুরুনবুলালী (১৫৮৬–১৬৫৯ খ্রিষ্টাব্দ)। ইবাদাত সংক্রান্ত প্রারম্ভিক আইনি পাঠ।
  • মুখতাছারুল কুদুরী: রচয়িতা—আবু হুসাইন আহমদ ইবনে মুহাম্মদ আল-কুদুরী (৯৭৭–১০৩৭ খ্রিষ্টাব্দ)। হানাফী ফিকহের প্রখ্যাত মেতন বা মূল আকর।
  • কানযুদ দাকাইক: রচয়িতা—হাফিজুদ্দীন আবুল বারাকাত আন-নাসাফী (মৃত্যু: ১৩১০ খ্রিষ্টাব্দ)।
  • শারহে বেকায়া:
    • মূল পাঠ (বেকায়াতুর রিওয়ায়াহ): রচয়িতা—বুর্হানুদ্দীন মাহমুদ আল-মাহবূবী।
    • ব্যাখ্যা গ্রন্থ: রচয়িতা—উবাইদুল্লাহ ইবনে মাসউদ আল-মাহবূবী (ছদরুশ শরী‘আহ আল-ছানী, মৃত্যু: ১৩৪৭ খ্রিষ্টাব্দ)।
  • আল-হেদায়া (৪ খণ্ড): রচয়িতা—বুর্হানুদ্দীন আল-মারগীনানী (১১৪-১১৯৭ খ্রিষ্টাব্দ)। সমগ্র হানাফী আইনি দর্শনের সর্বোচ্চ প্রামাণ্য গ্রন্থ।

 

৭. উছূলুল ফিকহ (আইনশাস্ত্রের মূলনীতি / Jurisprudence)

আইনের উৎস (কুরআন, সুন্নাহ, ইজমা, কিয়াস) থেকে নতুন নজির বা মাসআলা বের করার পদ্ধতি।
  • উছূলে শাশী: প্রথাগতভাবে এর রচয়িতা হিসেবে আল্লামা নিজামুদ্দীন আশ-শাশী (দ্বাদশ শতাব্দী)-র নাম উল্লেখ করা হয়।
  • নূরুল আনওয়ার: রচয়িতা—মোল্লা জিওন লখনউভী (আহমদ ইবনে আবূ সাঈদ, ১৬৩৭–১৭১৮ খ্রিষ্টাব্দ)। মুঘল সম্রাট আওরঙ্গজেবের শিক্ষক। এটি আবুল বারাকাত নাসাফীর ‘আল-মানার’-এর বিখ্যাত ব্যাখ্যা।
  • আল-হুসামী (আল-মুনতাখাব): রচয়িতা—হুসামুদ্দীন আল-আখসীকাছী (মৃত্যু: ১২-১৩ শতাব্দী)।
  • মুছাল্লামুস ছবুত: রচয়িতা—মোল্লা মহিব্বুল্লাহ বিহারী। আইন দর্শনের অত্যন্ত জটিল আকর গ্রন্থ।

 

৮. তাফসীর ও উছূলুত তাফসীর (কুরআনের ব্যাখ্যা ও নীতি)

কুরআনের ভাষা, শানে নযুল ও আইনি নির্দেশের তাফসীর।
  • তাফসীরে জালালাইন: রচয়িতা—জাজালুদ্দীন আল-মহাল্লী (১৩৮৯–১৪৫৯ খ্রিষ্টাব্দ) এবং জাজালুদ্দীন আস-সুয়ূতী (১৪৪৫–১৫০৫ খ্রিষ্টাব্দ)।
  • তাফসীরে বায়জাবী (আনওয়ারুত তানযীল): রচয়িতা—কাজী নাসিরুদ্দীন আল-বায়জাবী (মৃত্যু: ১২৮৬ খ্রিষ্টাব্দ)। আরবি অলঙ্কার ও ভাষার সুগভীর প্রয়োগিক তাফসীর।
  • আল-কাশশাফ: রচয়িতা—জারুল্লাহ আল-যামাখশারী (১০৭৫–১১৪৪ খ্রিষ্টাব্দ)। ভাষাগত শৈলীর জন্য বিখ্যাত মু’তাযিলী ধারার প্রয়োগ হলেও বালাগাতের জন্য পঠিত।

 

৯. হাদিস ও উছূলুল হাদিস (হাদিস শাস্ত্র ও সনদ বিশ্লেষণ)

মুঘল আমলে হাদিসের প্রাথমিক ধারণা দেওয়া হলেও দেওবন্দী যুগে এটিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়।
  • মিশকাতুল মাছাবীহ:
    • মূল সংকলক: ওয়ালীউদ্দীন আল-খতীব আত-তাবরীজী (মৃত্যু: ১৩৪০ খ্রিষ্টাব্দ)। (আবু মুহাম্মদ আল-বাঘবীর ‘মাসাবীহুস সুন্নাহ’-র বর্ধিত রূপ)।
  • সিহাহ ছিত্তাহ (দাওরায়ে হাদিস স্তরে পঠিত ছয়টি প্রধান হাদিস গ্রন্থ):
    1. সহীহ বুখারী: রচয়িতা—ইমাম মুহাম্মদ ইবনে ইসমাইল আল-বুখারী (৮১০–৮৭০ খ্রিষ্টাব্দ)।
    2. সহীহ মুসলিম: রচয়িতা—ইমাম মুসলিম ইবনুল হাজ্জাজ আল-কুশাইরী (৮১৫–৮৭৫ খ্রিষ্টাব্দ)।
    3. সুনানে আবু দাউদ: রচয়িতা—ইমাম আবু দাউদ আস-সিজিস্তানী (৮১৭–৮৮৯ খ্রিষ্টাব্দ)।
    4. জামে আত-তিরমিজী: রচয়িতা—ইমাম আবু ঈসা মুহাম্মদ আত-তিরমিজী (৮২৪–৮৯২ খ্রিষ্টাব্দ)।
    5. সুনানে নাসাঈ: রচয়িতা—ইমাম আহমাদ ইবনে শুআইব আন-নাসাঈ (৮২৯–৯১৫ খ্রিষ্টাব্দ)।
    6. সুনানে ইবনে মাজাহ: রচয়িতা—ইমাম ইবনে মাজাহ আল-কযভীনী (৮২৪–৮৮৭ খ্রিষ্টাব্দ)।

 

১০. কালাম ও আকাইদ (ইসলামি ধর্মতত্ত্ব ও যুক্তিভিত্তিক বিশ্বাস)

প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় দার্শনিক সংশয় এবং বিভ্রান্ত ধারার বিরুদ্ধে আকিদা রক্ষার বিদ্যা।
  • শারহুল আকাইদিন নাসাফিয়্যা:
    • মূল পাঠ (আকাইদে নাসাফী): রচয়িতা—নজমুদ্দীন আবু হাফস ওমর আন-নাসাফী (১০৬৭–১১৪২ খ্রিষ্টাব্দ)।
    • ব্যাখ্যা গ্রন্থ: রচয়িতা—আল্লামা সা’দুদ্দীন তাফতাজানী।
  • শারহুল মাওয়াকিফ:
    • মূল পাঠ (আল-মাওয়াকিফ): রচয়িতা—কাজী অদুদুদ্দীন আল-ঈজী (১২৮১–১৩৫৫ খ্রিষ্টাব্দ)।
    • ব্যাখ্যা গ্রন্থ: রচয়িতা—মির সাইয়্যেদ শরীফ জুরজানী।
  • মির আতুল কালাম: রচয়িতা—মোল্লা শামসুদ্দীন জৌনপুরী।

 

১১. ইলমুল মিরাস (উত্তরাধিকার আইন)

ফারায়েজ ও সম্পত্তির উত্তরাধিকার বণ্টনের সুনির্দিষ্ট গাণিতিক-আইনি শাস্ত্র।
  • আস-সিরাজী ফিল মিরাস: রচয়িতা—সিরাজুদ্দীন মুহাম্মদ ইবনে মুহাম্মদ আল-সাজাওয়ান্দী (দ্বাদশ শতাব্দী)। হানাফী ফারায়েজ আইনের মূল ভিত্তি।

 

১২. ফার্সি ভাষা ও সাহিত্য

মুঘল আমলের দাপ্তরিক, রাজকীয়, বিচারিক ও কূটনৈতিক যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে ফার্সি সাহিত্য বাধ্যতামূলক ছিল।
  • করীমা (পান্দ-নামা): রচয়িতা—শেখ সাদী শিরাজী (১২১০–১২৯১ খ্রিষ্টাব্দ)। নীতিশাস্ত্রভিত্তিক প্রাথমিক ফার্সি কবিতা।
  • পান্দনামা-ই-আত্তার: রচয়িতা—ফরীদুদ্দীন আত্তার (১১৪৫–১২২১ খ্রিষ্টাব্দ)।
  • গুলিসতাঁ ও বোস্তাঁ: রচয়িতা—শেখ সাদী শিরাজী। ফার্সি গদ্য ও পদ্য সাহিত্যের কালজয়ী আকর গ্রন্থ।
  • রুক’আতে আলমগীরী: মুঘল প্রশাসনিক ও কূটনৈতিক চিঠি লেখার ধরণ শেখার জন্য পঠিত সম্রাট আওরঙ্গজেব আলমগীর কর্তৃক লিখিত পত্রাবলির সংকলন।

 

তৌহিদী জনতা
তৌহিদী জনতা

 

১৮৫৭-উত্তর সংস্কার: দেওবন্দ ও কওমী ধারায় দরসে নিজামীর রূপান্তর

১৮৫৭ সালের সিপাহী বিপ্লবের পর ব্রিটিশরা ফার্সি ভাষার প্রশাসনিক মর্যাদা ও মুঘল রাজকীয় আদালত সম্পূর্ণ বিলুপ্ত করে দেয়। এই নতুন ঔপনিবেশিক বাস্তবতায় ১৮৬৬ সালে দারুল উলূম দেওবন্দ প্রতিষ্ঠিত হলে মাওলানা কাসেম নানুতবী ও মাওলানা রশীদ আহমদ গঙ্গোহী প্রমুখ সংস্কারকগণ মূল দরসে নিজামীতে ব্যাপক রদবদল আনেন:
১. মা’কূলাত হ্রাস ও মানকূলিয়াৎ বৃদ্ধি: প্রশাসনিক ও বিচারিক চাকরির সুযোগ না থাকায় দর্শন, যুক্তিবিদ্যা, প্রাচীন জ্যামিতি ও জ্যোতির্বিদ্যার পাঠ্যবইসমূহ ছাঁটাই করা হয় বা গুরুত্ব কমিয়ে দেওয়া হয়। এর স্থানে হাদিস, তাফসীর ও ফিকহের ওপর সর্বোচ্চ জোর দেওয়া হয়।
২. ফার্সির সংকোচন: সরকারি ভাষা হিসেবে ফার্সির পতন ঘটায় ফার্সি সাহিত্যের অংশ সংকুচিত করে প্রাথমিক পর্যায়ে সীমাবদ্ধ করা হয়।
৩. ইজাযাহ থেকে প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রি: প্রথাগত ব্যক্তিকেন্দ্রিক শিক্ষক সনদের (ইজাযাহ) বদলে সুনির্দিষ্ট শ্রেণিবিন্যাস (ইবতেদাইয়্যাহ, মুতাওয়াসসিতাহ, ছানাবিয়্যাহ, ফযীলত ও দাওরায়ে হাদীছ) চালু করা হয়।
দারুল উলুম দেওবন্দ
দারুল উলুম দেওবন্দ

একবিংশ শতাব্দীতে দরসে নিজামীর প্রাতিষ্ঠানিক অকার্যকারিতা ও সমকালীন সংকট

মোল্লা নিজামুদ্দিন যে দরসে নিজামী তৈরি করেছিলেন, তার মূল উদ্দেশ্যই ছিল তৎকালীন যুগের প্রয়োজন মেটানো (১৭-১৮ শতকের প্রশাসন ও সমাজ চালানো)। কিন্তু গত তিনশত বছরে বিশ্বব্যবস্থায় শিল্প বিপ্লব, আধুনিক বিজ্ঞান, কম্পিউটিং, ডাটা অ্যানালিটিক্স, আধুনিক আন্তর্জাতিক আইন, পুঁজিবাজার এবং সংবিধিবদ্ধ জাতিরাষ্ট্রের উদ্ভব ঘটেছে।
আজকের কওমী ও দেওবন্দী ধারায় যে ‘দরসে নিজামী’ চালু রয়েছে, তা মূলত ১৮৫৭-উত্তর যুগে রূপান্তরিত একটি অনমনীয় সংস্করণ। বর্তমান যুগের নিরিখে এর প্রধান প্রাতিষ্ঠানিক সীমাবদ্ধতাগুলো হলো:
  • যুগের সাথে সংগতিহীনতা: এই সিলেবাসে আধুনিক বিজ্ঞান, আধুনিক অর্থনীতি (ব্যাংকিং, শেয়ার বাজার, সেন্ট্রাল ব্যাংক), বিশ্ব ইতিহাস, রাজনীতি ও প্রযুক্তিবিদ্যার কোনো প্রাতিষ্ঠানিক উপস্থিতি নেই।
  • বাস্তব কর্মসংস্থানের অভাব: ১৮ শতকে এই সিলেবাস পড়ে প্রশাসনিক চাকরি পাওয়া যেত; কিন্তু একবিংশ শতাব্দীতে সাড়ে ১৫ থেকে ১৮ বছর এই কিতাবগুলো পড়ে বের হওয়া একজন শিক্ষার্থী আধুনিক শ্রমবাজারের জন্য সম্পূর্ণ অদক্ষ থেকে যাচ্ছেন।
  • আইনি প্রয়োগহীনতা: প্রথাগত হেদায়া বা কুদুরী কিতাবের আইনশাস্ত্র আধুনিক দেশের সংবিধিবদ্ধ আইন (Civil & Criminal Code) বা সংবিধানে প্রয়োগ করার কোনো প্রাতিষ্ঠানিক সুযোগ নেই।
‘দরসে নিজামী’ তার সূচনাপর্বে (অষ্টাদশ শতাব্দীতে) একটি অত্যন্ত বাস্তবমুখী, আধুনিক ও সময়োপযোগী প্রশাসনিক-ধর্মীয় পাঠ্যক্রম ছিল। কিন্তু কালক্রমে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের অভাব এবং যুগের পরিবর্তনকে গ্রহণ না করার ফলে এটি আজ আধুনিক সমাজ ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থা থেকে বিচ্ছিন্ন একটি সনাতন কিতাবী শিক্ষায় পরিণত হয়েছে। আধুনিক বিজ্ঞান, আন্তর্জাতিক আইন, সামষ্টিক অর্থনীতি ও আধুনিক প্রযুক্তির সাথে এই মূল পাঠ্যক্রমের আমূল সংস্কার ও সমন্বয় না ঘটালে, এই সিলেবাসে শিক্ষিত হাজার হাজার জনশক্তিকে সমাজের মূলধারায় নিয়ে আসা বা জাতীয় প্রবৃদ্ধিতে যুক্ত করা বাস্তবে অসম্ভব।

 

আরও দেখুন:
শেয়ার করুন: Facebook X WhatsApp LinkedIn

প্রেস ডেস্ক, সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর এর অফিস

সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর এর নিজের সকল লেখা, শুভেচ্ছা, স্মরণ ইত্যাদি এই ডেস্ক থেকে প্রকাশিত হয়।

সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সম্পাদক, কুষ্টিয়া জেলা আওয়ামী লীগ। ইতিহাস, রাজনীতি, প্রযুক্তি ও উন্নয়ন নিয়ে লেখালেখি।

যোগাযোগ

কুমারখালী বাস স্ট্যান্ড, দুর্গাপুর, কুমারখালী।
+৮৮০ (১৭) ৬৩০৩৮,৬৩০৩৯।contact@sufifaruq.com

© ২০২৬ সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।