হিন্দুস্থানি শাস্ত্রীয় সঙ্গীত

ধ্রুপদে দরভাঙ্গা ঘরানা (Darbhanga Gharana) | অসুরের সুরলোকযাত্রা সিরিজ

ধ্রুপদের দরভাঙ্গা ঘরানা

হিন্দুস্থানি শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের প্রাচীনতম ও বিশুদ্ধতম কণ্ঠসঙ্গীত ধারা ধ্রুপদের সুবিশাল মানচিত্রে দরভাঙ্গা ঘরানা (Darbhanga Gharana) এক অতীব জীবন্ত, ঐতিহ্যবাহী ও ঐতিহ্যমণ্ডিত নাম। উত্তর ভারতের ধ্রুপদী ধারায় বিহারের অবদান অপরিসীম, আর সেই বিহারের সঙ্গীত-সংস্কৃতির মুকুটে সবচেয়ে উজ্জ্বল রত্ন হলো এই দরভাঙ্গা গায়কী।

মিথিলা সংস্কৃতির ঐতিহ্যবাহী কেন্দ্র দরভাঙ্গা রাজদরবারের (Darbhanga Raj) আভিজাত্যপূর্ণ পৃষ্ঠপোষকতায় এবং মন্দিরকেন্দ্রিক উচ্চাঙ্গ সাধনার মাধ্যমে এই ঘরানা পূর্ণাঙ্গ রূপ লাভ করে। ধ্রুপদ সঙ্গীতের ইতিহাসে প্রখ্যাত ‘মল্লিক পরিবার’ (Mallick Family) গত চারশত বছরেরও বেশি সময় ধরে এই দরভাঙ্গা ঘরানার ঐতিহ্যকে পুষ্ট ও সজীব করে রেখেছে।

ঐতিহাসিক পটভূমি, প্রতিষ্ঠা ও প্রবাদপ্রতীম মল্লিক পরিবার

দরভাঙ্গা ঘরানার উৎপত্তির মূল শিকড় নিহিত রয়েছে আঠারো শতকের অন্যতম সেরা ধ্রুপদী সাধক দুই ভ্রাতা—পণ্ডিত রাধাকৃষ্ণ মল্লিক এবং পণ্ডিত কার্তারাম মল্লিক-এর অনন্য সুরসাধনায়। তাঁরা দরভাঙ্গা এস্টেটের মহারাজার সভাগায়ক ছিলেন এবং তাঁদের অসাধারণ কণ্ঠমাধুর্য, শাস্ত্রজ্ঞান ও প্রখর লয়প্রজ্ঞার জোরে রাজদরবারে এক স্বতন্ত্র সাঙ্গীতিক আভিজাত্যের ভিত্তি স্থাপন করেন।

কাব্য প্রজ্ঞা ও শাস্ত্রীয় বিশুদ্ধতার ওপর দাঁড়িয়ে এই দুই সাধক যে গুরু-শিষ্য পরম্পরা গড়ে তোলেন, পরবর্তীকালে ‘মল্লিক পরিবার’ বংশানুক্রমে তার একক ধাবক ও বাহক হয়ে ওঠে। দরভাঙ্গা ঘরানাকে কেন্দ্র করে মিথিলা অঞ্চলে এক সুবিশাল সাঙ্গীতিক পরিবার গড়ে ওঠে, যার প্রভাবে ধ্রুপদ কেবল দরবারের বিনোদন না থেকে গণমানুষের পরম শ্রদ্ধার শিল্পরূপে প্রতিষ্ঠিত হয়।

বাণী পরম্পরা: গওহার ও খণ্ডার বাণীর সুসংহত সংমিশ্রণ

ধ্রুপদের ঐতিহ্যবাহী চার বাণীর মধ্যে দরভাঙ্গা ঘরানাকে সঙ্গীত বিশারদগণ মূলত গওহার বাণী (Gauhar Bani) এবং খণ্ডার বাণী (Khandar Bani)-র এক অপূর্ব সমন্বিত রূপ হিসেবে চিহ্নিত করে থাকেন।

গওহার বাণী (শান্ত, সুষম সুর ও স্পষ্ট পদ) ──┐
                                     ├───>  দরভাঙ্গা ঘরানা (ওজস্বী ও লয়কেন্দ্রিক রূপ)
খণ্ডার বাণী (বীররস, শক্তি ও বলীয়সী স্বর) ──┘

গওহার বাণীর সুরময় প্রজ্ঞা এবং খণ্ডার বাণীর বীররসাত্মক শারীরিক শক্তি ও গতিময় স্বরপ্রক্ষেপণ মিলে দরভাঙ্গা গায়কীধারাকে একদিকে যেমন ওজস্বী করে তুলেছে, অন্যদিকে তেমনি করেছে অত্যন্ত প্রাণবন্ত ও উজ্জ্বল।

গায়কী শৈলী ও অনন্য সাঙ্গীতিক বৈশিষ্ট্য

দরভাঙ্গা ঘরানার ধ্রুপদ গায়কীকে অন্যান্য ধারা থেকে আলাদাভাবে চিহ্নিত করার জন্য বেশ কিছু সুনির্দিষ্ট সাঙ্গীতিক বৈচিত্র্য লক্ষণীয়:

১. পরিমিত আলাপ ও স্পষ্ট সাহিত্যিক উচ্চারণ

ডাগরবাণীতে যেখানে আলাপের অংশটি অত্যন্ত বিলম্বিত, ধীর ও ধ্যানমুখী স্বরপ্রক্ষেপণে দীর্ঘায়িত করা হয়, দরভাঙ্গা ঘরানায় আলাপ তুলনামূলকভাবে সুসংহত ও পরিমিত। আলাপে অহেতুক দীর্ঘসূত্রতা এড়িয়ে প্রথাসিদ্ধ ‘নোম-তোম’ উচ্চারণের মাধ্যমে স্বরস্থান রক্ষা করে দ্রুত মূল বন্দিশে প্রবেশ করা এই ঘরানার রীতি। এতে পদের শব্দ ও বাণীর স্পষ্ট উচ্চারণের ওপর সর্বাধিক জোর দেওয়া হয়।

২. প্রখর লয়কারিতা, ‘বোল-বাণ্ট’ ও ‘বোল-তান’

দরভাঙ্গা ঘরানার প্রধানতম শক্তি হলো এর ছান্দসিক প্রজ্ঞা এবং অসাধারণ লয়কারি। বন্দিশ শুরু হওয়ার পর গানের পদের বাণীকে বিভিন্ন ছন্দে ভেঙে ‘বোল-বাণ্ট’ (Bohl-Bant), ‘বোল-তান’ এবং জটিল তালবিন্যাস তৈরি করা এই ঘরানার সবচেয়ে বড় কারিগরি আকর্ষণ। দুগুণ, তি গুণ, চৌগুণ থেকে শুরু করে ‘আড়’ (১.৫ গুণ) ও ‘কুয়াড়’ (১.২৫ গুণ) লয়ে ছন্দ নিয়ে খেলার ক্ষেত্রে দরভাঙ্গা শিল্পীরা অপ্রতিদ্বন্দ্বী।

৩. পখাওয়াজ ও কণ্ঠশিল্পীর নাট্যিক সংলাপ

ধ্রুপদী তালবাদ্য পখাওয়াজ (Pakhawaj)-এর সাথে কণ্ঠশিল্পীর সঙ্গত দরভাঙ্গা গায়কীর এক অনন্য দিক। বন্দিশ চলাকালীন গায়ক ও পখাওয়াজীদের মধ্যে তালের জটিল চক্র ও সম-এ পৌঁছানোর এক রোমাঞ্চকর দ্বন্দ্ব ও সংগতি তৈরি হয়। এই সাঙ্গীতিক কথোপকথন বা সংলাপ পরিবেশনায় এক নাটকীয় বহিমুখী (Outward-looking) উজ্জ্বলতা এনে দেয়।

৪. প্রধান তালের প্রয়োগ

এই ঘরানার গায়কেরা প্রধানত চৌতাল (১২ মাত্রা), ধামার (১৪ মাত্রা), সূলতাল (১০ মাত্রা), তিওরা (৭ মাত্রা) এবং ঝম্পাতাল (১০ মাত্রা)-র ওপর বিশেষ দখল প্রদর্শন করেন। বিশেষ করে হোলি ও বসন্তভিত্তিক ধামার পরিবেশনায় এদের স্বতন্ত্র বুৎপত্তি রয়েছে।

অন্যান্য ধ্রুপদ ঘরানার সাথে তুলনামূলক বিশ্লেষণ

ধ্রুপদের প্রধান প্রথাগত ঘরানাগুলোর সাথে তুলনা করলে দরভাঙ্গা ঘরানার সুনির্দিষ্ট ও সতেজ অবস্থানটি পরিষ্কার বোঝা যায়:
ঘরানা/ধারাপ্রথাগত বাণী ও দৃষ্টিভঙ্গিআলাপের গতি ও প্রকৃতিলয়কারি ও তালের ভূমিকা
ডাগর ঘরানাডাগরবাণী: অন্তর্মুখী, ধ্যানমগ্ন ও সম্পূর্ণ শাস্ত্রীয়।অত্যন্ত ধীর, বিলম্বিত ও দীর্ঘায়িত নাভিজ স্বর।শান্ত, সূক্ষ্ম স্বরবিস্তার ও মৃদু ছন্দ।
তলোয়ান্ডি ঘরানাখণ্ডার বাণী: ওজস্বী, প্রখর ও ক্ষিপ্র।দ্রুত আলাপের সমাপ্তি ও জিকিরময় গতি।জটিল ছন্দবিন্যাস ও দ্রুতগতির তানপ্রয়োগ।
বেতিয়া ঘরানাচার বাণীর সমন্বয়: বহুবাণীমূলক ও সাহিত্যনির্ভর।প্রজ্ঞাময়, সুসংহত ও বহুবাণী মিশ্রিত।অলঙ্কারসংক্রান্ত ভাবঘন বোল-বাট।
দরভাঙ্গা ঘরানাগওহার ও খণ্ডার বাণী: বহিমুখী, ওজস্বী ও সতেজ।পরিমিত, সুসংহত ও পদভিত্তিক।প্রখর ‘বোল-বাণ্ট’, গতিশীল লয় ও পখাওয়াজ দ্বৈরথ।

প্রাতঃস্মরণীয় প্রবাদপ্রতীম দরভাঙ্গা শিল্পীগণ

দরভাঙ্গা ঘরানাকে বিংশ ও একবিংশ শতাব্দীতে আন্তর্জাতিক মানচিত্রে উজ্জ্বল করে রেখেছেন মল্লিক পরিবারের প্রখ্যাত সাধকগণ:
  • পণ্ডিত রাম চতুর মল্লিক (১৯০২ – ১৯৯০): ধ্রুপদ জগতের এক মহীরুহ যিনি দরভাঙ্গা রাজদরবারের শেষ সভাগায়ক ছিলেন। তাঁর গায়কীতে শাস্ত্রীয় আভিজাত্যের সাথে তানসেনের ঐতিহ্যের প্রখর প্রকাশ ঘটত। তিনি পদ্মশ্রী উপাধিতে ভূষিত হন।
  • পণ্ডিত বিদুর মল্লিক (১৯৩৬ – ২০০২): দরভাঙ্গা গায়কীধারাকে বিশ্বজুড়ে প্রসারিত করতে ও নতুন প্রজন্মকে তালিম দিতে তাঁর অবদান ছিল অপরিসীম।
  • পণ্ডিত অভয় নারায়ণ মল্লিক: প্রখ্যাত ধ্রুপদ সাধক যিনি ভারতীয় সঙ্গীত নাট্য আকাদেমি পুরষ্কারে ভূষিত হয়ে দরভাঙ্গা শৈলীকে সমৃদ্ধ করেছেন।
  • পণ্ডিত প্রেম কুমার মল্লিক ও তাঁদের উত্তরসূরিগণ: বর্তমানে ধ্রুপদী মেলা ও আন্তর্জাতিক উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত সম্মেলনে দরভাঙ্গা ঘরানার গৌরবময় ঐতিহ্যকে সগৌরবে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন।

 

SufiFaruq.com, Logo - 252x68 (1)
দরভাঙ্গা ঘরানা কেবল ধ্রুপদের একটি প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী ধারাই নয়; এটি আধুনিককালেও ধ্রুপদ সঙ্গীতকে সজীব, প্রাণবন্ত ও শ্রোতাগ্রাহ্য রাখার অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। গাম্ভীর্যের সাথে সাঙ্গীতিক গতিময়তা, স্পষ্ট সাহিত্যিক উচ্চারণ এবং প্রখর লয়কারির মেলবন্ধনে দরভাঙ্গা ঘরানা ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের ইতিহাসে চিরস্মরণীয় ও প্রাতঃস্মরণীয় হয়ে থাকবে।

সোর্স ও প্রামাণ্য রেফারেন্স

১. বিহার কি সঙ্গীত পরম্পরা (Classical Music Traditions of Bihar) — ড. উমা বাসুদেব।
২. ধ্রুপদ: ইতিহাস ও ঐতিহ্য — রামচতুর মল্লিক ও ড. সুভদ্রা চৌধুরী।
৩. উত্তর ভারতীয় সঙ্গীত পদ্ধতি — পণ্ডিত ভাতখণ্ডে।
৪. সঙ্গীত নাটক আকাদেমি ও আইটিসি সঙ্গীত গবেষণা একাডেমি (SRA) কালচারাল আর্কাইভ — নতুন দিল্লি ও কোলকাতা।
আরও দেখুন:
শেয়ার করুন: Facebook X WhatsApp LinkedIn

প্রেস ডেস্ক, সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর এর অফিস

সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর এর নিজের সকল লেখা, শুভেচ্ছা, স্মরণ ইত্যাদি এই ডেস্ক থেকে প্রকাশিত হয়।

সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সম্পাদক, কুষ্টিয়া জেলা আওয়ামী লীগ। ইতিহাস, রাজনীতি, প্রযুক্তি ও উন্নয়ন নিয়ে লেখালেখি।

যোগাযোগ

কুমারখালী বাস স্ট্যান্ড, দুর্গাপুর, কুমারখালী।
+৮৮০ (১৭) ৬৩০৩৮,৬৩০৩৯।contact@sufifaruq.com

© ২০২৬ সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।