হিন্দুস্থানি শাস্ত্রীয় সঙ্গীত

ধ্রুপদে দুমরাওন ঘরানা (Dumraon Gharana) | অসুরের সুরলোকযাত্রা সিরিজ

ধ্রুপদে দুমরাওন ঘরানা (Dumraon Gharana)

হিন্দুস্থানি শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের প্রাচীনতম, বিশুদ্ধতম ও অতীব গম্ভীর ধারা হলো ধ্রুপদ। বৈদিক যুগের সামগান থেকে রূপান্তরিত হয়ে ধ্রুপদের সুপ্রাচীন কাঠামো গড়ে ওঠার ক্ষেত্রে ভারতের বহু রাজদরবার, আঞ্চলিক সঙ্গীতকেন্দ্র ও প্রাচীন পরিবারের অবদান রয়েছে। উত্তর ভারতের চারটি প্রথাগত বাণী—গওহার বাণী (Gauhar Bani), খণ্ডার বাণী (Khandar Bani), নওহার বাণী (Nauhar Bani) ও ডাগরবাণী (Dagarvani)—এর সুবিশাল নান্দনিক ক্যানভাসে বিহারের ধ্রুপদী ঐতিহ্য এক অতুলনীয় নাম।

বিহারের তিনটি সুপরিচিত ও ঐতিহাসিক ধ্রুপদী ধারার (বেতিয়া, দরভাঙ্গা ও দুমরাওন) মধ্যে সবচেয়ে প্রচ্ছন্ন, ওজস্বী ও ঐতিহ্যবাহী একটি ধারা হলো দুমরাওন ঘরানা (Dumraon Gharana)। বর্তমান বিহারের বক্সার (Buxar) জেলায় অবস্থিত ঐতিহাসিক দুমরাওন এস্টেটের (Dumraon Raj) রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতায় এবং মন্দিরকেন্দ্রিক সাধনায় এই বিশেষ ধ্রুপদ গায়কী বিকাশ লাভ করেছিল।

ঐতিহাসিক পটভূমি ও রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতা

দুমরাওন ঘরানার উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশের ইতিহাস বিহারের উজ্জয়নিয়া পরমারা রাজপুত রাজবংশের (Ujjainiya Rajput Dynasty) সাংস্কৃতিক পৃষ্ঠপোষকতার সাথে গভীরভাবে যুক্ত। ষোড়শ ও সপ্তদশ শতাব্দীর সূচনা থেকে শুরু করে রাজা হরদয়াল সিং, রাজা জয়প্রকাশ সিং এবং পরবর্তীতে রাজা রাম রাধা প্রসাদ সিং-এর সময়কালে দুমরাওন রাজদরবার সমগ্র ভারত মহাদেশের পণ্ডিত, ধ্রুপদী, পখাওয়াজী ও সানাই বাদকদের অন্যতম প্রধান সাঙ্গীতিক তীর্থে রূপান্তরিত হয়।

দুমরাওনে ধ্রুপদ সঙ্গীতের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয় মূলত গুরু-শিষ্য পরম্পরা ও বৈষ্ণবীয় সাধনপদ্ধতির যৌথ ধারায়। ধ্রুপদ সাধক পণ্ডিত শিবদয়াল মিশ্র (Pandit Shivdayal Mishra) এবং তাঁর গুণী স্বজনদের মাধ্যমে দুমরাওনে শাস্ত্রীয় সঙ্গীতচর্চার সুসংহত অবকাঠামো রূপ নেয়। মোগল শাসনের রাজনৈতিক পরিবর্তনের সময় দিল্লির দরবার থেকে রাজকীয় আশ্রয় হারিয়ে অনেক গুণী সঙ্গীতজ্ঞ উত্তরপ্রদেশ ও বিহারের রাজবাড়িতে আশ্রয় নেন। দুমরাওনে এই বহিরাগত ধ্রুপদ গায়কদের সাথে বিহারের স্থানীয় মল্লিক ও মিশ্র বংশের লোকায়ত ভক্তিগীতি ও দরবারীরীতির এক অপূর্ব সংমিশ্রণ ঘটে।

বাণী পরম্পরা ও দুমরাওন গায়কীর অনন্য মিশ্রণ

ধ্রুপদ সঙ্গীতের নান্দনিক ও কারিগরি বিভাজন মূলত চারটি বাণীর ওপর প্রতিষ্ঠিত। প্রথাগত তাত্ত্বিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, দুমরাওন ঘরানা কোনো একক বাণীর গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ না থেকে মূলত খণ্ডার বাণী এবং গওহার বাণী-র এক ভারসাম্যপূর্ণ ও সমন্বিত রূপ পরিগ্রহ করেছে।

খণ্ডার বাণী (বীররস, শক্তি ও ওজস্বী স্বরপ্রক্ষেপণ) ──┐
                                             ├───>  দুমরাওন ঘরানা (বিহারী ধ্রুপদী রূপ)
গওহার বাণী (শান্তরস, মাধুর্য ও সরল সুরবিস্তার) ──┘

খণ্ডার বাণীর ওজস্বী কণ্ঠপ্রয়োগ, গমক ও তালের সাথে কঠোর শক্তির দ্বৈরথ যেমন দুমরাওনের গায়কী অঙ্গকে দৃঢ়তা প্রদান করেছে; ঠিক তেমনি গওহার বাণীর লালিত্য ও শান্তরসের ছোঁয়ায় দুমরাওনের ধ্রুপদ সাধারণ রসভোক্তার কাছেও অত্যন্ত প্রাঞ্জল ও হৃদয়গ্রাহী হয়ে উঠেছিল।

দুমরাওন ঘরানার সাঙ্গীতিক ও নান্দনিক বৈশিষ্ট্য

দুমরাওন ঘরানাকে অন্যান্য আঞ্চলিক ধ্রুপদ গায়কী থেকে আলাদাভাবে চেনার জন্য বেশ কিছু সুনির্দিষ্ট কারিগরি ও নান্দনিক বৈশিষ্ট্য রয়েছে:

১. প্রাঞ্জল ও গতিশীল আলাপচারিতা

ডাগরবাণীতে যেখানে অত্যন্ত ধীর, বিলম্বিত ও দীর্ঘায়িত নাভিজ স্বরের ধ্যানমুখী বিস্তার করা হয়, দুমরাওন ঘরানায় আলাপের সূচনা প্রথাসিদ্ধ ‘নোম-তোম’ উচ্চারণে হলেও তা অতিরিক্ত ধীর লয়ে ঝুলে পড়ে না। এতে বিলম্বিত, মধ্য ও দ্রুত লয়ের সুষম বিভাজন থাকে। স্বরের শুদ্ধতা ও রাগের ব্যাকরণ অক্ষুণ্ণ রেখে অত্যন্ত প্রাঞ্জল ও সুস্পষ্টভাবে রাগ রূপায়ণ করা হয়।

২. স্বরপ্রক্ষেপণে ওজস্বিতা ও ‘বোল-বাট’ (Bohl-Baht)

ধ্রুপদী বন্দিশ বা পদের বাণীর সাথে ছন্দের বৈচিত্র্যময় প্রয়োগের নাম ‘বোল-বাট’। দুমরাওনের গায়কেরা ক্ষিপ্রতার সাথে পদকে বিভিন্ন ছন্দে ভেঙে দুগুণ, তি গুণ, চৌগুণ থেকে শুরু করে ‘আড়’ (১.৫ গুণ) ও ‘কুয়াড়’ (১.২৫ গুণ) লয়ের কঠিন ছান্দসিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতেন। খণ্ডার বাণীর ওজস্বিতা তাঁদের শব্দ বিচ্ছেদ ও স্বরপ্রক্ষেপণকে শক্তিশালী করে তুলেছিল।

৩. ধামার, চৌতাল ও পখাওয়াজ সঙ্গত

দুমরাওন ঘরানার গায়কী মূলত চৌতাল (১২ মাত্রা), ধামার (১৪ মাত্রা), সূলতাল (১০ মাত্রা) এবং ঝম্পাতাল (১০ মাত্রা)-র ওপর প্রতিষ্ঠিত। এতে কণ্ঠসঙ্গীতের সাথে মৃদঙ্গ বা পখাওয়াজ (Pakhawaj)-এর সঙ্গত ছিল অত্যন্ত সুসংহত। কণ্ঠশিল্পী ও পখাওয়াজীর মধ্যে ছন্দ ও বোলের সমাহারে এমন এক যুগলবন্দী তৈরি হতো, যা শুনলে বীররস ও চমৎকারিত্ব ফুটত।

৪. আধ্যাত্মিক ও লৌকিক বাণীর সহজবোধ্যতা

দুমরাওন ঘরানার বন্দিশগুলো প্রধানত সংস্কৃত, প্রাকৃত, ব্রজবুলি ও হিন্দি উপভাষায় রচিত হতো। দেব-দেবীর স্তুতি, শিবতাণ্ডব, রামায়ণ-মহাভারতের আখ্যান এবং ঋতু বর্ণনার পদগুলোকে কঠিন বা অস্পষ্ট না রেখে উচ্চারণরীতির মাধ্যমে অতি সহজবোধ্য করে উপস্থাপন করা হতো।

উস্তাদ বিসমিল্লাহ খাঁ ও দুমরাওন বংশানুক্রমিক সংযোগ

দুমরাওন ঘরানার সাঙ্গীতিক ইতিহাসে সবচেয়ে স্মরণীয় ও বিশ্বনন্দিত নাম হলো ভারতরত্ন ওস্তাদ বিসমিল্লাহ খাঁ (Ustad Bismillah Khan)।

১৯১৬ সালে দুমরাওন রাজ্যের সাঙ্গীতিক পরিবারে বিসমিল্লাহ খাঁ জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা পাইগাম্বর বক্স খাঁ এবং পিতামহ রসূল বক্স খাঁ ছিলেন দুমরাওন রাজদরবারের বিশিষ্ট সানাইবাদক ও ধ্রুপদ সাধক। যদিও বিশ্ব দরবারে তিনি সানাইবাদক হিসেবে অমরত্ব লাভ করেছেন, তবে তাঁর সানাইয়ের আলাপে, দীর্ঘ মিড়ে এবং মিড়ের মাধ্যমে রাগ বিস্তারের কৌশলে দুমরাওন ঘরানার ধ্রুপদীয় আভিজাত্যই প্রবাহিত হতো। বিসমিল্লাহ খাঁ নিজেও স্বীকার করেছেন যে, তাঁর সুরসাধনার মূল রসদ তিনি দুমরাওন রাজ্যের প্রাচীন ধ্রুপদী প্রথা থেকেই আহরণ করেছিলেন।

বিহারের অন্যান্য ধ্রুপদ ঘরানার সাথে তুলনামূলক বিশ্লেষণ

বিহারের প্রধান তিন ধ্রুপদী ধারার সাথে তুলনা করলে দুমরাওন ঘরানার স্বকীয় অবস্থান স্পষ্টভাবে ধরা পড়ে:

ঘরানা/ধারামূল বাণী ও প্রবৃত্তিআলাপের মেজাজলয়কারি ও তালের প্রয়োগ
বেতিয়া ঘরানাখণ্ডার ও নওহার বাণী।অলঙ্কারপ্রধান, দ্রুত গতিময় ও স্বরপ্রক্ষেপণে বৈচিত্র্যময়।জটিল বোল-তান, দ্রুত গতি ও বিচিত্র লয়কারি।
দরভাঙ্গা ঘরানাখণ্ডার বাণী (মল্লিক পরম্পরা)।প্রখর শক্তিপ্রধান, দ্রুত তান ও বীররসাত্মক।ক্ষিপ্র লয়কারি, দ্রুত চৌতাল ও ধামার প্রয়োগ।
দুমরাওন ঘরানাখণ্ডার ও গওহার বাণী।প্রাঞ্জল, সংযত, গভীর ও শ্রুতিমধুর মধ্যপন্থী রূপ।ভারসাম্যপূর্ণ বোল-বাট, পখাওয়াজনির্ভর বিশুদ্ধ তালবন্ধন।

মৌখিক ঐতিহ্য, রূপান্তর ও বর্তমান পরিস্থিতি

বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে রাজতন্ত্রের বিলুপ্তি, জমিদারি প্রথার অবসান এবং ভারতীয় সঙ্গীতের মূলধারায় খেয়াল ও আধুনিক সুগম সঙ্গীতের দাপটে দুমরাওন ঘরানার মতো রাজদরবারকেন্দ্রিক প্রচারবিমুখ ধারাটি অস্তিত্ব সংকটের সম্মুখীন হয়। প্রাচীন অনেক মূল্যবান বন্দিশ লিখিত বা রেকর্ডিং আকারে সংরক্ষণ না করায় এবং যোগ্য শিষ্যের অভাবে এই ঘরানার বেশ কিছু ধারা বিস্মৃত হয়েছে।

তবে আধুনিক ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের ইতিহাসবিদ ও ধ্রুপদ গবেষকদের মতে, দুমরাওন ঘরানার নীতি পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি। আধুনিক ধ্রুপদী গায়কদের মধ্যে লয়কারি ও রাগের সরল প্রকাশের যে সমন্বিত রূপ দেখা যায়—তার ভেতর দুমরাওনের ভারসাম্যপূর্ণ ভাবধারা জীবিত রয়েছে।

SufiFaruq.com, Logo - 252x68 (1)

দুমরাওন ঘরানা কেবল একটি আঞ্চলিক সাঙ্গীতিক নাম নয়; এটি ভারতীয় শাস্ত্রীয় ধ্রুপদ ঐতিহ্যের সেই অমলিন ইতিহাস, যা প্রমাণ করে ধ্রুপদ কেবল বড় শহরের রাজকীয় আভিজাত্যেই গড়ে ওঠেনি, বরং সুদূর বিহারের রাজপ্রাসাদ ও মন্দির প্রাঙ্গণেও পরম শ্রদ্ধায় লালিত হয়েছিল। শাস্ত্রানুগ গাম্ভীর্য, প্রাঞ্জল স্বরপ্রক্ষেপণ এবং তালের সুষম সমন্বয়ে দুমরাওন ঘরানা ভারতীয় লোক-শাস্ত্রীয় সঙ্গীত মানচিত্রে চিরকাল এক উজ্জ্বল নক্ষত্র হয়ে থাকবে।

সোর্স ও প্রামাণ্য রেফারেন্স

১. বিহার কি সঙ্গীত পরম্পরা (Classical Music Traditions of Bihar) — ড. উমা বাসুদেব।
২. ধ্রুপদ: ইতিহাস ও ঐতিহ্য — রামচতুর মল্লিক ও ড. সুভদ্রা চৌধুরী।
৩. ভারতীয় সঙ্গীত ইতিহাস ও সংস্কৃতি — ড. শ্রীকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়।
৪. সঙ্গীত নাটক আকাদেমি ও সঙ্গীত গবেষণা একাডেমি (SRA) কালচারাল আর্কাইভ — নতুন দিল্লি ও কোলকাতা।

আরও দেখুন:

শেয়ার করুন: Facebook X WhatsApp LinkedIn

প্রেস ডেস্ক, সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর এর অফিস

সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর এর নিজের সকল লেখা, শুভেচ্ছা, স্মরণ ইত্যাদি এই ডেস্ক থেকে প্রকাশিত হয়।

সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সম্পাদক, কুষ্টিয়া জেলা আওয়ামী লীগ। ইতিহাস, রাজনীতি, প্রযুক্তি ও উন্নয়ন নিয়ে লেখালেখি।

যোগাযোগ

কুমারখালী বাস স্ট্যান্ড, দুর্গাপুর, কুমারখালী।
+৮৮০ (১৭) ৬৩০৩৮,৬৩০৩৯।contact@sufifaruq.com

© ২০২৬ সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।