বাংলাদেশের লোকসংস্কৃতি ও লোকনাট্যের সুবিশাল ভাণ্ডারে গম্ভীরা গান এক অনন্য, সমাজসচেতন ও তীক্ষ্ণ ব্যঙ্গাত্মক লোকসঙ্গীত ধারা। মূলত বৃহত্তর রাজশাহী অঞ্চল—বিশেষ করে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার প্রাণস্পন্দন হিসেবে পরিচিত এই সঙ্গীতরীতি কেবল বিনোদনের মাধ্যম নয়, বরং এটি সাধারণ মানুষের অভাব-অভিযোগ, সামাজিক অসংগতি ও সমসাময়িক সমস্যাবলি প্রকাশের এক শক্তিশালী লোকমাধ্যম। সঙ্গীত ও নাট্যের মেলবন্ধনে রচিত গম্ভীরা গানে হাস্যরস, কৌতুক এবং উপস্থিত বাকচাতুরীর আড়ালে সুগভীর সামাজিক বার্তা প্রদান করা হয়।
উৎপত্তি, নামকরণ ও ঐতিহাসিক পটভূমি
হিন্দু পৌরাণিক বিশ্বাস অনুযায়ী দেবদেব মহাদেবের (শিব) এক নাম ‘গম্ভীর’। প্রাচীনকালে শিবের প্রীতি অর্থে এবং শিবপূজাকে কেন্দ্র করে যে উৎসব আয়োজিত হতো, তা-ই ‘গম্ভীরা উৎসব’ নামে পরিচিত লাভ করে। আর সেই উৎসবে শিবের উদ্দেশ্যে গীত বন্দনাগীতি থেকেই উৎপত্তি ঘটে ‘গম্ভীরা গান’-এর।
গম্ভীরার মূল সুতিকাগার ছিল অবিভক্ত বাংলার পশ্চিমবঙ্গের মালদহ জেলা। ১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর মালদহ থেকে গম্ভীরা গানের মূল রূপকার ও শিল্পীরা তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের চাঁপাইনবাবগঞ্জে (তৎকালীন মহকুমা) চলে আসেন। চাঁপাইনবাবগঞ্জে স্থানান্তরের পর মুসলমান সমাজ এই লোকসঙ্গীতের প্রধান পৃষ্ঠপোষক হিসেবে এগিয়ে আসে। ফলে এর আঙ্গিক, ভাষা ও মূল প্রতিপাদ্যে আমূল সামাজিক রূপান্তর ঘটে। পৌরাণিক শিব বন্দনার গণ্ডি পেরিয়ে এটি আঞ্চলিক ভাষার মাধ্যমে সমসাময়িক রাজনৈতিক, সামাজিক ও নাগরিক সমস্যা তুলে ধরার এক সর্বজনীন গণমাধ্যমে রূপান্তরিত হয়।
গম্ভীরার প্রাচীন রূপভেদ
আদিতে গম্ভীরা গান ও পরিবেশন শৈলী মূলত দুটি প্রধান ধারায় বিভক্ত ছিল—আদ্যের গম্ভীরা এবং পালা-গম্ভীরা।
আদ্যের গম্ভীরা ছিল মূলত প্রার্থনামূলক ও ভক্তিমূলক ধারা। এতে দেবদেবীকে সম্বোধন করে সাধারণ মানুষের দুঃখ-কষ্ট, অভাব-অনটন এবং সারা বছরের ঘটে যাওয়া প্রধান প্রধান প্রাকৃতিক ও সামাজিক ঘটনাবলি গানের সুরে আবেদন হিসেবে নিবেদন করা হতো।
অন্যদিকে পালা-গম্ভীরা ছিল অভিনয়াশ্রয়ী ধারা। বছরের শেষ দিন অর্থাৎ বর্ষবিদায়ের ‘চৈত্র-সংক্রান্তি’ উপলক্ষে বিগত বছরের সার্বিক সালতামামি ও সমাজ-জীবনের নানা সমস্যাকে ছোট ছোট নাট্য-পালার মাধ্যমে অভিনয় করে তুলে ধরা হতো।
আধুনিক গম্ভীরা ও নানা-নাতি চরিত্রায়ন
কালের বিবর্তনে আধুনিক গম্ভীরা একক বা শিবমুখী বন্দনা ছেড়ে নানা-নাতি দ্বৈত চরিত্রে রূপ লাভ করেছে। এতে একজন অভিজ্ঞ বয়স্ক ব্যক্তি ‘নানা’ এবং একজন চটপটে তরুণ ‘নাতি’র ভূমিকায় অভিনয় করে থাকে।
নানা মূলত সমাজের প্রবীণ, অভিজ্ঞ ও ঐতিহ্যবাহী চেতনার প্রতীক। তাঁর পোশাক হিসেবে থাকে লুঙ্গি, মুখে পাকা দাড়ি, মাথায় মাথাল এবং হাতে লাঠি। অন্যদিকে নাতি হলো উদীয়মান তরুণ প্রজাতি, চপল ও প্রশ্নবাণে জর্জরিত আধুনিক প্রজন্ম। তার পোশাকে থাকে ছেঁড়া কলারের গেঞ্জি এবং কোমরে বাঁধা গামছা।
পরিবেশনের সময় নানা ও নাতির মধ্যে আঞ্চলিক চাঁপাই ভাষায় রসাত্মক সংলাপ, বিতর্ক ও বাকচাতুরী চলে। নাতি সমাজের নানা অসংগতি, দুর্নীতি বা অব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন তোলে বা ঠাট্টা করে, আর নানা তার প্রজ্ঞা দিয়ে সুর ও গানের মাধ্যমে সমাধান বাতলে দেন। সংলাপের ফাঁকে ফাঁকে বিশেষ সুরের গান বা ‘ধুয়া’ গীত হয়। মূল চরিত্রের পাশাপাশি পেছনের দোহার দল সেই ধুয়া দোহারি করে গানটিকে জমজমাট করে তোলে।
সুরের বৈচিত্র্য, বাদ্যযন্ত্র ও আধুনিক পরিবর্তন
প্রথাগত ও আধুনিক গম্ভীরার সাঙ্গীতিক কাঠামোতে বহু রূপান্তর এসেছে। পূর্বে গম্ভীরা গান একতাল, ত্রিতাল, দাদরা, খেমটা, কাহারবা এবং বিশেষ লোকছন্দে পরিবেশিত হতো। বর্তমানে আধুনিক শ্রোতার রুচির কথা মাথায় রেখে লোকসুরের পাশাপাশি বাংলা ও হিন্দি জনপ্রিয় সিনেমার সুরের আদল, এমনকি আধুনিক লোকনাট্যের বহু বিষয়, চরিত্র ও প্রাসঙ্গিক সংলাপ এতে সংযোজিত হচ্ছে। গম্ভীরার পরিবেশনায় মূল সুর ও তাল রক্ষায় ঢোল, কাসর, হারমোনিয়াম, বাঁশি, দোতারা, জুড়ি ও মন্দিরা বাদ্যযন্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
প্রখ্যাত ব্যক্তিত্ব ও কিংবদন্তি শিল্পীগণ
চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও রাজশাহী অঞ্চল থেকে উঠে আসা বহু গুণী সুরসাধক ও নাট্যকার গম্ভীরা গানকে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে মর্যাদা দিয়েছেন। তাঁদের মধ্যে কুতুবুল আলম গম্ভীরা গানের সুর ও সংলাপে আধুনিকতা আনার অন্যতম পথিকৃৎ ছিলেন। এছাড়া রকিবউদ্দীন ও বীরেন ঘোষ গম্ভীরাকে সুসংহত রূপ দেওয়া ও জনপ্রিয় করার ক্ষেত্রে অসামান্য ভূমিকা রাখেন।
পরবর্তীতে মাহবুবুল আলম নানা-নাতির নান্দনিক জুটিতে আধুনিক গম্ভীরাকে জনপ্রিয়তার শীর্ষে নিয়ে যান। স্বাধীনোত্তর বাংলাদেশে শফিকুল ইসলাম (নানা শফিক) নানার ভূমিকায় এবং ফাইজুর রহমান মনি নাতির ভূমিকায় অভিনয় করে বাংলাদেশ টেলিভিশন (বিটিভি) ও বিভিন্ন জাতীয় মঞ্চের মাধ্যমে গম্ভীরাকে ঘরে ঘরে পৌঁছে দেন।
সোর্স ও প্রামাণ্য রেফারেন্স:
১. বাংলাদেশের লোকসংস্কৃতি ও লোকসাহিত্য — বাংলা একাডেমি।
২. মালদহের গম্ভীরা — হরিদাস পালিত।
৩. বাংলাদেশের লোকসঙ্গীত ও লোকনাট্য আর্কাইভ — জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র ও বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি।
৪. চাঁপাইনবাবগঞ্জের ইতিহাস ও সংস্কৃতি — আঞ্চলিক ঐতিহাসিক গবেষণা কেন্দ্র।
আরও দেখুন:






