২০০৪ সালের ২১ আগস্ট—বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম এক কালো দিন। রাজধানীর বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউতে সন্ত্রাসবিরোধী শান্তির্যালির সভামঞ্চের ঠিক সামনে সাধারণ কর্মীদের সাথে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন এক তেজস্বী নারী। হঠাৎই বিকট শব্দে বিস্ফোরিত হলো একের পর এক ঘাতক আর্জেস গ্রেনেড। রক্তাক্ত, নিথর দেহগুলোর মাঝে মারাত্মকভাবে আহত হয়ে লুটিয়ে পড়লেন তিনি। মৃত্যুযন্ত্রণা ও রক্তক্ষরণের সাথে দীর্ঘ ৫৭ ঘণ্টা অলৌকিক জীবনযুদ্ধ চালিয়ে অবশেষে ২৪ আগস্ট শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন রাজপথের এই বীর নেত্রী। তিনি আর কেউ নন—মহীয়সী নারী, স্বাধিকার আন্দোলন ও নারী জাগরণের অন্যতম পথপ্রদর্শক আইভি রহমান।
শৈশব, বিবাহ ও শিক্ষাজীবন
আইভি রহমানের রাজনৈতিক জীবন কেবল রাজপথের আন্দোলন দিয়ে মাপা যাবে না; তাঁর জীবনের মূলে ছিল গভীর শিক্ষা ও পারিবারিক মূল্যবোধ। ১৯৪৪ সালের ১ ডিসেম্বর কিশোরগঞ্জ জেলার ভৈরব থানার এক ঐতিহ্যবাহী পরিবারে জন্ম নেন জেবুন্নাহার আইভি। তাঁর বাবা ঢাকা কলেজের প্রখ্যাত অধ্যক্ষ জালাল উদ্দিন আহমদ এবং মা হাসিনা বানু।
১৯৫৮ সালের ২৭ জুন, মাত্র নবম শ্রেণিতে অধ্যয়নকালে কিশোরগঞ্জের আরেক কৃতি সন্তান, ভাষা আন্দোলনের তুখোড় নেতা ও পরবর্তীকালে বাংলাদেশের রূপকারদের একজন (প্রয়াত রাষ্ট্রপতি) মো. জিল্লুর রহমানের সাথে তাঁর বিয়ে হয়। বিয়ের পর পারিবারিক ও রাজনৈতিক আঙিনায় তিনি পরিচিত হয়ে ওঠেন ‘আইভি রহমান’ নামে। বিয়ের পরও থেমে থাকেনি তাঁর পড়ালেখা। স্বামী জিল্লুর রহমানের অকৃত্রিম উৎসাহ ও অনুপ্রেরণায় ভৈরবে স্কুল ও কলেজের গণ্ডি পেরিয়ে তিনি ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এবং সেখান থেকে বাংলা সাহিত্যে সম্মান (অনার্স) ডিগ্রি অর্জন করেন।
পারিবারিক বন্ধন ও উত্তরসূরি
রাজনীতির বাইরেও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পরিবারের সাথে তাঁর ছিল গভীর আত্মিক ও পারিবারিক সম্পর্ক। তাঁর বড় বোন শামসুন্নাহার সিদ্দিক হলেন বঙ্গবন্ধুর কনিষ্ঠ কন্যা শেখ রেহানার শাশুড়ি।
ব্যক্তিজীবনে আইভি রহমান এক সফল ও রত্নগর্ভা মা। তাঁর একমাত্র ছেলে নাজমুল হাসান পাপন (যিনি পরবর্তীতে সংসদ সদস্য ও বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন) এবং দুই কন্যা—তানিয়া ও তনিমা। রাজনীতির কঠিন লড়াইয়ের মাঝেও তিনি সন্তানদের সুশিক্ষিত ও নীতিবান করে গড়ে তুলেছেন।
ছাত্ররাজনীতি থেকে স্বাধিকার আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রজীবনেই আইভি রহমানের অসাম্প্রদায়িক ও গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক জীবনের সূচনা ঘটে। পাকিস্তানের স্বৈরাচারী আইয়ুব বিরোধী আন্দোলন, ৬৬-এর ঐতিহাসিক ছয় দফা আন্দোলন, ৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান এবং ৭০-এর নির্বাচনে তিনি রাজপথে সক্রিয় ও বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করেন।
১৯৭১ সালের ঐতিহাসিক ৭ই মার্চের ভাষণের পর বঙ্গবন্ধুর সুস্পষ্ট নির্দেশনায় দেশজুড়ে যখন প্রাক-যুদ্ধের প্রস্তুতি চলছে, তখন বেগম সাজেদা চৌধুরীর নেতৃত্বে আইভি রহমান রাইফেল চালনা ও ফার্স্ট এইড (প্রাথমিক চিকিৎসা) ট্রেনিং নেন। কেবল নিজে প্রশিক্ষণ নিয়ে ক্ষান্ত হননি, অন্য নারী কর্মীদেরও সংগঠিত করে যুদ্ধের প্রস্তুতিতে যুক্ত করেন।
মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে তিনি বেগম বদরুন্নেছা ও সৈয়দা সাজেদা চৌধুরীর সাথে মিলে শরণার্থী ও বীর মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য স্থাপিত ক্যাম্পগুলোতে খাবার, জরুরি ওষুধ ও প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি সরবরাহের এক বিশাল দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেন। পাশাপাশি, মুক্তিযোদ্ধাদের মনোবল চাঙা রাখতে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে নিয়মিত প্রেরণা জোগানো রাজনৈতিক কথিকা পাঠ করতেন তিনি।
সংকটময় দিনগুলো ও বাংলাদেশ মহিলা লীগ
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে নির্মমভাবে হত্যা করার পর যখন দেশের রাজনৈতিক আকাশ ঘোর অমাবস্যায় ঢেকে যায়, তখনও আইভি রহমান দমে যাননি। সেনাশাসক ও স্বৈরাচারের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে তিনি রাজপথে নেমে আসেন।
পরবর্তী প্রতিটি গণতান্ত্রিক ও স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে তিনি ছিলেন অগ্রণী সারির যোদ্ধা। বাংলাদেশ মহিলা আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা সাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবে তিনি দলটিকে তৃণমূল পর্যায়ে সুসংগঠিত করেন এবং পরবর্তীতে এর সভানেত্রীর দায়িত্ব অত্যন্ত দক্ষতার সাথে পালন করেন।
নারী জাগরণ ও সামাজিক অবদান
আইভি রহমান কেবল রাজনৈতিক নেতৃত্বেই সীমাবদ্ধ ছিলেন না, বাংলাদেশের নারী সমাজকে স্বাবলম্বী করা ও অধিকার সচেতন করার ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা অনস্বীকার্য:
- বাংলাদেশ মহিলা সমিতি: ১৯৭২ থেকে ১৯৭৬ সাল পর্যন্ত তিনি বাংলাদেশ মহিলা সমিতির সাধারণ সম্পাদিকা, ১৯৭৬ থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত সহ-সভানেত্রী এবং ২০০৪ সালে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত সভানেত্রীর দায়িত্ব পালন করেন।
- জাতীয় মহিলা সংস্থা: ১৯৯৬ সালের আগস্ট থেকে ২০০১ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তিনি জাতীয় মহিলা সংস্থার সভানেত্রীর দায়িত্ব পালন করেন।
- আইন প্রণয়ন ও সামাজিক কাজ: দেশে নারী ও শিশু নির্যাতনবিরোধী কঠোর আইন প্রণয়নে তিনি নীতিনির্ধারণী ও কার্যকর ভূমিকা রাখেন। বহু সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও জনকল্যাণমূলক সংগঠনের সাথে তিনি আজীবন সম্পৃক্ত ছিলেন।

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক আদর্শকে বুকে ধারণ করে রাজনীতির মাঠে এসেছিলেন আইভি রহমান। জেল-জুলুম, অত্যাচার আর ঘাতকের রক্তচক্ষু কোনো কিছুই তাঁকে নীতি ও আদর্শ থেকে একচুল নাড়াতে পারেনি। ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট নিজের রক্ত দিয়ে তিনি প্রমাণ করে গেছেন দলের প্রতি, নেত্রীর প্রতি এবং দেশের মানুষের প্রতি তাঁর ভালোবাসার গভীরতা কতখানি।
বাংলাদেশের স্বাধিকার আন্দোলন, নারী মুক্তি এবং গণতান্ত্রিক সংগ্রামের ইতিহাসে আইভি রহমানের নাম এক দীপ্তিময় ও অমলিন নক্ষত্র হয়ে চিরকাল জ্বলজ্বল করবে।
আরও দেখুন:



