শ্রীকোল গ্রাম, ১ নং কয়া ইউনিয়ন, কুমারখালী, কুষ্টিয়া

কয়ার শ্রীকোল গ্রাম – ১ নং কয়া ইউনিয়ন, কুমারখালী, কুষ্টিয়া

কয়ার শ্রীকোল গ্রাম - ১ নং কয়া ইউনিয়ন, কুমারখালী, কুষ্টিয়া

কুষ্টিয়া জেলার কুমারখালী উপজেলার ১ নং কয়া ইউনিয়নের একটি ঐতিহ্যবাহী ও বর্ধিষ্ণু গ্রাম হলো কয়ার শ্রীকোল। গড়াই নদীর অববাহিকায় অবস্থিত এই গ্রামটি তার কৃষি সমৃদ্ধি এবং শান্ত নিবিড় পরিবেশের জন্য অত্র অঞ্চলে পরিচিত। কয়া ইউনিয়নের প্রশাসনিক ও ভৌগোলিক কাঠামোর মধ্যে এই গ্রামটি একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে।

ভৌগোলিক অবস্থান ও সীমানা

কয়ার শ্রীকোল গ্রামটি কয়া ইউনিয়নের মধ্যাঞ্চল থেকে কিছুটা দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থিত। গুগল ম্যাপ ও স্থানীয় ভূমি অফিসের মানচিত্র অনুযায়ী, গ্রামের উত্তর দিকে কয়া ও বানিয়াপাড়া, দক্ষিণ দিকে গড়াই নদী ও যদুবয়রা ইউনিয়ন, পূর্ব দিকে সুলতানপুর এবং পশ্চিম দিকে ঘোড়াই গ্রাম অবস্থিত। গড়াই নদীর সন্নিকটে হওয়ায় এ অঞ্চলের ভূমি মূলত পলিগঠিত এবং অত্যন্ত উর্বর। নদীর তীরবর্তী প্রাকৃতিক সৌন্দর্য গ্রামটিকে এক বৈচিত্র্যময় রূপ দান করেছে।

জনসংখ্যা ও জনমিতি

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (BBS) এবং স্থানীয় প্রশাসনের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, কয়ার শ্রীকোল গ্রামের মোট জনসংখ্যা প্রায় ৩,২৫০ জন। এর মধ্যে পুরুষের সংখ্যা ১,৬৫০ জন এবং নারীর সংখ্যা ১,৬০০ জন। নারী-পুরুষের অনুপাত প্রায় ১০০:৯৭। গ্রামে মোট পরিবারের সংখ্যা প্রায় ৭৫০টি। ধর্মীয় গঠনের দিক থেকে গ্রামের প্রায় ৯২% মানুষ ইসলাম ধর্মাবলম্বী এবং অবশিষ্ট ৮% মানুষ হিন্দু ধর্মাবলম্বী। জনসংখ্যার ঘনত্ব মাঝারি এবং বসতিগুলো মূলত কৃষি জমি ও রাস্তার দুই পাশে গড়ে উঠেছে।

শিক্ষা ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান

গ্রামের গড় শিক্ষার হার প্রায় ৫৭.৫%। প্রাথমিক শিক্ষার প্রসারে গ্রামে কয়ার শ্রীকোল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে। মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষার জন্য এই গ্রামের শিক্ষার্থীরা কয়া মহাবিদ্যালয় অথবা কুমারখালী উপজেলা সদরের বিভিন্ন নামকরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরশীল। BANBEIS-এর তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই গ্রাম থেকে কারিগরি শিক্ষায় শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ বাড়ছে। গ্রামের অনেক কৃতি সন্তান বর্তমানে শিক্ষকতা ও বিভিন্ন সরকারি চাকরিতে নিয়োজিত রয়েছেন।

ভূমি ব্যবহার ও কৃষি ব্যবস্থা

ভূমি মন্ত্রণালয়ের ডিজিটাল ল্যান্ড জোনিং ডাটাবেজ অনুযায়ী, কয়ার শ্রীকোল গ্রামের ভূমির প্রায় ৮০% কৃষি জমি হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এখানকার মাটি পলি-দোআঁশ ও বেলে-দোআঁশ প্রকৃতির, যা প্রায় সকল ধরনের ফসল চাষের উপযোগী। প্রধান ফসলের মধ্যে ধান, পাট, গম ও সরিষা উল্লেখযোগ্য। এছাড়া পিঁয়াজ ও সবজি চাষে এখানকার কৃষকদের বিশেষ দক্ষতা রয়েছে। গ্রামের প্রায় ৭০% পরিবার সরাসরি কৃষি এবং কৃষি শ্রমের ওপর তাদের জীবিকার জন্য নির্ভরশীল।

অবকাঠামো ও যোগাযোগ ব্যবস্থা

LGED এবং উপজেলা প্রকৌশল দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, কয়ার শ্রীকোল গ্রামের যোগাযোগ ব্যবস্থা সন্তোষজনক। কুষ্টিয়া-কুমারখালী প্রধান সড়কের সাথে সংযোগ রক্ষাকারী গ্রামের ভেতরের রাস্তাগুলো পাকা (বিটুমিনাস) ও হেরিংবোন বন্ড (HBB) দ্বারা নির্মিত। তবে নদীর সন্নিকটে হওয়ায় কিছু অভ্যন্তরীণ রাস্তা কাঁচা মেঠো পথ হিসেবেই রয়ে গেছে। গ্রামে পানি নিষ্কাশন ও সহজ চলাচলের জন্য ৩টি কালভার্ট রয়েছে। গ্রামটি শতভাগ বিদ্যুতায়িত এবং অধিকাংশ পরিবার উন্নত স্যানিটেশন ব্যবস্থার আওতায় এসেছে।

ধর্মীয় ও সামাজিক প্রতিষ্ঠান

ধর্মীয় ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে কয়ার শ্রীকোল গ্রামে ৩টি জামে মসজিদ ও ১টি পাঞ্জেগানা মসজিদ রয়েছে। মুসলমানদের ধর্মীয় ও সামাজিক সমাবেশের জন্য একটি ঈদগাহ ময়দান সংরক্ষিত আছে। হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ তাদের প্রধান পূজাগুলো স্থানীয় মন্দির ও অস্থায়ী মণ্ডপে পালন করেন। গ্রামের নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় একটি কবরস্থান ও শ্মশান ঘাট রয়েছে, যা গড়াই নদীর কাছাকাছি অবস্থিত। সামাজিক শৃঙ্খলা বজায় রাখতে গ্রামের প্রবীণদের সমন্বয়ে গঠিত স্থানীয় সমাজ ব্যবস্থা বেশ সক্রিয়।

প্রশাসন ও স্থানীয় নেতৃত্ব

কয়ার শ্রীকোল গ্রামটি ১ নং কয়া ইউনিয়নের ৫ নং ওয়ার্ডের অংশ হিসেবে পরিচালিত হয়। ইউনিয়ন পরিষদের ডাটাবেজ অনুযায়ী, গ্রামের মোট ভোটার সংখ্যা প্রায় ১,৯৫০ জন। স্থানীয় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় গ্রাম পুলিশ নিয়মিত দায়িত্ব পালন করে। নির্বাচিত ইউপি সদস্য (মেম্বার) এবং স্থানীয় মুরব্বিরা বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড ও সামাজিক বিবাদ মিমাংসায় নেতৃত্ব দেন। সরকারি বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প ও সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর সুবিধাগুলো এখানে নিয়মিত বিতরণ করা হয়।

পেশা ও অর্থনীতি

গ্রামের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি কৃষি। তবে যাতায়াত ব্যবস্থার উন্নতির ফলে বর্তমানে অনেক যুবক কুমারখালী ও কুষ্টিয়া শহরে ছোট-বড় ব্যবসায় নিয়োজিত হয়েছেন। উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষ রাজমিস্ত্রি, কাঠমিস্ত্রি ও পরিবহন শ্রমিক হিসেবে কাজ করেন। এছাড়া এই গ্রামের একটি উল্লেখযোগ্য জনশক্তি প্রবাসে কর্মরত থেকে রেমিট্যান্সের মাধ্যমে গ্রাম্য অর্থনীতিতে ভূমিকা রাখছেন। গ্রামীণ নারীরা হাঁস-মুরগি পালন ও কুটির শিল্পের মাধ্যমে পরিবারে বাড়তি আয়ের যোগান দেন।

সামাজিক সমস্যা ও সম্ভাবনা

গড়াই নদীর ভাঙন প্রবণতা কয়ার শ্রীকোল গ্রামের অন্যতম একটি প্রাকৃতিক সমস্যা। বর্ষাকালে নদী ভাঙনের কারণে কৃষিজমি ও বসতভিটা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। তবে সঠিক নদী শাসন ব্যবস্থা ও বাঁধ নির্মাণের মাধ্যমে এই ঝুঁকি কমানো সম্ভব। গ্রামের উর্বর জমি ও নদীর নিকটবর্তী অবস্থান কৃষিভিত্তিক পর্যটন বা ক্ষুদ্র শিল্প স্থাপনের জন্য অত্যন্ত সম্ভাবনাময়। পরিকল্পিতভাবে অবকাঠামোগত উন্নয়ন করা গেলে কয়ার শ্রীকোল গ্রামটি একটি স্বনির্ভর ও আধুনিক গ্রামীণ জনপদে পরিণত হবে।

 

আরও দেখুন:

শেয়ার করুন: Facebook X WhatsApp LinkedIn

প্রেস ডেস্ক, সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর এর অফিস

সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর এর নিজের সকল লেখা, শুভেচ্ছা, স্মরণ ইত্যাদি এই ডেস্ক থেকে প্রকাশিত হয়।

সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সম্পাদক, কুষ্টিয়া জেলা আওয়ামী লীগ। ইতিহাস, রাজনীতি, প্রযুক্তি ও উন্নয়ন নিয়ে লেখালেখি।

যোগাযোগ

কুমারখালী বাস স্ট্যান্ড, দুর্গাপুর, কুমারখালী।
+৮৮০ (১৭) ৬৩০৩৮,৬৩০৩৯।contact@sufifaruq.com

© ২০২৬ সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।