কখনো কি চেন্নাইয়ের মার্গালি (Margazhi) মিউজিক ফেস্টিভ্যালে যাওয়ার সুযোগ হয়েছে আপনার? কিংবা কোনো এক পড়ন্ত বিকেলে দক্ষিণ ভারতের কোনো প্রাচীন মন্দিরের পাথুরে চত্বরে বসে চোখ বন্ধ করে শুনেছেন কর্ণাটকী সঙ্গীতের সুর? যদি শুনে থাকেন, তবে যে সুগভীর, গাণিতিক অথচ পরম ভক্তিময় সাঙ্গীতিক কাঠামোটি আপনার আত্মাকে ছুঁয়ে গেছে—তার নাম ‘কৃতি’ (Kriti)।
আমরা যখন সাধারণ কোনো গান শুনি, তখন সুর আর কথার একটা মেলবন্ধন খুঁজি। কিন্তু কর্ণাটকী সঙ্গীতে একটি ‘কৃতি’ নিছক কোনো গান নয়; এটি হলো সাহিত্য (Sahitya) এবং সুরের (Raga) এমন এক ঐশ্বরিক স্থাপত্য, যা একটি নির্দিষ্ট তালের ফ্রেমে বাঁধা থাকে। একটি কৃতির আসল সৌন্দর্য তখনই ফোটে, যখন শিল্পী এর নির্ধারিত সুরকাঠামোর ওপর দাঁড়িয়ে নিজের মনন থেকে সুরের বিস্তার করেন, যাকে বলা হয় ‘নিরভাল’ বা ‘কল্পনাস্বরাম’।
কৃতি কী এবং এর ঐতিহাসিক বিবর্তন
সংস্কৃত ‘কৃতি’ শব্দের অর্থ ‘সৃষ্টি’ বা ‘কর্ম’। সপ্তদশ শতাব্দীর দিকে এটি বর্তমান রূপ পেতে শুরু করলেও, অষ্টাদশ শতাব্দীতে কর্ণাটকী সঙ্গীতের কিংবদন্তি ত্রিমূর্তির (সন্ত ত্যাগারাজ, মুথুস্বামী দিক্ষিতর ও শ্যামাশাস্ত্রী) হাত ধরে কৃতি তার শৈল্পিক উৎকর্ষের চরম শিখরে পৌঁছায়। গীতম বা ভার্নামের মতো প্রাথমিক কাঠামোর তুলনায় কৃতি অনেক বেশি পরিণত, জটিল এবং শিল্পীকে ইম্প্রোভাইজেশনের (মনোধর্ম সঙ্গীত) অবারিত স্বাধীনতা দেয়।
কৃতির বিবর্তনে উথুক্কাদু ভেঙ্কটা কবির (১৭০০–১৭৬৫) অবদান অনস্বীকার্য। ত্রিমূর্তিদেরও আগে তিনি কৃতির চিরাচরিত কাঠামোতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছিলেন। তাঁর রচনাগুলোতে লয়ের বৈচিত্র্য (Contrasting speeds), ছন্দের চলন (Gatis) এবং তালের জটিল বিন্যাসের যে অভাবনীয় সংমিশ্রণ দেখা যায়, তা পরবর্তীকালে ত্যাগারাজ বা দিক্ষিতরের মতো সাধকদের পথপ্রদর্শক হিসেবে কাজ করেছে।
কৃতির প্রথাগত স্থাপত্য (Structure)
ভাবুন, কৃতি হলো একটি চমৎকার প্রাসাদ। এই প্রাসাদের মূলত তিনটি মূল প্রকোষ্ঠ থাকে:
১. পল্লবী (Pallavi): এটি গানের মুখড়া বা প্রারম্ভিক অংশ। পাশ্চাত্যের ‘Refrain’-এর মতো এটি বারবার ফিরে আসে। রাগের মূল মেজাজ এবং গানের কেন্দ্রীয় আধ্যাত্মিক ভাবটি এখানেই প্রতিষ্ঠিত হয়।
২. অনুপল্লবী (Anupallavi): এটি গানের দ্বিতীয় স্তবক। সাধারণত এটি মন্ত্র (খাদ) বা মধ্য সপ্তক থেকে শুরু হয়ে তার সপ্তকের (উঁচু স্বর) দিকে ধাবিত হয়, যা কৃতির সুরের ব্যাপ্তিকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যায়। ক্ষেত্রবিশেষে এটি ঐচ্ছিক হতে পারে।
৩. চরণম (Charanam): এটি কৃতির শেষ এবং দীর্ঘতম অংশ। এতে কাহিনীর বিস্তারিত বর্ণনা বা সাহিত্যের গভীরতা থাকে। চরণমের সুরবিন্যাসে প্রায়শই অনুপল্লবীর ছায়া পাওয়া যায়। সবচেয়ে চমৎকার বিষয়টি হলো—চরণমের শেষ লাইনে সুরকারের নাম বা প্রতীকী স্বাক্ষর লুকানো থাকে, যাকে ‘মুদ্রা’ (Mudra) বলে। যেমন, সন্ত ত্যাগারাজের মুদ্রায় তাঁর নিজের নাম থাকে, মুথুস্বামী দিক্ষিতর ব্যবহার করেন ‘গুরুগুহ’ আর শ্যামাশাস্ত্রী ব্যবহার করেন ‘শ্যামাকৃষ্ণ’।
কৃতির অলঙ্কার ও কারিগরি বৈচিত্র্য
কৃতির এই প্রথাগত প্রাসাদে সুরকারেরা নিজেদের মতো করে চমৎকার সব কারুকাজ যোগ করেন:
- চিট্টাস্বরাম (Chittaswara): অনেক কৃতিতে অনুপল্লবী ও চরণমের মাঝে এমন একটি অংশ থাকে যেখানে কোনো কথা থাকে না। কেবল রাগের স্বরগুলো (সা-রে-গা-মা) একটি নির্দিষ্ট তালের চালে মোমের মতো সাজানো থাকে।
- সমষ্টি চরণম (Samashti Charanam): মুথুস্বামী দিক্ষিতর মাঝে মাঝেই অনুপল্লবী রাখতেন না। পল্লবীর পরেই একটি বড় স্তবক দিয়ে দিতেন, যা অনুপল্লবী ও চরণম—উভয়ের অভাব পূরণ করত। একেই সমষ্টি চরণম বলে।
- মধ্যমকাল (Madhyamakala): কৃতির শেষে এসে হঠাৎ কয়েক লাইন সাহিত্য মূল লয়ের চেয়ে দ্বিগুণ দ্রুত গতিতে গাওয়া হয়। গান শেষ হওয়ার ঠিক আগে এটি এক অদ্ভুত রোমাঞ্চ তৈরি করে।
- সংগতি (Sangati): একটি নির্দিষ্ট লাইনকে বারবার গেয়ে, প্রতিবার সুরের নতুন নতুন অলঙ্করণ তৈরি করা। সন্ত ত্যাগারাজ তাঁর কীর্তিতে এর চমৎকার প্রয়োগ ঘটিয়েছেন।
পঞ্চরত্ন কীর্তি: কর্ণাটকী সঙ্গীতের পাঁচটি অমর স্তম্ভ
সন্ত ত্যাগারাজ (১৭৬৭–১৮৪৭) তাঁর জীবনে শ্রীরামের বন্দনায় হাজারো কৃতি রচনা করেছেন। কিন্তু এর মধ্যে পাঁচটি কৃতি রাগ, তাল এবং সাহিত্যের দিক থেকে এতই মহিমান্বিত যে, এদের একত্রে ‘পঞ্চরত্ন’ (Pancharatna) বলা হয়।
এই পাঁচটি কৃতি অন্যান্য সাধারণ কৃতির চেয়ে গঠনে অনেক বেশি সুশৃঙ্খল। এর প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো গাণিতিক নিটোলতায় গড়া ‘স্বরা-সাহিত্য’ (Swara-Sahitya) বিন্যাস। এখানে পল্লবী ও অনুপল্লবীর পর ছোট ছোট অনেকগুলো চরণম থাকে। শিল্পীরা প্রথমে স্বর (সা-রে-গা-মা) গান এবং ঠিক পরের লাইনেই সেই একই সুরকাঠামোতে বসানো লিরিক গেয়ে ওঠেন। ৮ মাত্রার ‘আদি তাল’-এ নিবদ্ধ এই পাঁচটি রত্ন সাধারণত ‘মধ্যমকাল’ বা দ্রুত লয়ে গাওয়া হয়।
ঘনা রাগ পঞ্চক: পাঁচটি রত্নের পরিচয় এই পাঁচটি কৃতি পাঁচটি ভিন্ন ‘ঘনা’ (গম্ভীর) রাগে রচিত। একনজরে এদের রূপরেখা:
| ক্রম | কৃতির নাম | রাগ | বিশেষত্ব ও ব্যক্তিগত অনুভূতি |
| ১ | জগতদানন্দ কারক | নাটা (Nata) | এটি একমাত্র কৃতি যা সম্পূর্ণ সংস্কৃত ভাষায় রচিত। শ্রীরামের ১০৮টি নামের এক অপূর্ব বিজয়গাথা এটি। এর সুরের উচ্ছ্বাস শুনলে মনে এক অদ্ভুত শক্তির সঞ্চার হয়। |
| ২ | দুদুকু গালা | গৌলা (Gaula) | এখানে ত্যাগারাজ অত্যন্ত মানবিক ও কাতর ভঙ্গিতে নিজের জীবনের ভুলগুলো স্বীকার করে ঈশ্বরের কাছে ক্ষমা চেয়েছেন। এর সুরের ভেতর এক গভীর আত্মোপলব্ধি লুকিয়ে আছে। |
| ৩ | সাধিনচেনে | আরভি (Arabi) | এটি মূলত শ্রীকৃষ্ণের লীলা, চপলতা ও মহিমা নিয়ে রচিত। সুরটি এতই প্রাণবন্ত যে শুনলেই মনের মেঘ কেটে যায়। |
| ৪ | কানা কানা রুচিরা | বরালি (Varali) | এখানে ঐশ্বরিক রূপের বন্দনা করা হয়েছে। বরালি অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও কঠিন একটি রাগ, যা গায়কের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ দাবি করে। |
| ৫ | এন্দারো মহানুভাবুলু | শ্রী (Sri) | পঞ্চরত্নের সমাপনী এবং কর্ণাটকী সঙ্গীতের সবচেয়ে জনপ্রিয় সৃষ্টি। এখানে ত্যাগারাজ বিশ্বের সমস্ত মহাপুরুষ ও সাধকদের বিনম্র প্রণাম জানিয়েছেন। |
একটি আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতা: ‘ত্যাগারাজ আরাধনা’
সাংস্কৃতিক ও আবেগীয় দৃষ্টিকোণ থেকে পঞ্চরত্ন কীর্তি একক পরিবেশনার গণ্ডি পেরিয়ে এক সমষ্টিগত প্রার্থনায় পরিণত হয়েছে।
প্রতি বছর জানুয়ারি মাসে অন্ধ্রপ্রদেশের তিরুভাইয়ারুতে অনুষ্ঠিত হয় ‘ত্যাগারাজ আরাধনা’ উৎসব। ভাবুন তো একবার দৃশ্যটা—শত শত কণ্ঠশিল্পী, বেহালাবাদক ও মৃদাঙ্গম শিল্পী এক বিশাল প্যান্ডেলের নিচে পাশাপাশি বসেছেন। কোনো একক অহংকার নেই, কোনো প্রতিযোগিতা নেই। শত শত কণ্ঠ যখন একযোগে দ্রুত গতির গিটকিরি ও অলঙ্করণসহ গেয়ে ওঠে “এন্দারো মহানুভাবুলু, আন্দেরিকি বন্দনামু…” (সেই সব মহান আত্মাদের প্রতি আমার শত কোটি প্রণাম)—তখন সেখানে যে ঐশ্বরিক আবহের সৃষ্টি হয়, তা নিজ চোখে না দেখলে বা না শুনলে বিশ্বাস করা কঠিন।
উপসংহারে বলতে হয়, কৃতি ও পঞ্চরত্ন কীর্তি কেবল সুর বা তালের কারুকাজ নয়; এটি হলো ভক্তি আর ব্যাকরণের এক নিখুঁত মেলবন্ধন। এখানে সুরের জটিলতা কখনো ভক্তির সরলতাকে আড়াল করে না, বরং তাকে আরও বেশি মানবিক করে তোলে। সন্ত ত্যাগারাজের এই সৃষ্টিগুলো আজও প্রমাণ করে যে, শাস্ত্রীয় সঙ্গীত কেবল মস্তিষ্কের ব্যায়াম নয়, এটি আত্মারও পরম খোরাক।



