মেধাস্বত্ব, কপিরাইট, ট্রেড মার্ক বিষয়ক বাংলাদেশের আইন, নীতিমালা, প্রবিধানমালা, নির্দেশিকা ইত্যাদি

মেধাসম্পদ বা ইন্টেলেকচ্যুয়াল প্রপার্টি (IP) হলো মানুষের বুদ্ধিবৃত্তিক বা সৃজনশীল সৃষ্টির আইনগত অধিকার। বাংলাদেশে মেধা সম্পদ সুরক্ষার জন্য মূলত দুটি পৃথক ধারা ও দপ্তর কাজ করে। সাহিত্য, শিল্পকলা ও সঙ্গীতের জন্য ‘কপিরাইট অফিস’ এবং শিল্প ও বাণিজ্যের (যেমন: লোগো, আবিষ্কার, ডিজাইন) জন্য ‘পেটেন্ট, ডিজাইন ও ট্রেডমার্কস অধিদপ্তর (DPDT)’। বিশ্ববাণিজ্য সংস্থা (WTO)-এর ট্রিপস (TRIPS) চুক্তির সাথে সামঞ্জস্য রেখে বাংলাদেশ সরকার সাম্প্রতিক সময়ে এই আইনগুলোকে অনেক আধুনিক ও যুগোপযোগী করেছে।

নিচে মেধাস্বত্ব বিষয়ক আইন, বিধিমালা ও নীতিমালার পূর্ণাঙ্গ তালিকা দেওয়া হলো:

১. কপিরাইট বিষয়ক আইন ও বিধি (Copyright)

সাহিত্য, নাটক, সঙ্গীত, চলচ্চিত্র, চিত্রকলা, অডিও রেকর্ড, সফটওয়্যার ইত্যাদির সুরক্ষার জন্য এই আইন প্রযোজ্য।

  • কপিরাইট আইন, ২০০০ (সংশোধিত ২০০৫): এটি বাংলাদেশের কপিরাইট সুরক্ষার মূল ভিত্তি। কোনো সৃজনশীল কাজের মালিকানা, মেয়াদকাল (সাধারণত লেখকের মৃত্যুর পর ৬০ বছর), এবং লঙঘনের শাস্তি এই আইনে বর্ণিত আছে।
  • কপিরাইট বিধিমালা, ২০০৬: আইনটি কীভাবে প্রয়োগ হবে, কপিরাইট রেজিস্ট্রেশনের পদ্ধতি, ফি এবং বোর্ড গঠনের নিয়মাবলী এতে বিস্তারিত বলা আছে।
  • কপিরাইট (সংশোধন) বিল, ২০২৩ (প্রক্রিয়াধীন): ডিজিটাল পাইরেসি রোধ এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের স্বত্ব সুরক্ষার জন্য এই আইনটি আরও কঠোর করার প্রক্রিয়া চলছে।

২. ট্রেডমার্ক বিষয়ক আইন ও বিধি (Trademark)

ব্যবসা বা পণ্যের নাম, লোগো, স্লোগান, মোড়ক বা প্রতীকের সুরক্ষার জন্য।

  • ট্রেডমার্ক আইন, ২০০৯ (সংশোধিত ২০১৫): কোনো কোম্পানির ব্র্যান্ড ভ্যালু বা পরিচিতি যাতে অন্য কেউ নকল করতে না পারে, তার আইনি সুরক্ষা দেয় এই আইন।
  • ট্রেডমার্ক বিধিমালা, ২০১৫: ট্রেডমার্ক আবেদনের প্রক্রিয়া, যাচাই-বাছাই (Examination), বিরোধ নিষ্পত্তি এবং নবায়নের নিয়মাবলী।

৩. প্যাটেন্ট ও ডিজাইন বিষয়ক আইন (Patent & Industrial Design)

নতুন কোনো বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার (প্যাটেন্ট) এবং পণ্যের বাহ্যিক রূপ বা নকশা (ডিজাইন) সুরক্ষার জন্য। পূর্বে এটি ১৯১১ সালের আইনের অধীনে ছিল, যা সম্প্রতি নতুন করে প্রণয়ন করা হয়েছে।

  • বাংলাদেশ প্যাটেন্ট আইন, ২০২২: ১৯১১ সালের আইন বাতিল করে নতুন এই আইন করা হয়েছে। এতে উদ্ভাবকের অধিকার রক্ষা এবং প্যাটেন্টের মেয়াদ ২০ বছর নির্ধারণ করা হয়েছে।
  • বাংলাদেশ শিল্প-নকশা আইন, ২০২৩ (Bangladesh Industrial Designs Act, 2023): পণ্যের নান্দনিক বা বাহ্যিক নকশা নিবন্ধনের জন্য এই নতুন আইনটি করা হয়েছে।
  • প্যাটেন্ট ও ডিজাইন বিধিমালা, ১৯৩৩ (নতুন বিধিমালার অপেক্ষায়): নতুন আইনের অধীনে বিধিমালা তৈরির কাজ চলমান, তবে প্রক্রিয়াগত কারণে পুরনো বিধিমালার কিছু অংশ এখনো প্র্যাকটিসে ব্যবহার হয়।

৪. ভৌগোলিক নির্দেশক বিষয়ক আইন (Geographical Indication – GI)

কোনো নির্দিষ্ট এলাকার মাটি, পানি বা আবহাওয়ার কারণে উৎপন্ন বিশেষ পণ্যের (যেমন: জামদানি শাড়ি, ইলিশ মাছ, বাগদা চিংড়ি) স্বীকৃতি ও সুরক্ষার জন্য।

  • ভৌগোলিক নির্দেশক পণ্য (নিবন্ধন ও সুরক্ষা) আইন, ২০১৩: বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী পণ্যগুলোকে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতি দেওয়ার জন্য এই আইনটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
  • ভৌগোলিক নির্দেশক পণ্য (নিবন্ধন ও সুরক্ষা) বিধিমালা, ২০১৫: জিআই (GI) পণ্য হিসেবে নিবন্ধনের আবেদন প্রক্রিয়া ও মানদণ্ড।

৫. জাতীয় নীতিমালা ও অন্যান্য (National Policies)

সরকারের দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা ও আন্তর্জাতিক দায়বদ্ধতা।

  • জাতীয় মেধাসম্পদ নীতিমালা, ২০১৮ (National Intellectual Property Policy, 2018): উদ্ভাবন ও সৃজনশীলতাকে উৎসাহিত করা এবং মেধাসম্পদ বাণিজ্যিকীকরণের জন্য একটি সমন্বিত গাইডলাইন।
  • উদ্ভিদ জাত সংরক্ষণ আইন, ২০১৯: নতুন কোনো উদ্ভিদের জাত উদ্ভাবন করলে তার ওপর কৃষিবিদ বা গবেষকের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য।

৬. আন্তর্জাতিক চুক্তি (যেগুলোতে বাংলাদেশ স্বাক্ষরকারী)

বাংলাদেশের আইনগুলো এই আন্তর্জাতিক কনভেনশনগুলোর আলোকে তৈরি:

  • TRIPS Agreement (WTO): বাণিজ্য সম্পর্কিত মেধাস্বত্ব অধিকার।
  • Paris Convention: শিল্প ও প্যাটেন্ট সুরক্ষার জন্য।
  • Berne Convention: সাহিত্য ও শিল্পকর্ম সুরক্ষার জন্য।
  • WIPO Convention: বিশ্ব মেধাসম্পদ সংস্থার সদস্য হিসেবে বাংলাদেশ তাদের গাইডলাইন অনুসরণ করে।

একজন সৃজনশীল ব্যক্তি, উদ্ভাবক কিংবা ব্যবসায়ী হিসেবে ‘কপিরাইট আইন ২০০০’, ‘ট্রেডমার্ক আইন ২০০৯’ এবং নতুন ‘প্যাটেন্ট আইন ২০২২’ সম্পর্কে ধারণা থাকা আবশ্যক। নিজের মেধা ও সৃষ্টিকে চুরির হাত থেকে বাঁচাতে এবং এর বাণিজ্যিক সুফল ভোগ করতে যথাযথ দপ্তরে (কপিরাইট অফিস বা DPDT) নিবন্ধন করা অত্যন্ত জরুরি।

শেষ আপডেট ১৪/০২/২০২৬

Comments are closed.