বাংলাদেশে অলাভজনক প্রতিষ্ঠান (Non-Profit Organization বা NGO) তৈরি এবং এটি পরিচালনার প্রক্রিয়া বেশ কয়েকটি ধাপে বিভক্ত এবং এটি বিভিন্ন আইনের অধীনে নিয়ন্ত্রিত হয়। প্রতিষ্ঠানটি কোন ধরনের সামাজিক কাজ করবে এবং এর পরিধি কতটুকু হবে, তার ওপর ভিত্তি করে নিবন্ধনের কর্তৃপক্ষ ভিন্ন হতে পারে।
নিচে বাংলাদেশে অলাভজনক প্রতিষ্ঠান তৈরি ও পরিচালনার প্রধান আইন ও নীতিমালাগুলো বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
১. অলাভজনক প্রতিষ্ঠানের ধরন ও নিবন্ধন কর্তৃপক্ষ
বাংলাদেশে প্রধানত তিনভাবে অলাভজনক প্রতিষ্ঠান নিবন্ধিত হতে পারে:
| প্রতিষ্ঠানের ধরন | সংশ্লিষ্ট আইন | নিবন্ধন কর্তৃপক্ষ |
| স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা | ভলান্টিয়ারি সোশ্যাল ওয়েলফেয়ার এজেন্সিস (রেজিস্ট্রেশন অ্যান্ড কন্ট্রোল) অর্ডিন্যান্স, ১৯৬১ | সমাজসেবা অধিদপ্তর |
| সোসাইটি | সোসাইটিস রেজিস্ট্রেশন অ্যাক্ট, ১৮৬০ | যৌথ মূলধন কোম্পানি ও ফার্মসমূহের পরিদপ্তর (RJSC) |
| ট্রাস্ট | ট্রাস্ট অ্যাক্ট, ১৮৮২ | সাব-রেজিস্ট্রার অফিস (ভূমি মন্ত্রণালয়) |
| অলাভজনক কোম্পানি | কোম্পানি আইন, ১৯৯৪ (ধারা ২৮) | যৌথ মূলধন কোম্পানি ও ফার্মসমূহের পরিদপ্তর (RJSC) |
২. প্রতিষ্ঠান তৈরির প্রধান আইন ও বিধিমালা
ক. সমাজসেবা অধিদপ্তরের অধীনে (১৯৬১ সালের আইন)
অধিকাংশ তৃণমূল পর্যায়ের এনজিও এই আইনের অধীনে নিবন্ধিত। এটি প্রধানত সমাজকল্যাণমূলক কাজ যেমন—অনাথ আশ্রম, লাইব্রেরি বা দুস্থ সহায়তা প্রকল্পের জন্য প্রযোজ্য।
খ. সোসাইটিস রেজিস্ট্রেশন অ্যাক্ট, ১৮৬০
শিক্ষা, বিজ্ঞান, সংস্কৃতি বা চ্যারিটেবল কাজের জন্য এটি জনপ্রিয়। এটি পরিচালনার জন্য একটি ‘গভর্নিং বডি’ এবং ‘মেমোরেন্ডাম অব অ্যাসোসিয়েশন’ প্রয়োজন হয়।
গ. কোম্পানি আইন, ১৯৯৪ (অলাভজনক কোম্পানি)
যদি কোনো প্রতিষ্ঠান কোম্পানির মতো কাঠামোগতভাবে পরিচালিত হতে চায় কিন্তু মুনাফা বণ্টন করবে না, তবে ধারা ২৮ অনুযায়ী এটি লাইসেন্স গ্রহণ করতে পারে। একে অনেক সময় ‘সেকশন ২৮ কোম্পানি’ বলা হয়।
৩. বৈদেশিক অনুদান গ্রহণ ও এনজিও বিষয়ক ব্যুরো
যদি কোনো প্রতিষ্ঠান দেশের বাইরে থেকে বৈদেশিক অনুদান (Foreign Donation) গ্রহণ করতে চায়, তবে তাকে অবশ্যই এনজিও বিষয়ক ব্যুরো (NGO Affairs Bureau) থেকে আলাদাভাবে নিবন্ধিত হতে হবে।
- সংশ্লিষ্ট আইন: বৈদেশিক অনুদান (স্বেচ্ছাসেবী কার্যক্রম) রেগুলেশন আইন, ২০১৬।
- প্রধান কাজ: এই আইন অনুযায়ী, এনজিওদের প্রতিটি প্রকল্পের বাজেট অনুমোদন এবং বার্ষিক অডিট রিপোর্ট এনজিও ব্যুরোতে জমা দিতে হয়।
৪. পরিচালনা ও তদারকি নির্দেশিকা
প্রতিষ্ঠান তৈরি করার পর সেটি পরিচালনার জন্য সরকার প্রদত্ত কিছু নির্দিষ্ট গাইডলাইন মেনে চলতে হয়:
- পরিচালনা পর্ষদ: প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের একটি সাধারণ পরিষদ (General Body) এবং একটি কার্যকরী পরিষদ (Executive Body) থাকতে হবে। রক্তের সম্পর্কের কেউ সাধারণত কার্যকরী পরিষদে একসাথে থাকতে পারেন না (স্বার্থের সংঘাত এড়াতে)।
- আর্থিক ব্যবস্থাপনা: প্রতিষ্ঠানের নামে একটি আলাদা ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থাকতে হবে। সকল লেনদেন চেকের মাধ্যমে হওয়া বাঞ্ছনীয়।
- অডিট ও রিপোর্টিং: প্রতি বছর অনুমোদিত চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট ফার্ম দ্বারা প্রতিষ্ঠানের হিসাব নিরীক্ষা বা অডিট করানো বাধ্যতামূলক।
- ট্যাক্স ও ভ্যাট: অলাভজনক প্রতিষ্ঠান হলেও এনজিওদের প্রতি বছর আয়কর রিটার্ন জমা দিতে হয়। তবে শর্তসাপেক্ষে তারা আয়কর অব্যাহতি (Tax Exemption) পেতে পারে।
৫. গুরুত্বপূর্ণ প্রবিধানমালা ও অন্যান্য কমপ্লায়েন্স
- মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২: এনজিওগুলো যাতে জঙ্গি অর্থায়ন বা অবৈধ অর্থের লেনদেনে জড়িত না হয়, সেজন্য এই আইন অত্যন্ত কড়াকড়িভাবে অনুসরণ করা হয়।
- শ্রম আইন, ২০০৬: প্রতিষ্ঠানের বেতনভুক্ত কর্মকর্তা বা কর্মচারীদের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের শ্রম আইন কার্যকর হবে।
- তথ্য অধিকার আইন, ২০০৯: জনগণের কাছে স্বচ্ছতা বজায় রাখতে প্রতিষ্ঠানের নির্দিষ্ট কিছু তথ্য প্রকাশ করা বাধ্যতামূলক হতে পারে।
বাংলাদেশে অলাভজনক প্রতিষ্ঠান পরিচালনা এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি স্বচ্ছ এবং জবাবদিহিতামূলক। সরকার বর্তমানে ডিজিটাল পদ্ধতিতে আবেদনের প্রক্রিয়া (যেমন—RJSC বা সমাজসেবার অনলাইন পোর্টাল) সহজতর করছে। তবে এনজিও ব্যুরোর নিয়মকানুন এবং আয়কর রিটার্ন জমা দেওয়ার ক্ষেত্রে বিশেষ সাবধানতা অবলম্বন করা প্রয়োজন।

Comments are closed.