ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের বিশাল পরিসরে ‘গৌরী’ একটি অতি প্রাচীন ও গম্ভীর রাগ, যা শিল্পীর গায়কী এবং ঘরানার ওপর ভিত্তি করে একাধিক ঠাটে পরিবেশিত হয়। পূরবী এবং ভৈরব ঠাটের পাশাপাশি মারওয়া ঠাটেও গৌরী রাগের একটি অত্যন্ত সমাদৃত ও স্বতন্ত্র রূপ রয়েছে। মারওয়া ঠাটের প্রভাবে এই গৌরীতে একদিকে যেমন গোধূলি বেলার বিষাদ ফুটে ওঠে, অন্যদিকে তেমনি এক অদ্ভুত বৈরাগ্য ও অস্থিরতার সুর ধ্বনিত হয়, যা শ্রোতাকে এক ভিন্ন আধ্যাত্মিক জগতে নিয়ে যায়।
রাগের পরিচয়, বিশেষত্ব ও ইতিহাস মারওয়া ঠাটের অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় এই রাগের স্বরবিন্যাসে শুদ্ধ ধৈবত (ধা)-এর উপস্থিতি একে পূরবী ঠাটের গৌরী থেকে সম্পূর্ণ আলাদা করে দেয়। নিচে এর তাত্ত্বিক পরিচয় তুলে ধরা হলো:
ঠাট: মারওয়া (Marwa Thaat)।
জাতি: ঔড়ব-সম্পূর্ণ বা ষাড়ব-সম্পূর্ণ (ঘরানা ও গায়কী ভেদে আরোহণে স্বর প্রয়োগ ভিন্ন হতে পারে)।
আরোহ: সা রে ক্ষা পা, ধা নি র্সা (স্বরলিপির সুবিধার্থে: রে = কোমল, ক্ষা = তীব্র/কড়ি মা, ধা = শুদ্ধ)।
অবরোহ: র্সা নি ধা পা, ক্ষা গা, ক্ষা রে সা।
পকড়: সা রে ক্ষা পা, ক্ষা গা, ক্ষা রে সা।
বাদী স্বর: রে (কোমল ঋষভ)।
সমবাদী স্বর: পা (পঞ্চম) অথবা সা (ষড়জ)।
বর্জিত স্বর: আরোহণে সাধারণত ‘গা’ (গান্ধার) দুর্বল বা বর্জিত থাকে।
ব্যবহৃত স্বর: কেবল ঋষভ (রে) কোমল ব্যবহৃত হয়। মধ্যম (মা) তীব্র বা কড়ি (ক্ষা) এবং ধৈবত (ধা) শুদ্ধ ব্যবহৃত হয়। বাকি সমস্ত স্বর শুদ্ধ।
সময়: দিনের চতুর্থ প্রহর বা গোধূলি লগ্ন (বিকেল ৪টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত)। এটি একটি সান্ধ্যকালীন ‘সন্ধিপ্রকাশ রাগ’।
প্রকৃতি: অত্যন্ত গম্ভীর, করুণ, বৈরাগ্যপূর্ণ এবং কিছুটা অস্থিরতা বা ব্যাকুলতা মিশ্রিত।
সংশ্লিষ্ট বা রিলেটেড রাগসমূহ
রাগ মারওয়া: মারওয়া রাগের সাথে এই রাগের ঠাটগত মিল থাকলেও, মারওয়াতে ‘পা’ (পঞ্চম) বর্জিত থাকে। কিন্তু মারওয়া ঠাটের গৌরীতে ‘পা’-এর সুস্পষ্ট ও গুরুত্বপূর্ণ প্রয়োগ রয়েছে।
পূরবী ঠাটের গৌরী: পূরবী ঠাটের গৌরীতে ধৈবত (ধা) কোমল ব্যবহৃত হয়, কিন্তু মারওয়া ঠাটের গৌরীতে ধৈবত (ধা) শুদ্ধ থাকে, যা এই দুই গৌরীর মধ্যে মূল পার্থক্য তৈরি করে।
রাগ শ্রী: শ্রী রাগে ‘রে’ এবং ‘পা’-এর ওপর বিশেষ মীড় ব্যবহৃত হয় এবং সেখানে কোমল ধৈবত (ধা) থাকে, যা মারওয়া অঙ্গের গৌরী থেকে সম্পূর্ণ আলাদা।
মারওয়া ঠাটের গৌরী ধীর ও বিলম্বিত লয়ে গাওয়ার রাগ। এই রাগে কোমল ঋষভ (রে) এবং কড়ি মধ্যমের (মা) সাথে শুদ্ধ ধৈবতের (ধা) যে সাঙ্গীতিক সম্পর্ক তৈরি হয়, তা গোধূলি লগ্নে এক অদ্ভুত শূন্যতা ও অনন্তের প্রতি তৃষ্ণার সৃষ্টি করে। অবরোহণে ‘ক্ষা গা, ক্ষা রে সা’ চলনটি গৌরী রাগের চিরচেনা বিষাদময় আবেশটি নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তোলে।
কাজী নজরুল ইসলামের গানে রাগ গৌরী (মারওয়া ঠাট):
নজরুলের গানে গৌরী রাগের প্রভাব থাকলেও সুনির্দিষ্টভাবে মারওয়া ঠাটের বিশুদ্ধ গৌরীতে সুরারোপিত গানের উদাহরণ বেশ বিরল। (তথ্য সংগ্রহ চলছে)।
কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের গানে রাগ গৌরী (মারওয়া ঠাট):
রবীন্দ্রনাথের গানে মিশ্র রাগের আধিপত্য থাকায় বিশুদ্ধ মারওয়া অঙ্গের গৌরী খুব একটা দেখা যায় না। (তথ্য সংগ্রহ চলছে)।
আধুনিক গানে রাগ গৌরী (মারওয়া ঠাট): রাগের গাম্ভীর্য ও অস্থির মেজাজের কারণে আধুনিক লঘু সঙ্গীতে এই রাগের ব্যবহার প্রায় নেই।
গজলে রাগ গৌরী (মারওয়া ঠাট):(তথ্য সংগ্রহ চলছে)
ভজনে রাগ গৌরী (মারওয়া ঠাট):(তথ্য সংগ্রহ চলছে)
ঠুমরিতে রাগ গৌরী (মারওয়া ঠাট):(তথ্য সংগ্রহ চলছে)
যন্ত্রে রাগ গৌরী (মারওয়া ঠাট):সেতার ও সরদ: ১. যন্ত্রসঙ্গীতে অনেক সময় শিল্পীরা মারওয়া ঠাটের গৌরীর আলাপ ও জোড় বাজিয়ে থাকেন। (সুনির্দিষ্ট রেকর্ডিংয়ের তথ্য সংগ্রহ চলছে)।
খেয়াল:
১. ইন্দোর ঘরানার কিংবদন্তি ওস্তাদ আমীর খান সাহেবের গায়নে মারওয়া অঙ্গের গৌরী রাগের অত্যন্ত অনবদ্য পরিবেশনা রয়েছে।
২. পণ্ডিত কুমার গান্ধর্বের কণ্ঠেও মারওয়া ঠাটের গৌরীর প্রভাব লক্ষ্য করা যায়।
৩. পাতিয়ালা ও জয়পুর ঘরানার শিল্পীদের কণ্ঠে গৌরী (মারওয়া ঠাট) খেয়াল হিসেবে সমাদৃত।
টিউটোরিয়াল:
যেকোনো রাগের স্বরের চলাফেরা বোঝার জন্য ২/৫ টি স্বর-মালিকা বা সারগম-গীত শোনা দরকার। স্বর মল্লিকার পাশাপাশি দু একটি লক্ষণ গীত (বা ছোট খেয়াল) শুনলে সহজ হতে পারে। ১. রাগ গৌরী (মারওয়া অঙ্গ) স্বরমল্লিকা। ২. AUTRIM প্রজেক্ট আর্টিকেল বা শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের অনলাইন আর্কাইভ।
তথ্যসূত্র:
১. সঙ্গীত রিসার্চ একাডেমী (SRA): রাগের সময়কাল ও পরিবেশনার সিদ্ধান্ত সংক্রান্ত তথ্যের জন্য।
২. পণ্ডিত বিষ্ণুনারায়ণ ভাতখণ্ডে — ‘হিন্দুস্তানি সংগীত পদ্ধতি’: মারওয়া ঠাট ও গৌরী রাগের তাত্ত্বিক বিশ্লেষণের জন্য।
৩. বিমলকান্ত রায় চৌধুরী — ‘ভারতীয় সংগীতকোষ’: রাগের ঐতিহাসিক বিবর্তন ও প্রয়োগ সংক্রান্ত তথ্যের জন্য।
৪. বসন্ত — ‘সংগীত বিশারদ’: শাস্ত্রীয় নিয়ম ও বাদী-সমবাদী যাচাইয়ের জন্য।
৫. পণ্ডিত ওমকারনাথ ঠাকুর — ‘প্রণাব ভারতী’: রাগের রসতাত্ত্বিক ও গায়নশৈলী নিশ্চিতকরণের জন্য।
শ্রোতা সহায়িকা নোট সিরিজে আজকের রাগ – মারওয়া ঠাটের রাগ গৌরী। এই আর্টিকেলটির উন্নয়ন কাজ চলমান রয়েছে। আপডেট পেতে আবারো আসার আমন্ত্রণ রইলো।