আজারবাইজানি শাস্ত্রীয় সঙ্গীত ‘মুগাম’ | অসুরের সুরলোকযাত্রা সিরিজ

ককেশাসের প্রাচীন পর্বতমালা আর কাস্পিয়ান সাগরের হাওয়া যেখানে এসে মিশেছে, সেই আগুনের দেশ আজারবাইজানের বুকে জন্ম নিয়েছে প্রাচ্যের অন্যতম জটিল, রহস্যময় ও নিখাদ আধ্যাত্মিক সুরধারা—‘মুগাম’ (Mugham)। এটি কেবল কান জুড়ানোর পরিবেশনা কিংবা বিনোদনের কোনো উপকরণ নয়; আজারবাইজানিদের কাছে মুগাম হলো আত্মার ভাষান্তর, বেঁচে থাকার দর্শন এবং খোদ পরম সত্তার সাথে সংযোগ স্থাপনের অতীন্দ্রিয় মাধ্যম।

আমাদের “অসুরের সুরলোকযাত্রা” সিরিজের এই পর্বে আমরা ককেশীয় আবেগ এবং প্রাচ্যের গাণিতিক সুরকাঠামোর এমন এক মহাকাব্যিক মেলবন্ধনে ডুব দেব, যা শতাব্দী ধরে মানুষকে পার্থিব জগৎ থেকে এক সুরময় রহস্যলোকে নিয়ে চলেছে।

আজারবাইজানি শাস্ত্রীয় সঙ্গীত মুগাম

 

১. মুগাম কী এবং এর গীতিনীতি (The Nature & Main Genres of Mugham)

‘মুগাম’ মূলত এক ধরনের সুরভিত্তিক কাঠামোর ভেতরে স্বাধীন ইম্প্রোভাইজেশন বা তাৎক্ষণিক সুর রচনার শিল্পকলা। ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের ‘রাগ’ কিংবা আরবীয় ‘মাকাম’-এর সাথে এর বেশ কিছু কাঠামোগত মিল থাকলেও, আজারবাইজানি মুগামের নাটকীয়তা, অলঙ্করণ এবং পরিবেশনার তীব্রতা একে এক সম্পূর্ণ আলাদা পরিচয় দিয়েছে।

                                    [আজারবাইজানি মুগামের মূল ধারাসমূহ]
                                                   │
         ┌───────────────────┬─────────────────────┴─────────────────────┬───────────────────┐
         ▼                   ▼                                           ▼                   ▼
    [১. ক্লাসিক্যাল মুগাম]   [২. তাসনিফ (Tasnif)]                        [৩. রেঙ্গ (Rang)]    [৪. আশুয়িগ (Ashig)]
 (অনির্ধারিত তাল ও অতীন্দ্রিয়) (ছন্দবদ্ধ বাদ্য-কণ্ঠের বিরতি)                   (দ্রুত লয়ের নৃত্যগীত) (চারণ কবিদের সাজ-সংগীত)
প্রধান গীতিনীতিসমূহ:
  • ক্লাসিক্যাল মুগাম (Classical Mugham Suite): এটি এই সুরধারার সর্ববিউচ্চ ও সবচেয়ে গম্ভীর রূপ। এখানে নির্দিষ্ট কোনো ছকবাঁধা তাল বা মিটার থাকে না। গায়ক (যাঁকে বলা হয় ‘খানেেন্দা’) এবং যন্ত্রশিল্পীরা পূর্ব নির্ধারিত একটি স্কেল বা ‘মোড’-এর ওপর দাঁড়িয়ে নিজেদের হৃদয়ের গভীরতম অনুভূতি, শোক বা ঐশী বিরহ প্রকাশ করেন। ২০০৩ সালে ইউনেস্কো (UNESCO) মুগামকে ‘মানবজাতির অমূল্য বাচিক ও বিমূর্ত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য’ (Masterpiece of Oral and Intangible Heritage) হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।
  • তাসনিফ (Tasnif): অনিয়মিত ও জটিল দীর্ঘ মুগামের মাঝে পরিবেশের গম্ভীরতা হালকা করতে এবং বৈচিত্র্য আনতে মাঝপথে ছন্দবদ্ধ যে সুর ও গান গাওয়া হয়, তা-ই তাসনিফ। এতে নির্দিষ্ট তাল এবং নির্দিষ্ট বাদ্যযন্ত্রের লয় থাকে।
  • রেঙ্গ (Rang): এটি মুগাম পরিবেশনার মধ্যবর্তী বা শেষের দিকের একক যন্ত্রসঙ্গীত (Instrumental movement)। নাচ বা গতিময় সুরের মাধ্যমে এক অনুভূতি থেকে অন্য অনুভূতিতে যাওয়ার রূপান্তর হিসেবে রেঙ্গ বাজানো হয়।
  • আশুয়িগ সুরধারা (Ashig Music): শহুরে রাজদরবার বা সুফি খানকাহর বাইরে গ্রামীণ আজারবাইজানের চারণ কবি বা গায়কদের ঐতিহ্য এটি। চারণ কবিগণ তাঁদের কাঁধে ‘সাজ’ (Saz) নামক লম্বা ঘাড়ের তারযন্ত্র ঝুলিয়ে দেশপ্রেম, নায়কোচিত বীরগাথা কিংবা লোকায়ত প্রেমের কাব্য গেয়ে বেড়ান।

২. ‘মুগাম ট্রাইও’ ও বাদ্যযন্ত্রের স্বর্গীয় যুগলবন্দী

আজারবাইজানি মুগামের পূর্ণাঙ্গ রূপ ফুটে ওঠে তিন সদস্যের একটি ঐতিহ্যবাহী পরিবেশক দলের মাধ্যমে, যাকে বলা হয় ‘মুগাম ট্রাইও’ (Mugham Trio)। এই দলের নেতৃত্ব দেন একজন প্রধান গায়ক (খানেেন্দা), যিনি একই সাথে কণ্ঠ দেন এবং তালে তালে ছন্দ নিয়ন্ত্রণ করেন।

                                     [মুগাম ট্রাইও (Mugham Trio)]
                                                   │
         ┌─────────────────────────────────────────┼─────────────────────────────────────────┐
         ▼                                         ▼                                         ▼
   [১. তার (Tar)]                           [২. কামঞ্চা (Kamancha)]                     [৩. দাফ / গাভাল (Daf / Ghaval)]
(মালবেরি কাঠের ১১ তারের হৃদয়)             (মখমলি সুরের ৪ তারের বেহালা)                (ছন্দ ও তালের খঞ্জনি ড্রাম)
১. তার (Tar)

‘তার’ হলো আজারবাইজানের আত্মাস্বরূপ এবং জাতীয় বাদ্যযন্ত্র। ১১টি তারবিশিষ্ট এই বিশেষ যন্ত্রটির বডি বা পেটের অংশটি খোদাই করা শুকনো মালবেরি (তুত) কাঠ দিয়ে দুটি চেম্বারে তৈরি করা হয়, যার ওপর ছাগলের চামড়ার সূক্ষ্ম পর্দা টানা থাকে। ১৯ শতকের বিখ্যাত উস্তাদ সাদিগজান (Sadigjan) এই যন্ত্রে সংস্কার এনে কোলের বদলে বুকের সাথে চেপে ধরে বাজানোর রীতি প্রবর্তন করেন। হৃদপিণ্ডের ঠিক ওপর ‘তার’ রেখে যখন প্লাক করা হয়, তখন তার তীক্ষ্ণ ও গমগমে সুর সরাসরি শ্রোতার হৃদয়ে গিয়ে বিঁধে।

২. কামঞ্চা (Kamancha)
চারটি তারবিশিষ্ট ছছড়ি দিয়ে বাজানো (Bowed) এই যন্ত্রটি আধুনিক বেহালার অতি প্রাচীন এক পূর্বসূরি। এর গোলাকার রেশমি বডি এবং ভেতরের অনুরণন এমন এক সুর তৈরি করে, যা মানুষের বিষাদগ্রস্ত কণ্ঠস্বরের মতো অত্যন্ত মসৃণ, করুণ ও চোখ ভিজিয়ে দেওয়ার মতো আবেগপূর্ণ।
৩. দাফ বা গাভাল (Daf / Ghaval)
এটি একটি মেমব্রানোফোন বা ফ্রেম-ড্রাম (এক ধরণের খঞ্জনি), যার কাঠের রিংয়ের ভেতরের দিকে শত শত ছোট ধাতব আংটা লাগানো থাকে। খানেেন্দা বা গায়ক নিজে এক হাতে এই দাফ উঁচিয়ে ধরে গলায় উচ্চাঙ্গের তান তোলেন এবং অন্য হাতে দাফ বাজিয়ে পরিবেশনার তাল, লয় ও নাটকীয় মোড় নিয়ন্ত্রণ করেন।

৩. সুরের গাণিতিক মেজাজ: প্রধান সাতটি মুগাম (The Seven Core Modes)

আজারবাইজানি সঙ্গীতের প্রাণপুরুষ ও তত্ত্ববিদ উযেইর হাজিবেয়ভ (Uzeyir Hajibeyov)-এর গবেষণানুসারে, শাস্ত্রীয় মুগাম মূলত সাতটি মূল স্কেল বা ‘মোড’-এর ওপর দাঁড়িয়ে আছে। প্রতিটি মুগাম মানুষের মানসিক অবস্থা, চেতনা ও আধ্যাত্মিকতার একেকটি নির্দিষ্ট মাত্রা বা রূপকে ফুটিয়ে তোলে:

মুগামের নামসুরের মেজাজ ও আধ্যাত্মিক বৈশিষ্ট্যশ্রোতার মানসিক অনুভূতি
রাস্ত (Rast)স্থিরতা, আত্মবিশ্বাস, বীরত্ব ও পরম সত্যের প্রকাশ।হৃদয়ে শক্তি ও সাহসিকতার সঞ্চার করে।
শুরু (Shur)কোমল আনন্দ, উদ্দীপনা ও প্রজ্ঞার সঞ্চার।মনে এক ধরনের প্রশান্তি ও মিষ্টি দোলা সৃষ্টি করে।
সেগাহ (Segah)ঐশী প্রেম, বিরহ, প্রিয়তমের আকুলতা ও করুণ রস।মানব হৃদয়ের গভীরতম ভালোবাসার কান্না ও ব্যাকুলতা।
শশুতার (Shushtar)গভীর শোক, শোকগাথা ও বেদনার আত্মপ্রকাশ।বিষাদ ও অনুশোচনায় আত্মাকে ভারাক্রান্ত করে।
চাহারগাহ (Chahargah)তীব্র উত্তেজনা, অবিচল উদ্দীপনা ও বিপ্লব।মানসিক জাগরণ ও সংগ্রামের উদ্দীপনা জোগায়।
বায়াতি-শিরাজ (Bayaty-Shiraz)গভীর নির্জনতা, একাকিত্ব ও সুরের ব্যাকুলতা।একাকী আত্মা ও স্মৃতিকাতরতার ছবি আঁকে।
হুমায়ুন (Humayun)উচ্চাঙ্গের দার্শনিক চিন্তা, বৈরাগ্য ও গভীর ধ্যান।মহাজাগতিক চিন্তা ও আত্মজিজ্ঞাসায় মগ্ন করে।

৪. গজল, সুফি দর্শন ও বাতেনি লিব্রেত্তো

মুগাম কেবল একটি সুরের খেলা নয়, এর আসল শক্তি নিহিত রয়েছে এর লিব্রেত্তো বা গীতিকাব্যের গভীরে। মুগামে ব্যবহৃত কবিতাগুলো নেওয়া হয় ক্লাসিক্যাল ফারসি ও আজারবাইজানি সাহিত্যের মহান সুফি কবিদের গজল থেকে।

নিজামি গাঞ্জাভি, ফুজুলি, ইমাদাদিন নাসিমী কিংবা খাগানী-র মতো কালজয়ী মরমী কবিদের গজল যখন মুগামের সুরে উচ্চারিত হয়, তখন সাধারণ মানবিক প্রেম রূপান্তরিত হয় ‘ইশক-ই-হকীকী’ বা পরম ঐশী প্রেমে।

[সুফি গজল (ফুজুলি/নাসিমী)] ──► [উচ্চাঙ্গের সুর ও তান (খানিেন্দা)] ──► [ওয়াজদ / আধ্যাত্মিক তন্নিষ্ঠতা (শ্রোতা)]

একজন দক্ষ খানেেন্দা গান গাওয়ার সময় কেবল শব্দ উচ্চারণ করেন না; বরং তিনি স্বরযন্ত্রের সূক্ষ্ম তান এবং বুকের ভেতর থেকে আসা গলার কাঁপনের (যাকে বলা হয় ‘তহরীর’) মাধ্যমে প্রতিটি শব্দের ভেতরের লুকায়িত বাতেনি রূপক ফুটিয়ে তোলেন। শ্রোতা তখন পার্থিব পৃথিবীর সীমানা ছাড়িয়ে সুরের ডানায় ভর করে এক পরম সত্তার সান্নিধ্য বা ‘ওয়াজদ’ (Spiritual Ecstasy) অনুভব করেন।

প্রাচ্যের প্রজ্ঞা ও ককেশীয় আবেগের অবিনশ্বর ঐতিহ্য

১৯০৮ সালে উযেইর হাজিবেয়ভ যখন আজারবাইজানের প্রথম অপেরা ‘লেইলি ও মজনুন’ রচনা করেন, তখন তিনি প্রাচ্যের এই মুগামকে পশ্চিমা সিম্ফনির সাথে যুক্ত করে বিশ্বসঙ্গীতে এক নতুন ইতিহাসের জন্ম দিয়েছিলেন। পরবর্তীতে ২০ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে বাকু শহরে গড়ে ওঠে ‘জ্যাজ-মুগাম’ (Jazz-Mugham)-এর মতো চমৎকার ফিউশন ধারা।

আজারবাইজানি মুগাম প্রমাণ করে যে, সুর কোনো নির্দিষ্ট ভূগোলে বন্দি নয়। ককেশাসের বুকে জন্ম নেওয়া এই সুরধারা প্রাচ্যের গাণিতিক ব্যাকরণ ও মানবাত্মার অতীন্দ্রিয় ক্রন্দনকে এক সুতোয় গেঁথেছে। এটি কেবল আজারবাইজানের জাতীয় গর্ব নয়, বরং পুরো বিশ্বমানবের সুরলোকের এক অমর সম্পদ।