হিন্দুস্থানি সঙ্গীতের রাগের নোট

রাগ ভৈরব গৌরী । শ্রোতা সহায়িকা নোট । অসুরের সুরলোকযাত্রা সিরিজ

ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের জটিল ও বিরল জোড় রাগগুলোর (Compound Ragas) মধ্যে ‘ভৈরব গৌরী’ একটি অত্যন্ত গাম্ভীর্যপূর্ণ রাগ। নাম থেকেই বোঝা যায়, এটি প্রাতঃকালীন রাগ ‘ভৈরব’ এবং অত্যন্ত গম্ভীর প্রকৃতির রাগ ‘গৌরী’-এর এক অপূর্ব সাঙ্গীতিক সংমিশ্রণ। এই রাগে একদিকে যেমন ভৈরবের বৈরাগ্য ও ভক্তিভাব ফুটে ওঠে, অন্যদিকে গৌরীর করুণ ও বিষাদময় চলন একে এক অনন্য আধ্যাত্মিক মাত্রা প্রদান করে। এটি একটি অত্যন্ত উচ্চাঙ্গের রাগ, যা কেবল নিপুণ ও দক্ষ শিল্পীর পক্ষেই সঠিকভাবে পরিবেশন করা সম্ভব।

রাগের পরিচয়, বিশেষত্ব ও ইতিহাস ভৈরব এবং গৌরী রাগের মিশ্রণ হওয়ায় এই রাগে উভয় রাগেরই স্বকীয়তা বজায় রাখতে হয়। সাধারণত এই রাগে ভৈরবের ঠাট ও স্বরপ্রয়োগকে ভিত্তি করে গৌরীর বক্র চলন বা গায়কী প্রয়োগ করা হয়। নিচে এর তাত্ত্বিক পরিচয় তুলে ধরা হলো:

  • ঠাট: ভৈরব (Bhairav Thaat)।
  • জাতি: সম্পূর্ণ-সম্পূর্ণ (তবে গায়কী ও ঘরানা ভেদে আরোহণে অনেক সময় স্বর দুর্বল রেখে ঔড়ব বা ষাড়ব রূপও দেওয়া হয়)।
  • আরোহ: সা রে গা মা পা, ধা নি র্সা (স্বরলিপির সুবিধার্থে: রে ও ধা = কোমল, মা = শুদ্ধ মধ্যম)।
  • অবরোহ: র্সা নি ধা পা, মা গা, রে সা (অবরোহণে গৌরীর বিশেষ মীড় ও চলন ব্যবহৃত হয়)।
  • পকড়: গায়কী ভেদে পরিবর্তিত হয়, তবে সাধারণত ‘গা মা ধা পা, মা গা, মা রে সা’ চলনের মাধ্যমে ভৈরব ও গৌরীর মেলবন্ধন ঘটানো হয়।
  • বাদী স্বর: ধৈবত (ধা) বা ঋষভ (রে)।
  • সমবাদী স্বর: ঋষভ (রে) বা ধৈবত (ধা)।
  • বর্জিত স্বর: কোনো স্বর বর্জিত নয়, তবে আরোহণে অনেক সময় ‘গা’ ও ‘নি’ দুর্বলভাবে প্রয়োগ করা হয়।
  • ব্যবহৃত স্বর: ঋষভ (রে) এবং ধৈবত (ধা) কোমল ব্যবহৃত হয়। বাকি সমস্ত স্বর (সা, গা, মা, পা, নি) শুদ্ধ।
  • সময়: দিনের প্রথম প্রহর বা সকাল বেলা (ভৈরব অঙ্গ প্রধান হওয়ায় এটি সাধারণত প্রাতঃকালে গাওয়া হয়)।
  • প্রকৃতি: অত্যন্ত গম্ভীর, ধীর, শান্ত এবং বৈরাগ্যপূর্ণ।

সংশ্লিষ্ট বা রিলেটেড রাগসমূহ

  • রাগ ভৈরব: ভৈরব রাগে ‘গৌরী’ অঙ্গের বক্র চলন থাকে না। ভৈরবে ‘রে’ এবং ‘ধা’-এর ওপর যে বিশেষ আন্দোলন বা মীড় থাকে, ভৈরব গৌরীতে তা গৌরীর চলনের সাথে মিশে যায়।
  • রাগ গৌরী (ভৈরব ঠাট): মূল ভৈরব ঠাটের গৌরীতে গৌরীর প্রাধান্য থাকে এবং সেটি মূলত সান্ধ্যকালীন রাগ। কিন্তু ‘ভৈরব গৌরী’ জোড় রাগটিতে ভৈরবের আধিপত্য থাকে এবং এটি প্রাতঃকালীন মেজাজ বহন করে।

ভৈরব গৌরী অত্যন্ত বিলম্বিত লয়ে গাওয়ার রাগ। সকালের স্নিগ্ধতা এবং একাকীত্বের যে শান্ত রস, তা এই রাগের বক্র চলন ও কোমল স্বরগুলোর মধ্য দিয়ে চমৎকারভাবে ফুটে ওঠে।

কাজী নজরুল ইসলামের গানে রাগ ভৈরব গৌরী: এটি শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের অত্যন্ত উচ্চাঙ্গের ও বিরল জোড় রাগ হওয়ায় নজরুলের গানে এর সরাসরি ও বিশুদ্ধ প্রয়োগ দেখা যায় না। (তবে ভৈরব অঙ্গের গানে গৌরীর সামান্য ছোঁয়া থাকতে পারে)।

কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের গানে রাগ ভৈরব গৌরী: রবীন্দ্রনাথের গানে ভৈরব বা গৌরীর আলাদা প্রভাব থাকলেও, জটিল ‘ভৈরব গৌরী’ জোড় রাগের সরাসরি প্রয়োগ নেই।

আধুনিক গানে রাগ ভৈরব গৌরী: রাগের গাম্ভীর্য ও জটিল চলনের কারণে আধুনিক লঘু সঙ্গীতে এই রাগের ব্যবহার নেই বললেই চলে।

গজলে রাগ ভৈরব গৌরী:(তথ্য সংগ্রহ চলছে)

ভজনে রাগ ভৈরব গৌরী:(তথ্য সংগ্রহ চলছে)

ঠুমরিতে রাগ ভৈরব গৌরী:(তথ্য সংগ্রহ চলছে)

যন্ত্রে রাগ ভৈরব গৌরী:সেতার ও সরদ: ১. যন্ত্রসঙ্গীতে কিছু উচ্চাঙ্গের শিল্পী এই রাগের আলাপ পরিবেশন করেছেন। (সুনির্দিষ্ট রেকর্ডিংয়ের তথ্য সংগ্রহ চলছে)।

খেয়াল: ভৈরব গৌরী মূলত খেয়াল গায়কীর জন্যই সমাদৃত। এই রাগে ভারতের শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের কিংবদন্তিদের কিছু স্মরণীয় পরিবেশনা রয়েছে: ১. পণ্ডিত কুমার গান্ধর্ব-এর কণ্ঠে ‘ভৈরব গৌরী’ রাগের পরিবেশনাটি শাস্ত্রীয় সঙ্গীত জগতে অত্যন্ত বিখ্যাত ও সমাদৃত। ২. গোয়ালিয়র ও আগ্রা ঘরানার কিংবদন্তি পণ্ডিত উলহাস কশলকর-এর কণ্ঠে এই রাগের অনবদ্য পরিবেশনা রয়েছে।

টিউটোরিয়াল: যেকোনো রাগের স্বরের চলাফেরা বোঝার জন্য ২/৫ টি স্বর-মালিকা বা সারগম-গীত শোনা দরকার। স্বর মল্লিকার পাশাপাশি দু একটি লক্ষণ গীত (বা ছোট খেয়াল) শুনলে সহজ হতে পারে। ১. পণ্ডিত কুমার গান্ধর্বের গাওয়া ভৈরব গৌরীর বন্দিশ শোনা এই রাগটি অনুধাবন করার জন্য সবচেয়ে ভালো উপায়। ২. AUTRIM প্রজেক্ট আর্টিকেল বা শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের অনলাইন আর্কাইভ।

তথ্যসূত্র: ১. সঙ্গীত রিসার্চ একাডেমী (SRA): রাগের সময়কাল ও পরিবেশনার সিদ্ধান্ত সংক্রান্ত তথ্যের জন্য। ২. পণ্ডিত বিষ্ণুনারায়ণ ভাতখণ্ডে — ‘হিন্দুস্তানি সংগীত পদ্ধতি’: মিশ্র রাগের তাত্ত্বিক বিশ্লেষণের জন্য। ৩. বিমলকান্ত রায় চৌধুরী — ‘ভারতীয় সংগীতকোষ’: রাগের ঐতিহাসিক বিবর্তন ও প্রয়োগ সংক্রান্ত তথ্যের জন্য। ৪. বসন্ত — ‘সংগীত বিশারদ’: শাস্ত্রীয় নিয়ম ও বাদী-সমবাদী যাচাইয়ের জন্য। ৫. পণ্ডিত ওমকারনাথ ঠাকুর — ‘প্রণাব ভারতী’: রাগের রসতাত্ত্বিক ও গায়নশৈলী নিশ্চিতকরণের জন্য।

শ্রোতা সহায়িকা নোট সিরিজে আজকের রাগ – রাগ ভৈরব গৌরী। এই আর্টিকেলটির উন্নয়ন কাজ চলমান রয়েছে। আপডেট পেতে আবারো আসার আমন্ত্রণ রইলো।

 

আরও দেখুন:

শেয়ার করুন: Facebook X WhatsApp LinkedIn

প্রেস ডেস্ক, সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর এর অফিস

সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর এর নিজের সকল লেখা, শুভেচ্ছা, স্মরণ ইত্যাদি এই ডেস্ক থেকে প্রকাশিত হয়।

সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সম্পাদক, কুষ্টিয়া জেলা আওয়ামী লীগ। ইতিহাস, রাজনীতি, প্রযুক্তি ও উন্নয়ন নিয়ে লেখালেখি।

যোগাযোগ

কুমারখালী বাস স্ট্যান্ড, দুর্গাপুর, কুমারখালী।
+৮৮০ (১৭) ৬৩০৩৮,৬৩০৩৯।contact@sufifaruq.com

© ২০২৬ সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।