শ্রোতা সহায়িকা নোট সিরিজে আজকের রাগ – রাগ ভৈরব। এই আর্টিকেলটির উন্নয়ন কাজ চলমান রয়েছে। আপডেট পেতে আবারো আসার আমন্ত্রণ রইলো।

রাগ ভৈরব বা ভায়রোঁ
হিন্দুস্তানি শাস্ত্রীয় সঙ্গীত ভুবনে প্রভাতের সূর্যোদয়, অন্তরাত্মার পরম জাগরণ এবং গাম্ভীর্যপূর্ণ ভক্তিরস প্রকাশের প্রধান আশ্রয় হলো ‘রাগ ভৈরব’ (বা ভায়রোঁ)। এটি ‘ভৈরব ঠাট’-এর প্রথম ও জনক (আশ্রয়) রাগ।
প্রাক-ভোর ও প্রত্যুষের সুগভীর শান্ত নিস্তব্ধতায় তানপুরার জোড়া সুরে যখন ভৈরবের প্রথম স্বরলহরী ধ্বনিত হয়, তখন তা শ্রোতার হৃদয়ে আধ্যাত্মিক পরম শুভ্রতা ও ভক্তিসিক্ত অনুভূতি জাগিয়ে তোলে। শাস্ত্র মতে, দেবাধিদেব মহাদেবের ‘ভৈরব’ রূপ থেকেই এই রাগের নামকরণ ও সুরভাবের উৎপত্তি।
ইতিহাস, উৎসের বিতর্ক ও পৌরাণিক পটভূমি
রাগ ভৈরবের প্রাচীনত্ব নিয়ে সঙ্গীত পণ্ডিত ও গবেষকদের মধ্যে অত্যন্ত কৌতূহলোদ্দীপক ঐতিহাসিক আলোচনা বিদ্যমান:
১. পৌরাণিক ও প্রাচীন গ্রন্থপঞ্জি: সপ্তদশ শতাব্দীর প্রখ্যাত সঙ্গীতজ্ঞ পণ্ডিত দামোদর সেন তাঁর ‘সংগীত দর্পণ’ গ্রন্থে ভৈরবকে শিবের মুখ নিঃসৃত ‘আদি রাগ’ এবং সর্বশ্রেষ্ঠ রাগ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। কিন্তু এর পূর্বেও খ্রিষ্টীয় একাদশ ও ত্রয়োদশ শতাব্দীর ‘আর্য মার্গ সংগীত’ বিষয়ক পান্ডুলিপিতে ভৈরবের উল্লেখ পাওয়া যায়। এছাড়া পণ্ডিত মতঙ্গ মুনির ‘বৃহদ্দেশী’ এবং জৈন সঙ্গীতবিদ পার্শ্বদেবের ‘সংগীত সময়সার’ গ্রন্থেও প্রাচীন ‘ভৈরব’ বা ‘ভৈরব জাতি’-র স্পষ্ট ঐতিহাসিক ইঙ্গিত রয়েছে।
২. ‘ভীর’ জাতির তত্ত্ব: প্রখ্যাত সঙ্গীত তাত্ত্বিকদের একটি অংশের মতে, প্রাক-বৈদিক যুগে হিমালয়ের পার্বত্য উপত্যকায় বাস করা সঙ্গীতানুরাগী প্রাচীন ‘ভীর’ (Abhir/Bhir) নামক এক জাতি ছিল, যারা গন্ধর্বদের মতোই সঙ্গীতকলায় পারদর্শী ছিল। গবেষকদের মতে, অনার্য ভীরদের নিজস্ব লোকসুর (বিশেষ করে ‘ভৈরব’ ও ‘ভৈরবীক’ সুরধারা) পরবর্তীতে মার্গ সঙ্গীতে সংগৃহীত হয়ে শাস্ত্রীয় রূপ লাভ করে।
৩. কালেংড়ার সাথে বৈসাদৃশ্য: একই ঠাটের ভৈরব অঙ্গের নিকটবর্তী রাগ হলো ‘কালেংড়া’। কিন্তু কালেংড়ার প্রকৃতি চপল, এর বাদী-সমবাদী আলাদা এবং এতে ঋষভ ও ধৈবতে ভৈরবের মতো বিশেষ আন্দোলন বা গাম্ভীর্য থাকে না। তাই ভৈরবে আন্দোলন বাদ দিলে তা মুহূর্তের মধ্যে সাধারণ কালেংড়ায় পরিণত হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
রাগের শাস্ত্রীয় কাঠামো
- ঠাট: ভৈরব ঠাট (জনক রাগ)।
- জাতি: সম্পূর্ণ-সম্পূর্ণ (আরোহণ ও অবরোহণে সাতটি স্বরই ব্যবহৃত হয়; তবে আরোহণে ঋষভ স্বরটিকে অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও আলতোভাবে প্রকাশ করা হয়)।
- বাদী স্বর: ধ (কোমল ধৈবত)।
- সমবাদী স্বর: র (কোমল ঋষভ)।
- ব্যবহৃত স্বর: কোমল ঋষভ (ঋ/r), কোমল ধৈবত (ধা/d) এবং শুদ্ধ গান্ধার (গ), শুদ্ধ মধ্যম (ম), শুদ্ধ পঞ্চম (প), শুদ্ধ নিখাদ (নি) ও ষড়্জ (স)।
- বিবাদী স্বরের প্রয়োগ: কুশলী সুরসাধকগণ অবরোহণে সৌন্দর্য বৃদ্ধির জন্য অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে কোমল নিখাদ (ণ) বিবাদী স্বর হিসেবে অলঙ্কার রূপে স্পর্শ করেন।
- সময়: প্রাতঃকাল (দিনের ১ম প্রহর — ভোর ৪টা থেকে সকাল ৭টা)। এটি একটি প্রধান ‘সন্ধিপ্ৰকাশ রাগ’ (রাত্রির অবসান ও দিনের শুরুর শুভ মুহূর্ত)।
- প্রকৃতি ও রস: অত্যন্ত গম্ভীর, প্রমিত, আধ্যাত্মিক; প্রধান রস হলো শান্ত, ভক্তি ও করুণ রস।
আরোহ, অবরোহ ও পকড় (স্বরসংগতি)
আরোহণ:
স ঋ গ ম প ধ নি র্স
(S r G M P d N S’)
(বিশেষ নোট: কোনো কোনো কুশলী গায়ক আরোহণে ঋষভকে ঈষৎ দুর্বল বা বক্র রেখে ণ্ স গ ম প ধ নি র্স রূপেও আরোহণ করেন)।
অবরোহণ:
র্স নি ধ প, ম গ ঋ স
(S’ N d P, M G r S)
প্রধান স্বরসংগতি (পকড়):
স, গ, ম প, ধ্ প, ম গ, ঋ ঋ স
(S, G, M P, d P, M G, r r S)
গায়কি ও কারিগরি বৈশিষ্ট্য
১. আন্দোলিত কোমল ঋষভ ও কোমল ধৈবত: রাগ ভৈরবের মূল প্রাণস্পন্দন হলো এর কোমল ঋষভ (r) এবং কোমল ধৈবত (d)-এর বিশেষ ধীর আন্দোলন। ধৈবতে স্থায়িত্ব নিয়ে পঞ্চমে নামা (d~P) এবং মধ্যম থেকে কোমল ঋষভে গাম্ভীর্যপূর্ণ আন্দোলন দিয়ে ষড়্জে আসা রাগটির আসল ব্যক্তিত্ব ফুটিয়ে তোলে।
২. ‘ম-র’ এবং ‘প-র’ মীড়: মধ্যম থেকে কোমল ঋষভ (M~r) এবং পঞ্চম থেকে কোমল ঋষভের দীর্ঘ আভিজাত্যপূর্ণ মীড় পরিবেশনকে গভীরভাবে প্রীতিদায়ক করে তোলে।
৩. উত্তরাঙ্গ প্রধান বিস্তার: রাগটি প্রাতঃকালের সন্ধিপ্ৰকাশ এবং উত্তরাঙ্গ প্রধান হওয়ায় অবরোহ বর্গে এবং মন্দ্র-মধ্য সপ্তকে এর রূপ সবচেয়ে বেশি বিকশিত হয়। এতে দ্রুত চপল তান বা ছোট ছোট অলঙ্কারের বদলে বিলম্বিত বিস্তার, মায়াবী গাম্ভীর্য ও স্পষ্ট আন্দোলনই এর আভিজাত্য রক্ষা করে।
প্রথাগত স্বর-বিস্তার ও আলাপচর্চা (Notation)
শিক্ষার্থীদের সুবিধার জন্য প্রথাগত কোমল স্বর (ঋ=r, ধ=d) ও সপ্তক নির্দেশক চিহ্নসহ রাগ ভৈরবের আলাপ ও স্বর-বিস্তার নিচে ধারাবাহিকভাবে উপস্থাপন করা হলো:
১. স ঋ ঋ স, ধ্ স ঋ স, গ ঋ ম গ ঋ ঋ স (ঋ এবং ধ স্বরে সূক্ষ্ম আন্দোলন আবশ্যক)।
২. স ঋ স, ণ্ ধ্ স ণ্ প্, প্ ধ্ স ঋ, গ ঋ ম গ ঋ, পা ম গ ঋ ঋ স।
৩. ণ্ স ঋ স, ণ্ ধ্ স ধ্ ণ্ প্, ম্ প্ ধ্ ণ্ স ঋ, গ ঋ ম গ ঋ, গ ম প ম গ ঋ, গ ঋ ঋ স।
৪. ণ্ স ঋ স, ণ্ স ধ্ স, গ ম প ম গ ঋ, গ ম ধ্ প, ম প ম গ ঋ, গ ম প ম গ ঋ ঋ স।
৫. স গ ম প ধ্ প, ম প ম গ ঋ, গ ম প ম গ ঋ ঋ স, গ ম প ধ্ প।
৬. স ঋ স, স ঋ গ ঋ স, স ঋ গ ম ঋ ঋ স, স ঋ গ ম প গ ম ঋ ঋ স, স ঋ গ ম প ধ্ প ম গ ম ঋ ঋ স, স ঋ গ ম প ধ্ নি ধ্ প ম গ ম ঋ ঋ স, স ঋ গ ম প ধ্ নি র্স, র্স নি ধ্ প ম গ ঋ সা।
৭. ণ্ স ম গ ঋ স, ণ্ স গ ম প গ ম ঋ ঋ স, ণ্ স গ ম প গ ম ধ্ নি ধ্ প, ম প ম গ ঋ সা, ণ্ স গ ম প ধ্ নি র্স, নি ধ্ প ম গ ঋ সা।
৮. ণ্ স গ ম প গ ম ধ্ নি র্স, র্স র্ঋ র্স নি ধ্, র্স নি ধ্ নি ধ্ প, গ ম নি ধ্ প, ম গ ম গ ম ঋ, গ ম প ম গ ম ঋ সা, গ ম প ধ্ প।
৯. স ধ্ প ধ্ ম প ম গ ঋ, গ ম প ম গ ঋ সা, স ঋ স ণ্ ণ্ সা, গ ঋ গ প ঋ সা, গ ম প ধ্ প।
১০. ম প ধ্ নি র্স, র্স নি র্স ধ্ নি র্স, র্স র্ঋ র্স নি র্স ধ্ প, ম গ ম প ধ্ র্ঋ র্স নি ধ্ ধ্ প, ম গ ম ঋ, গ ম প ম গ ম ঋ সা, গ ম প ধ্ প।
১১. স ধ্ ধ্ নি ধ্ প, প ধ্ নি র্স র্ঋ র্স নি র্স ধ্ প, গ ম প ধ্ প ম গ ঋ, গ ম প ম গ ঋ সা।
১২. প প ধ্ নি র্স, র্স নি র্স ধ্ নি র্স র্ঋ র্স, নি র্স ধ্ প, র্মা র্গা র্মা র্ঋ র্সা, র্ঋ র্সা নি র্স ধ্ প, ম গ ম প ধ্ প, ম গ ঋ, গ ম প ম গ ঋ, গ ম প ম গ ঋ সা, ঋ গ ম প ধ্ প।
সম্পর্কিত রাগের তালিকা
- রাগ কালেংড়া: ভৈরব ঠাটের একই স্বরযুক্ত চপল ও শুভ্র রাগ; যাতে আন্দোলন বর্জিত।
- রাগ রামকেলী: ভৈরব ঠাটের অন্যতম বিখ্যাত প্রভাতী রাগ; যাতে তীব্র মধ্যম ও কোমল নিখাদের স্পর্শ থাকে।
- রাগ আহীর ভৈরব: ভৈরব ও আহীরী অঙ্গের মিশ্রণে তৈরি অত্যন্ত মধুর প্রাতঃকালীন রাগ।
- রাগ আনন্দ ভৈরব: ভৈরব অঙ্গের আরেকটি প্রফুল্ল রূপ।

কাজী নজরুল ইসলামের গানে ভৈরব:
নজরুলের অনেক গান রাগাশ্রয়ী। নির্দিষ্ট রাগের আশ্রয়ে যে গানগুলোতে সুর করা হয়েছে, সেগুলোর পুরো সুরে রাগের অবয়ব বজায় রাখার চেষ্টা থেকেছে; খুব বেশি রাগভ্রষ্ট হয়নি। তাই নজরুলের গানগুলো কান তৈরিতে বেশি উপযোগী বলে আমার কাছে মনে হয়।
১. জাগো অলখ নিরঞ্জন — শিল্পী: ধীরেন্দ্রচন্দ্র মিত্র / অনুপ জালোটা। (এটি নজরুলগীতিতে রাগ ভৈরবের শুদ্ধ রূপের শ্রেষ্ঠ উদাহরণ। এর সুরের প্রতিটি বাঁকে ভৈরবের ‘রে’ এবং ‘দা’ স্বরের আন্দোলন অত্যন্ত স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে। আধ্যাত্মিক আর্তি ও গাম্ভীর্য এই গানটির মূল প্রাণ)।
২. ভৈরব সাজে সাজো মহাদেব — শিল্পী: মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায় / পণ্ডিত অজয় চক্রবর্তী। (এই গানটিতে ভৈরব রাগের বীর রস এবং শিবের রুদ্র রূপটি অদ্ভুত মুন্সিয়ানার সাথে চিত্রিত হয়েছে। এটি শাস্ত্রীয় বিচারে অত্যন্ত সমৃদ্ধ একটি নজরুলগীতি)।
৩. প্রাতঃ আরতি বাজে জয় শঙ্কর — শিল্পী: বিবিধ শিল্পী। (সকালের উপাসনার গান হিসেবে এটি ভৈরব রাগের ওপর নিবদ্ধ। এর আরোহ-অবরোহ এবং ভৈরব অঙ্গের গায়নশৈলী শ্রোতার মনে এক পবিত্র অনুভূতি তৈরি করে)।
৪. শুক্ল-বসনা শুভ্র-বরণা — শিল্পী: সুপ্রীতি ঘোষ / বিবিধ শিল্পী। (দেবী সরস্বতীর এই বন্দনা গানটি ভৈরব রাগের শান্ত ও প্রসন্ন রূপটিকে ফুটিয়ে তোলে। এটি শিক্ষার্থীদের কান তৈরির জন্য একটি আদর্শ গান)।
কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের গানে ভৈরব:
রবীন্দ্রনাথ নিজে স্বীকার করেছেন যে, তিনি সুরের খাতিরে অনেক সময় রাগের ব্যাকরণকে পাশ কাটিয়ে গেছেন। তাঁর কাছে ‘ভাব’ ছিল মুখ্য, আর ‘রাগ’ ছিল সেই ভাব প্রকাশের একটি মাধ্যম মাত্র। তিনি রাগের শুদ্ধ রূপ বজায় রাখার চেয়ে সেই রাগের গাম্ভীর্য বা বিষণ্ণতাকে নিজের মতো করে ব্যবহার করতে বেশি পছন্দ করতেন। তাই অনেক ক্ষেত্রে তাঁর গানকে ‘ভৈরব-াশ্রয়ী’ বলা হলেও তা বিশুদ্ধ শাস্ত্রীয় ভৈরবের কাঠামোতে (যেমন—রে এবং দা-র বিশেষ আন্দোলন) সবসময় আবদ্ধ থাকে না।
১. বাজে বাজে রম্যবীণা — শিল্পী: সুচিত্রা মিত্র / কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়। এটি রবীন্দ্রসংগীতে রাগ ভৈরবের সবচেয়ে ধ্রুপদী উদাহরণগুলোর একটি। গানের চলন এবং স্বরবিন্যাস (বিশেষ করে কোমল রে ও কোমল দা-র ব্যবহার) ভৈরব রাগের শান্ত ও গম্ভীর রূপটিকে খুব স্পষ্টভাবে ফুটিয়ে তোলে। এটি একটি ধ্রুপদ অঙ্গের গান, তাই এতে রাগের কাঠামো অনেকটা অটুট।
২. আনন্দলোকে মঙ্গলালোকে — শিল্পী: বিবিধ শিল্পী। এই বিখ্যাত গানটি মূলত রাগ ভৈরব-এর ওপর ভিত্তি করে তৈরি। যদিও এটি একটি কোরাস বা সম্মেলক গান এবং এতে রাগের জটিল তান নেই, তবুও এর মূল সুরের কাঠামোটি ভৈরবের ‘শান্ত’ ও ‘মঙ্গলময়’ রসের এক অনন্য প্রকাশ।
৩. তব চরণে নিমেসে — শিল্পী: পণ্ডিত অজয় চক্রবর্তী / দেবব্রত বিশ্বাস। এটিও একটি ধ্রুপদ অঙ্গের গান যা ভৈরব রাগের ওপর আধারিত। এই গানে ভৈরবের গাম্ভীর্য এবং আধ্যাত্মিক আর্তি অত্যন্ত প্রবলভাবে ধরা পড়ে।
৪. নিশিভোরে এল কে রে — শিল্পী: সুপ্রতী ঘোষ / বিবিধ শিল্পী। ভোরের গান হিসেবে এতে ভৈরব রাগের স্পর্শ রয়েছে। তবে আপনার পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, এখানে রবীন্দ্রনাথ কিছুটা ‘প্রাতঃস্মরণীয়’ লোকজ সুরের সাথে ভৈরবের মিশ্রণ ঘটিয়েছেন, যা গানটিকে বিশুদ্ধ ভৈরব থেকে কিছুটা দূরে নিয়ে গেছে।
গজলে ভৈরব:
গজল গায়কিতে রাগ ভৈরব-এর ব্যবহার তুলনামূলকভাবে বিরল, কারণ গজলের চপলতা বা রোমান্টিক মেজাজের চেয়ে ভৈরবের গাম্ভীর্য ও ভক্তি রস অনেক বেশি ভারী। তবে বেশ কিছু কিংবদন্তি গজল গায়ক এই রাগের শুদ্ধ এবং মিশ্র রূপকে অত্যন্ত নিপুণভাবে গজলের ফ্রেমে বেঁধেছেন।
১. ইয়ে কউন সখি হ্যায় — শিল্পী: মেহেদী হাসান : এটি গজল গায়িকিতে রাগ ভৈরব-এর অন্যতম শ্রেষ্ঠ এবং বিশুদ্ধ উদাহরণ। শাহেনশাহ-এ-গজল মেহেদী হাসান এই গজলটিতে ভৈরবের কোমল ঋষভ এবং কোমল ধৈবত -এর আন্দোলন অত্যন্ত পরিমিত ও শাস্ত্রীয় শুদ্ধতায় ব্যবহার করেছেন। গজলের বিষণ্ণ মেজাজটি ভৈরব রাগের গম্ভীর প্রকৃতির সাথে মিলে এক আধ্যাত্মিক পরিবেশ তৈরি করে।
২. ক্যয়সে পুঁছো ক্যয়সে ক্যায়হুঁ — শিল্পী: গুলাম আলী: এটি মূলত ‘ভৈরব-মিশ্র’ বা অনেক ক্ষেত্রে ‘অহির ভৈরব’ অঙ্গের ছোঁয়া থাকলেও, এর মূল কাঠামো ভৈরবের গম্ভীর মেজাজকে ধারণ করে। গুলাম আলী সাহেব এই গজলে ভৈরবের ভোরের স্নিগ্ধতাকে কাজে লাগিয়েছেন। বিরহের আর্তি প্রকাশে ভৈরবের কোমল স্বরগুলো এখানে অত্যন্ত কার্যকর।
৩. বাত চলত নয়ি নয়ি — শিল্পী: বিভিন্ন গজল গায়ক (ঠুমরি-গজল অঙ্গ) এটি মূলত একটি প্রাচীন বন্দিশ বা ঠুমরি যা গজল গায়িকিতেও প্রচলিত। এটি রাগ ভৈরব-এর ওপর ভিত্তি করে তৈরি। এর চলনে ভৈরবের আদি রূপটি পাওয়া যায়। বেনারস ঘরানার শিল্পীরা যখন এটি গজল বা দাদরা অঙ্গে পরিবেশন করেন, তখন ভৈরবের মিড় ও স্বর-প্রক্ষেপণ একে এক অনন্য উচ্চতা দান করে।
ভজনে ভৈরব:
রাগ ভৈরব ভজন গায়কির জন্য সবচেয়ে আদর্শ রাগগুলোর একটি। এর শান্ত, সমাহিত এবং আধ্যাত্মিক প্রকৃতি ভোরের প্রার্থনায় এক অলৌকিক পরিবেশ তৈরি করে। ভজনে ভৈরব রাগটি সাধারণত খুব গম্ভীর এবং ভক্তি রসপ্রধান হয়।
১. জাগো মোহন প্যারে — শিল্পী: লতা মঙ্গেশকর / বিভিন্ন শাস্ত্রীয় শিল্পী : এটি ভজন অঙ্গের ভৈরব রাগের সবচেয়ে বিখ্যাত এবং বিশুদ্ধ উদাহরণ। যদিও এটি চলচ্চিত্রে ব্যবহৃত হয়েছে, কিন্তু এর গঠন একটি খাঁটি ভজনের। এতে ভৈরব রাগের কোমল ঋষভ ($ঋ$) এবং কোমল ধৈবত ($দ্$)-এর আন্দোলন এবং ‘মা গা ঋা সা’ সংগতি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে। সকালের জাগরণী গান হিসেবে এটি ভৈরবের ‘টেক্সটবুক’ রেফারেন্স।
২. ম্যায় তো তেরে পাস মেঁ — শিল্পী: পণ্ডিত কুমার গান্ধর্ব : কবীরের এই অমর পদটি কুমার গান্ধর্ব রাগ ভৈরব-এর এক অনন্য আঙ্গিকে গেয়েছেন। কুমার গান্ধর্ব ভৈরবের গাম্ভীর্যের সাথে নির্গুণ ভজনের যে আধ্যাত্মিকতা মিশিয়েছেন, তা অতুলনীয়। এতে ভৈরবের শুদ্ধ স্বরবিন্যাস এবং ভক্তি রস অত্যন্ত প্রবল।
৩. অখিয়াঁ হরি দর্শন কী পিয়াসী — শিল্পী: পণ্ডিত ওমকারনাথ ঠাকুর / অনুপ জালোটা : সুরদাসের এই পদটি মূলত রাগ ভৈরব-এর ওপর ভিত্তি করে তৈরি। পণ্ডিত ওমকারনাথ ঠাকুর যখন এটি গাইতেন, তখন ভৈরবের করুণ ও ভক্তি রস শ্রোতাকে আবিষ্ট করে রাখত। বিরহী ভক্তের আর্তিকে প্রকাশ করতে ভৈরবের কোমল স্বরগুলো এখানে জাদুর মতো কাজ করে।
৪. ঘর মেঁ পধারো গজাননজি — শিল্পী: পণ্ডিত রাজন ও সাজন মিশ্র (মিশ্র ভৈরব) : এটি অনেক সময় জৈনপুরীতে গাওয়া হলেও, বেনারস ঘরানার শিল্পীরা প্রায়ই একে ভৈরব বা মিশ্র ভৈরব অঙ্গে পরিবেশন করেন। গণেশ বন্দনা হিসেবে ভৈরবের মঙ্গলময় সুর এতে এক পবিত্র আবহ তৈরি করে।
ঠুমরিতে ভৈরব:
রাগ ভৈরব অত্যন্ত গম্ভীর এবং তাত্ত্বিক রাগের অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় সাধারণত বিশুদ্ধ ঠুমরিতে এর ব্যবহার কিছুটা সীমিত। ঠুমরির যে চপলতা বা ‘অদা’ (Expression), তা ভৈরবের ভারী মেজাজের সাথে কিছুটা সাংঘর্ষিক। তবে বেনারস ঘরানার শিল্পীগণ ভৈরবের শান্ত ও করুণ রসকে কাজে লাগিয়ে কিছু চমৎকার ‘বন্দিশি ঠুমরি’ বা ‘দাদরা’ সৃষ্টি করেছেন।
১. বাজে ঝুনঝুন প্যায়লিয়া — শিল্পী: বিদুষী গিরিজা দেবী : এটি ভৈরব রাগের ‘ঠুমরি-অঙ্গ’ গায়কির সবচেয়ে বড় এবং প্রামাণ্য উদাহরণ। বেনারস ঘরানার ‘আপ্পাজি’ (গিরিজা দেবী) এই ঠুমরিটিতে ভৈরবের গম্ভীর রেখাব ($ঋ$) এবং ধৈবত ($দ্$)-এর আন্দোলনের সাথে ঠুমরির সূক্ষ্ম খটকা-মুরকি মিশিয়েছেন। এটি মূলত একটি বন্দিশি ঠুমরি, যা দ্রুত তালের ছন্দে ভৈরবের এক অনন্য মাধুর্য প্রকাশ করে।
২. বাত চলত নয়ি নয়ি — শিল্পী: বিভিন্ন বেনারস ঘরানার শিল্পী : এটি একটি অত্যন্ত প্রাচীন বন্দিশ যা ঠুমরি ও দাদরা অঙ্গে রাগ ভৈরব-এ গাওয়া হয়। এই ঠুমরিটিতে ভৈরবের শুদ্ধ স্বরবিন্যাসের সাথে ‘শৃঙ্গার রস’ (রোমান্টিক মেজাজ) যোগ করা হয়েছে। লখনউ ও বেনারস উভয় ঘরানার শিল্পীরাই এটি পরিবেশন করেন।
৩. রস কে ভরে তোরে নৈন — শিল্পী: উস্তাদ বড় গুলাম আলী খাঁ (মিশ্র ভৈরব) : এটি মূলত একটি দাদরা বা ঠুমরি যা ‘মিশ্র ভৈরব’ অঙ্গে গাওয়া হয়। পটিয়ালা ঘরানার এই প্রবাদপ্রতিম শিল্পী ভৈরবের সাথে পিলু বা খাম্বাজ রাগের সামান্য ছোঁয়া দিয়ে একে ঠুমরির জন্য উপযোগী করে তুলেছেন। তাঁর ‘তৈয়ারি’ এবং মিড়ের কাজ এখানে ভৈরব রাগের গাম্ভীর্যকে এক ললিত রূপ দেয়।
খেয়ালে ভৈরব:
রাগ ভৈরব খেয়াল গায়কির একটি অত্যন্ত প্রাচীন এবং প্রামাণ্য রাগ। এর গম্ভীর প্রকৃতি এবং ভক্তি রসকে বিভিন্ন ঘরানার শিল্পীরা তাঁদের নিজস্ব ঢঙে পরিবেশন করেছেন। আপনার ‘কান তৈরি’র জন্য ভৈরব রাগের খেয়াল গায়কির সবচেয়ে প্রামাণ্য এবং বৈচিত্র্যময় তালিকা নিচে দেওয়া হলো:
১. পণ্ডিত ভীমসেন জোশী (কিরানা ঘরানা) : এটি ভৈরব রাগের সবচেয়ে শক্তিশালী এবং গম্ভীর রূপায়ণগুলোর একটি। কিরানা ঘরানার এই প্রবাদপ্রতিম শিল্পী ভৈরবের মন্দ্র সপ্তকের কাজ এবং তার স্বর-বিস্তারে এক অদ্ভুত স্থৈর্য দেখাতেন। তাঁর বিখ্যাত বন্দিশ ‘জাগো মোহন প্যারে’ বা ‘প্রভু মেরে অবগুণ চিত না ধরো’-তে ভৈরবের কোমল ঋষভ ($ঋ$) এবং কোমল ধৈবত ($দ্$)-এর আন্দোলন অত্যন্ত স্পষ্ট। তাঁর ভরাট গলায় ভৈরবের আধ্যাত্মিক আর্তি এক অন্য উচ্চতা পায়।
২. উস্তাদ আমীর খাঁ (ইন্দোর ঘরানা) : ইন্দোর ঘরানার স্রষ্টা আমীর খাঁ সাহেবের কণ্ঠে ভৈরব রাগের ‘বিলম্বিত’ খেয়াল এক ধ্যানের স্তরে নিয়ে যায়। তিনি অত্যন্ত মন্থর গতিতে রাগের বিস্তার করতেন। তাঁর বাজনায় ‘অতি-বিলম্বিত’ লয়ের চলন ভৈরবের শান্ত ও গম্ভীর রসকে পূর্ণতা দেয়। তিনি ভৈরবের বিশুদ্ধতা বজায় রেখে কোমল ঋষভের যে মিড় দেখাতেন, তা শাস্ত্রীয় সংগীতের এক অনন্য সম্পদ।
৩. পণ্ডিত ওমকারনাথ ঠাকুর (গোয়ালিয়র ঘরানা) : তাঁর কণ্ঠে ভৈরব রাগের ‘করুণ রস’ এবং ‘আর্তি’ সবচেয়ে তীব্রভাবে ধরা দেয়। গোয়ালিয়র ঘরানার এই শিল্পী তাঁর গায়কিতে নাটকীয়তা এবং আবেগের মিশেল ঘটাতেন। তাঁর গাওয়া ভৈরব শুনলে আপনার মনে হবে যেন কেউ ঈশ্বরের কাছে অত্যন্ত আকুলভাবে প্রার্থনা করছে। তাঁর ‘মীড়’ ও ‘গমক’-এর কাজ ভৈরবের আন্দোলনকে এক বিশেষ রূপ দেয়।
৪. বিদুষী কিশোরী আমোনকর (জয়পুর-আত্রৌলি ঘরানা) : জয়পুর ঘরানার বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী তাঁর ভৈরব ছিল জটিল এবং বক্র তানের কারুকাজে ঠাসা। কিশোরী তাই-এর গায়কিতে ভৈরবের প্রতিটি স্বর যেন কথা বলত। তিনি এই রাগের কোমল স্বরগুলোকে অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে ‘শ্রুতি’র (Microtones) কারুকাজে ফুটিয়ে তুলতেন। তাঁর কণ্ঠে ভৈরব রাগের একটি অত্যন্ত উজ্জ্বল ও ললিত রূপ পাওয়া যায়।
আপনি যদি ভৈরবের স্থৈর্য ও ভক্তি বুঝতে চান, তবে পণ্ডিত ভীমসেন জোশী-র গান শুনুন। আর যদি ভৈরবের সূক্ষ্ম কারুকাজ ও ব্যাকরণ বুঝতে চান, তবে বিদুষী কিশোরী আমোনকর আপনার জন্য আদর্শ।
যন্ত্রে ভৈরব:
সেতারে ভৈরব:
সেতারে রাগ ভৈরব বাজানো অত্যন্ত কঠিন এবং পাণ্ডিত্যের কাজ। সেতারের ধাতব স্বরে ভৈরবের সেই বিশেষ ‘আন্দোলন’ (ঋষভ ও ধৈবতের কম্পন) ফুটিয়ে তুলতে আঙ্গিকের ওপর অসাধারণ নিয়ন্ত্রণ প্রয়োজন। আপনার ‘কান তৈরি’র জন্য সেতারে ভৈরবের কিছু প্রামাণ্য রেফারেন্স নিচে দেওয়া হলো:
১. পণ্ডিত নিখিল বন্দ্যোপাধ্যায় (মাইহার ঘরানা) :সেতারে রাগ ভৈরবের সবচেয়ে গম্ভীর এবং আধ্যাত্মিক রূপটি তাঁর বাজনায় পাওয়া যায়। নিখিল বন্দ্যোপাধ্যায় ভৈরবের ‘আলাপ’ এবং ‘জোড়’ অংশে মন্দ্র সপ্তকের যে কাজ করতেন, তা শ্রোতাকে এক ধ্যানের স্তরে নিয়ে যায়। তিনি ভৈরবের কোমল ঋষভ ($ঋ$) এবং কোমল ধৈবত ($দ্$)-এর আন্দোলন সেতারের মিড়ের মাধ্যমে এত সূক্ষ্মভাবে করতেন যে তা কণ্ঠসংগীতের মতো শোনায়। তাঁর বাজানো ভৈরব এই রাগের একটি ‘টেক্সটবুক’ উদাহরণ।
২. উস্তাদ বিলায়েত খাঁ (ইমদাদখানী ঘরানা) : তাঁর সেতারে ভৈরবের ‘গায়ন-অঙ্গ’ (Vocal style) এবং সূক্ষ্ম কারুকাজ অতুলনীয়। বিলায়েত খাঁ সাহেব ভৈরবের গম্ভীর মেজাজের সাথে এক ধরণের রাজকীয় উজ্জ্বলতা যোগ করতেন। তাঁর দ্রুত গতির ‘তান’ এবং ‘ঝালা’-তে ভৈরবের শুদ্ধ স্বরবিন্যাস অত্যন্ত স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে। বিশেষ করে তিনি যখন কোমল নিষাদ ($ণি$) বিবাদী স্বর হিসেবে ব্যবহার করতেন, তখন রাগের সৌন্দর্য বহুগুণ বেড়ে যেত।
৩. পণ্ডিত রবিশঙ্কর (মাইহার ঘরানা) : তিনি ভৈরব রাগের একটি তেজোদীপ্ত ও ছন্দময় রূপ পরিবেশন করতেন। রবিশঙ্করজি ভৈরবের আদি গাম্ভীর্যের সাথে বিভিন্ন তালের (যেমন—ঝাপতাল বা রূপক) সংমিশ্রণ ঘটিয়ে এক অনন্য গতিশীলতা তৈরি করতেন। তাঁর সেতারে ভৈরবের ‘বীর রস’ এবং ‘ভক্তি রস’—উভয়ই সমান্তরালে চলত।
সরদে ভৈরব:
সরদে রাগ ভৈরব এক অনন্য গম্ভীর এবং রাজকীয় রূপ লাভ করে। সরদের গম্ভীর প্রতিধ্বনিময় শব্দ এবং এর ধাতব পাত (Fretless fingerboard) ভৈরবের সেই বিখ্যাত ‘আন্দোলন’ এবং ‘মীড়’ ফুটিয়ে তোলার জন্য অত্যন্ত উপযোগী। আপনার ‘কান তৈরি’র জন্য সরদে ভৈরবের নিচের দুটি প্রামাণ্য রেফারেন্স সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ:
১. ওস্তাদ আলী আকবর খাঁ (মাইহার ঘরানা) : সরদে রাগ ভৈরবের সবচেয়ে আধ্যাত্মিক ও মরমী রূপটি তাঁর বাজনায় পাওয়া যায়। আলী আকবর খাঁ সাহেব ভৈরব রাগের ‘আলাপ’ এবং ‘জোড়’ অংশে মন্দ্র সপ্তকের যে কাজ করতেন, তা শ্রোতাকে এক ধ্যানের স্তরে নিয়ে যায়। তিনি সরদে কোমল ঋষভ ($ঋ$) এবং কোমল ধৈবত ($দ্$)-এর আন্দোলন স্লাইড বা ‘ঘষিট’-এর মাধ্যমে এত সূক্ষ্মভাবে করতেন যে তা এক অপার্থিব পরিবেশ তৈরি করে। তাঁর বাজানো ভৈরব এই রাগের ‘ভক্তি রস’ ও ‘গাম্ভীর্য’ বোঝার জন্য শ্রেষ্ঠ মাধ্যম। তাঁর অগণিত কনসার্ট রেকর্ডিং এবং অ্যালবাম (যেমন: The Genius of Ali Akbar Khan সিরিজ) দেখুন।
২. পণ্ডিত বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত (শাহজাহানপুর ঘরানা) : তাঁর সরদে ভৈরব রাগের গাণিতিক শুদ্ধতা এবং রাগের কাঠামোগত স্পষ্টতা অতুলনীয়। শাহজাহানপুর ঘরানার এই দিকপাল শিল্পী ভৈরব রাগের আরোহ-অবরোহের ব্যাকরণ অত্যন্ত কঠোরভাবে মেনে চলতেন। বিশেষ করে তাঁর ‘তন্ত্ৰকারী’ এবং দ্রুত লয়ের ‘গৎ’-এ ভৈরবের উজ্জ্বল ও তেজোদীপ্ত রূপটি প্রকাশ পায়। তিনি যখন কোমল নিষাদ ($ণি$) বিবাদী স্বর হিসেবে ব্যবহার করতেন, তখন রাগের সৌন্দর্য বহুলাংশে বৃদ্ধি পেত। তাঁর বিভিন্ন শাস্ত্রীয় সংকলন এবং আকাশবাণীর (AIR) রেকর্ডিং দেখুন।
টিউটোরিয়াল:
আপনার এই টিউটোরিয়াল ভাবনাটি অত্যন্ত বিজ্ঞানসম্মত। রাগ সংগীত শেখার বা কান তৈরির প্রাথমিক ধাপে স্বর-মালিকা (Sargam Geet) এবং লক্ষণ গীত (Lakshan Geet) শোনার গুরুত্ব অপরিসীম। স্বর-মালিকা যেখানে রাগের স্বরবিন্যাস ও ছন্দ শেখায়, লক্ষণ গীত সেখানে গানের কথার মাধ্যমে রাগের ব্যাকরণ (বাদী, সমবাদী, সময়, জাতি) বুঝিয়ে দেয়।
স্বর-মালিকার জন্য ইউটিউবে “Raga Bhairav Sargam Geet” লিখে সার্চ করলে অনেক প্রামাণ্য ভিডিও পাবেন। বিশেষ করে ভাতখণ্ডে সংগীত বিদ্যাপীঠ বা গান্ধর্ব মহাবিদ্যালয় অনুমোদিত টিউটোরিয়ালগুলো সবচেয়ে নির্ভুল।
আকাশবাণী (AIR) লেসন: আকাশবাণীর ‘সংগীত শিখুন’ (Sangeet Shikshak) প্রোগ্রামে বড় বড় পণ্ডিতরা রাগ ভৈরব শিখিয়েছেন। এগুলো ‘কান তৈরি’র জন্য অমূল্য সম্পদ।
রিলেটেড রাগ:
রাগ ভৈরব একটি বিশাল বৃক্ষের মতো, যার শাখা-প্রশাখা হিসেবে অনেকগুলো ‘ভৈরব অঙ্গ’-এর রাগ সৃষ্টি হয়েছে। ভৈরবকে ভিত্তি করে তৈরি এই রিলেটেড রাগগুলো আপনার ‘কান তৈরি’র জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এগুলোর সূক্ষ্ম পার্থক্য ধরতে পারলেই রাগের আসল রূপ চেনা যায়।
১. আহীর-ভৈরব (Ahir Bhairav)
২. নট-ভৈরব (Nat Bhairav)
৩. আনন্দ-ভৈরব (Anand Bhairav)
৪. বৈরাগী (Bairagi / Bairagi Bhairav)
৫. রামকেলী (Ramkali)
আরও দেখুন:
