ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের প্রাচীন গ্রন্থগুলোতে উল্লেখিত বহু রাগের মধ্যে ‘মালব গৌরী’ একটি অতি প্রাচীন এবং বর্তমানে প্রায় বিলুপ্ত বা অত্যন্ত অপ্রচলিত একটি জোড় রাগ (Compound Raga)। আপনি ঠিকই উল্লেখ করেছেন, নাম থেকেই বোঝা যায় এটি ‘মালব’ এবং ‘গৌরী’—এই দুটি প্রাচীন রাগের সংমিশ্রণে তৈরি। হিন্দুস্তানি শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে বর্তমানে এর চর্চা প্রায় নেই বললেই চলে, তবে প্রাচীন সঙ্গীতশাস্ত্রে এর তাত্ত্বিক ও ঐতিহাসিক গুরুত্ব অপরিসীম। যেহেতু এটি একটি প্রায়-অপ্রচলিত রাগ, তাই এর সম্পর্কে প্রামাণ্য তথ্যের ভিত্তিতেই এই নোটটি সাজানো হলো।
রাগের পরিচয়, বিশেষত্ব ও ইতিহাস মালব গৌরী রাগের তাত্ত্বিক কাঠামো প্রাচীন সঙ্গীতগ্রন্থগুলোতে (যেমন: সঙ্গীত রত্নাকর বা পরবর্তীকালের গ্রন্থ) পাওয়া যায়। মালব রাগের প্রাচীন রূপের সাথে গৌরী রাগের গম্ভীর চলন মিশিয়ে এটি গাওয়া হতো। নিচে এর তাত্ত্বিক পরিচয় তুলে ধরা হলো:
- ঠাট: ভৈরব বা পূরবী (প্রাচীন রাগ হওয়ায় এবং বিভিন্ন যুগে রাগের রূপ পরিবর্তিত হওয়ায় পণ্ডিতদের মধ্যে এর ঠাট নিয়ে মতভেদ রয়েছে। তবে গৌরী অঙ্গ থাকায় এতে ভৈরব বা পূরবী ঠাটের প্রভাব দেখা যায়)।
- জাতি: ঔড়ব-সম্পূর্ণ বা ষাড়ব-সম্পূর্ণ (প্রাচীন গ্রন্থ অনুযায়ী)।
- আরোহ ও অবরোহ: যেহেতু বর্তমানে রাগটির চলন প্রায় বিলুপ্ত, তাই আধুনিক ঘরানাগুলোতে এর সুনির্দিষ্ট ও সর্বজনীন কোনো আরোহ-অবরোহ প্রচলিত নেই। তবে তাত্ত্বিকভাবে আরোহণে মালব অঙ্গ এবং অবরোহণে গৌরী অঙ্গের (বিশেষ করে মা রে গা রে সা) প্রয়োগ থাকার কথা প্রাচীন গ্রন্থে উল্লেখ আছে।
- বাদী ও সমবাদী স্বর: গৌরী অঙ্গের প্রাধান্য থাকলে ঋষভ (রে) এবং পঞ্চম (পা)।
- বর্জিত স্বর: প্রাচীন রীতি অনুযায়ী আরোহণে নির্দিষ্ট স্বর (সাধারণত গান্ধার বা নিষাদ) বর্জিত থাকতে পারে।
- ব্যবহৃত স্বর: ঋষভ (রে) কোমল এবং মধ্যম (মা) তীব্র ব্যবহৃত হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি, যেহেতু এটি গৌরী অঙ্গের রাগ।
- সময়: দিনের চতুর্থ প্রহর বা গোধূলি লগ্ন (সন্ধ্যাকাল)।
- প্রকৃতি: অত্যন্ত ধীর, প্রাচীন মেজাজ সম্পন্ন এবং গম্ভীর।
সংশ্লিষ্ট বা রিলেটেড রাগসমূহ
- রাগ গৌরী: মূল গৌরী রাগের সাথে এর নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে, তবে মালব গৌরীতে ‘মালব’ রাগের প্রাচীন চলনের একটি মিশ্রণ ঘটানো হতো, যা একে বিশুদ্ধ গৌরী থেকে আলাদা করত।
- রাগ মালব / মালবী: প্রাচীন মালব রাগের স্বাধীন অস্তিত্ব বর্তমানে খুব একটা দেখা যায় না (যদিও মালব কৌশিক বা মালকৌষে এর নামের একটি অংশ টিকে আছে)।
যেহেতু মালব গৌরী একটি অতি প্রাচীন রাগ এবং আধুনিক কনসার্ট বা মেহেফিলে এর পরিবেশনা নেই বললেই চলে, তাই আধুনিক শ্রোতাদের কান এই রাগের সাথে পরিচিত নয়। এটি মূলত শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের ইতিহাস ও গবেষণার একটি বিষয় হিসেবেই বেশি সমাদৃত।
কাজী নজরুল ইসলামের গানে রাগ মালব গৌরী: এটি একটি অত্যন্ত প্রাচীন ও বিলুপ্তপ্রায় রাগ হওয়ায় নজরুলের গানে এর কোনো প্রয়োগ নেই।
কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের গানে রাগ মালব গৌরী: রবীন্দ্রনাথের গানে এই রাগের কোনো প্রয়োগ পাওয়া যায় না।
আধুনিক গানে রাগ মালব গৌরী: আধুনিক সঙ্গীতে এই রাগের ব্যবহার নেই।
গজলে রাগ মালব গৌরী:(প্রয়োগ নেই)
ভজনে রাগ মালব গৌরী:(প্রয়োগ নেই)
ঠুমরিতে রাগ মালব গৌরী:(প্রয়োগ নেই)
যন্ত্রে রাগ মালব গৌরী:সেতার ও সরদ: বর্তমানে যন্ত্রসঙ্গীতের কোনো বাণিজ্যিক বা পাবলিক রেকর্ডিংয়ে মালব গৌরী রাগের সুনির্দিষ্ট আলাপ বা গৎ পাওয়া অত্যন্ত দুষ্কর। (যদি কোনো আর্কাইভাল রেকর্ডিং পাওয়া যায়, তবে তা পরবর্তীতে যুক্ত করা হবে)।
খেয়াল: ১. যেহেতু এটি প্রাচীন রাগ, তাই আধুনিক যুগের প্রখ্যাত খেয়ালিয়াদের (যেমন: আমীর খান, ভীমসেন জোশী বা কুমার গান্ধর্ব) সাধারণ পরিবেশনায় এই রাগটি শোনা যায় না। প্রাচীন ধ্রুপদ বা খেয়ালের আর্কাইভে এর কোনো দুর্লভ রেকর্ডিং থাকতে পারে। (তথ্য অনুসন্ধান চলছে)।
টিউটোরিয়াল: সাধারণত ইউটিউব বা অন্যান্য পাবলিক প্ল্যাটফর্মে মালব গৌরী রাগের সরাসরি কোনো টিউটোরিয়াল বা স্বরমল্লিকা সহজলভ্য নয়। রাগটি সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে প্রাচীন সঙ্গীতশাস্ত্রের বইগুলোই মূল ভরসা। ১. AUTRIM প্রজেক্ট আর্টিকেল বা শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের প্রাচীন আর্কাইভ।
তথ্যসূত্র: ১. পণ্ডিত বিষ্ণুনারায়ণ ভাতখণ্ডে — ‘হিন্দুস্তানি সংগীত পদ্ধতি’: প্রাচীন ও মিশ্র রাগের ঐতিহাসিক পটভূমি জানার জন্য। ২. বিমলকান্ত রায় চৌধুরী — ‘ভারতীয় সংগীতকোষ’: রাগের ঐতিহাসিক বিবর্তন ও প্রাচীন রাগের নামগুলোর জন্য। ৩. শাঙ্গদেব প্রণীত — ‘সঙ্গীত রত্নাকর’: প্রাচীন রাগাঙ্গের বর্ণনার জন্য। ৪. সঙ্গীত রিসার্চ একাডেমী (SRA): রাগের ঐতিহাসিক আর্কাইভিং তথ্যের জন্য।
শ্রোতা সহায়িকা নোট সিরিজে আজকের রাগ – রাগ মালব গৌরী। এটি একটি অতি প্রাচীন রাগ হওয়ায় এর শ্রুতি-উদাহরণ অত্যন্ত সীমিত। এই আর্টিকেলটির উন্নয়ন কাজ চলমান রয়েছে। আপডেট পেতে আবারো আসার আমন্ত্রণ রইলো।
আরও দেখুন:


