ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের প্রভাতকালীন ভূখণ্ডে পা রাখলে এমন কিছু কালজয়ী ও মহিমান্বিত রাগের সাক্ষাৎ মেলে, যা ভোরের নিস্তব্ধতায় কেবল কান জুড়ায় না, বরং মানবমনকে এক পরম আধ্যাত্মিক ব্যাকুলতা, গম্ভীর করুণ রস এবং ঈশ্বরমুখী আকুলতায় ভরিয়ে তোলে। তেমনই এক সুপ্রাচীন, রাজকীয় ও পরম শ্রদ্ধেয় রূপ হলো ‘রাগ মিঞাঁ কি তোড়ী’ (বা সংক্ষেপে রাগ তোড়ী / টোড়ি)। তোড়ী ঠাটের মূল ভিত্তি বা জনক রাগ হলো এটি। হিন্দুস্তানি সঙ্গীতের ঐতিহ্যে সংগীতসম্রাট মিঞাঁ তানসেনের হাতে এই রাগের ব্যাকরণসিদ্ধ ও গম্ভীর সংস্কার ঘটেছিল বলে তাঁর নামানুসারেই একে ‘মিঞাঁ কি তোড়ী’ বলা হয়। ভোরের স্নিগ্ধ আলো যখন ফুটতে শুরু করে, তখন তোড়ীর মরমী সুরতরঙ্গ চারপাশের বাতাসকে এক অপার্থিব শান্তিময় আবেশে সিক্ত করে।
সঙ্গীত শাস্ত্রে বিভিন্ন প্রথা, লিপ্যন্তর ও ঘরানায় এটি ‘মিঞাঁ কি তোড়ী’, ‘তোড়ী’, ‘টোড়ি’ কিংবা ‘শুদ্ধ তোড়ী’ নামে বহুল সমাদৃত।

ইতিহাস, চিত্রকল্প ও সাঙ্গীতিক আভিজাত্য
তোড়ী রাগের ইতিহাস হাজার বছরের প্রাচীন। প্রাচীন সঙ্গীতগ্রন্থ ‘সঙ্গীত দর্পণ’-এ তোড়ী রাগের সুবাসকে জাফরান ও কর্পূরের স্নিগ্ধ গন্ধের সাথে তুলনা করা হয়েছে। এছাড়া মধ্যযুগীয় রাগমালা চিত্রকলার (Ragamala Paintings) চিত্রকল্পে রাগিণী তোড়ীকে বর্ণনা করা হয়েছে বনের গভীরে এক শান্ত পদ্মপুকুরের পাড়ে দাঁড়ানো এক রাজকীয় রমণী হিসেবে—যিনি হাতে বীণা নিয়ে সুর তুলছেন, আর তাঁর সুরের মায়ায় মুগ্ধ হয়ে চারপাশে ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে বুনো হরিণের দল।
মোগল সম্রাট আকবরের রাজসভার প্রখ্যাত সঙ্গীতরত্ন মিঞাঁ তানসেন প্রাচীন তোড়ীর রূপকে অলঙ্কৃত করে এতে বিশেষ গম্ভীর গমক, মন্দ্র বিস্তার এবং অতি-কোমল স্বরের সূক্ষ্ম কাজ যুক্ত করেন। ফলে এই রাগে যুক্ত হয় তানসেনের সেই বিখ্যাত আভিজাত্য।
রাগের শাস্ত্রীয় কাঠামো
- ঠাটের নাম: তোড়ী ঠাট (এটি স্বনামধন্য জনক রাগ)।
- জাতি: সম্পূর্ণ-সম্পূর্ণ (আরোহণ ও অবরোহণ—উভয় ক্ষেত্রেই সাতটি স্বর ব্যবহৃত হয়)।
- বাদী স্বর: ধ (কোমল ধৈবত)।
- সমবাদী স্বর: গ (কোমল গান্ধার)।
- বর্জিত স্বর: কোনো স্বর বর্জিত নয় (তবে আরোহণে পঞ্চমের প্রয়োগ কিছুটা বক্র বা সূক্ষ্ম)।
- ব্যবহৃত স্বর: অতি-কোমল ঋষভ (র), অতি-কোমল গান্ধার (গ), তীব্র মধ্যম (হ্ম), পঞ্চম (প), অতি-কোমল ধৈবত (দ), শুদ্ধ নিখাদ (ন) এবং ষড়্জ (স)।
- সময়: দিনের প্রথম প্রহর (সকাল ৬টা থেকে ৯টার মধ্যবর্তী সময়)।
- প্রকৃতি: অত্যন্ত গম্ভীর, করুণ, মরমী, ব্যাকুল ও আধ্যাত্মিক ধ্যায়নমগ্ন।
দ্ ন্ স র গ, র স, হ্ম গ র গ, র স | হ্ম প ধ নি র্স, নি ধ পগায়কি ও কারিগরি বৈশিষ্ট্য
তোড়ী রাগের প্রধান সৌন্দর্য ও কারিগরি বৈচিত্র্য লুকিয়ে রয়েছে এর চারটি বিকৃত স্বরের (কোমল ঋষভ, কোমল গান্ধার, তীব্র মধ্যম ও কোমল ধৈবত) অতি সূক্ষ্ম আন্দোলন ও প্রক্ষেপণের ওপর।
১. অতি-কোমল স্বরের মিড়: তোড়ীর কোমল ঋষভ (র), কোমল গান্ধার (গ) এবং কোমল ধৈবত (দ) সাধারণ কোমল স্বরের চেয়ে খানিকটা নিচের শ্রুতিতে (অতি-কোমল) হেলিয়ে লাগানো হয়। র গ র স চরণে অতি-কোমল ঋষভ ও গান্ধারের মন্থর আন্দোলন রাগে এক করুণ আকুলতা এনে দেয়।
২. পঞ্চমের বক্র প্রয়োগ: আরোহণে মধ্যম থেকে পঞ্চমে যাওয়ার সময় হ্ম প বা হ্ম ধ বক্রভাবে স্পর্শ করা হয়। অনেকে মনে করেন, আরোহণে পঞ্চমের স্পষ্ট ব্যবহার থাকলে তা ‘মিঞাঁ কি তোড়ী’ এবং পঞ্চমের সম্পূর্ণ অনুপস্থিতি ঘটলে তা ‘গুর্জরী তোড়ী’-র রূপ নেয়।
৩. ধৈবত ও গান্ধারের সংগতি: বাদী স্বর কোমল ধৈবত এবং সমবাদী কোমল গান্ধার হওয়ায় মধ্য ও তারা সপ্তকে ধ নি র্স এবং হ্ম গ র স বাক্যাংশের মাধুর্য সবচেয়ে বেশি প্রস্ফুটিত হয়।
ধ্রুপদ, ধামার এবং ঐতিহ্যবাহী খেয়াল বন্দিশে তোড়ী রাগের আসল মেজাজ ফুটে ওঠে। সেতার, সরোদ, সুরবাহার ও রুদ্রবীণায় ভোরের স্নিগ্ধ প্রহরে তোড়ীর আলাপ পরিবেশন আসরে এক পরম স্তব্ধতা তৈরি করে। ওপরের সংযুক্ত ভিডিওগুলোতে প্রখ্যাত শিল্পীদের তান ও আলাপে এই রাগের সেই গম্ভীর রূপটি স্পষ্ট উপলব্ধি করা যায়।

বাংলা গান ও আধুনিক সঙ্গীতে তোড়ীর স্পর্শ
- কাজী নজরুলের গানে তোড়ী: জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের রাগাশ্রয়ী গানগুলো রাগের বিশুদ্ধ অবয়ব ধরে রাখার জন্য অনন্য। তোড়ী অঙ্গের ছায়ায় রচিত তাঁর বিখ্যাত গানগুলোর মধ্যে রয়েছে—
- নয়ন মুদিল কুমুদিনী হায় (শুদ্ধ তোড়ী)
- সেদিন অভাব ঘুচবে কি মোর (খট্ তোড়ী)
- সে ধীরে ধীরে আসি (দেশি তোড়ী)
- উদার অম্বরে দরবারে তোড়ী প্রশান্ত প্রভাত (দরবারী তোড়ী)
- রবীন্দ্রসঙ্গীতে তোড়ীর প্রভাব: কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রাগের প্রথাগত ব্যাকরণে আটকে না থেকে তোড়ীর করুণ ভাবটিকে নিজের মতো করে গানে বুনেছেন—
- আর কি আমি ছাড়ব তোরে
- ভবকোলাহল ছাড়িয়ে
- সখীরে পীরিত বুঝাবে কে
- আধুনিক গানে তোড়ীর জাদু: পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কথায়, রতু মুখোপাধ্যায়ের সুরে মান্না দে-র গাওয়া বিখ্যাত কালজয়ী গান—“রাত জাগা দুটি চোখ”-এ তোড়ীর করুণ ও সজল আকুলতা অনবদ্যভাবে ফুটে উঠেছে।
বাদ্যযন্ত্রে তোড়ীর রূপায়ণ (ওস্তাদ ও পণ্ডিতদের চিরন্তন পরিবেশনা)
- সেতারে তোড়ী:
- পণ্ডিত নিখিল বন্দ্যোপাধ্যায় (মাইহার ঘরানা): তাঁর সেতারে “রাগ মিঞাঁ কি তোড়ী – আলাপ, জোড় ও ঝালা” এই রাগের আধ্যাত্মিক রূপের অন্যতম শ্রেষ্ঠ দলিল।
- পণ্ডিত রবিশঙ্কর (মাইহার ঘরানা): তাঁর সেতারে মাইহার অঙ্গের বিশেষ তান ও গৎ রূপায়ণ।
- ওস্তাদ বিলায়েত খাঁ (ইমদাদখানী ঘরানা): গায়ন-অঙ্গে তোড়ীর ব্যাকুলতা প্রকাশের এক অপ্রতিদ্বন্দ্বী উদাহরণ।
- ওস্তাদ শহীদ পারভেজ খাঁ (ইমদাদখানী ঘরানা): তাঁর বাম হাতের অনবদ্য মীড় ও গতির কারুকাজ।
- সরদে তোড়ী:
- ওস্তাদ আলী আকবর খাঁ (মাইহার ঘরানা): তাঁর সরদে তোড়ীর ধ্যায়নমগ্ন আলাপের গম্ভীর গাম্ভীর্য।
- ওস্তাদ আমজাদ আলী খাঁ (সেনিয়া বঙ্গশ ঘরানা): তোড়ীর দ্রুত গৎ ও তানের চপল মেলবন্ধন।
- ওস্তাদ হাফিজ আলী খাঁ (গোয়ালিয়র/বঙ্গশ ঘরানা): প্রাচীন ধ্রুপদী অঙ্গের বাজনা বোঝার জন্য অপরিহার্য রেকর্ড।
- পণ্ডিত বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত (শাহজাহানপুর ঘরানা): শাহজাহানপুর ঘরানার ছকবদ্ধ আলাপ ও তানাক্রি।

তোড়ী পরিবারের অন্যান্য রূপ ও সম্পর্কিত রাগ
- প্রধান ও প্রখ্যাত রূপসমূহ: গুর্জরী তোড়ী, বিলাসখানী তোড়ী, ভূপাল তোড়ী, আসাবরী তোড়ী, বাহাদুরী তোড়ী, আহিরী তোড়ী, লাচারী তোড়ী, সহেলী তোড়ী, খট্ তোড়ী, জৌনপুরী তোড়ী, লক্ষ্মী তোড়ী, মঙ্গল তোড়ী, হুসাইনী তোড়ী, সুহা তোড়ী, বৈরাগী তোড়ী, নিরঞ্জনী তোড়ী।
- কেবল নামেই তোড়ী (ভিন্ন অঙ্গের রাগ): দেশি তোড়ী, অঞ্জনী তোড়ী, গোবর্ধনী তোড়ী, আভেরী তোড়ী (আসাবরী ও খামাজ অঙ্গের সংমিশ্রণ)।
- শাস্ত্রীয় গ্রন্থে উল্লিখিত অপ্রচলিত রূপ (পণ্ডিত ভাতখণ্ডে সংকলিত): মার্গ তোড়ী, মুদ্রিকী তোড়ী, জিল্ফ তোড়ী, কাফী তোড়ী।
রাগ মিঞাঁ কি তোড়ী হলো ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের ভোরের প্রহরে আঁকা এক চিরন্তন সুরছবি। কোনো প্রকার চপলতা বা চটুল অলঙ্কার ছাড়াই কেবল চারটি বিকৃত স্বরের অতি সূক্ষ্ম ও গম্ভীর আন্দোলনে এটি শ্রোতার মনে যে অপার্থিব শূন্যতা ও আধ্যাত্মিক জাগরণ তৈরি করে, তা এক কথায় অনন্য। ভোরের স্নিগ্ধ বাতাসে যখন এই রাগের ‘হ্ম গ র গ, র স’-র গভীর মিড় ছড়িয়ে পড়ে, তখন তা মুহূর্তের মধ্যে মনকে নিয়ে যায় এক পরম প্রশান্তময় সুরলোকে।
সোর্স ও প্রামাণ্য রেফারেন্স
t
আরও দেখুন:
