রাগ বসন্ত । অসুরের সুরলোকযাত্রা সিরিজ

রাগ বসন্ত উত্তর ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের অত্যন্ত প্রাচীন ও গম্ভীর প্রকৃতির একটি রাগ। অষ্টম শতক থেকেই এই রাগের নিয়মিত চর্চার ঐতিহাসিক প্রমাণ পাওয়া যায়। হিন্দুস্তানি সংগীতের পাশাপাশি শিখ ঐতিহ্যেও এই রাগের গভীর স্থান রয়েছে। শিখদের পবিত্র ধর্মগ্রন্থ শ্রী গুরু গ্রন্থ সাহেব-এর ৩১টি প্রধান রাগের মধ্যে রাগ বসন্ত ২৫তম। শিখ ‘রাগমালা’র বর্ণনা অনুযায়ী, বসন্তকে রাগ হিন্দোলের “পুত্র রাগ” হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

 

রাগ বসন্ত

রাগ বসন্ত

 

প্রাচীনকালে এই রাগকে পুংলিঙ্গ বিচারে রাগ এবং স্ত্রীলিঙ্গ বিচারে কেউ কেউ ‘বাসনী’ বা ‘বসন্তী’ নামে অভিহিত করেছেন। প্রাচীন পণ্ডিতদের মতে, আদি বসন্ত রাগটি ছিল সম্পূর্ণ শুদ্ধ স্বরের, যা বিলাবল ঠাটের অন্তর্গত। বর্তমানে সেই রূপটিকে বলা হয় ‘শুদ্ধ বসন্ত’। তবে আধুনিক হিন্দুস্তানি সংগীতে পণ্ডিত ভাতখণ্ডের ঠাট বিভাজন অনুযায়ী প্রচলিত বসন্ত রাগকে পূরবী ঠাটের অন্তর্গত ধরা হয়।

Raga Vastnt | রাগ বসন্ত
Raga Vastnt | রাগ বসন্ত

স্বর ও চলনের বৈশিষ্ট্য:

বর্তমানে প্রচলিত রাগ বসন্তের চলনে ঋষভ কোমল ($r$), মধ্যম তীব্র ($M’$) এবং ধৈবত কোমল ($d$) ব্যবহার করা হয়। আরোহণে ঋষভ ও পঞ্চম বর্জিত হওয়ায় এটি পাঁচ স্বরের এবং অবরোহণে সাত স্বরই ব্যবহৃত হওয়ায় এর জাতি ঔড়ব-সম্পূর্ণ। এই রাগের চলন মধ্য ও তার সপ্তকেই বেশি বিস্তৃত হয়। আরোহণে ঋষভ কম ব্যবহৃত হলেও অবরোহণে তার সপ্তকের ষড়্‌জ থেকে নামার সময় এতে রাগ ‘শ্রী’-র চলন ও প্রভাব স্পষ্ট লক্ষ্য করা যায়। তবে শ্রী রাগের মতো এতে ঋষভের দীর্ঘ প্রয়োগ হয় না। পণ্ডিত ভাতখণ্ডে এই রাগে উভয় মধ্যম (শুদ্ধ ও তীব্র) ব্যবহারের চলন দেখিয়েছেন। রসের বিচারে এটি শৃঙ্গার ও বীর রসের রাগ।

পরিবেশনের সময়:

ঋতুভিত্তিক রাগ হওয়ায় বসন্তকালে (ফাল্গুন ও চৈত্র মাস) এই রাগ দিনের যেকোনো সময় পরিবেশন করা যায়। তবে অন্য ঋতুতে এই রাগ পরিবেশনের সময় হচ্ছে রাত্রির শেষ প্রহর বা ঊষাকালীন সন্ধিপ্রকাশ সময় (ভোর ৩টা থেকে সকাল ৬টা)

আরোহণ: স গ, হ্ম দ র্ঋ র্স
অবরোহণ: র্ঋ ন দ প, হ্ম গ, হ্ম দ হ্ম গ ঋ স

এক নজরে রাগ বসন্তের শাস্ত্রীয় পরিচয়:

  • ঠাট: পূরবী
  • জাতি: ঔড়ব-সম্পূর্ণ (আরোহণে ৫ স্বর, অবরোহণে ৭ স্বর)
  • বাদী স্বর: তার সপ্তকের ষড়্‌জ ($\dot{S}$)
  • সমবাদী স্বর: পঞ্চম ($P$) বা তীব্র মধ্যম ($M’$)
  • বর্জিত স্বর: আরোহণে ঋষভ ($r$) ও পঞ্চম ($P$)
  • সময়: বসন্ত ঋতুতে যেকোনো সময়; অন্য ঋতুতে রাত্রির শেষ প্রহর (ভোর)।
  • আরোহণ (ঔড়ব জাতি): স গ, ম্ট দ্ র্র্ র্স
  • অবরোহণ (সম্পূর্ণ জাতি): র্র্ ন দ্ প, ম্ট গ, ম্ট দ্ ম্ট গ র্র্ স
  • পকড় (মুখ্য চলন): ম্ট দ্ র্র্ র্স, ন র্স র্র্ ন দ্ প, গ ম্ট দ্ ন ম্ট গ
  • চলন: ণ# স ম ম প ণ ধ প ম প জ্ঞ ম জ্ঞ র স

 

আরোহ-আবরোহ নিচের ভিডিও থেকে শুনে নিতে পারেন ।

 

SufiFaruq.com Logo 252x68 1 রাগ বসন্ত । অসুরের সুরলোকযাত্রা সিরিজ

 

কাজী নজরুল ইসলামের গানে রাগ বসন্ত:

নজরুলের অনেক গান রাগাশ্রয়ী। নির্দিষ্ট রাগের আশ্রয়ে যে গানগুলোতে সুর করা হয়েছে, সেগুলোর পুরো সুরে রাগের অবয়ব বজায় রাখার চেষ্টা থেকেছে; খুব বেশি রাগভ্রষ্ট হয়নি। তাই নজরুলের গানগুলো কান তৈরিতে বেশি উপযোগী বলে আমার কাছে মনে হয়।

১. এলো ওই বনান্তে পাগল বসন্ত (খাঁটি রাগ বসন্ত)

২. বসন্ত মুখর আজি (রাগ বসন্ত-বাহার মিশ্র)

কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের গানে বসন্ত:

কবিগুরু তার অনেক কম্পোজিশনে প্রচলিত রাগের আশ্রয় নিলেও অনেক সময় রাগের কাঠামোতে তিনি আটকে থাকতে চাননি। তাঁর সুরের পথ রাগের বাইরে চলে গেছে প্রায়শই। বিশুদ্ধ রাগাশ্রয়ী গান হিসেবে তাঁর গান অনেক ক্ষেত্রেই খুব ভালো উদাহরণ নয়

১. ওরে ভাই, ফাগুন লেগেছে বনে বনে (রাগ: বসন্ত-বাহার)

২. এসো এসো বসন্ত ধরাতলে (রাগ: বসন্ত-পঞ্চম-ভৈরব-কীর্তন মিশ্র)

আধুনিক গানে বসন্ত:

বাংলা আধুনিক গানে বিশুদ্ধ রাগ বসন্তের প্রয়োগ খুব কম। তবে উচ্চাঙ্গ সংগীতের ছায়াঘেরা আধুনিক গানে এর সুরের চলন পাওয়া যায়:

১. মধু বসন্ত আজি এলো ফিরিয়া (শিল্পী: দীপালী নাগ)

ভজনে বসন্ত:

শাস্ত্রীয় সংগীতে ভজন বা ভক্তিগীতি গাওয়ার সময় প্রায়ই প্রাতঃকালীন রাগ বসন্তের শান্ত ও গম্ভীর রূপটি ফুটিয়ে তোলা হয়। বিশেষ করে কৃষ্ণলীলা বা হোলির ভজনে এর চমৎকার ব্যবহার রয়েছে:

১. ফাগোয়া ব্রজ খেলন আয়ে কানহাইয়া (ঐতিহ্যবাহী কৃষ্ণ ভজন)

২. আব তো জাগো মোহন প্যারে (প্রাতঃকালীন ভক্তিগীতি)

ঠুমরিতে বসন্ত (হোরি/দাদরা অঙ্গ):

উপ-শাস্ত্রীয় সংগীতে (Semi-classical) ঠুমরি এবং হোরিতে রাগ বসন্তের সাথে অন্য রাগের মিশ্রণ ঘটিয়ে গাওয়া হয়। বেনারস বা লখনউ ঘরানার শাস্ত্রীয় হোরি-ঠুমরিতে এর অসামান্য ব্যবহার রয়েছে:

১. সখিয়াঁ খেলো হরি আজ বসন্ত (মিশ্র বসন্ত অঙ্গের ঐতিহ্যবাহী হোরি-ঠুমরি)

২. আই রুত বসন্ত কি (হোরি অঙ্গের ঠুমরি)

গজলে বসন্ত:

গজলে সাধারণত চপল বা রোমান্টিক রাগ (যেমন খাম্বাজ, কাফি, পিলু বা ভৈরবী) বেশি ব্যবহৃত হয়। বসন্ত রাগের তীব্র মধ্যম ও কোমল ঋষভের গাম্ভীর্য গজল গায়কীতে সরাসরি খুব একটা মানায় না। তাই একক রাগ বসন্তের গজল পাওয়া দুষ্কর। তবে বসন্ত-বাহার বা মিশ্র বসন্ত অঙ্গের সেমি-ক্লাসিক্যাল গজল শোনা যায়:

১. আয়ে বসন্ত বাহার (উস্তাদ গোলাম আলী বা মেহেদী হাসানের ঘরানার শাস্ত্রীয় ঠুমরি-গজল অঙ্গ)

যন্ত্রে বসন্ত (Instrumental Basant):

সেতার: ১. ইমদাদখানী (ইটাওয়া) ঘরানার ওস্তাদ শহীদ পারভেজ খানের সেতারে — রাগ বসন্ত। ২. সেনিয়া মাইহার ঘরানার পণ্ডিত নিখিল ব্যানার্জীর সেতারে — রাগ বসন্ত।

সরোদ: ১. মাইহার ঘরানার খলিফা ওস্তাদ আলী আকবর খানের সরোদে — রাগ বসন্ত। ২. শাহজাহানপুর ঘরানার পণ্ডিত বুদ্ধদেব দাশগুপ্তের সরোদে — রাগ বসন্ত।

খেয়াল (Khayal in Basant):

১. রামপুর সহসওয়ান ঘরানার ওস্তাদ রশিদ খানের খেয়াল ও হোরি — বন্দিশ: “পিয়া সাঙ্গ খেলু হোরি…”

২. ইন্দোর ঘরানার প্রবাদপ্রতিম শিল্পী ওস্তাদ আমীর খান সাহেবের কণ্ঠে — রাগ বসন্ত।

৩. পণ্ডিত কুমার গান্ধর্বের জোড় রাগ — কেদার-বসন্ত (দুটি রাগের অপূর্ব সংমিশ্রণ)।

৪. জয়পুর-আতরৌলি ঘরানার বিদুষী কিশোরী আমোনকারের কণ্ঠে — রাগ বসন্ত।

৫. কুমার গান্ধর্বের সুযোগ্য পুত্র পণ্ডিত মুকুল শিবপুত্রের কণ্ঠে — রাগ বসন্ত।

৬. গোয়ালিয়র ও আগ্রা ঘরানার শাস্ত্রীয় রূপ ও ফিউশনের ধারক বিদুষী শুভ্রা মুডগালের (শোভা মুডগাল) কণ্ঠে — রাগ বসন্ত।

অন্যান্য (ভিন্ন ধারার শাস্ত্রীয় প্রয়োগ):

শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের আদি রূপ ধ্রুপদ (Dhrupad) এবং দক্ষিণ ভারতীয় কর্ণাটকী সঙ্গীতেও বসন্ত রাগের চমৎকার প্রয়োগ রয়েছে:

১. ধ্রুপদ অঙ্গের বসন্ত: ডাগর ঘরানার ওস্তাদ ফৈয়াজ ওয়াসিফুদ্দিন ডাগরের কণ্ঠে ধ্রুপদ — রাগ বসন্ত।

২. কর্ণাটকী সঙ্গীতে বসন্ত: দক্ষিণ ভারতীয় সঙ্গীতে রাগ ‘বসন্ত’-এর একটি সুন্দর রূপ প্রচলিত রয়েছে। কর্ণাটকী সঙ্গীতের কিংবদন্তি ড. এম. বালমুরলীকৃষ্ণের কণ্ঠে — রাগ বসন্ত।

টিউটোরিয়াল ও সহায়ক লিংক

যেকোনো রাগের স্বরের চলাফেরা বোঝার জন্য কয়েকটি স্বরমালিকা (Sargam-Geet) শোনা অত্যন্ত জরুরি। স্বরমালিকার পাশাপাশি দু-একটি লক্ষণ গীত বা ছোট খেয়াল শুনলে রাগের স্বরূপ বোঝা সহজ হয়। লক্ষণ গীত মূলত তৈরিই করা হয় শিক্ষার্থীদের রাগের নিয়ম ও লক্ষণগুলো সহজে শেখানোর জন্য। ছোট খেয়ালও প্রায় একই কাজ করে। অনলাইনে এই সংক্রান্ত প্রচুর উপাদান রয়েছে, তার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ ও মানসম্মত কয়েকটি লিংক নিচে দেওয়া হলো:

১. রাগ বসন্তের স্বরমালিকা ও বিবরণ (Tanarang):

লিংক: tanarang.com/raag-basant/ (এই লিংকে রাগ বসন্তের আরোহ-অবরোহ, লক্ষণ, স্বরমালিকা এবং ছোট খেয়ালের নোটেশন ও অডিও রয়েছে।)

২. এনসিইআরটি (NCERT Official) টিউটোরিয়াল:

লিংক: Rag Basant / राग बसन्त (YouTube)

(ভারতের জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড NCERT-এর অফিসিয়াল শাস্ত্রীয় সংগীতের লেকচার-ভিডিও, যেখানে রাগটির পরিচয়, আরোহ-অবরোহ ও বন্দিশ খুব সুন্দর করে বুঝিয়ে গাওয়া হয়েছে।)

৩. শুদ্ধ বসন্ত টিউটোরিয়াল (Raga Junglism & Performance):

লিংক: Shuddha Basant Profile (Rāga Junglism)

(প্রাচীন ও আদি শুদ্ধ বসন্তের রূপ, স্বরবিন্যাস ও বিস্তারিত আলোচনার জন্য এই আর্কাইভটি অত্যন্ত কার্যকরী।)

৪. বাংলা ভাষায় রাগ বসন্তের ছোট খেয়াল ও টিউটোরিয়াল:

লিংক: Raag Basant Tutorial with Notation in Trital (YouTube)

সম্পর্কিত রাগ:

রাগ বসন্তের গম্ভীর মেজাজ, স্বরের ব্যবহার এবং ঋতুভিত্তিক বৈশিষ্ট্যের কারণে শাস্ত্রীয় সংগীতে এর বেশ কিছু সম্পর্কিত ও মিশ্র রাগ (জোড় রাগ) প্রচলিত রয়েছে:

  • সগোত্রীয় রাগ (একই স্বরের রাগ): পরজ (Paraj)। (পরজ ও বসন্তের স্বর একই, কেবল পরজের চলন মধ্য সপ্তকে এবং বসন্তের চলন তার সপ্তকে বেশি হয়)

  • ঋতুভিত্তিক সমগোত্রীয় রাগ: বাহার (Bahar)। (বসন্ত ঋতুর রাগ হলেও বাহারের চলন চপল ও কাফি ঠাটের অন্তর্গত)

  • ঠাটভিত্তিক সম্পর্কিত রাগ: পূরবী (Purvi) এবং সোহিনী (Sohini)।

  • আদি ও মিশ্র বসন্ত রাগসমূহ: * শুদ্ধ-বসন্ত (Shuddha-Basant)

  • বসন্ত-বাহার (Basant-Bahar)
  • পরজ-বসন্ত (Paraj-Basant)
  • বসন্ত-ললিত (Basant-Lalit)
  • বসন্ত-মুখরি (Basant-Mukhari)
  • বসন্তী-কেদার (Basanti-Kedar)
  • দক্ষিণী বা কর্ণাটকী রাগ: বসন্ত-পঞ্চম (Basant-Pancham) ও বসন্তম (Vasantham)।

 

শ্রোতা সহায়িকা নোট সিরিজে আজকের রাগ – রাগ বসন্ত।  এই আর্টিকেলটির উন্নয়ন কাজ চলমান রয়েছে। আপডেট পেতে আবারো আসার আমন্ত্রণ রইলো।

 

আরও দেখুন:

Leave a Comment