মালহার বা মল্লার বর্ষার রাগ। মালহার রাগের পরিবার বেশ বড়ো। মালহারের যত প্রকার আছে তার মধ্যে মিয়া-কি-মালহার অন্যতম। বর্ষার গম্ভীর মেজাজ এবং মেঘমুক্তির আকুলতাকে সুরের জালে বন্দি করার জন্য রাগ মিয়াঁ কি মল্লার (বা মিয়াঁ মল্লার) হিন্দুস্তানি শাস্ত্রীয় সংগীতে এক অবিসংবাদিত সম্রাট। এই রাগটি কেবল বৃষ্টির সুর নয়, বরং প্রকৃতির এক আদিম ও শক্তিশালী সত্তার বহিঃপ্রকাশ।
রাগ মিঞাঁ কি মালহার, মিয়া কি মল্লার, মিয়া মল্লার
মিয়াঁ কি মল্লার একটি অতি প্রাচীন এবং জনপ্রিয় রাগ। এই রাগের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো এর গম্ভীর প্রকৃতি এবং ‘আন্দোলন’। বিশেষ করে কোমল গান্ধার (গ) এবং কোমল নিষাদ (ণ)-এর ওপর যে বিশেষ কম্পন বা আন্দোলন তৈরি করা হয়, তা মেঘের গুরুগুরু গর্জন এবং বৃষ্টির অঝোর ধারার আবহ তৈরি করে। এই রাগে দুটি নিষাদ (শুদ্ধ ও কোমল) ব্যবহৃত হয়, যা এর চলনকে অত্যন্ত বৈচিত্র্যময় করে তোলে। এর ‘প ম রে স’ (পঞ্চম-মধ্যম-ঋষভ-ষড়জ) স্বরসংগতিটি মল্লার অঙ্গের এক অনন্য স্বাক্ষর।
কিংবদন্তি অনুযায়ী, মোগল সম্রাট আকবরের রাজসভার নবরত্নের অন্যতম সঙ্গীতসম্রাট তানসেন (যাঁকে ‘মিয়াঁ’ উপাধিতে ভূষিত করা হয়েছিল) প্রাচীন মল্লার রাগের পরিবর্তন ও পরিমার্জন করে এই রাগটি সৃষ্টি করেন। লোকগাঁথা আছে যে, তানসেন যখন এই রাগটি গাইতেন, তখন আকাশ থেকে অঝোর ধারায় বৃষ্টি নামত। তাঁর নামানুসারেই এই রাগের নামকরণ হয়েছে ‘মিয়াঁ কি মল্লার’ (অর্থাৎ মিয়াঁ তানসেনের মল্লার)। এটি মল্লার পরিবারের মধ্যে সবচেয়ে প্রভাবশালী এবং কঠিন রাগ হিসেবে গণ্য হয়।
রাগের শাস্ত্র: মিঞা কি মল্লার
- ঠাট: কাফি।
- জাতি: ষাড়ব-সম্পূর্ণ (আরোহে ৬টি এবং অবরোহে ৭টি স্বর ব্যবহৃত হয়)।
- আরোহ: সা রে মা পা, ন্ দা ণি র্সা (অথবা: সা রে ম পা, দা ণি র্সা)
(আরোহে গান্ধার বর্জিত)
- অবরোহ: র্সা ণি দা পা, মা পা, জ্ঞা মা রে সা
(অবরোহে কোমল গান্ধার এবং উভয় নিষাদের প্রয়োগ অত্যন্ত শৈল্পিক)
- বাদী স্বর: সা (ষড়জ)।
- সমবাদী স্বর: পা (পঞ্চম)।
- বর্জিত স্বর: আরোহে গান্ধার (গা/জ্ঞা) বর্জিত।
- ব্যবহৃত স্বর: ঋষভ (রে), মধ্যম (মা), পঞ্চম (পা) এবং ধৈবত (ধা) শুদ্ধ; গান্ধার সর্বদা কোমল (জ্ঞা) এবং নিষাদ উভয় (কোমল-ণি ও শুদ্ধ-না) ব্যবহৃত হয়।
বিশেষত্ব: এই রাগের কোমল গান্ধার (জ্ঞা) অতি কোমল এবং বিশেষভাবে আন্দোলিত হয় যা এই রাগের প্রাণ।
- সময়: বর্ষাকাল (যেকোনো সময়) অথবা মধ্যরাত্রি।
- প্রকৃতি: অত্যন্ত গম্ভীর, করুণ, আধ্যাত্মিক এবং বর্ষার মেঘগম্ভীর আবেশপূর্ণ।
এই রাগটির বিশেষত্বও অতি কোমল গান্ধার, যেটা একটু “মধ্যম” বা “মা” এর দিকে ঝুঁকে যাওয়া। আর দুটি নিষাদ এ সাথে লাগা।
অতি কোমল গান্ধার (গ)-এর প্রয়োগ ও মধ্যমের দিকে ঝোঁক মিয়াঁ কি মল্লারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং কঠিন বৈশিষ্ট্য। এই রাগের গান্ধার (গ) কেবল কোমল নয়, একে ‘অতি কোমল’ বলা হয়। গায়াকী বা বাজানোর সময় এই ‘গ’ স্বরটি সরাসরি লাগানো হয় না; বরং মধ্যম (ম) থেকে একটি সূক্ষ্ম মিঁড় বা আন্দোলনের মাধ্যমে গান্ধারে আসা হয়। শ্রুতি বিচার করলে দেখা যায়, মিয়াঁ কি মল্লারের গান্ধারটি তার সাধারণ অবস্থান থেকে কিছুটা চ্যুত হয়ে মধ্যমের (ম) সীমানার দিকে ঝুঁকে থাকে। একে বলা হয় ‘আন্দোলিত গান্ধার’। এই আন্দোলনের কারণেই বর্ষার মেঘের গুরুগুরু গম্ভীর আওয়াজটি সুরের মাধ্যমে ফুটে ওঠে।
দুটি নিষাদ (ণ ও ন)-এর একত্র প্রয়োগ বা মিয়াঁ কি মল্লারের চলনে দুই প্রকার নিষাদের ব্যবহার একে মল্লার পরিবারের অন্য রাগ থেকে পৃথক করে। আরোহে সাধারণত শুদ্ধ নিষাদ (ন) এবং অবরোহে কোমল নিষাদ (ণ) ব্যবহৃত হয়। তবে এই রাগের একটি বিশেষ চমৎকারিত্ব হলো ‘ণ ধ ন স’—এই স্বরসঙ্গতিটি। এখানে কোমল ও শুদ্ধ নিষাদ প্রায় পাশাপাশি অবস্থান করে একটি বিশেষ বক্র চলন তৈরি করে। আরোহের সময় ‘ধ’ থেকে সরাসরি ‘স’-এ না গিয়ে ‘ণ ধ ন স’ করার সময় যে মুড়কি বা কাজ দেখানো হয়, সেটিই এই রাগের প্রাণ।
তবে এই রাগের ঋষভ (র) স্বরটিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে ‘নি ধ প’ থেকে ‘ম প’ হয়ে যখন ‘গ ম র স’ করা হয়, তখন ঋষভ স্বরটির ওপর এক ধরণের গাম্ভীর্য বজায় থাকে যা মল্লার অঙ্গের বৈশিষ্ট্য।
আরোহ-আবরোহ এই লিঙ্ক গুলোতে গিয়ে শুনে নিতে পারেন । লিংক ১ ।
ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার আলোকে আমি দেখেছি, নতুন শ্রোতাদের জন্য জটিল শাস্ত্রীয় রাগের গহীন অরণ্যে প্রবেশের আগে সেই রাগের কাঠামোয় রচিত সহজবোধ্য ও সাধারণ গানগুলো শোনার অভ্যাস করা অত্যন্ত ফলপ্রসূ। মূলত, রাগ সংগীতের ব্যাকরণ ও অলঙ্করণ বোঝার প্রাথমিক ধাপ হলো এর ‘মেলোডিক ফ্রেমওয়ার্ক’ বা সুরের ছাঁচটি চিনে নেওয়া। যখন একজন শ্রোতা একই রাগের আধারে তৈরি বিভিন্ন জনপ্রিয় গান, ভজন বা আধুনিক সুর বারবার শোনেন, তখন অবচেতনভাবেই তাঁর মনের মণিকোঠায় সেই রাগের একটি সুনির্দিষ্ট অবয়ব তৈরি হয়ে যায়। তাই চলুন এত শাস্ত্র কপচানোর আগে কিছু গান বাজনা শোনা যাক ..
কণ্ঠে মিয়াঁ কি মল্লার
আমার কাছে মিয়া-মালহার বৃষ্টি শুরু হয়ে থিতু হবার পরে শোনার রাগ। চলমান বৃষ্টিতে সুরবাহারে মিয়া কি মালহার শোনার অনুভূতি অসাধারণ।
শোনা শুরু করা যাক কোক স্টুডিওর একটা গান দিয়ে:
কাজী নজরুল ইসলামের মিঞাঁ কি মালহার:
নজরুলের অনেক গান রাগাশ্রীয়। নির্দিষ্ট রাগের আশ্রয়ে যে গানগুলোতে সুর করা হয়েছে, সেগুলোর পুরো সুরে রাগের অবয়ব বজায় রাখার চেষ্টা থেকেছে; খুব বেশি রাগভ্রষ্ট হয়নি। তাই নজরুলের গানগুলো কান তৈরিতে বেশি উপযোগী বলে আমার কাছে মনে হয়। কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর গানে রাগ মিঞাঁ কি মল্লার-এর গম্ভীর আভিজাত্য এবং বর্ষার আবাহনকে অত্যন্ত নিপুণভাবে ব্যবহার করেছেন।
১. অবিরত বাদর বরষিছে ঝরঝর: এটি নজরুলের ‘মিয়াঁ কি মল্লার’ রাগের ওপর ভিত্তি করে তৈরি অত্যন্ত প্রামাণ্য একটি গান। গানটির সুরবিন্যাসে এই রাগের সেই গম্ভীর ‘আন্দোলিত গান্ধার’ (গ) এবং বর্ষার ঝরঝর ধারার এক চমৎকার মেলবন্ধন রয়েছে। রাগের ‘প ম রে স’ চলনটি এখানে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে।
২. আজি এ শ্রাবণ-নিশি কাটে কেমনে: এই গানটিও মিয়াঁ কি মল্লার রাগের আধারে রচিত। বিশেষ করে বর্ষার নিশীথ রাতের বিরহ ও গাম্ভীর্য ফুটিয়ে তুলতে নজরুল এই রাগের ‘কোমল ও শুদ্ধ নিষাদ’-এর চলনটি নিখুঁতভাবে ব্যবহার করেছেন। এটি রাগ চেনার জন্য একটি ধ্রুপদী উদাহরণ।
৩. ঝড়ের বাঁশিতে কে গেলে ডেকে: এই গানটি নজরুলের এক অনন্য সৃষ্টি। ঝড়ের তাণ্ডব আর বৃষ্টির আবাহনে মিয়াঁ কি মল্লারের যে ওজস্বী রূপ, তা এই গানে সার্থকভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। রাগের ‘বাদী-সমবাদী’ (স-প) সম্পর্কটি এখানে গানের স্থায়ী ও অন্তরায় খুব সুন্দরভাবে রক্ষা করা হয়েছে।
৪. রামছাগী গায় চতুরঙ্গ বেড়ার ধারে: এটি একটি অত্যন্ত কৌতুকপূর্ণ এবং ব্যতিক্রমী গান। নজরুল তাঁর স্বভাবজাত রসবোধ থেকে গম্ভীর ‘মিয়াঁ কি মল্লার’ রাগের প্যারোডি বা লঘু রূপ হিসেবে এটি রচনা করেছিলেন। যদিও এটি একটি হাসির গান, কিন্তু এর সুরের কাঠামোটি মিয়াঁ কি মল্লারের ব্যাকরণ মেনেই তৈরি। শাস্ত্রীয় রাগের এমন বৈচিত্র্যময় ও হাস্যরসাত্মক ব্যবহার নজরুলের পক্ষেই সম্ভব ছিল।
কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের মিঞাঁ কি মালহার:
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর শাস্ত্রীয় রাগের কাঠামোকে ‘ভিত্তি’ হিসেবে ব্যবহার করলেও সুরের প্রয়োজনে প্রায়শই রাগের ব্যাকরণ ভেঙে নিজের এক স্বতন্ত্র জগৎ তৈরি করেছেন। মিয়াঁ কি মল্লার-এর মতো গম্ভীর রাগের ক্ষেত্রেও তিনি এর মূল মেজাজটি গ্রহণ করেছেন, কিন্তু অনেক সময় স্বরপ্রয়োগে নিজস্বতা দেখিয়েছেন।
১. কোথা যে উধাও হল -তাল: আড়াঠেকা , রচনাকাল (১৩৩২ বঙ্গাব্দ), (১৯২৫ খৃষ্টাব্দ) এই গানটি মিয়াঁ কি মল্লার রাগের একটি সার্থক রবীন্দ্র-রূপান্তর। গানটির সুরের চলনে মল্লার অঙ্গের সেই বিশেষ ‘নি ধ প’ এবং ‘ম প গ ম র স’ স্বরসংগতিগুলো অত্যন্ত নিপুণভাবে মিশে আছে।
২. তোমার গীতি জাগালো স্মৃতি – তাল: তেওরা, রচনাকাল (১৩ আষাঢ়, ১৩৩৪ বঙ্গাব্দ), রচনাকাল (২৮ জুন, ১৯২৭, খৃষ্টাব্দ) এটি মিয়াঁ কি মল্লারের উদাহরণ হিসেবে ভালো। গানটির সুরবিন্যাসে দুই প্রকার নিষাদ (কোমল ও শুদ্ধ) এবং অতি কোমল গান্ধারের প্রয়োগ মল্লার রাগের আবহ তৈরি করে।
![Sufi Faruq ByCicle in Rain 7 রাগ মিঞাঁ কি মালহার, মিয়া কি মল্লার, মিয়া মল্লার । অসুরের সুরলোকযাত্রা সিরিজ 2 রাগ মিয়া মল্লার, মিয়া কি মল্লার, মিয়া কি মালহার [ Raga Miyan Malhar, Miyan Ki Malhar ] সহজে রাগ চেনার উপায় । শ্রোতা সহযোগী নোট](https://sufifaruq.com/wp-content/uploads/2015/03/Sufi-Faruq-ByCicle-in-Rain-7-300x200.jpg)
চলচ্চিত্রে মিঞাঁ কি মালহার:
১. জলসাঘর (১৯৫৮) — গান: খেয়াল; শিল্পী: ওস্তাদ সালামত আলী খাঁ; সঙ্গীত পরিচালক: ওস্তাদ বিলায়েত খাঁ; রাগের বিশুদ্ধতম রূপ।
২. বোল রে পপিহারা — চলচ্চিত্র: গুড্ডি (১৯৭১); শিল্পী: বাণী জয়রাম; সুরকার: বসন্ত দেশাই; চলচ্চিত্র সংগীতে রাগের শ্রেষ্ঠ উদাহরণ।
৩. নাচে মন মোরা মগন — চলচ্চিত্র: মেরি সুরাত তেরি আঁখেন (১৯৬৩); শিল্পী: মোহাম্মদ রফি; সুরকার: এস ডি বর্মন; বর্ষার আবহে রাগের প্রয়োগ।
৪. বিণা মধুর বোলে — চলচ্চিত্র: রাম রাজ্য (১৯৪৩); শিল্পী: সরস্বতী রাণে; সুরকার: শঙ্কর রাও ব্যাস; প্রাচীন ও ধ্রুপদী ঢংয়ের মল্লার।
গজলে মিঞাঁ কি মালহার:
গজল গায়নরীতিতে মিয়াঁ কি মল্লার-এর প্রয়োগ অত্যন্ত বিরল এবং দুঃসাধ্য, কারণ এই রাগের গাম্ভীর্য ও ‘আন্দোলিত গান্ধার’ গজলের তরল মেজাজের সাথে খাপ খাওয়ানো কঠিন। তবে গজল সম্রাট ওস্তাদ মেহেদী হাসান তাঁর শাস্ত্রীয় সংগীতে অগাধ পাণ্ডিত্যের কারণে এই অসাধ্য সাধন করেছেন।
১. এক বাস তু হি নেহি মুঝসে খাফা হো বৈঠা (Ek bas tu hi nahin mujhse khafa ho baitha): * শিল্পী: ওস্তাদ মেহেদী হাসান। কাহারবা (ধীর লয়)। এটি গজলে মিয়াঁ কি মল্লারের এক বিস্ময়কর উদাহরণ। ওস্তাদজি এই গজলটির শুরুতেই রাগের সেই ‘অতি কোমল গান্ধার’-এর নিখুঁত আন্দোলন দেখিয়েছেন। গজলের প্রতিটি অন্তরায় তিনি যেভাবে ‘নি ধ প’ এবং ‘ম প গ ম র স’ স্বরসংগতি ব্যবহার করেছেন, তা মিয়াঁ কি মল্লারের প্রকৃত স্বরূপ চিনিয়ে দেয়। বৃষ্টির রাতের একাকীত্ব ও অভিমানের যে আর্তি গজলটির কথায় আছে, এই রাগটি তাকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে।
ভজনে মিঞাঁ কি মালহার:
ভজন গায়নরীতিতে রাগ মিয়াঁ কি মল্লার-এর ব্যবহার অত্যন্ত ভক্তিপূর্ণ এবং গম্ভীর। বর্ষার মেঘের আবাহনের সাথে যখন পরমাত্মার মিলনের আকুতি যুক্ত হয়, তখন এই রাগের ‘আন্দোলিত গান্ধার’ এক অপার্থিব আধ্যাত্মিক পরিবেশ তৈরি করে।
১. শ্যাম বিন উমড়ে ইয়ে বদরা (Shyam Bina Unye Ye Badara): শিল্পী: পণ্ডিত যশরাজ (মেওয়াতি ঘরানা)। রাগ: মিয়াঁ কি মল্লার। এটি মেওয়াতি ঘরানার একটি অত্যন্ত প্রসিদ্ধ ও প্রাচীন বন্দিশ বা ভজন। পণ্ডিত যশরাজ তাঁর দরাজ ও আধ্যাত্মিক কণ্ঠে এই রাগের ‘অতি কোমল গান্ধার’ এবং ‘নি ধ প’ চলনটি অত্যন্ত নিখুঁতভাবে দেখিয়েছেন। কৃষ্ণের অভাব এবং কালো মেঘের গর্জনের যে আর্তি ভজনটিতে আছে, তা মিয়াঁ কি মল্লারের গাম্ভীর্যের মাধ্যমে এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছেছে।
২. ভজন – প্রফেসর ড. শৈলেন্দ্র গোস্বামী: মিয়াঁ কি মল্লার। ড. শৈলেন্দ্র গোস্বামী তাঁর ভজনে মিয়াঁ কি মল্লার রাগের বিশুদ্ধ শাস্ত্রীয় রূপটি বজায় রেখেছেন। তাঁর গায়কীতে রাগের ‘বাদী-সমবাদী’ (স-প) এবং দুই নিষাদের কাজগুলো খুব স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে, যা সাধারণ শ্রোতা ও শিক্ষার্থীদের জন্য রাগটি চেনার জন্য অত্যন্ত সহায়ক।
খেয়ালে মিয়া কি মালহার:
খেয়াল গায়নরীতিতে রাগ মিয়াঁ কি মল্লার হলো আভিজাত্য এবং গাম্ভীর্যের চূড়ান্ত পরীক্ষা। একজন শিল্পীর পরিপক্কতা বোঝা যায় তিনি এই রাগের ‘আন্দোলিত গান্ধার’ কতক্ষণ এবং কতটা শুদ্ধভাবে ধরে রাখতে পারছেন তার ওপর।
খেয়াল সংগীতে এই রাগের বিস্তার মূলত ‘বিলম্বিত’ লয়ে এর মেঘমন্দ্র রূপ এবং ‘দ্রুত’ লয়ে বৃষ্টির ছন্দের মতো তানের কারুকার্য দিয়ে সাজানো হয়।
১. কিরানা ঘরানা – পণ্ডিত ভীমসেন জোশী: পণ্ডিতজির কণ্ঠে মিয়াঁ কি মল্লার এক অতিপ্রাকৃত শক্তি লাভ করতো। তাঁর উদাত্ত কণ্ঠস্বর এবং বিশেষ করে মন্দ্র সপ্তকের (নিচু স্বরের) বিস্তার মেঘের গর্জনের মতো শোনায়। কিরানা ঘরানার বিশেষত্ব অনুযায়ী তিনি স্বরের ওপর খুব সূক্ষ্ম কাজ করতেন, যা এই রাগের ‘অতি কোমল গান্ধার’ ফুটিয়ে তুলতে অনন্য। তাঁর “করিম নাম তেরো” বন্দিশটি এই রাগের একটি কালজয়ী উদাহরণ।
২. রামপুর-সহসওয়ান ঘরানা – ওস্তাদ রশিদ খান: ওস্তাদ রশিদ খানের গায়কীতে এই রাগের এক সজল ও আবেগঘন রূপ পাওয়া যায়। তাঁর বিশেষ ‘সরগম’ এবং ‘তান’-এর কাজগুলো বৃষ্টির ঝাপটার মতো দ্রুত ও নিখুঁত। তিনি এই রাগের বিলম্বিত খেয়ালে যে গাম্ভীর্য তৈরি করতেন, তা শ্রোতাকে এক আধ্যাত্মিক জগতে নিয়ে যায়।
৩. ইন্দোর ঘরানা – ওস্তাদ আমীর খাঁ সাহেব: ওস্তাদ আমীর খাঁ ছিলেন ‘মেরুখণ্ড’ পদ্ধতির প্রবর্তক। তাঁর মিয়াঁ কি মল্লার অত্যন্ত ধীর, গভীর এবং মননশীল। তিনি অতি বিলম্বিত লয়ে রাগের প্রতিটি স্বরকে (বিশেষ করে দুই নিষাদ) যেভাবে বিশ্লেষণ করতেন, তা এই রাগের ব্যাকরণ বোঝার জন্য শ্রেষ্ঠ পাঠশালা। তাঁর গায়কীতে কোনো চপলতা নেই, আছে কেবল এক অতল গাম্ভীর্য।
৪. পণ্ডিত কুমার গান্ধর্ব: কুমার গান্ধর্ব ছিলেন প্রথা ভাঙার শিল্পী। তাঁর মিয়াঁ কি মল্লার গায়কীতে মালব অঞ্চলের লোকসুরের একটি সূক্ষ্ম ছোঁয়া পাওয়া যায়। তিনি রাগের প্রচলিত কাঠামোর মধ্যে থেকেও স্বরের প্রয়োগে এমন এক অভিনবত্ব আনতেন, যা অন্য সবার চেয়ে আলাদা। তাঁর কণ্ঠে এই রাগের এক আদিম ও বন্য রূপ ফুটে ওঠে।
৫. জয়পুর-আত্রৌলি ঘরানা – বিদুষী কিশোরী আমোনকর: কিশোরী তাই-এর কণ্ঠে মিয়াঁ কি মল্লার এক অপার্থিব রূপ পায়। জয়পুর ঘরানার বিশেষত্ব অনুযায়ী তিনি জটিল স্বরসংগতি এবং বক্র তানের মাধ্যমে রাগের অবয়ব তৈরি করতেন। তাঁর গায়কীতে রাগের শাস্ত্রীয় শুদ্ধতার সাথে এক তীব্র আকুলতা মিশে থাকে, যা বর্ষার বিরহকে সার্থকভাবে ফুটিয়ে তোলে।
ধ্রপদে মিঞাঁ কি মালহার:
ধ্রুপদ রীতিতে মিয়াঁ কি মল্লার গাওয়ার সময় ‘আলাপ’, ‘জোড়’ এবং ‘ঝালা’-র মাধ্যমে মেঘের গম্ভীর গর্জন এবং বর্ষার বিপুলতাকে ফুটিয়ে তোলা হয়। এখানে তানের চেয়ে ‘গমক’ এবং ‘মীড়’-এর কাজ বেশি থাকে।
১. ডাগর ঘরানা – নাসির আমিনুদ্দিন ডাগর ও নাসির মঈনুদ্দিন ডাগর (ডাগর ব্রাদার্স): ডাগর বাণী বা ডাগর ঘরানা ধ্রুপদের শুদ্ধতা রক্ষার জন্য বিশ্ববিখ্যাত। ডাগর ভাইদের কণ্ঠে মিয়াঁ কি মল্লার এক অপার্থিব ধ্যানগম্ভীর রূপ পায়। তাঁদের বিলম্বিত আলাপে ‘অতি কোমল গান্ধার’-এর যে সূক্ষ্ম আন্দোলন দেখা যায়, তা এই রাগের ব্যাকরণগত শ্রেষ্ঠ নিদর্শন। তাঁদের গায়কীতে এই রাগটি কেবল বিনোদন নয়, বরং একটি আধ্যাত্মিক আরাধনায় পরিণত হয়।
২. ডাগর ঘরানা – ওস্তাদ সাফিউদ্দিন ডাগর (পণ্ডিত সাঈদউদ্দীন ডাগর): তাঁর গায়কীতে মিয়াঁ কি মল্লারের ‘অস্থায়ী’ ও ‘অন্তরা’ অংশে রাগের যে বিস্তার দেখা যায়, তা অত্যন্ত প্রামাণ্য। ধ্রুপদ অঙ্গের বিশেষ ‘নম-তোম’ আলাপের মাধ্যমে তিনি বৃষ্টির গুরুগম্ভীর পরিবেশ তৈরি করতেন।
৩. বেতিয়া ঘরানা – পণ্ডিত ফাল্গুনী মিত্র: বেতিয়া ঘরানার ধ্রুপদ গায়কীতে মিয়াঁ কি মল্লারের একটি অত্যন্ত প্রাচীন ও বলিষ্ঠ রূপ পাওয়া যায়। পণ্ডিত ফাল্গুনী মিত্রের গায়কীতে রাগের শুদ্ধ স্বরপ্রয়োগ এবং লয়কারীর কাজগুলো এই রাগের রাজকীয় ভাবকে তুলে ধরে।
৪. ওস্তাদ আসাদ আলী খাঁ (রুদ্ৰবীণা): যদিও এটি কণ্ঠসংগীত নয়, কিন্তু ধ্রুপদ অঙ্গের রুদ্রবীণা বাদনে ওস্তাদ আসাদ আলী খাঁ সাহেবের মিয়াঁ কি মল্লার এই রাগের ইতিহাসে একটি অবিস্মরণীয় নাম। রুদ্রবীণার গম্ভীর ধ্বনিতে মিয়াঁ কি মল্লারের গাম্ভীর্য পূর্ণতা পায়।
যন্দ্রে মিঞাঁ কি মালহার:
সুরবাহার ও সেতারে মিঞাঁ কি মালহার:
সেতারে রাগ মিঞাঁ কি মল্লার-এর গম্ভীর এবং মেঘমেদুর আভিজাত্য এক অনন্য মাত্রা পায়। বিশেষ করে ইমদাদখানী (ইটাওয়া) ঘরানার ‘গায়কী অঙ্গ’-এর বাদনশৈলীতে এই রাগের আন্দোলিত গান্ধার এবং দুই নিষাদের কাজগুলো হুবহু মানুষের কণ্ঠের আর্তিকেও হার মানায়।
সেতারে এই রাগটি শোনার সময় খেয়াল করবেন, শিল্পীরা কীভাবে ‘মিঁড়’-এর মাধ্যমে মধ্যম থেকে অতি কোমল গান্ধারে নেমে আসেন, যা বৃষ্টির মেঘের গুরুগম্ভীর আওয়াজের ভ্রম তৈরি করে।
১. ইমদাদখানী ঘরানার ওস্তাদ বিলায়েত খাঁ সাহেবের সেতারে – মিঞাঁ কি মল্লার: ওস্তাদ বিলায়েত খাঁ সাহেব ছিলেন গায়কী অঙ্গের প্রবর্তক। তাঁর বাজানো মিঞাঁ কি মল্লারকে এই রাগের অন্যতম ‘বেঞ্চমার্ক’ ধরা হয়। তিনি সেতারের তারে যেভাবে ‘গ ম র স’ স্বরসংগতিতে অতি কোমল গান্ধারের আন্দোলন দেখাতেন, তা অত্যন্ত কঠিন এবং গাণিতিকভাবে নিখুঁত। তাঁর আলাপ এবং জোড় অংশের গাম্ভীর্য এই রাগের প্রকৃত স্বরূপ চিনিয়ে দেয়।
২. ইমদাদখানী ঘরানার ওস্তাদ শহীদ পারভেজ খানের সেতারে – মিঞাঁ কি মল্লার: বর্তমান সময়ের সেতার সম্রাট ওস্তাদ শহীদ পারভেজ খান তাঁর ঘরানার ঐতিহ্যকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। তাঁর বাজানোয় মিঞাঁ কি মল্লারের একটি অত্যন্ত ওজস্বী ও বিস্তারধর্মী রূপ পাওয়া যায়। বিশেষ করে তাঁর দ্রুত তানের কাজ এবং দুই নিষাদের (কোমল ও শুদ্ধ) বক্র চলনগুলো এই রাগটি বোঝার জন্য অত্যন্ত সহায়ক।
৩. মৈহার ঘরানার পণ্ডিত রবিশঙ্করের সেতারে – মিঞাঁ কি মল্লার: পণ্ডিত রবিশঙ্কর মিঞাঁ কি মল্লার রাগকে বিশ্বদরবারে পরিচিত করেছিলেন। তাঁর বাজানোয় মল্লার অঙ্গের গাম্ভীর্যের সাথে একটি বিশেষ ‘ছন্দ’ বা রিদম থাকে। তিনি এই রাগের আরোহে শুদ্ধ নিষাদ এবং অবরোহে কোমল নিষাদের প্রয়োগটি খুব স্পষ্টভাবে দেখিয়েছেন।
৪. ইমদাদখানী ঘরানার ওস্তাদ ইমরাত খাঁ সাহেবের সুরবাহার ও সেতারে – মিঞাঁ কি মল্লার: ওস্তাদ বিলায়েত খাঁ সাহেবের ভাই ওস্তাদ ইমরাত খাঁ সাহেব এই রাগটি সুরবাহার (সেতারের চেয়েও গম্ভীর ও বড় যন্ত্র) যন্ত্রে বাজিয়ে অমর করে গেছেন। মিঞাঁ কি মল্লারের মতো গম্ভীর রাগের জন্য সুরবাহার যন্ত্রটি অত্যন্ত উপযুক্ত, যেখানে মন্দ্র সপ্তকের কাজগুলো আরও প্রগাঢ় হয়।
সারদে মিঞাঁ কি মালহার :
সরোদ যন্ত্রের গম্ভীর এবং গমকপ্রধান বাদনশৈলী রাগ মিয়াঁ কি মল্লার-এর মেঘমন্দ্র প্রকৃতির সাথে চমৎকারভাবে মানিয়ে যায়। সরোদের তবলি বা কাঠের ওপর আঙুলের ঘর্ষণে যে ‘রেজোন্যান্স’ তৈরি হয়, তা বর্ষার গুরুগম্ভীর আবহ সৃষ্টিতে অনন্য।
সরোদে এই রাগটি শোনার সময় এর ‘আন্দোলিত গান্ধার’ এবং ‘ধ ণ ন স’—এই বক্র চলনগুলো সরোদের বিশেষ ‘ঘষিট’ বা ‘স্লাইড’-এর মাধ্যমে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে।
১. মৈহার ঘরানার ওস্তাদ আলী আকবর খাঁ সাহেবের সরোদে – মিয়াঁ কি মল্লার: ওস্তাদ আলী আকবর খাঁকে বলা হয় ‘সরোদ সম্রাট’। তাঁর বাজানো মিয়াঁ কি মল্লার এই রাগের ইতিহাসে একটি অমর দলিল। বিশেষ করে তাঁর ধীর লয়ের আলাপ এবং মন্দ্র সপ্তকের (নিচু স্বরের) কাজগুলো বর্ষার এক আদিম ও গম্ভীর রূপ তৈরি করে। মৈহার ঘরানার বিশেষত্ব অনুযায়ী তিনি এই রাগে তানের চেয়ে ‘মীড়’ ও ‘গলায়’র কাজে বেশি জোর দিতেন, যা রাগের বিশুদ্ধতা বজায় রাখে। তাঁর বাজানোয় ‘গ’ স্বরের আন্দোলনটি অত্যন্ত দীর্ঘ এবং ভাবগম্ভীর।
২. সেনিয়া বঙ্গশ ঘরানার ওস্তাদ আমজাদ আলী খাঁ সাহেবের সরোদে – মিয়াঁ কি মল্লার: ওস্তাদ আমজাদ আলী খাঁ তাঁর বিশেষ ‘ইখারা’ তানের কাজ এবং দ্রুত লয়ের জোড়-ঝালার জন্য বিখ্যাত। তাঁর মিয়াঁ কি মল্লার বাজানোর স্টাইলটি অনেক বেশি ওজস্বী এবং রাজকীয়। তিনি সরোদের তারে যেভাবে কোমল ও শুদ্ধ নিষাদের খেলা দেখান, তা শ্রোতাকে মুগ্ধ করে। তাঁর বাজানোয় এই রাগের একটি আধুনিক ও প্রাণবন্ত রূপ পাওয়া যায়, যা বিশেষ করে দ্রুত গতির গৎ-এর সময় স্পষ্টভাবে বোঝা যায়।
৩. ওস্তাদ হাফিজ আলী খাঁ সাহেবের সরোদে – মিয়াঁ কি মল্লার: ওস্তাদ আমজাদ আলী খাঁর পিতা ও গুরু ওস্তাদ হাফিজ আলী খাঁ ছিলেন এই রাগের একজন প্রবাদপ্রতিম বাদক। তাঁর সময়ে মিয়াঁ কি মল্লারের গাম্ভীর্য রক্ষা করার ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন আপসহীন। তাঁর ঐতিহাসিক রেকর্ডিংগুলো আজও এই রাগের প্রামাণ্য দলিল হিসেবে গণ্য হয়।

বাঁশিতে মিঞাঁ কি মালহার:
বাঁশির কোমল আর গম্ভীর ধ্বনি রাগ মিঞাঁ কি মল্লার-এর বর্ষার মেজাজ ফুটিয়ে তোলার জন্য এক অনন্য মাধ্যম। বাঁশিতে যখন এই রাগের ‘আন্দোলিত গান্ধার’ এবং ‘দুই নিষাদ’-এর কাজ করা হয়, তখন তা সরাসরি শ্রোতার হৃদয়ে বৃষ্টির সজল আবেশ তৈরি করে। বাঁশিতে এই রাগটি শোনার সময় খেয়াল করবেন, শিল্পীরা কীভাবে ফুঁ ও আঙুলের শৈল্পিক ছোঁয়ায় ‘গ ম র স’ এবং ‘ণ ধ ন স’ স্বরসংগতিগুলোতে মেঘের গর্জনের মতো এক প্রকার গাম্ভীর্য তৈরি করেন।
১. পণ্ডিত পান্নালাল ঘোষ: আধুনিক বাঁশির জনক পণ্ডিত পান্নালাল ঘোষ এই রাগের অন্যতম শ্রেষ্ঠ রূপকার। তিনিই প্রথম বড় মাপের বাঁশি (Bass Flute) প্রবর্তন করেন, যা মিঞাঁ কি মল্লারের মতো গম্ভীর রাগের জন্য অত্যন্ত উপযুক্ত। তাঁর বাজানোয় এই রাগের ‘আন্দোলিত গান্ধার’ এক অপার্থিব রূপ পায়। তাঁর বিলম্বিত আলাপ এবং ‘গ ম র স’-এর কাজগুলো শাস্ত্রীয় সংগীতের শিক্ষার্থীদের জন্য একটি প্রামাণ্য দলিল।
২. পণ্ডিত হরিপ্রসাদ চৌরাসিয়া: বর্তমান সময়ের বাঁশি সম্রাট পণ্ডিত হরিপ্রসাদ চৌরাসিয়া মিঞাঁ কি মল্লার রাগকে এক নতুন প্রাণ দিয়েছেন। তাঁর বাজানোয় বর্ষার চপলতা ও গাম্ভীর্য—উভয়ই সমানভাবে বিদ্যমান। বিশেষ করে তাঁর ‘ঝালা’ এবং দ্রুত গতির গৎগুলো বৃষ্টির অঝোর ধারার আবহ তৈরি করে। তাঁর বাজানোয় দুই নিষাদের (কোমল ও শুদ্ধ) বক্র চলন অত্যন্ত স্পষ্ট ও শ্রুতিমধুর।
৩. পণ্ডিত বিজয় রাঘব রাও: পণ্ডিত পান্নালাল ঘোষের শিষ্য বিজয় রাঘব রাও এই রাগের শুদ্ধতা বজায় রাখার জন্য সুপরিচিত। তাঁর বাদনশৈলীতে রাগের ব্যাকরণগত সূক্ষ্মতা (বিশেষ করে ‘প ম রে স’ চলনটি) খুব চমৎকারভাবে ফুটে ওঠে।
৪. পণ্ডিত রঘিনাথ শেঠ: তাঁর বাঁশিতে মিঞাঁ কি মল্লারের এক অত্যন্ত শান্ত ও আধ্যাত্মিক রূপ পাওয়া যায়। তিনি রাগের বিলম্বিত অংশে যে গাম্ভীর্য তৈরি করেন, তা মোগল দরবারের সেই প্রাচীন ঐতিহ্যের কথা মনে করিয়ে দেয়।
টিউটোরিয়াল:
যেকোনো রাগের চরিত্র এবং স্বরের বিন্যাস গভীরভাবে বোঝার জন্য শুধুমাত্র গান শোনা যথেষ্ট নয়, বরং এর ব্যাকরণগত কাঠামোটি অনুধাবন করা জরুরি; তাই মিঞাঁ কি মল্লার-এর মতো গম্ভীর রাগকে চেনার জন্য শুরুতেই অন্তত ২-৫টি স্বর-মালিকা বা সারগম-গীত শোনা প্রয়োজন, যা রাগের আরোহ-অবরোহের গাণিতিক রূপ ও ছন্দের চলন স্পষ্ট করে। এর পাশাপাশি লক্ষণ গীত শোনা অত্যন্ত কার্যকর, কারণ এই বিশেষ পরিচয়মূলক গানের বাণীর মধ্যেই রাগের ঠাট, জাতি, বাদী-সমবাদী ও বর্জিত স্বরের উল্লেখ থাকে, যা রাগের তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক দিকগুলো সহজে আয়ত্ত করতে সাহায্য করে। এছাড়া ছোট খেয়াল বা লক্ষণ গীতের দ্রুত লয় ও তানের কাজগুলো শুনলে রাগের গাম্ভীর্য ও চপলতার এক চমৎকার সংমিশ্রণ ফুটে ওঠে, যা শিক্ষার্থী বা শ্রোতাকে রাগের চলন বুঝতে পূর্ণাঙ্গ সহায়তা প্রদান করে।
রাগের চলন হাতে-কলমে শেখার জন্য অনলাইনে প্রচুর টিউটোরিয়াল রয়েছে। একটু অনুসন্ধান করলেই অনেক গুণী শিল্পীর শেখানোর ভিডিও পাওয়া যাবে। উদাহরণ হিসেবে নিচেরটি অনুসরণ করতে পারেন:
১. NCERT-এর টিউটোরিয়াল (মিঞাঁ কি মল্লার): ভারত সরকারের এনসিইআরটি (NCERT) কর্তৃক পরিচালিত এই টিউটোরিয়ালটিতে রাগের অতি কোমল গান্ধারের আন্দোলন এবং দুই নিষাদের প্রয়োগ অত্যন্ত প্রাঞ্জলভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
২. সারিতা পাঠক এর “মিঞাঁ কি মল্লার” টিউটোরিয়াল: তাঁর প্রাঞ্জল গায়কীর মাধ্যমে রাগের সূক্ষ্ম আন্দোলন এবং বিশেষ করে ‘কোমল গান্ধার’-এর কাজগুলো খুব সহজে বোঝা যায়।
৩. সিদ্ধার্থ সালাথিয়ার “মিঞাঁ কি মল্লার” টিউটোরিয়াল: আধুনিক আঙ্গিকে এবং খুব সহজ ভঙ্গিতে এই রাগের বৈশিষ্ট্যগুলো তিনি উপস্থাপন করেছেন, যা নতুন প্রজন্মের সংগীত অনুরাগী বা সাধারণ শ্রোতাদের জন্য রাগটি শনাক্ত করতে বিশেষভাবে সহায়ক।
মিঞাঁ কি মল্লার চেনার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো এর ‘আন্দোলন’। যখনই কোনো গানে দেখবেন ‘মা’ (মধ্যম) থেকে দুলতে দুলতে ‘গা’ (কোমল গান্ধার)-এ সুর নামছে এবং ‘নি ধা পা’ (অবরোহ) অংশে এক ধরণের গম্ভীর বিষাদ তৈরি হচ্ছে, তখনই বুঝবেন এটি এই রাগের স্পর্শ।
মিয়া মল্লারের সাথে সম্পর্কিত অন্যান্য রাগ
মিয়াঁ কি মল্লারের সাথে গঠনগত বা অঙ্গগত সাদৃশ্য রয়েছে এমন কিছু রাগের তালিকা:
- মেঘ মল্লার: এটি মল্লার পরিবারের মূল রাগ; মিয়াঁ কি মল্লারের তুলনায় এটি অনেক বেশি সরল এবং এতে গান্ধার ও ধৈবত বর্জিত।
- গৌড় মল্লার: মিয়াঁ কি মল্লারের সাথে এর তফাৎ হলো এর চলন কিছুটা চপল এবং এতে শুদ্ধ গান্ধার ব্যবহৃত হয়।
- সুর মল্লার: এই রাগে কোমল নিষাদের ব্যবহার থাকলেও মিয়াঁ কি মল্লারের মতো ‘গ’ এর আন্দোলন থাকে না।
- বাহার: মিয়াঁ কি মল্লারের সাথে বাহার রাগের সংমিশ্রণে ‘মিয়াঁ কি বাহার’ নামক একটি সুন্দর মিশ্র রাগ তৈরি হয়।
- রামদাসী মল্লার: এই রাগে মিয়াঁ কি মল্লারের চলনের সাথে শুদ্ধ গান্ধারের একটি সূক্ষ্ম ছোঁয়া থাকে।
আরও দেখুন:
