ইতিহাস ও রাজনীতি সিরিজ

দ্য এপিক অফ দ্য ফাইভ সানস । গুরুত্বপূর্ণ মহাকাব্যগুলোর পরিচয় । ইতিহাস ও রাজনীতি সিরিজ

দ্য এপিক অফ দ্য ফাইভ সানস

মেসোআমেরিকার প্রাচীন অ্যাজটেক (Aztec) বা মেক্সিকা (Mexica) সভ্যতার পরিমণ্ডলে মহাবিশ্বের সৃষ্টি, পৌরাণিক বিবর্তন এবং পৃথিবীর বারবার ধ্বংস ও পুনরুত্থানের সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ রূপক মহাকাব্যিক রূপায়ণ হলো “দ্য এপিক অফ দ্য ফাইভ সানস” (Nahuatl: Nahui Tonatiuh, উচ্চারণ: ধ্রুপদী নাহুয়াতল ভাষায় নাহুই তনতিউহ বা বাংলায় ফাইভ সানস / পাঁচটি সূর্য)।

শব্দগত দিক থেকে ধ্রুপদী নাহুয়াতল ভাষায় ‘নাহুই’ (Nahui) শব্দের অর্থ ‘চার’ এবং ‘তনতিউহ’ (Tonatiuh) শব্দের অর্থ ‘সূর্য’। অর্থাৎ ‘নাহুই তনতিউহ’ বলতে মূলতঃ পূর্ববর্তী চার যুগের সূর্য এবং মহাজাগতিক চক্রকে বোঝায়। এটি মেসোআমেরিকার আদিবাসী নাহুয়াতল ভাষায় রচিত এবং গাছের বাকল ও হরিণের চামড়ায় তৈরি প্রাচীন ‘কোডেক্স’ (Codex) বা চিত্রলিপির মাধ্যমে সংরক্ষিত ছিল, যা ১৫১৯ সালের স্প্যানিশ বিজয়ের পর আলফাবেটিক লাতিন হরফে লিপিবদ্ধ করা হয়।

Table of Contents

একনজরে মূল কাহিনির সারাংশ ও সৃষ্টিতত্ত্বের পটভূমি

অ্যাজটেক দর্শনে মহাবিশ্ব বা সৃষ্টি হঠাৎ করে একদিনে একবারে জন্ম নেয়নি; বরং এটি ধারাবাহিক কিছু দেব-দ্বন্দ্ব, প্রাকৃতিক প্রলয় এবং নতুন সূচনার এক অন্তহীন চক্র। বর্তমান পৃথিবীর পূর্বে আরও চারটি পৃথক বিশ্ব বা সূর্য-যুগ বিদ্যমান ছিল, যা মানুষের নৈতিক অবক্ষয় এবং দেবতাদের অভ্যন্তরীণ সংঘর্ষের কারণে বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগে ধ্বংস হয়ে গেছে।

আমাদের বর্তমান পৃথিবী হলো পঞ্চম সূর্য বা ‘নাহুই ওলিন’ (Nahui Ollin – গতির সূর্য)-এর যুগ। কিন্তু অ্যাজটেক পুরাণ অনুযায়ী, এই পঞ্চম সূর্যও স্থায়ী নয়; একে আকাশে সচল ও জীবিত রাখার জন্য দেবতাদের আত্মত্যাগ এবং মানুষের প্রতিদিনের রক্ত ও ভক্তির সংমিশ্রণ প্রয়োজন। এই চরম নাটকীয় ও আধ্যাত্মিক সৃষ্টিতত্ত্বেরই মহাকাব্যিক গাথা হলো এটি।

রচনা ও সংকলনের ইতিহাস: অ্যাজটেক কোডেক্স ও ফ্লোরেন্টাইন নথি

এই মহাকাব্যটি কোনো একক মহাকবি বা লেখকের নির্দিষ্ট সময়ে কলমে রচিত সাহিত্যকর্ম নয়; এটি অ্যাজটেক সাম্রাজ্যের রাজধানী তেনোচতিৎলান (Tenochtitlan)-এর পুরোহিত, জ্যোতির্বিদ ও চারণদের মাঝে মৌখিকভাবে এবং চিত্রলিপির মাধ্যমে শতাব্দী ধরে সংরক্ষিত ছিল।

১৫১৯ সালে স্প্যানিশ বিজয়ের পর ফ্রান্সিসকান সন্ন্যাসী বার্নার্ডিনো দে সাহাগুন (Bernardino de Sahagún) আদিবাসী পণ্ডিদের সাহায্য নিয়ে ষোড়শ শতাব্দীতে এটি প্রখ্যাত ‘ফ্লোরেন্টাইন কোডেক্স’ (Florentine Codex) এবং ‘কোদিস চিরোমালপোপোকা’ (Codex Chimalpopoca) নামক গ্রন্থে নাহুয়াতল ও স্প্যানিশ ভাষায় বিশ্বস্ততার সাথে সংকলন করেন।

অ্যাজটেক সভ্যতা ও মেসোআমেরিকান বিশ্বদৃষ্টির দর্পণ

এই গ্রন্থটি অ্যাজটেক সভ্যতার ধর্মবিশ্বাস, সুসংবদ্ধ ক্যালেন্ডার সিস্টেম (Aztec Sun Stone) এবং প্রকৃতিবাদী বিশ্বদৃষ্টির এক নিখুঁত দর্পণ। অ্যাজটেক সমাজে সূর্য ছিল সমস্ত প্রাণশক্তি ও জীবনের আধার। সূর্যকে সচল রাখার জন্য মহাজাগতিক শক্তিকে রক্ত দিতে হবে—এই পরম বিশ্বাসই তাদের সমগ্র রাজনৈতিক, সামাজিক ও সামরিক কাঠামোকে পরিচালিত করত। প্রকৃতির অদম্য রুদ্ররূপ এবং মানুষের নশ্বরতার মধ্যকার সম্পর্ক এই পৌরাণিক আখ্যানে অত্যন্ত মনস্তাত্ত্বিক গভীরতায় ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।

বিস্তারিত গল্পের সারাংশ: প্রথম চারটি সূর্য থেকে বর্তমান পঞ্চম যুগের সূচনা

প্রথম সূর্য: ওসেলে এতনতিউহ (Ocelotltonatiuh) – জাগুয়ারের যুগ

কাহিনির সূচনা হয় আদি পরম দ্বৈত-দেবতা ওমেতেউতেল (Ometeteotl)-এর ইচ্ছায় মহাবিশ্ব সৃষ্টির মাধ্যমে। প্রথম যুগে আলো ও সূর্য নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বে ছিলেন রাতের অন্ধকারের দেবতা তেৎস্লিপোকা (Tezcatlipoca)। এই যুগের মানুষ ছিল দৈত্যাকৃতির ও বিশাল শক্তিশালী, যারা মূলত বুনো ফলমূল ও পাথর খেত। একপর্যায়ে তেৎস্লিপোকা এবং তাঁর চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ‘পক্ষিল সর্প’ দেবতা কেতসালোয়াতল (Quetzalcoatl)-এর মধ্যে যুদ্ধ বেঁধে যায়। কেতসালোয়াতলের আঘাতে সূর্যরূপী তেৎস্লিপোকা আকাশ থেকে নিচে পড়ে যান এবং ক্রুদ্ধ হয়ে প্রকাণ্ড জাগুয়ার (চিতাবাঘ) রূপ ধারণ করে পৃথিবীর সমস্ত মানুষকে গ্রাস করেন। ফলে প্রথম যুগের অবসান ঘটে।

দ্বিতীয় সূর্য: এহেকাতেলিয়াত (Ehecatltonatiuh) – বাতাসের যুগ

দ্বিতীয় যুগে সূর্য হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন বায়ু ও প্রজ্ঞার দেবতা কেতসালোয়াতল। এই যুগে মানুষ সভ্য হতে শুরু করে, কিন্তু ধীরে ধীরে তারা দেবভীতি ভুলে অহংকারী ও নৈতিকভাবে দুর্নীতিগ্রস্ত হয়ে পড়ে। তখন ক্ষুব্ধ তেৎস্লিপোকা আকাশ থেকে প্রচণ্ড ভয়ংকর ঘূর্ণিঝড় ও তুফান নামিয়ে আনেন। বাতাসের তাণ্ডবে সমগ্র পৃথিবী লণ্ডভণ্ড হয়ে যায়; টিকে থাকার জন্য মানুষগুলো কোনোমতে গাছে আশ্রয় নিয়ে বানরে রূপ নেয় এবং দ্বিতীয় বিশ্ব ধ্বংস হয়ে যায়।

তৃতীয় সূর্য: কিইয়াহুইতনতিউহ (Quiyahuitlonatiuh) – বৃষ্টির যুগ

তৃতীয় যুগের সূর্য হন বৃষ্টি, বজ্র ও ঝড়ের দেবতা তলালোক (Tlaloc)। এই যুগের মানুষও একপর্যায়ে দেবতাদের প্রতি অবাধ্য ও কৃতজ্ঞতাহীন হয়ে পড়ে। তলালোক ক্ষুব্ধ হয়ে পৃথিবীতে দীর্ঘ খরা পাঠান এবং পরিশেষে আকাশ থেকে সাধারণ বৃষ্টির বদলে উত্তপ্ত অগ্নিবৃষ্টি ও গলিত লাভা বর্ষণ করে সমগ্র পৃথিবী ভস্মীভূত করে দেন। মানুষগুলো বাঁচার জন্য ডানা মেলে পাখি ও মুরগিতে রূপান্তরিত হয়, যার মাধ্যমে তৃতীয় যুগের করুণ পতন ঘটে।

চতুর্থ সূর্য: চালচিউহিতলাতনতিউহ (Chalchihuitlatonatiuh) – জলের যুগ

চতুর্থ যুগের সূর্য হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন নদী ও সমুদ্রের দেবী চালচিউহিতলিকুয়ে (Chalchiuhtlicue)। কিন্তু এই যুগেও মানবজাতি হিংসা ও পাপে লিপ্ত হয়। দেবীর হৃদয় এতে গভীরভাবে ব্যথিত হয় এবং তিনি এত তীব্র ক্রন্দন শুরু করেন যে তাঁর চোখের জল ও আকাশ ভেঙে চারপাশ প্লাবিত হয়ে যায়। সেই মহাপ্লাবনে (Great Deluge) সমস্ত পৃথিবী জলের নিচে তলিয়ে যায় এবং বেঁচে থাকার সুবিধার্থে মানুষগুলো মাছে রূপান্তরিত হয়ে যায়।

পঞ্চম সূর্য: নাহুই ওলিন (Nahui Ollin) ও বর্তমান পৃথিবীর সূচনা

চারটি বিশ্ব ধ্বংস হওয়ার পর পুরো মহাবিশ্ব এক অসীম অন্ধকারে নিমজ্জিত হয়। দেবতারা তখন মেসোআমেরিকার প্রাচীন পবিত্র শহর তেওতিহুয়াকান (Teotihuacan)-এ সমবেত হয়ে একটি নতুন সূর্য ও চাঁদ সৃষ্টির জন্য মহাসভার আয়োজন করেন।

সূর্য হওয়ার জন্য দুই দেবতা এগিয়ে আসেন—একজন ধনবান ও অহংকারী তেকুচিস্তেকাতল (Tecuciztecatl) এবং অপরজন দরিদ্র, সর্বাঙ্গে ক্ষতগ্রস্ত কিন্তু বিনম্র নানাহুয়াতসিন (Nanahuatzin)। দেবতারা এক বিশাল পবিত্র অগ্নিপ্রজ্বলন করেন। অহংকারী তেকুচিস্তেকাতল আগুনে ঝাঁপ দিতে ভয়ে চারবার ইতস্তত করেন, কিন্তু বিনীত নানাহুয়াতসিন কোনো দ্বিধা না করে ধেয়ে আসা আগুনের কুণ্ডলীতে আত্মাহুতি দেন। তাঁর সেই মহৎ ত্যাগের ফলে তিনি আকাশে জ্বলজ্বলে প্রথম সূর্য হিসেবে উদিত হন। লজ্জায় তেকুচিস্তেকাতলও পরে আগুনে ঝাঁপ দেন এবং আকাশে দ্বিতীয় সূর্য হিসেবে উদিত হন।

কিন্তু দুই সূর্য একসাথে উঠায় পৃথিবী অতিরিক্ত উত্তপ্ত হয়ে উঠছিল, তাই দেবতারা তেকুচিস্তেকাতলের মুখে একটি খরগোশ ছুঁড়ে মেরে তাঁর আলো কমিয়ে তাঁকে ‘চাঁদে’ পরিণত করেন। তবে নতুন সূর্য ও চাঁদ আকাশে স্থির হয়ে আটকে ছিল—চলছিল না। তখন দেবতারা বুঝতে পারেন, সূর্যকে গতিশীল করতে জীবনের স্পন্দন প্রয়োজন। তাঁরা নিজেদের রক্ত ও জীবনশক্তি উৎসর্গ করেন, যার ফলে মহাকাশে গতি ফিরে আসে এবং পঞ্চম সূর্য ‘ওলিন’-এর সূচনা হয়। এই যুগেই আজকের আধুনিক মানুষের বসবাস।

গুরুত্বপূর্ণ দেবতা ও চরিত্রসমূহ এবং তাদের পৌরাণিক ভূমিকা

দেবতা: কেতসালোয়াতল (Quetzalcoatl)

  • পরিচয় ও পৌরাণিক ভূমিকা: ‘Feathered Serpent’ বা পক্ষিল সর্প দেবতা। বাতাস, প্রজ্ঞা, শিক্ষা এবং মানবজাতিকে পুনরায় হাড় থেকে পুনরুজ্জীবিত করার প্রধান রূপকার।
  • মনস্তাত্ত্বিক ও রূপক তাৎপর্য: সৃষ্টিশীলতা, প্রজ্ঞা, সহমর্মিতা এবং সভ্যতার রূপক প্রতীক।

দেবতা: তেৎস্লিপোকা (Tezcatlipoca)

  • পরিচয় ও পৌরাণিক ভূমিকা: ‘Smoking Mirror’ বা ধোঁয়াটে আয়নার দেবতা। রাতের আকাশ, যুদ্ধ ও জাদুর শাসক।
  • মনস্তাত্ত্বিক ও রূপক তাৎপর্য: বিশৃঙ্খলা, মহাজাগতিক রূপান্তর, অহংকার এবং প্রলয়ের প্রাকৃতিক শক্তি।

দেবতা: নানাহুয়াতসিন (Nanahuatzin)

  • পরিচয় ও পৌরাণিক ভূমিকা: বিনম্র, দরিদ্র ও ব্যাধিগ্রস্ত দেবতা, যিনি নিজেকে উৎসর্গ করেছিলেন।
  • মনস্তাত্ত্বিক ও রূপক তাৎপর্য: প্রকৃত আত্মত্যাগ, অহংকারহীনতা এবং বিনয়ের শক্তি যা অন্ধকার ভেদ করে আলো নিয়ে আসে।

দেবতা: ওমেতেউতেল (Ometeteotl)

  • পরিচয় ও পৌরাণিক ভূমিকা: আদি ও পরম দ্বৈত ঈশ্বর (পুরুষ ও নারীর সম্মিলিত রূপ)।
  • মনস্তাত্ত্বিক ও রূপক তাৎপর্য: মহাবিশ্বের উৎস শক্তি এবং আলো-আধার বা জীবন-মৃত্যুর মৌলিক দ্বৈততার (Duality) উৎস।

প্রধান ঘটনা ও মোড় পরিবর্তনকারী স্থানসমূহ (Turning Points)

  • চারটি পূর্ববর্তী বিশ্বের প্রলয়: মানুষের পাপাচার ও দেবতাদের দ্বন্দ্বে জাগুয়ার, বাতাস, অগ্নিবৃষ্টি এবং মহাপ্লাবনে একের পর এক যুগ ধ্বংস হওয়ার ঘটনা।
  • তেওতিহুয়াকানের পবিত্র অগ্নিতে আত্মাহুতি: মহাবিশ্বের অন্ধকার দূর করতে বিনীত দেবতা নানাহুয়াতসিনের আগুনে ঝাঁপ দেওয়া এবং সূর্য হিসেবে পুনর্জন্ম নেওয়া।
  • দেবতাদের রক্তদান ও সূর্যের গতিশীলতা: পঞ্চম যুগের সূর্যকে আকাশে সচল রাখার উদ্দেশ্যে দেবতাদের নিজস্ব রক্ত উৎসর্গ এবং কালানুক্রমিক সৃষ্টিচক্র সচল হওয়া।

ধর্ম, দর্শন এবং নৈতিক শিক্ষা: মহাজাগতিক ঋণ ও নশ্বরতা

মহাজাগতিক ঋণ এবং বলিদানের দর্শন

দ্য এপিক অফ দ্য ফাইভ সানস-এর মূল দার্শনিক ভিত্তি গড়ে উঠেছে চরম ভারসাম্য এবং ত্যাগের ওপর। এর প্রধান বার্তা হলো—আমরা যে পৃথিবীতে বাস করছি, তার অস্তিত্ব চিরস্থায়ী নয়; এটি অত্যন্ত ভঙ্গুর। দেবতারা নিজেদের রক্ত ও আত্মাহুতি দিয়ে এই সূর্য সৃষ্টি করেছেন, ফলে মানবজাতি দেবতাদের কাছে এক মহাজাগতিক ঋণে (Cosmic Debt) আবদ্ধ। অহংকার, অন্যায্যতা এবং প্রকৃতির সাথে বৈরিতা মুহূর্তের মধ্যে একটি উন্নত সভ্যতাকে বিনাশের মুখে ঠেলে দিতে পারে।

প্রধান মূলভাবসমূহ (Core Themes)

  • সৃষ্টি ও ধ্বংসের চিরন্তন চক্র (Cycle of Creation & Destruction): পৃথিবীর কোনো কিছুই স্থায়ী নয়, প্রলয়ের মাধ্যমেই নতুন জীবনের জন্ম হয়।
  • বলিদানের অপরিহার্যতা (Inevitability of Sacrifice): সামষ্টিক আলো ও জীবন টিকিয়ে রাখতে ব্যক্তি-স্বার্থ বা আত্মত্যাগের মানসিকতা অপরিহার্য।
  • প্রকৃতির সামনে মানুষের নশ্বরতা (Human Vulnerability): প্রকৃতির অসীম রুদ্ররূপের সামনে মানুষের অহংকার কতখানি তুচ্ছ।

বিশ্বসাহিত্যে গুরুত্ব এবং মেসোআমেরিকান সংস্কৃতির শেকড়

বিশ্বসাহিত্যের দরবারে এই অ্যাজটেক মহাকাব্যটি গ্রিক পৌরাণিক কাহিনীর ‘গোল্ডেন এজ’ বা বাইবেলের ‘নোহের মহাপ্লাবনে’র ধারণার সমকক্ষ আমেরিকার আদিম সাহিত্যের মুকুটে এক উজ্জ্বল রত্ন। মেসোআমেরিকান আদিবাসীদের জ্যোতির্বিদ্যা, সুসংবদ্ধ স্থাপত্য ও বিখ্যাত ‘স সূর্য ক্যালেন্ডার’ (Calendar Stone)-এর পেছনের গভীর পৌরাণিক ভিত্তি বুঝতে এই মহাকাব্যের বিকল্প নেই।

আজকের আধুনিক পৃথিবীতে ফাইভ সানস মহাকাব্যের প্রাসঙ্গিকতা

একবিংশ শতাব্দীর এই জলবায়ু সংকট, গ্লোবাল ওয়ার্মিং এবং পরিবেশগত বিপর্যয়ের যুগে অ্যাজটেকদের এই ফাইভ সানস আখ্যানটি নতুন করে রূপক সতর্কবার্তা দেয়। অ্যাজটেকদের ভয় ছিল—মানুষ যদি প্রকৃতির নিয়মের বাইরে গিয়ে অহংকারী হয়ে ওঠে, তবে পঞ্চম সূর্যও একদিন থমকে যাবে এবং পৃথিবী এক বিশাল ভূমিকম্পে ধ্বংস হবে। আজকের বৈশ্বিক পরিবেশ অবক্ষয়ের যুগে প্রকৃতির সাথে সামঞ্জস্য রেখে বাঁচার প্রয়োজনীয়তা এই রূপক গাথা আমাদের নতুন করে মনে করিয়ে দেয়।

পাঠকদের জন্য প্রামাণিক অনুবাদ ও সংস্করণ গাইডলাইন

প্রাচীন নাহুয়াতল ভাষার কোডেক্স চিত্রলিপি সরাসরি পড়া জটিল হওয়ায় প্রখ্যাত মেসোআমেরিকান গবেষক ও অনুবাদক মিগুয়েল লিয়ন-পোর্টিলা (Miguel León-Portilla)-র রচিত ‘The Broken Spears’ বা ‘Aztec Thought and Culture’ এবং ফ্রায়ার বার্নার্ডিনো দে সাহাগুনের ‘Florentine Codex’-এর আধুনিক ইংরেজি অনুবাদ পাঠকদের জন্য সবচেয়ে প্রামাণিক উৎস।

সমালোচনামূলক মূল্যায়ন: পৌরাণিক রূপক বনাম ঐতিহাসিক বলিদানের বাস্তবতা

এই মহাকাব্যের সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য হলো এর বিস্ময়কর রূপক কল্পনাশক্তি এবং সৃষ্টির গভীর দর্শন। তবে ঐতিহাসিক ও নৃবিজ্ঞানীদের মতে, এই পৌরাণিক আখ্যানের চরমপন্থী ব্যাখ্যা প্রদান করেই পরবর্তীকালের অ্যাজটেক শাসক ও পুরোহিতরা নিজেদের সামরিক রাজনৈতিক প্রভাব ধরে রাখতে ব্যাপকভাবে ‘মানবধন বা নরবলি’র (Human Sacrifice) মতো ভয়ংকর প্রথা চালু করেছিল। মহাজাগতিক ঋণের দোহাই দিয়ে হাজার হাজার মানুষকে বলি দেওয়ার এই ঐতিহাসিক নৃশংসতা আধুনিক নৈতিকতার দৃষ্টিতে অত্যন্ত কঠোরভাবে সমালোচিত হয়, যা এই মহাকাব্যের গভীর দার্শনিক আবেদনকে ঐতিহাসিক বাস্তবতায় কিছুটা প্রশ্নবিদ্ধ করে তোলে।

আরও দেখুন:
শেয়ার করুন: Facebook X WhatsApp LinkedIn

প্রেস ডেস্ক, সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর এর অফিস

সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর এর নিজের সকল লেখা, শুভেচ্ছা, স্মরণ ইত্যাদি এই ডেস্ক থেকে প্রকাশিত হয়।

সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সম্পাদক, কুষ্টিয়া জেলা আওয়ামী লীগ। ইতিহাস, রাজনীতি, প্রযুক্তি ও উন্নয়ন নিয়ে লেখালেখি।

যোগাযোগ

কুমারখালী বাস স্ট্যান্ড, দুর্গাপুর, কুমারখালী।
+৮৮০ (১৭) ৬৩০৩৮,৬৩০৩৯।contact@sufifaruq.com

© ২০২৬ সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।