“ইসলামি স্বর্ণযুগ” “ইসলামের স্বর্ণযুগ” [The Islamic Golden Age ] কী, কেন, কিভাবে?

“ইসলামি স্বর্ণযুগ” “ইসলামের স্বর্ণযুগ” [The Islamic Golden Age ] কী, কেন, কিভাবে?

রমজানে গঠিত আমাদের “বায়তুল হিকমাহ” পাঠচক্র থেকে প্রথম লেখাটি লিখেছেন – রাজিব হাসান

তিনি লিখেছেন “ইসলামের স্বর্ণযুগ” এর অর্জন নিয়ে, যেটা আমার ভাষায় “মুসলিমদের স্বর্ণযুগ”। সেই যুগে জ্ঞান-বিজ্ঞানে “মুসলিমদের” অগণিত অবদান নিয়ে। কুরআনের প্রথম আদেশ “ইকরা” কে সত্যিকারের অর্থে ব্যবহার করার ফলাফল নিয়ে।

এরপর আপনাদের সম্মিলতি আলোচনায় অনেকগুলো প্রশ্ন উঠে এসেছে। সেই প্রশ্নগুলোর উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করছি। পাশাপাশি একটু আলো ফেলতে চাই সেই যুগের উপর। সেই বিশেষ সময়টার উপর।

সেই সময় কোনটি? কিভাবে এসেছিল? কেমন ছিল?

সেটা কি সামরিক শক্তি বা যুদ্ধজয়ের কারণে এসেছিল?

আব্বাসীয়দের মতো সামরিক উত্থান তো বহুবার হয়েছে, বড়ো খেলাফত প্রতিষ্ঠা হয়েছে, কিন্তু সেসব খেলাফতকে তো “মুসলিমদের স্বর্ণযুগ” বলা হয় না?

বাগদাদের খলিফা আল-মনসুরের “বায়তুল-হিকামহ” স্থাপন (৭৫৪ খ্রিষ্টীয় সাল) থেকে শুরু করে ১১ শতকের শেষ বা ১২ শতকের শুরু পর্যন্ত (কেউ ১২৫৪ সালের মঙ্গল আক্রমণ পর্যন্ত বলেন) “মুসলিমদের স্বর্ণযুগ” বলে। এই সময়টুকুর মতো জ্ঞান-বিজ্ঞানে অর্জনের সুসময় মুসলিমদের দীর্ঘ ইতিহাসে আর কখনও আসেনি।

ইসলামি স্বর্ণযুগ "ইসলামের স্বর্ণযুগ" [The Islamic Golden Age ] কী, কেন, কিভাবে? - "ইসলামি স্বর্ণযুগ" "ইসলামের স্বর্ণযুগ" [The Islamic Golden Age ] কী, কেন, কিভাবে? - আহমেদ ইবনে মুসা ইবনে শাকিরের যন্ত্রবিষয়ক বইয়ে স্বয়ংক্রিয় বাতির চিত্র।
“ইসলামি স্বর্ণযুগ” “ইসলামের স্বর্ণযুগ” [The Islamic Golden Age ] – আহমেদ ইবনে মুসা ইবনে শাকিরের যন্ত্রবিষয়ক বইয়ে স্বয়ংক্রিয় বাতির চিত্র।

“ইসলামি স্বর্ণযুগ” কিভাবে এসেছিল সে সময়?

কারণ আল-মনসুর এবং তার সুযোগ্য পুত্র হারুন-আল-রশিদের খেলাফতে পুরো মুসলিমদের ইতিহাসে একটি ব্যতিক্রমী সময় ও পরিবেশ তৈরি করতে পেরেছিল। ইতিহাসে কোন দেশের মুসলিমরা আর একবারও পারেনি।

এমন একটি পরিবেশ- যেখানে মুসলিমরা সবচেয়ে বেশি কুসংস্কার ও অহংকার মুক্ত হয়ে জ্ঞান বিজ্ঞানের চর্চা করতে পেরেছিল। মামুন বিশ্বাস করতেন জ্ঞান বিজ্ঞানের বিস্তারের জন্য সকল কুসংস্কার মুক্ত হয়ে, সব জানালা দরজা খুলে দিতে হবে। খিলাফত হতে পৃষ্ঠপোষকতা দিতে হবে, নিরাপত্তা দিতে হবে। আর শুধুমাত্র ইসলামিক টেক্সটই নয়, সব দেশের, সব ধর্মের, মতের টেক্সটগুলোকেও পড়তে হবে। সেই বিশ্বাস থেকেই এমন একটি পরিবেশ তিনি তৈরি করেছিল- যেখানে শুধুমাত্র মুসলিমরাই নয়, সব মতের, সব ধর্মের, সব বিশ্বাসের, সব যুক্তির আলেম/পণ্ডিতরা নিশ্চিন্তে, নিরাপদে ও নির্ভয়ে জ্ঞানচর্চা করেছে।

শিক্ষক শিক্ষার্থীরা উভয়ই খেলাফতের বৃত্তির আওতায় থাকবে, তাই তাদের আর্থিক দুশ্চিন্তা করতে হবেনা। তার গবেষণার বিষয়বস্তু কোন দলের সেন্টিমেন্ট বিরোধী হলও খিলাফতের নিরাপত্তা বেষ্টনীতে সে নিরাপদ থাকবে। তার গবেষণার ফলাফল নেগেটিভ/পজিটিভ যাই হোক, প্রকাশ করতে তাকে ভয় পেতে হবে না।

কেমন ছিল সেই সময়, “ইসলামি স্বর্ণযুগ”?

সে সময়ের কয়েকটি ঘটনা তুলে ধরলে, সেই পরিবেশ সম্পর্কে আপনাদের ধারনা পেতে সুবিধা হবে।

– সারা পৃথিবী থেকে উটের পিঠে বোঝাই করে আসছে বিভিন্ন দেশের বই। ধর্মীয় বই, ইতিহাস, সাহিত্য যা যেখানে পাওয়া যাচ্ছে। ভারতের ওস্তাদ পণ্ডিতদের দাওয়াত দেয়া হয়েছে, তারা আনছে বই।

বাইজেন্টাইন সম্রাট থিওফিলোসের কাছে আল মামুনের দূত।
“ইসলামি স্বর্ণযুগ” “ইসলামের স্বর্ণযুগ” [The Islamic Golden Age ] – বাইজেন্টাইন সম্রাট থিওফিলোসের কাছে আল মামুনের দূত।
জাষ্টিনিয়ান এর কাছে বিনীত ভাবে খলিফা লিখছেন প্লেটোর লাইব্রেরীর বইগুলো ধার দেবার জন্য। শুধু বই ধার নেবার জন্য উপহার হিসেবে পাঠাচ্ছেন মনি মুক্তার উপহার। ভাবুন? ঘুণে খাওয়া পতিত লাইব্রেরীর জন্য নত হয়ে বহু দামী মনি মুক্তা!

– বায়তুল হিকমায় শত শত স্কলার নতুন আসা বইগুলো আরবিতে অনুবাদ করছেন। অন্য কোন দেশের লোক পড়ার আগ্রহ দেখালে, বিনা মূল্যে তার ভাষায় অনুবাদ করে দেয়া হচ্ছে। স্কলারদের নিয়মিত বিভিন্ন বিষয়ে বক্তৃতা-বিতর্ক হচ্ছে খলিফার উপস্থিতিতে। সব মতের পথের মানুষ নির্ভয়ে বলছে তাদের দর্শন। আজ তাদের কিছু লেখা থেকে বোঝা যায় সেসব মতের মধ্যে আজকের বিচারের প্রচুর ব্লাসফেমাস দর্শনও ছিল। কিন্তু লক্ষণীয় যেটা যে বিরুদ্ধ মত হলেই তাকে মেরে-কেটেই জবাব দিতে হবে, এমন সংস্কৃতি একটা ভয়ের সংস্কৃতি গড়ে তোলেনি। বরং কোনো ভাবনার বিরুদ্ধে লড়াই করতে চাইলে ভাবনা দিয়েই লড়াই করতে হবে, তলোয়ার দিয়ে নয়। এরকম একটি পরিবেশ গড়েছিল।

– ভারতের সিন্ধু থেকে পণ্ডিত “কানাক” পৌঁছচ্ছেন বায়তুল হিকমায় “সুরিয়া সিদ্ধান্ত” সহ ৫ টি বই নিয়ে। ভারতের ঋষিদের লেখা প্রথম জ্যোতির্বিজ্ঞানের বই। খলিফা মনসুর সেই বইয়ের কিছু অংশ শুনে এতই মুগ্ধ হলেন যে, ফাজারিকে আদেশ দিলেন পণ্ডিতকে রাষ্ট্রীয় আতিথেয়তায় রেখে বইগুলোর অনুবাদ শুরু করতে। নাম দেয়া হল “সিন্ধ হিন্দ”। এখান থেকেই বইটি প্রথম গেছে স্পেনে। স্পেন থেকে ছড়িয়ে গেছে পুরো ইউরোপে। বললে অত্যুক্তি হবে না যে এই বইটিই ইউরোপের জ্যোতির্বিজ্ঞানের ফাউন্ডেশন।

– বায়তুল হিকমার আচার্য (প্রমুখ) ছিলেন একজন খ্রিষ্টান। ইসহাক বীণ হুনাইন। আজকের পরিবেশের সাথে ভেবে দেখুন- কোন মুসলিম খেলাফতের সবচেয়ে বড় জ্ঞান-কেন্দ্রের দায়িত্ব দেয়া হচ্ছে একজন বিধর্মীকে! খলিফা সেই আমলে ওই কমিউনাল সেন্টিমেন্টকে দুই পয়সার পাত্তা দেননি। দেখিয়েছেন মেরিট্রোক্রেসি। এসব কথা উঠলে বলেছিলেন ইসহাকের বেশি যোগ্য কোন মুসলমান থাকলে সে প্রতিযোগিতায় ইসহাক হারিয়ে আসুক, আমি তাকে নিয়োগ নেব। কিন্তু শুধুমাত্র মুসলিম নিয়োগ দিতে হবে জ্ঞ্যনকেন্দ্রের উদ্দেশ্যের সাথে কম্প্রোমাইজ করবো না।

– আব্বাসীয় খলিফারা দশ শকতের আগে পর্যন্ত বারবার উদারতার জন্য কট্টরপন্থী মোল্লাদের কাছে সমালোচিত হয়েছিলেন। তাদের মন্ত্রীসভায় আফগানিস্তান থেকে যাওয়া একজন বুদ্ধ পুরোহিতের ছেলে ছিল বলে তলে তলে বুদ্ধ হয়ে যাবার অভিযোগও হয়েছিল। কারন ইসলামের কট্ট্ররপন্থি কিছু ব্যাখ্যাকে বর্জন করে তারা এতটাই উদার ব্যখ্যা গ্রহন করেছে যারা সাথে শরিয়ার চেয়ে বেশি বুদ্ধ সংস্কৃতির মিল ভেবে বের করা সম্ভব ছিল। সেই অভিযোগকেও তারা পাত্তা দেননি।

ইসলামের স্বর্ণযুগের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্বগণ; উপর থেকে ঘরির কাটার দিকে: আল-জাহরাবী, আব্বাস ইবনে ফিরনাস, আল-বেরুনী, ইবনে সিনা, ইবনে রুশদ, ইবনুন নাফিস, আল-খারেজমি, ইবনুল হায়সাম, ইবনে খালদুন
ইসলামের স্বর্ণযুগের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্বগণ; উপর থেকে ঘরির কাটার দিকে: আল-জাহরাবী, আব্বাস ইবনে ফিরনাস, আল-বেরুনী, ইবনে সিনা, ইবনে রুশদ, ইবনুন নাফিস, আল-খারেজমি, ইবনুল হায়সাম, ইবনে খালদুন

এবার একটু গভীর ভাবে চিন্তা করুন। কেন আর সেরকম সময় একবারও আসেনি মুসলিমদের ইতিহাসে? আমি জানি, জবাব আপনি ইতমধ্যে পেয়ে গেছেন।

আরব মুসলিমদের সেই স্বর্ণযুগ নিয়ে আমরা অত্যন্ত গর্বিত। গর্ব করার বিষয়ই বটে।
আমরা নিজেরা সেটার অংশ না হলেও ফেলো মুসলিম হিসেবে ভালো লাগে।
কিন্তু বিজ্ঞান প্রযুক্তি এমন কোন বিষয় নয় যে একবার আবিস্কার করে ফেললেই তা দিয়ে যুগের পর পর যুগ চলে।

সেসময় আমাদের অনেক অবদান থাকলেও, আজকের আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে আমাদের অবদান প্রায় শুন্যের কোঠায় এসে গেছে।
বিজ্ঞান প্রযুক্তিতে অতীত ইতিহাস বাদে গর্ব করার আর কিছু আমাদের নেই।
তাই আজকে আসুন অতীত ইতিহাসের গর্বকে পুঁজি করে করে এমন একটি পরিবেশ তৈরির প্রতিজ্ঞা করি, যেখানে আবার বায়তুল হিকমার মতো জ্ঞ্যানকেন্দ্র তৈরি হবে, মনসুর-হারুন-মামুন এর খেলাফতের মতো মুক্ত জ্ঞ্যান চর্চার একটি সময় ফিরিয়ে আনা যাবে।

*** এছাড়া জের, জবর, নোক্তার ভুলের মতো কিছু “ট্রিভিয়াল ইস্যু” এসেছে। যেগুলোর আলোচনা ওখানেই হয়েছে বলে আমি আর সেগুলো নিয়ে লিখলাম না।

[ “ইসলামি স্বর্ণযুগ” “ইসলামের স্বর্ণযুগ” [The Islamic Golden Age ]  ]

আরও পড়ুন:

মন্তব্য করুন