বালিকা পথ-শিশুদের সমস্যা – একটি সাধারণ জরিপ

বালিকা পথ শিশুদের সমস্যা – একটি সাধারণ জরিপ

ব্যক্তিগত আগ্রহে যায়গা থেকে ২৫/০৩/২০১০ তারিখে ২৫ জন পথ শিশুর উপরে একটি জরিপ চালানো হয়। পরিচালিত তথ্য প্রাপ্ত তথ্যের সার সংক্ষেপ নিম্নে বর্ণিত হল:

জরিপের জন্য ব্যবহৃত প্রশ্নমালা:
জরিপের শিরোনাম : ‘বালিকা পথ শিশুদের সমস্যা’।

(এই প্রশ্নমালার তথ্যাবলী গবেষণার কাজে ব্যবহার করা হবে। প্রদত্ত তথ্যাবলীতে প্রদানকারী ব্যক্তিকে আলাদা করে চেনা যায় এরকম পরিচয় সমূহ সম্পূর্ণ গোপন রাখা হবে।)

১. ব্যক্তিগত তথ্যাবলীঃ
১.১ ক্রমিক নং
১.২ উত্তরদাতার নাম :
১.৩ উত্তরদাতার বয়স :
১.৪ উত্তরদাতার ধর্ম :
১.৫ উত্তরদাতার শিক্ষাগত যোগ্যতা :
১.৬ উত্তরদাতার পেশা :
১.৭ উত্তরদাতার শিক্ষা :
১.৮ উত্তরদাতার বৈবাহিক অবস্থা :

২. পারিবারিক তথ্যাবলীঃ
২.১ পরিবারের ধরন :
২.২ পরিবারের প্রধান কে?
২.৩ পরিবারের প্রধানের সাথে সম্পর্ক?
২.৪ পরিবারের কোথায় থাকেন?
২.৫ পরিবারের সদস্য সংখ্যা কত?
২.৬ পরিবারের সদস্যদের বিবরণ?

৩. আর্থ-সামাজিক তথ্যাবলী:
৩.১ আপনার পরিবারের কেউ আয় করে কি?
৩.২ উত্তর যদি হ্যাঁ হয় তবে কে করে?
৩.৩ আপনার দৈনিক আয় কত?
৩.৪ আপনার মাসে ব্যয় কত?
৩.৫ আপনার কোন সঞ্চয় থাকে কি?
৩.৬ উত্তর যদি হ্যাঁ হয় তবে কত টাকা?

৪. বিষয়ভিত্তিক তথ্যাবলীঃ
৪.১ আপনি কতদিন ধরে পেশায় নিয়োজিত ?
৪.২ এই পেশা ছাড়া অন্য কোন কাজ করেন কিনা?
৪.৩ উত্তর যদি হ্যাঁ হয় তাহলে কি কাজ করেন?
৪.৪ উত্তর যদি হ্যাঁ হয় তাহলে কি কাজ করেন?
৪.৫ উপার্জিত আয় দিয়ে পরিবারের ভরণপোষণ সঠিকভাবে হয় কিনা?
৪.৬ খাবারে কত টাকা খরচ হয়?
৪.৭ আপনি কোন স্বাস্থ্য সমস্যার ভোগেন বেশি কিনা?
৪.৮ সাধারণত কোন ধরনের রোগ বেশি হয়?
৪.৯ আপনি লেখাপড়া করেন কিনা?
৪.১০ উত্তর যদি হ্যাঁ হয় তবে কোথায়?
৪.১১ উত্তর না হলে যদি সুযোগ করে দেয়া হয় তাহলে করবেন কিনা?
৪.১২ আপনি কি সিনেমা দেখেন?
৪.১৩ আপনি কি খেলাধুলা পছন্দ করেন?
৪.১৪ আপনর প্রিয় শখ কি?
৪.১৫ বড়রা আপনার সাথে কি ধরনের ব্যবহার করে?
৪.১৬ বর্তমানে আপনার কোন ধরনের সমস্যা বেশি হচ্ছে?
৪.১৭ কখন নিজেকে অসহায় মনে হয়?
৪.১৮ কোন শারীরিক নির্যাতনের স্বীকার হয়েছেন কিনা?
৪.১৯ কখনও যৌন নির্যাতনের স্বীকার হয়েছেন?
৪.২০ যদি হয়ে থাকেন কতদিন আগে?
৪.২১ আপনি পুলিশ হয়রানির স্বীকার হয়েছেন কিনা?
৪.২২ কোন নেশা গ্রহণ করেন কিনা?
৪.২৩ যদি নিয়ে থাকেন তা কোন ধরনের নেশা?
৪.২৪ এই অবস্থা থেকে রেহাই পেতে অন্য কোন অবস্থায় যেতে চান কিনা?
৪.২৫ আপনি বড় হয়ে কি হতে চান?

আপনাকে ধন্যবাদ-
তথ্য সংগ্রহকারীর স্বাক্ষর ও তারিখ:

জরিপের সাধারণ ফলাফল:
অংশগ্রহণকারী বালিকা পথ শিশুদের বয়স:
– সর্বাধিক সংখ্যক পথ-শিশু ১১-১৩ বছর বয়সের যার শতকরা হার ৩২
– সর্বাপেক্ষা কম পথ-শিশু ছিল ৫-৭ বছর বয়সের যার শতকরা হার ২০

অংশগ্রহণকারী বালিকা পথ শিশুদের জীবিকা:
– এদের মধ্যে ফুল বিক্রি করে সবচেয়ে বেশি শিশু যার শতকরা হার ১২
– কাগজ কুড়ায় ৪জন যার শতকরা হার ১৬
– ভিক্ষা করে ৪ জন যার শতকরা হার ১৬
– বাকী ৪ জন অন্যান্য কাজ করে যার শতকরা হার ১৬।

অংশগ্রহণকারী বালিকা পথ শিশুদের দৈনিক আয়:
– (৩০-৫০) টাকা দৈনিক আয় করে ৩ জন শিশু যার শতকরা হার ১২
– (৬০-৮০) টাকা আয় করে ৭ জন যার শতকরা হার ২৮
– (৯০-১১০) টাকা আয় করে ৭ জন যার শতকরা হার ২৮
– (১২০-১৪০) টাকা আয়করে ৮ জন যার শতকরা হার ৩২।

অংশগ্রহণকারী বালিকা পথ শিশুদের ব্যয়:
– মাসিক বায়ের পরিমাণ ১১০০-১৩০০ টাকা ৮ জনের, যার শতকরা হার ৩২
– মাসিক বায়ের পরিমাণ ৫০০-৭০০ টাকা ৪, জনের যার শতকরা হার ১৬
– প্রাসিঙ্গক : উক্ত জরিপে প্রদেয় উত্তরদাতার গবেষণা থেকে আরও জানা যায় যে, ২০% পরিবারের ক্ষেত্রে শিশুটির উপার্জনেই তার সংসার চলে। ফলে তাদের অনেক ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করতে হয়।

অংশগ্রহণকারী বালিকা শিক্ষা:
– ২৫ জন শিশুর মধ্যে নিরক্ষর বালিকা শিশু ১০ জন যার শতকরা হার ৪০
– অক্ষরজ্ঞান ৬ জন যার শতকরা হার ২৪। এর মধ্যে:
o ১ম – ৩য় – শ্রেণী ৭ জন যার শতকরা হার ২৮
o ৪র্থ থেকে ৫ম শ্রেণী ২ জন যার শতকরা হার ৮।

বাসস্থান:
২৫ জনের মধ্যে বর্তমানে ১২ জনের বাসস্থান সমস্যা বেশি হচ্ছে যার শতকরা হার ৪৮।

বস্ত্র:
বস্ত্র সমস্যায় রয়েছে ৫ জনের যার শতকরা হার ২০।

খাদ্য ও চিকিৎসা:
খাদ্য ও চিকিৎসা সমস্যা চলছে ৮ জনের যার শতকরা হার ৩২।

যৌন নির্যাতনের শিকার:
– ২৫ জন বালিকা পথ-শিশুর মধ্যে ৭ জনই যৌন নির্যাতনের স্বীকার হয়েছে যার শতকরা হার ২৮
– বাকী ১৮ জন নানারকম সমস্যার মুখোমুখি হয়েছেন যার শতকরা হার ৭২।

উত্তরদাতাদের মতামত মূল্যায়ন :
উত্তরদাতা বালিকা বা পথ শিশুদের মতামত বিশ্লেষণ করলে একটি বিষয় সুস্পষ্ট হয় আর তা হলে বালিকা পথ শিশু আর দশটা শিশু থেকে ভিন্ন। আর শিশুদের এই ভিন্নতা পরিলক্ষিত হয় মানুষের আচরণ দ্বারা। পথ শিশুদের প্রতি সাধারণত তেমন কেউ ভালো ব্যবহার করে না। ফলে পথ শিশুরা অভাগা এবং অবহেলা পেয়ে তারা ধীরে ধীরে খারাপের দিকে চলে যায়। ফলে তারা সমাজের জন্য হুমকিস্বরুপ। সকল পথ শিশুরা রাস্তায় জন্মায় না, কোন না কোন পরিবারে তাদের জন্ম হয়। কিন’ বিভিন্ন কারনে তারা পরবর্তীতে রাস্তায় নামতে বাধ্য তহয় এবং পথশিশুতে পরিণত হয়।

শিশুদের পথশিশু হবার পিছনে অনেক জটিল এবং পারিবারিক কারন রয়েছে। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য কারন গুলো হলঃ-

অর্থনৈতিক কারণঃ
ভুমিহীন, দারিত্রতা, সৎ বাবা মায়ের জন্য, অধিক আয়ের জন্য চাপ সৃষ্টিকরা, জীবিকার জন্য ঘন ঘন স’ান পরিবর্তণ।

পারিবারিক কারণঃ
বাবা মায়ের বহুবিবাহ, পারিবারিক বিশৃঙ্খলা, বাবা-মসায়ের বিচ্ছেদ, মানসিক নির্যাতন, যৌন নিপীড়ন ইত্যাদি।

আবেগ জনিত কারনঃ
বিশেষ করে রাগ, দুঃখ, ঘৃণার বশবর্তী হয়ে বাড়ি ছেড়ে বাইরে পথশিশুদের পরিণত হয়।

নৈতিক কারণঃ
নৈতিক ও মূল্যবোধের অভাব, অপহরন, প্রলোভন, পাচারকারীর খপপরে বিয়ের নামে প্রতারনা, বসি- উচ্ছেদ ইত্যাদি।

অন্যান্য কারণঃ
নদী ভাঙ্গনে, খরা, জ্বলোচ্ছ্বাস, অতিরিক্ত জনসংখ্যা ইত্যাদি, এছাড়া সম্পদের অপ্রতুলতা ও সুষ্ঠু কন্টনের অভাবে একটি বড় অংশ বালিকা পথশিশুতে পরিণত হয়। বিভিন্ন পরিসি’তি ও পরিবেশ শিশুদেরকে বাধ্য করে পথে নামতে।

উপসংহারঃ
বাংলাদেশে একটি উন্নয়নশীল দেশ। এদেশে শিক্ষা, স্বাস’্য বিভিন্ন ক্ষেত্রে উন্নয়ন হলেও আর্থ-সামাজিক সমস্যা বিদ্যামান। আমাদের দেশে দ্রুত জনসংখ্যা বেড়ে চলেছে এবং সেটা সমাজের জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। এদেশে মানুষের মৌলিক মানবিক চাহিদাগুলো ঠিক মতো পূরণ হচ্ছে না। ফলে মানুষ অপুষ্টি, অশিক্ষা ইত্যাদি নানা সমস্যা ভুগছে।

এছাড়াও আমাদের দেশে প্রাকৃতিক দুর্যোগ, নদী ভাঙ্গন ইত্যাদি কারণে মানুষ গ্রাম থেকে শহরে স’ানান-রিত হচ্ছে। গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর এই শহরমুখী হওয়ার কারণে সৃষ্টি হচ্ছে বসি-, বাড়ছে পথশিশুর সংখ্যা এবং এসব শিশুরা নানারকম অবহেলা, অনাদর ও বঞ্ছনার মধ্যে দিয়ে বেড়ে উঠে। অথচ বলা হয়ে থাকে শিশুরাই জাতির ভবিষ্যৎ নাগরিক। শিশুরা তাদের মৌলিক চাহিদা পূরনের সাথে চায় আত্ম স্বীকৃতি, প্রশংসা ভালবাসা, মর্যাদা ইত্যাদি। কিন্তু বালিকা পথশিশুরা তাদের পরিচয় দ্বারাই অবহেলিত হচ্ছে। এই অবহেলার কারণ পথশিশুরা জানে না। শিশুর প্রতি সমাজের এরূপ মনোভাবের কারণে যে সমাজের প্রতি বিরূপ মনোভাব পোষণ করছে।

একদিন সে শিশু থাকবে না। সে বড় হবে কিন্তু সমাজের প্রতি তার শ্রদ্ধবোধ, ভালবাসা ও আন-রিকতা কমে যাবে। তারা মানুষের সাথে ভালো আচরণ করবে না। তারা জিদের বশবর্তী হয়ে সমাজের মধ্যে নানা অপকর্ম করবে যা সমাজের জন্য হুমকী স্বরূপ। পথশিশুরা বেঁচে থাকার জন্য প্রতিনিয়ত সংগ্রাম করে যাচ্ছে। তারা সমাজের অবহেলা, বঞ্ছনা, অবজ্ঞা ইত্যাদির মধ্যে সংগ্রাম করে টিকে রয়েছে। কিন’ এসব বালিকা পথশিশুরাও সুযোগ পেলে দেশ ও জাতির জন্য ভবিষ্যতে অবদান রাখতে সক্ষম হবে এতে কোন সন্দেহ নেই।

এজন্য পথশিশুদের মতামতের ভিত্তিতে তাদের সমস্যা ও চাহিদা চিহ্নিত করে সমস্যার সমাধান এবং অনুভূত চাহিদা পূরণের জন্য প্রয়োজন একটি বহুমুখী সমন্বিত কর্মসূচী। আমার কথা হচ্ছে সরকারী ও বেসরকারী উদ্যোগে কিছু প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বালিকা পথশিশুদের কল্যালেণ কিছু প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। এসব প্রচেষ্টা গ্রহীত হলে আগামী দিনে বালিকা পথশিশুরা দেশ ও জাতির কল্যানে তাদের অবদান সুপ্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হবে।

সুতরাং দেখা যাচ্ছে বালিকা পথশিশুরা বেচে থাকার জন্য প্রতিনিয়ত সংগ্রাম করে চলেছে। তারা সমাজের অবহেলা, বঞ্চনা, অবজ্ঞা ইত্যাদির মধ্যে সংগ্রাম করে বেঁচে রয়েছে। কিন’ সুযোগ পেলে তারাও যে দেশ ও জাতির জন্য ভবিষ্যতে অবদান রাখতে সক্ষম হবে এতে কোন সন্দেহ নেই।

 

 

 

এডিট- এসএস

মন্তব্য করুন