হিন্দুস্থানি শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের পরিবেশনা নিয়ে আজকের আলোচনা। একটি রাগ শুধুমাত্র আকার (আ, ই, উ শব্দ করে) বা সারগম দিয়ে (সা-নি) গেয়ে বা বাজিয়ে পরিবেশন করা যায়। রাগের অবয়ব পুরো প্রতিষ্ঠা করা যায়। একসময় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের মূল রীতিটা এরকমই ছিল। তবে যুগে যুগে পরিবেশন আরও আকর্ষণীয় করার জন্য সঙ্গীতকে বিভিন্ন প্রকারে অলঙ্কৃত করা হয়েছে।

হিন্দুস্থানি শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের পরিবেশনা
পণ্ডিত-ওস্তাদরা বিভিন্ন ধরনের গায়ন/বাদনরীতি (ধ্রুপদ, খেয়াল) উদ্ভাবন করেছেন। বিভিন্ন অঞ্চলের লোকসঙ্গীতের গায়কী থেকেও এসেছে গায়কীর বিভিন্ন অঙ্গ। বড় শিল্পীদের গায়কী/গতকারির স্বতন্ত্রতা নিয়ে তৈরি হয়েছে বিভিন্ন ঘরানা বা স্কুল। বিভিন্ন ঘরানা বিভিন্ন গায়নরীতিতে বিভিন্ন রাগে তৈরি হয়েছে সুন্দর সব বন্দিশ। তাই রাগের পাশাপাশি উপভোগ করার আছে গায়নশৈলীর ভিন্নতা। এজন্য একই রাগ ভিন্ন রীতিতে ভিন্ন অঙ্গে ভিন্ন ঘরানার গায়কের কাছে শুনে ভিন্নরকম অনুভূতি পাবেন। হিন্দুস্থানি শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের কণ্ঠের প্রতিষ্ঠিত দুটি ধারা: ধ্রুপদ ও খেয়াল। উপশাস্ত্রীয় ধারাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় ধারা ঠুমরি। এছাড়া যন্ত্রসঙ্গীত তো রয়েছেই।
প্রথমে আলাপ করা যাক বৈঠকি পরিবেশন নিয়ে:
আগে আলোচনা করা হয়েছে রেকর্ডিং সঙ্গীত শোনার বিষয়ে। কিন্তু ভারতিয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীত শোনার রীতি মুলত বৈঠকি আসরে। আল্টিমেট মজা পাবার জন্য বৈঠকি আসরের বিকল্প নেই। বৈঠকি পরিবেশনা কিছু রীতি-নীতির মধ্যে থেকে করা হয়। পরিবেশনা মজা নিতে হলে সেই নিয়মগুলো বোঝা দরকার।
সঙ্গীতের ধরন অনুযায়ী পরিবেশনের নিয়ম কানুনে ভিন্নতা আছে। সব জনরার সঙ্গীত একই ক্রমে গাওয়া/বাজানো হয় না। পাশাপাশি কন্ঠে সঙ্গীত এবং যন্ত্রসঙ্গীতের উপস্থাপনের মধ্যে কিছু পার্থক্য আছে।
এই নোটে সংক্ষিপ্ত পরিসরে আমরা কন্ঠসঙ্গীতে খেয়াল এবং একটি যন্ত্রসঙ্গীতের বৈঠকি পরিবেশন নিয়ে আলাপ করবো।

বৈঠকের নিয়ম:
সব ধরনের ভারতিয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীত পরিবেশন করা হয় বৈঠকি স্টাইলে। পরিবেশন মূলত একক (solo) হয়। মানে প্রধান একজন গায়ক/বাদককে কেন্দ্র করে সব আয়োজন। তিনি কণ্ঠ দিয়ে বা তার বাদ্যযন্ত্র দিয়ে সুরের নেতৃত্ব দেন, বাঁকিরা সহায়তা করেন। যুগলবন্দীর ক্ষেত্রে গায়ক/বাদক একাধিক হতে পারে। যুগলবন্দীর শিল্পীরা আগে থেকে নিজেদের মধ্যে একটা বোঝাপড়া করে নেন। ইম্প্রোভাইজ করলেও, ওই বোঝাপড়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেন।
প্রধান শিল্পিকে একটানা টোনিক সাপোর্ট দেবার জন্য সাথে ১/২ জন তানপুরা বাদক থাকেন (এরা সচরাচর প্রধান শিল্পীর শিষ্য হন)। একজন তালবাদ্য বাদক থাকেন, যিনি তবলা বা পাখোয়াজ নিয়ে তাল-ঠেকা ধরে রাখেন। যন্ত্রসঙ্গীত শিল্পীর আর কিছু লাগে না।
কণ্ঠশিল্পীর হাত সচরাচর খালি থাকে। কখনও তার হাতে সুরমন্ডল বা তানপুরা থাকতে পারে। কণ্ঠশিল্পীকে সুরের আবহাওয়া ধরে রাখার সহায়তা করার জন্য, একজন সারেঙ্গী বাদক থাকেন বা হারমোনিয়াম বাদক থাকেন। সারেঙ্গী বা হারমোনিয়াম বাদক গায়ককে অনুসরণ করে, গায়কের সুরের আবেশ তার যন্ত্রে ধরে রাখেন।
প্রধান শিল্পী বসেন মাঝখানে, সবার সামনে। শিল্পীর পিছনে তানপুরা বাদকরা থাকেন। ডানপাশে থাকে তবলা, বামে সারেঙ্গী/হারমনিয়াম। যুগলবন্দী হলে প্রধান দুজন শিল্পী পাশাপাশি বসেন। অনেক সময় জ্যৈষ্ঠতা অনুসারে শিল্পী সামনে পিছনে বসেতে পারে।
আগে এ ধরনের অনুষ্ঠান হতো ঘরোয়া মহফিল হিসেবে। যেখানে শিল্পী এবং শ্রোতা একই উচ্চতায় মেঝেতে বসতো। তাদের মধ্যে ভাব বিনিময় হতো। আজকাল বেশি শ্রোতাকে একবারে গান শোনানোর জন্য সাউন্ড সিস্টেম ব্যাবহারের প্রয়োজন হয়। শিল্পিকে সবাই যেন দেখতে পারে সেজন্য স্টেজ বানানো হয়।

বৈঠকি ধ্রুপদ পরিবেশন: ধ্রুপদ
খেয়াল পরিবেশনের বিস্তারিত পাওয়া যাবে – খেয়াল – লিঙ্কে
আমি যে ধারাবাহিকতায় বর্ননা করেছি, সেটা প্রত্যেকে ঘরানা বা শিল্পির জন্য প্রযোয্য নাও হতে পারে। এমনকি শিল্পি স্থান, কাল পাত্র ভেদে পারফরমেন্স এর ধারাবাহিকতায় পরিবর্তন করতেও পারেন। কখনও একটি অংশকে দু ধরনের টেম্পোতে ভাগ করে নিতে পারেন। তবে পারফরমেন্স সম্পর্কে মোটামুটি একটা ধারনা তৈরি হলে সেটা বুঝতে খুব একটা কষ্ট হবে না।

অষ্টাঙ্গ খেয়ালের পরিবেশনা
অষ্টাঙ্গ বা খেয়ালের ৮টি অঙ্গ। খেয়ালের জন্মস্থান অর্থাৎ গোয়ালিয়র ঘরানার ঐতিহ্য হলো এই অষ্টাঙ্গের খেয়াল। এখনো হাতেগোনা কয়েকজন শিল্পী এই অষ্টাঙ্গে খেয়াল গেয়ে থাকেন। তবে সব ঘরানা বা সব শিল্পী একইভাবে গান-বাজনা করেন না। তবুও খেয়াল গায়কি বুঝতে এই অষ্টাঙ্গ সম্পর্কে ধারণা থাকাটা অত্যন্ত জরুরি।
১. বন্দিশ নায়কী (Bandish Nayaki)
অষ্টাঙ্গ খেয়ালের প্রথম ধাপ হলো বন্দিশ নায়কী, যা খেয়ালের প্রাণের ভিত্তি স্থাপন করে। এই ধাপে শিল্পী মূল বন্দিশের কাঠামো স্থাপন করেন এবং রাগের প্রাথমিক ভাব, সীমারেখা ও চরিত্র নির্ধারণ করেন। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, মূল কম্পোজার বা রচয়িতা কর্তৃক রচিত মূল বন্দিশের কম্পোজিশন হুবহু রাখা হয়। এটি রাগের মৌলিকতা ও শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের শুদ্ধতা রক্ষা করে। শিল্পী শুধুমাত্র স্বরবিন্যাস, অলঙ্কার, বা ব্যাখ্যা যোগ করে গানকে ব্যক্তিগত স্পর্শ দেন, কিন্তু মূল শব্দ বা বিন্যাস পরিবর্তন করা হয় না।
এই ধাপে শিল্পী রাগের প্রধান স্বরসমষ্টি ও অলঙ্কার চিহ্নিত করে, যাতে শ্রোতা রাগের মৌলিক রস এবং চরিত্র প্রথম মুহূর্তেই অনুভব করতে পারে। বন্দিশ নায়কী সাধারণত ধীরগতিতে পরিবেশিত হয়, যা শিল্পীকে শ্বাস ও স্বরের নিয়ন্ত্রণে রাখে এবং পরবর্তী বিস্তার, বহলাওয়া ও লয়বদ্ধ অংশের জন্য মঞ্চ প্রস্তুত করে।
শিল্পীরা এখানে ছোট ছোট স্বরপ্রয়োগ, হালকা অলঙ্কার এবং মূল বন্দিশের বোল ব্যবহার করে শ্রোতাকে রাগের আধ্যাত্মিক যাত্রায় প্রবেশ করান। ফলে বন্দিশ নায়কী কেবল রাগের শাস্ত্রীয় ভিত্তি নয়, বরং শিল্পীর প্রথম সৃজনশীল নিদর্শন এবং শ্রোতার সঙ্গে সংযোগের সূচনা হিসেবেও কাজ করে।
২. বন্দিশ গায়কী (Bandish Gayaki)
অষ্টাঙ্গ খেয়ালের দ্বিতীয় ধাপ হলো বন্দিশ গায়কী, যেখানে শিল্পী মূল বন্দিশের আওতায় গান পরিবেশন শুরু করেন এবং রাগের স্বর ও অলঙ্কার ধীরে ধীরে প্রয়োগ করতে থাকেন। এই ধাপে শিল্পী মূল কম্পোজার বা রচয়িতার রচিত বন্দিশকে হুবহু রেখে নিজের কণ্ঠের ব্যাখ্যা, ছন্দের পরিবর্তন এবং সূক্ষ্ম অলঙ্কার যোগ করে গানকে প্রাণবন্ত করে তোলেন। বন্দিশ গায়কী তাই খেয়ালের প্রধান প্রকাশভঙ্গি হিসেবে কাজ করে, যেখানে শিল্পীর নিজের কৌশল ও সৃজনশীলতা প্রথমবারের মতো পূর্ণভাবে ফুটে ওঠে।
৩. বিস্তার বা বোল-বিস্তার বা বড়হত (Bistar / Bol-Bistar / Barhat)
বিস্তার হলো খেয়ালের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ। শিল্পী ধীরগতিতে স্বর ও বোল ব্যবহার করে রাগকে বিস্তৃতভাবে ফুটিয়ে তোলে। এটি শ্রোতার জন্য রাগের গভীরতা, সৌন্দর্য এবং আবেগ বুঝবার মূল মাধ্যম। অনলাইনে অনেক ভারতীয় সাইটে বিস্তারকে “আলাপ” বা “বোল-আলাপ” বলা হলেও, নতুন শ্রোতাদের জন্য এটি বিস্তার নামেই পরিচিত রাখা শ্রেয়, কারণ খেয়ালের বিস্তার লয়বদ্ধ, আলাপ অনিবদ্ধ।
৪. বহলাওয়া (Mīṛ যুক্ত অতি ধীরগতির আ-কারের তান)
বহলাওয়া ধাপে শিল্পী খুব ধীরগতিতে এবং মীড় যুক্ত আ-কারের তান পরিবেশন করেন। এটি রাগের প্রতিটি স্বরকে গভীরভাবে স্পর্শ করে এবং শ্রোতাকে এক ধ্যানমগ্ন অভিজ্ঞতায় পৌঁছে দেয়।
৫. বোল-বাঁট (Bol-Baant)
বোল-বাঁট হলো ধাপ যেখানে শিল্পী গান বা বন্দিশের বোলকে ভেঙে ভিন্ন ভিন্ন স্বর এবং অলঙ্কারে সাজিয়ে পরিবেশন করেন। এতে রাগের বৈচিত্র্য এবং স্বরসৌন্দর্য স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে।
৬. বোলতান (Bol-Taan)
এই ধাপে শিল্পী বোলের সঙ্গে তালমেল রেখে দ্রুত স্বরপ্রয়োগ বা তান করে। এটি খেয়ালের গতিশীল অংশ, যেখানে শিল্পীর দক্ষতা ও সৃজনশীলতা বিশেষভাবে প্রকাশ পায়।
৭. তান (Taan)
তান হলো দ্রুত স্বরপ্রয়োগের অংশ। শিল্পী তালের সঙ্গে স্বরের ওঠানামা এবং অলঙ্কার প্রয়োগ করে রাগের সৌন্দর্য চূড়ান্তভাবে তুলে ধরেন।
৮. লয়কারী (Laykari)
শেষ ধাপ লয়কারী, যেখানে শিল্পী রাগের তাল ও ছন্দের সঙ্গে স্বরবিন্যাসকে সমন্বয় করে পরিবেশনা শেষ করেন। এটি খেয়ালের সমাপ্তি, যা শ্রোতার মনে আধ্যাত্মিক এবং নান্দনিক প্রভাব সৃষ্টি করে।
সরগম কোনো অপরিহার্য খেয়ালের অঙ্গ নয়; তবে কিছু শিল্পী যেমন নবম অঙ্গ হিসেবে সরগম ব্যবহার করেন, বিশেষত রাগের ব্যাখ্যা বা প্রসারিত করতে। পণ্ডিত উলহাস কশলকর সরগম ব্যবহার করেন না, অন্যদিকে পণ্ডিত অজয় চক্রবর্তীর গানে আটটি অঙ্গ ছাড়াও নবম অঙ্গ ব্যবহৃত হয়।
আলাপও আদিতে খেয়ালের অঙ্গ ছিল না। খেয়ালের বিস্তার ধীরে ধীরে আলাপের মতো হয়ে গেছে। আলাপকে প্রথম খেয়ালে ব্যবহার করেন উস্তাদ ফৈয়াজ খাঁ, পরে গোয়ালিয়র ও সহসওয়ান ঘরানায় সংক্ষিপ্ত আউচার আলাপ শুরু হয়। খেয়ালের বিস্তারকে কেউ কেউ আলাপ বা স্বরবিস্তারও বলে থাকেন, তবে মূলত এটি লয়বদ্ধ, যেখানে স্বর ও বোলের সঙ্গমে রাগের পূর্ণ প্রকাশ ঘটে।

এবার কিছু বিশেষ অঙ্গ নিয়ে আলাপ করা যাক:
আলাপ (Alap) :
খেয়াল পরিবেশন শুরু হয় “আলাপ” দিয়ে। এটা খেয়াল বা ধ্রুপদ পরিবেশনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ। আলাপ শুরু হয় খুব ধীর গতিতে “অতি বিলম্বিত” বা “বিলম্বিত লয়ে” (সময় কম থাকলে মধ্যলয়েও শুরু হতে পারে)। তালবাদ্য সহায়তা ছাড়া, আকার বা অর্থহীন শব্দ (নোম, তোম) দিয়ে আলাপ করা হয়। সচরাচর ষড়জ (টনিক স্বর) থেকে আলাপ শুরু হয় (কখনও বাদী স্বর থেকেও আলাপ শুরু হতে পারে)। এরপর শিল্পি প্রথমে নিচের দিকের সপ্তকে গিয়ে, সেখানের এই রাগের নোটগুলো শোনান। তারপরে উপরের দিকের সপ্তকের নোটগুলোকে দেখিয়ে, আবার সড়জে ফেরেন।
এখানে শিল্পী ধীরে রাগটির পরিচয় করান। নোটগুলো ধরে ধরে শ্রোতাদের দেখান। গুরুত্বপুর্ন স্বরগুলোকে (বাদী-সমবাদী) স্বরদের প্রতিষ্ঠিত করেন। একে একে রাগের সুন্দর মিউজিক্যাল ফ্রেইজগুলোর ভাঁজ খোলেন। যেন একটা ক্যানভাসে শিল্পী এক এক টান দিয়ে ক্রমশ পোট্রেইটের মুল অবয়ব তৈরি করতে থাকেন।
পারফরমেন্সের এই অংশটি সবচেয়ে চ্যালেন্জিং। শিল্পীর রাগ বোঝার গভীরতা এবং উপস্থাপনের দক্ষতার সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা হয় আলাপে। যে শিল্পী যত দক্ষ, তিনি তত সুন্দর করে আলাপের মাধ্যমে রাগের মূলভাব প্রতিষ্ঠিত করে ফেলেন। শ্রোতার মনে রাগের ছায়া তৈরি হয়ে যায়। তবে নতুন শ্রোতাদের এই বিভাগটি খুব ভাল নাও লাগতে পারে। রাগটা যত ধরতে থাকবে, এই অংশের মজা তত বাড়বে।
আজ এই তাড়াহুড়োর শ্রোতে আলাপের প্রচলন ক্রমশ কমে আসছে। খেয়ালিয়ারাও দ্রুত আলাপ শেষ করে বান্দিশ/গাত এ ঢুকে পড়েন। এখন খুব বিস্তারিত আলাপের প্রচলণ মুলত ধ্রপদিয়ারাই ধরে রাখছেন।
আলাপ-গান সম্পর্কে আরও বিস্তারিত জানার জন্য এই সিরিজের “সঙ্গীতের ধারা (Genre)” বিভাগের “আলাপ-গান” আর্টিকেলটি দেখতে পারেন।
বান্দিশ (Bandish):
আলাপের পরেই আসে বান্দিশ। বান্দিশকে চিজ (Cheez) বা গাত (Gaat) ও বলা হয়। কণ্ঠ সঙ্গীতের ক্ষেত্রে বলে বান্দিশ, যন্দ্রসঙ্গীতের ক্ষেত্রে বলে চিজ বা গাত। এ অংশ পারফরমেন্সের যেকোন সময় গাইতে/বাজাতে পারে। তবে শেষ তান করার আগে বান্দিশ শেষ করতে হয়।
বান্দিশ/চিজ/গাত মানে কম্পোজড্ কম্পোজিশন। একটি নিদ্রিষ্ট রাগের আধারে, নিদ্রিষ্ট তালের উপরে নিবন্ধিত। সুর, তাল নিদ্রিষ্ট হবার কারনে, ইমপ্রোভাইজেশনের সুযোগ খুব সামান্য। আমাদের সবার কান কম্পোজড কম্পোজিশনে অভ্যস্ত হওয়ায়, সঙ্গীতের এই অংশতে কমিউজিকেট করা সবচেয়ে সহজ হয়। তাই সব ধরনের শ্রোতা, সবচেয়ে আগে বান্দিশ অংশটি উপভোগ করতে পারেন।
বান্দিশ খেয়ালের সবচেয়ে গুরুত্বপুর্ন অংশও বটে। খেয়ালের বান্দিশ দু অংশে বিভক্ত – “স্থায়ী” এবং “অন্তরা”। এছাড়া ধ্রপদের বান্দিশে “সন্চরি” এবং “আভোগী” নামে আরও দুটি অংশ থাকে।
বিভিন্ন ঘরানার কিছু সিগনেচার পুরানো বন্দিশ রয়েছে। এর বাইরে এখনো বিভিন্ন গুনি গায়ক নতুন বান্দিশ কম্পোজ করে গেছেন। তবে এখনও পুরোনো বান্দিশগুলোই বেশি জনপ্রিয়।
তান (Taan):
পারফরমেন্সের শেষে সচরাচর তান করেন শিল্পী। এই অংশে শিল্পী রাগের নোটগুলোর উপর দিয়ে বিভিন্ন ছন্দে খুব দ্রুত আসা যাওয়া করেন। তানের মাধ্যমে একটু জমিয়ে পারফর্মেন্স শেষ করা হয়।
তানের মধ্যে উল্লেখযোগ্য তানগুলো হলো : বোল তান, সাপাঠ বা শুদ্ধ তান, কুট তান, মিশ্র তান, গমক তান। এছাড়া বিভিন্ন ঘরানায় তৈরি বিভিন্ন ধরনের তানও প্রচলিত ছিল (যেমন : পাল্টা তান, হলক তান, জটকা তান, গীতকারি তান, ইত্যাদি)।
বোলতান গাওয়া হয় বান্দিশের শব্দগুলো থেকে শব্দ বেছে নিয়ে। সাপাট তানের গতিপথ সরল (দুটি বা তিনিটি সপ্তকের রাগের আরোহ আবরোহের স্বরগুলো বেছে নিয়ে সোজা যাওয়া আসা করে সাপাট তান করা হয়)। কুটতানের গতিপথের এরকম কোন চরিত্র নেই।
এই অংশে দেখা যায় শিল্পির তৈয়ারি। রাগের বেঝাপড়ার চেয়ে বেশি প্রমান হয়, শিল্পির গলার উপরে নিয়ন্ত্রনের মাত্র। কিছু শ্রোতা তান শুনতে খুব পছন্দ করেন। হালকা মেজাজের পারফরমেন্সে তানগুলো ভাল চলে। খুব গরুমম্ভীর পারফর্মেন্স বাড়তি তানের কারনে নষ্ট হতে পারে।
আরও দেখুন:
