আজ ৩ নভেম্বর – জেল হত্যা দিবস [ Jail Killing Day ]

বাঙালি জাতির ইতিহাসের সবচেয়ে কলঙ্কিত দিনের একটি ৩ নভেম্বর, রক্তক্ষরা জেল হত্যা দিবস[ Jail Killing Day ]।

জেল এমন একটা জায়গা, যেটা খুনি বা দাগী অপরাধীদের জন্যও সবচেয়ে নিরাপদ। কারণ সেখানে বিচার ছাড়া কাউকে সামান্য শাস্তিও দেয়া যায় না। সেই জেলে ১৯৭৫ সালের এই দিনে নির্বিচারে হত্যা করা হয়েছিল স্বাধীনতাকালীন বাংলাদেশের নেতৃত্বদানকারী ৪ নেতাকে। স্বয়ং রাষ্ট্রপতির আদেশে রাতের অন্ধকারে ঢুকে ব্রাশ ফায়ার করে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছিল জাতির সূর্য সন্তানদের। মৃত্যুর আগে একফোঁটা পানি চেয়ে পাননি।

হত্যাকারীরা যেন নির্মমতার চূড়ান্তে যেতে পারে, সেজন্য জেলে ঢোকার আগে তাদের অকুণ্ঠ মদ্যপান করানো হয়েছি। প্রেসিডেন্ট বলেছিল- এই কাজটার মাধ্যমে ইসলামিক রাষ্ট্র গঠনের কাজ এক ধাপ এগিয়ে গেল।

কারাগারের নিরাপদ আশ্রয়ে থাকা অবস্থায় এমন জঘন্য, নৃশংস ও বর্বরোচিত হত্যাকান্ড পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল।

Jail Killing Day | ৩ নভেম্বর জেল হত্যা দিবস
৩ নভেম্বর, জেল হত্যা দিবস

বাঙালী জাতিকে নেতৃত্বশূন্য করতে ৪৩ বছর আগে ১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর মধ্যরাতে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে অন্তরীণ জাতির চার মহান সন্তান, মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম পরিচালক, মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী ও জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর একনিষ্ঠ ঘনিষ্ঠ সহচর, জাতীয় চার নেতা বাংলাদেশের প্রথম অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম, প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ, মন্ত্রিসভার সদস্য ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলী এবং এ এইচ এম কামরুজ্জামানকে নির্মম ও নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়।

স্বাধীন বাংলাদেশের যে কয়টি দিন চিরকাল কালো দিন হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে, তার একটি ৩ নভেম্বর। যে কয়েকটি ঘটনা বাংলাদেশকে কাঙ্ক্ষিত অর্জনের পথে বাধা তৈরি করেছে, তার মধ্যে অন্যতমটি ঘটেছিল ১৯৭৫ সালের এই দিনে।

বাংলাদেশ যত উচ্চতাতেই যাক, এই ঘটনাটি বাংলাদেশ নামক বইয়ে কালো পাতা হিসেবে থেকেই যাবে।

জেল হত্যার প্রেক্ষাপট:

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করে স্বঘোষিত রাষ্ট্রপতি খন্দকার মোশতাক সরকার গঠন করে। এই এই চার নেতাকে সেই সরকারে যুক্ত হবার জন্য মোশতাক চাপ দিতে থাকে। কিন্তু এই নেতারা স্পষ্ট বলে দেন বঙ্গবন্ধুর রক্তের উপরে দিয়ে তারা সরকারে যুক্ত হবেন না। তারা প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করার পরে তাদের বন্দি করে কারাগারে পাঠানো হয়।

সেসময় সেনাবাহিনীর মধ্যে অসন্তোষ স্পষ্ট হয়ে উঠতে থাকে। অবৈধ মোশতাক সরকারকে সেনাবাহিনীর অনেকেই উৎখাত করতে চায়, এটা স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিল। এর মধ্যে মেজর খালেদ মোশারফের নেতৃত্বে সেনা অভ্যুত্থান হয়।

এসব ঘটনার ফলে মোশতাকের মনে হতে থাকে, এই সময়ে কোন একটা জাগরণ ঘটলে, সরকার গঠন করা ও দেশ পরিচালনা করার মতো নেতৃত্ব বলতে ৪ নেতা। এরা বেঁচে থাকলে মোশতাক সরকার ও তার প্রভুরা কখনো নিরাপদ নয়। সেই চিন্তা থেকে তারা ৪ নেতাকে হত্যার সিদ্ধান্ত নেয়।

যেভাবে হত্যা করা হয় :

দেশের বিশিষ্ট লেখক গোলাম মুরশিদ তার ‘মুক্তিযুদ্ধ ও তারপর’ গ্রন্থে লিখেছেন – কর্নেল ফারুক এবং কর্নেল রশিদকে নিয়েই জেলহত্যার পরিকল্পনা করেছিলেন খন্দকার মোশতাক আহমেদ। এই হত্যাকাণ্ডের মাস্টারমাইন্ডও ছিলেন এ তিনজন। হত্যাকাণ্ডে অংশ নেয় মুসলেমউদ্দীন। এর আগে এই ঘাতকই ৭৫-এর ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যায় অংশ নিয়েছিল। আর নেতৃত্বে ছিলেন ক্যাপ্টেন আবদুল মাজেদ।

খালেদ মোশাররফ (শাফায়াত জামিলের সহায়তায়) ২ নভেম্বর ভোর রাতে অর্থাৎ ৩ নভেম্বর খুব ভোরে অভ্যুত্থান ঘটান। এই অভ্যুত্থান শুরু হয়েছিল রাত দুটায়। এটা টের পেয়েই ফারুক আর রশিদ একটি ঘাতক দল পাঠায় ঢাকায় কেন্দ্রীয় কারাগারে। এর নেতৃত্ব দেয় মুসলেমউদ্দীন। এই ঘাতক দলের একমাত্র মিশন ছিল চার নেতাকে হত্যা করা। সেখানে ঢোকার পর জেল কর্তৃপক্ষ তাদের বাধা দেয়।

সে সময়ে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের [ পুরানো ঢাকা ] জেলার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন আমিনুর রহমান। তার ভাষ্যমতে – রাত ২ টার দিকে জেলার আমিনুর রহমানের কাছে একটা ফোন আসে। ফোন করেছিলেন কারা মহাপরিদর্শক। মহাপরিদর্শক আমিনুর রহমানকে তাৎক্ষনিক ভাবে আসতে বলেন। আমিনুর রহমান কারাগারের মূল ফটকে গিয়ে দেখলেন, একটি পিকআপে কয়েকজন সেনা সদস্য সশস্ত্র অবস্থায় রয়েছে।

মূল ফটকের সামনে এসে সেনা সদস্যরা কারা মহাপরিদর্শককে একটি কাগজ দেন। জেলার আমিনুর রহমান সেই কাগজে কী লেখা ছিল সেটা দেখার সুযোগ পান নি।

এরপর জেলারের সেই রুমের টেলিফোনটি বেজে উঠে। ওই কারাগারে মূল ফটকের বাম দিকে জেলারের রুম। জেলার দৌড়ে গিয়ে ফোন ধরেন। ফোন তুলতেই অপর প্রান্ত থেকে বলা হয় – প্রেসিডেন্ট কথা বলবেন, ফোনটা যেন আইজি সাহেব কে দেয়া হয়। আমিনুর রহমান দৌড়ে গিয়ে আইজি সাহেবকে ডেকে এনে ফোনে ধরিয়ে দেন। কথা শেষে আইজি সাহেব আমিনুর রহমানকে কি কথা হল তা জানান। আইজি সাহেবের কথা অনুযায়ী, প্রেসিডেন্ট সাহেব ফোনে বলছে আর্মি অফিসাররা যা চায়, সেটা তাদের করতে দিতে।” অর্থাৎ প্রেসিডেন্ট নিজে হত্যার আদেশ দেন।

জেলের এক কক্ষে থাকতেন তাজউদ্দীন আহমেদ আর সৈয়দ নজরুল ইসলাম। পাশের কক্ষে ক্যাপ্টেন মনসুর আলী এবং এএইচএম  কামরুজ্জামান। সেনা সদস্যরা তাদের সবাইকে তাজউদ্দীন আহমেদ এর কক্ষে একত্রিত করতে বলেন। তখন তাজউদ্দিন আহমেদ কোরআন তেলাওয়াত করছিলেন। তারপর সেখানেই তাদের গুলি করে এবং বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা করা হয়। তাজউদ্দীন কিছুক্ষণ বেঁচে ছিলেন। কিন্তু অন্য তিনজন মারা যান প্রায় সঙ্গে সঙ্গে। এরপর রাত চারটায় টেলিফোনে তৎকালীন জিআইজি খন্দকার মোশতাককে হত্যাকান্ডের কথা অবহিত করেন।

জেল হত্যা মামলার বিচারকার্য:

জেলহত্যার পরদিন অর্থাৎ ৪ নভেম্বর তৎকালীন উপ-কারা মহাপরিদর্শক (ডিআইজি প্রিজন), কাজী আবদুল আউয়াল, লালবাগ থানায় একটি হত্যা মামলা করেন। তবে এই মামলার কোন কার্যক্রম হয়নি। কারণ জেলহত্যার পরে হত্যাকারী ও তার দোসররা ক্ষমতায় ছিল। এজন্য আওয়ামীলীগ সরকার পুনরায় ক্ষমতায় আসার পরে ১৯৯৬ সালে জেল হত্যা মামলা পরিচালনার কার্যক্রম শুরু হয়। ২০০৪ সালে মামলার রায় হয়। সেই রায়ে ৩ জন সেনা কর্মকর্তাকে মৃত্যুদণ্ড ও ১২ জন সেনা কর্মকর্তাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের নির্দেশ দেওয়া হয়। ঢাকা মহানগর দায়রা জজ মতিউর রহমানের দেওয়া রায় দেন।

জেল হত্যা মামলায় সাজাপ্রাপ্তদের তালিকা:

মৃত্যুদণ্ড প্রাপ্ত:
১. দফাদার মারফত আলী শাহ
২. রিসালদার মোসলেম উদ্দিন ওরফে হিরন খান
৩. এলডি দফাদার মো. আবুল হাসেম মৃধা

যাবজ্জীবিন কারাদন্ড-প্রাপ্ত:
১. কর্নেল (অব.) সৈয়দ ফারুক রহমান
২. কর্নেল (অব.) সৈয়দ শাহরিয়ার রশীদ
৩. মেজর (অব.) বজলুল হুদা
৪. লে. কর্নেল খন্দকার আবদুর রশীদ (বরখাস্ত)
৫. লে. কর্নেল শরিফুল হক ডালিম
৬. লে. কর্নেল (অব) এম এইচ এম বি নূর চৌধুরী
৭. লে. কর্নেল (অব) এ কে এম মহিউদ্দিন আহমেদ
৮. লে. কর্নেল (অব) এ এম রাশেদ চৌধুরী
৯. মেজর (অব্যাহতিপ্রাপ্ত) আহম্মদ শরিফুল হোসেন
১০. ক্যাপ্টেন (অব) আবদুল মাজেদ
১১. ক্যাপ্টেন (অব্যাহতিপ্রাপ্ত) মো. কিসমত হোসেন
১২. ক্যাপ্টেন (অব.) নাজমুল হোসেন আনসার।

২০০৮ সালের ২৮শে আগস্ট, বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ, জেল হত্যা মামলায় সাজাপ্রাপ্ত ছয়জন সামরিক কর্মকর্তাকে খালাস দেয়। খালাস পেয়েছিলো সৈয়দ ফারুক রহমান, সুলতান শাহরিয়ার রশীদ খান, বজলুল হুদা এবং এ কে এম মহিউদ্দীন আহমেদ। তবে তাদের ২০১০ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকাণ্ডের রায় অনুযায়ী ফাঁসিকাষ্ঠে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়।  খালাস যারা পেয়েছিল তাদের বিপক্ষে রাষ্ট্রপক্ষ সর্বোচ্চ শাস্তির আবেদন করে সুপ্রিম কোর্টে আপিল করে।

সেদিনের প্রত্যক্ষদর্শী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া বর্ণনা করেছেন সেদিনের ঘটনার:

#Diary [ দিনপঞ্জি ] ৩ নভেম্বর – জেল হত্যা দিবস সম্পর্কে আরও পড়ুন:

মন্তব্য করুন