অপেরা (Opera) | পশ্চিমা সঙ্গীত | অসুরের সুরলোকযাত্রা সিরিজ

“অসুরের সুরলোকযাত্রা” সিরিজের চেম্বার মিউজিক পর্ব শেষ করে আমরা এখন পা রাখছি পশ্চিমা শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের সবচেয়ে জাঁকজমকপূর্ণ এবং মহাকাব্যিক অধ্যায়ে—অপেরা (Opera)

অপেরা: সুর ও নাট্যের মহামিলন

সহজ কথায়, অপেরা হলো এমন একটি নাটক যেখানে চরিত্ররা কথা বলার বদলে গান গেয়ে তাদের আবেগ ও কাহিনী বর্ণনা করে। এটি কেবল গান নয়, বরং এটি সঙ্গীত (Music), কাব্য (Libretto), অভিনয় (Acting), নৃত্য (Dance) এবং দৃশ্যশিল্পের (Scenography) এক জটিল ও সমন্বিত রূপ।

১. অপেরার জন্ম ও বিবর্তন

অপেরার যাত্রা শুরু হয় ১৬শ শতাব্দীর শেষভাগে ইতালির ফ্লোরেন্সে। একদল পণ্ডিত ও শিল্পী (যাদের বলা হতো ‘ফ্লোরেনটাইন ক্যামেরাতা’) প্রাচীন গ্রিক নাটকের সেই মহিমা ফিরিয়ে আনতে চেয়েছিলেন যেখানে সংলাপের সাথে সুরের মিলন ছিল।

  • ক্লদিও মোন্তেভের্দি (Claudio Monteverdi): তাঁকে বলা হয় আধুনিক অপেরার জনক। তাঁর ‘অরফেও’ (L’Orfeo) প্রথম সার্থক অপেরা হিসেবে স্বীকৃত।
  • ধ্রুপদী ও রোমান্টিক যুগ: মোৎসার্ট অপেরাকে দেন মানবিক গভীরতা ও কৌতুক। পরবর্তীকালে ভাগনার (Wagner) এবং ভের্দি (Verdi) অপেরাকে এক অতিমানবিক ও বিশাল প্রেক্ষাপটে নিয়ে যান।

২. অপেরার কারিগরি উপাদানসমূহ

একটি অপেরা বুঝতে গেলে এর বিশেষ কিছু পরিভাষা ও উপাদান জানা প্রয়োজন:

  • লিব্রেত্তো (Libretto): অপেরার কাহিনী বা নাট্যলিপিকে বলা হয় লিব্রেত্তো। যিনি এটি লেখেন তাঁকে বলা হয় লিব্রেত্তিস্ট।
  • আরিয়া (Aria): এটি অপেরার সেই অংশ যেখানে প্রধান চরিত্র তাঁর মনের গভীর অনুভূতি গানের মাধ্যমে এককভাবে প্রকাশ করেন। এটি সাধারণত অত্যন্ত সুরপ্রধান এবং গায়ক বা গায়িকার কণ্ঠের দক্ষতার চূড়ান্ত পরীক্ষা।
  • রেসিটেটিভ (Recitative): এটি গানের সেই ধরন যা অনেকটা কথা বলার মতো ছন্দহীন। কাহিনীর দ্রুত অগ্রগতির জন্য বা চরিত্রের মধ্যে কথোপকথনের সময় এটি ব্যবহৃত হয়।
  • উভার্চার (Overture): অপেরা শুরু হওয়ার আগে অর্কেস্ট্রা যে বিশেষ বাদ্যযন্ত্রীয় সুরটি বাজায়, তাকে উভার্চার বলে। এটি মূলত পুরো অপেরার মূল সুরগুলোর একটি সংক্ষিপ্ত রূপ যা শ্রোতাকে কাহিনীর মুড সম্পর্কে ধারণা দেয়।
  • কয়ার (Chorus): অনেক অপেরায় একদল সমবেত গায়ক থাকে যারা সাধারণ মানুষ বা সৈন্যদলের ভূমিকা পালন করে।

৩. কণ্ঠস্বরের বৈচিত্র্য (Voice Types)

অপেরাতে গায়ক-গায়িকাদের কণ্ঠের রেঞ্জ অনুযায়ী বিভিন্ন ভাগে ভাগ করা হয়:

  • নারী কণ্ঠ: সোপরানো (উচ্চ), মেজো-সোপরানো (মধ্যম), কন্ট্রাল্টো (গম্ভীর)।
  • পুরুষ কণ্ঠ: তেনোর (উচ্চ), ব্যারিটোন (মধ্যম), বাস (গম্ভীর ও ভারী)।

৪. অপেরার প্রধান দুটি ধরণ

ইতিহাসে অপেরা মূলত দুটি প্রধান ধারায় বিভক্ত ছিল:

  • অপেরা সিরিয়া (Opera Seria): এটি গম্ভীর ও উচ্চাঙ্গের কাহিনী (যেমন রাজা-বাদশাহ বা উপকথা) নিয়ে রচিত।
  • অপেরা বুফা (Opera Buffa): এটি হাস্যকৌতুক ও সাধারণ মানুষের প্রতিদিনের জীবন নিয়ে রচিত (যেমন মোৎসার্টের ‘দ্য ম্যারেজ অফ ফিগারো’)।

৫. কেন অপেরা অনন্য?

অন্যান্য সঙ্গীত ধারার চেয়ে অপেরা আলাদা কারণ এটি ইন্দ্রিয়ের পূর্ণ তৃপ্তি দেয়। এখানে অর্কেস্ট্রা থাকে মঞ্চের নিচে একটি গর্তে (যাকে বলা হয় ‘পিট’), আর মঞ্চে চলে শিল্পীদের অভিনয় ও গান। সুরকার রিচার্ড ভাগনার একে বলতেন ‘Gesamtkunstwerk’ বা ‘সম্পূর্ণ শিল্পকর্ম’—যেখানে কোনো একটি শিল্প আলাদা নয়, বরং সবাই মিলে একটি একক লক্ষ্য অর্জন করে।

শোনার তালিকায় রাখার মতো কিছু অপেরা:

  • মোৎসার্ট: দ্য ম্যাজিক ফ্লুট (The Magic Flute) – রূপকথা ও দর্শনের মিশেল।
  • জর্জে বিজে: কারমেন (Carmen) – তীব্র প্রেম ও ট্র্যাজেডির গল্প।
  • জুসেপ্পে ভের্দি: লা ট্রাভিয়াটা (La Traviata) – এক করুণ প্রেমের উপাখ্যান।
  • জিয়াকোমো পুচ্চিনি: লা বোহেম (La Bohème) – সাধারণ মানুষের জীবন ও বিরহ।

পরবর্তী সংখ্যায় আমরা অপেরার ভেতরে ব্যবহৃত বিশেষ কণ্ঠশৈলী এবং ‘বেল কান্টো’ (Bel Canto) গায়নপদ্ধতি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব।