কম্বোডিয়ার সঙ্গীত | অসুরের সুরলোকযাত্রা সিরিজ
কম্বোডিয়ার শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের আলোচনায় যে ধারাটির নাম সবচেয়ে আগে আসে, তা হলো ‘পিনপিয়েট’। এটি মূলত রাজদরবার এবং বৌদ্ধ মন্দিরগুলোর বিভিন্ন পবিত্র অনুষ্ঠান, প্রার্থনা এবং ঐতিহ্যবাহী রাজকীয় শাস্ত্রীয় নৃত্যের রাজকীয় আবহ তৈরিতে বাজানো হতো। পিনপিয়েট মূলত একটি সুসংগঠিত সমবেত বাদকদল বা অর্কেস্ট্রা, যেখানে তারযুক্ত বাদ্যযন্ত্রের ব্যবহার নেই বললেই চলে। এর বদলে এখানে প্রাধান্য পায় বিভিন্ন ধরণের ঘাতযন্ত্র এবং ফুঁ দিয়ে বাজানো বায়ুচালিত বাদ্যযন্ত্র। এই অর্কেস্ট্রায় সুরের মূল গতি সামলায় ‘রোনিয়াত এক’ নামের একটি উচ্চ স্বরের বাঁশের জাইলোফোন। এর সাথে সুর মেলায় ‘কং ভং’ নামের একটি বৃত্তাকার কাঠের কাঠামোয় সাজানো একদল ছোট গং এবং ‘স্কোর থম’ নামের বিশাল আকৃতির জোড়া ড্রাম। এই সব মিলিয়ে পিনপিয়েটের সুরের মধ্যে এক ধরণের গম্ভীর ও ছান্দসিক রাজকীয় মেজাজ ফুটে ওঠে।
অবশ্য পিনপিয়েটের বাইরেও খেমার সংস্কৃতিতে বিনোদন ও সাধারণ মানুষের জীবনের জন্য ভিন্ন কিছু ধারা তৈরি হয়েছিল। যেমন, রাজকীয় ভোজসভা বা হালকা বিনোদনের জন্য ব্যবহৃত হতো ‘মোহরি’ নামের আরেকটি শাস্ত্রীয় ধারা। পিনপিয়েটের মতো এটি অতটা গম্ভীর বা ধর্মীয় আচারের সাথে যুক্ত ছিল না। মোহরিতে ভারী ড্রাম বা গং-এর বদলে বিভিন্ন তারযুক্ত যন্ত্রের ব্যবহার বেশি থাকায় এর সুর শুনতেও বেশ মিষ্টি, লিরিক্যাল এবং আরামদায়ক মনে হয়। এর পাশাপাশি কম্বোডিয়ার গ্রামীণ সমাজে ‘আরেয়াক’ নামের একটি অত্যন্ত প্রাচীন ধারা প্রচলিত ছিল, যা মূলত প্রেতাত্মা বা আধ্যাত্মিক শক্তির সাথে যোগাযোগের লোকজ আচারে ওঝারা ব্যবহার করত।
কম্বোডিয়ার লোকসঙ্গীতের সবচেয়ে চমৎকার এবং ইউনেস্কো স্বীকৃত একটি ঐতিহ্যবাহী রূপ হলো ‘চ্যাপেই ডাং ভেং’। এই শিল্পে একজন চারণ কবি ‘চ্যাপেই’ নামের একটি লম্বা গলার দুই তারের লিউট বাজিয়ে মুখে মুখে সমাজ সচেতনতামূলক, শিক্ষামূলক কিংবা ব্যঙ্গাত্মক কাহিনী সুর করে গেয়ে শোনান, যা আমাদের দেশের বাউল বা কবিগানের ঐতিহ্যের কথা মনে করিয়ে দেয়। আবার বিয়ের মতো পারিবারিক উৎসবের জন্য খেমারদের রয়েছে নিজস্ব ঘরানার গান, যাকে বলা হয় ‘ফ্ল্যাং কার’। বিয়ের বিভিন্ন নিয়ম ও আচার পালনের সময় এই গানগুলো গাওয়া কম্বোডিয়ান সমাজে বাধ্যতামূলক। এই সব লোকজ বাদ্যযন্ত্রের মধ্যে ‘ত্রো’ নামের একটি যন্ত্রের কথা আলাদাভাবে বলতে হয়। এটি মূলত দুই তারের একটি বিশেষ বেহালা জাতীয় যন্ত্র, যার ধনুকটি তারের মাঝখান দিয়ে টেনে বাজাতে হয়। এর থেকে নির্গত সুর এতটাই মরমী যে, তা শ্রোতার মনে এক গভীর করুণ ও উদাসী ভাব তৈরি করে।
কারিগরি দিক থেকে বিচার করলে দেখা যায়, কম্বোডিয়ার এই সঙ্গীত মূলত পাঁচ স্বরের পেন্টাটোনিক কিংবা সাত স্বরের হেপ্টাটোনিক স্কেলের ওপর ভিত্তি করে চলে। এই সংস্কৃতির সবচেয়ে বড় বিশেষত্ব হলো, এখানে সঙ্গীত শেখার জন্য কোনো লিখিত স্বরলিপি বা নোটেশনের চল নেই। শিষ্যরা ওস্তাদের পাশে বসে বছরের পর বছর শুধু কান দিয়ে শুনে এবং কঠোর অনুশীলনের মাধ্যমে এই জটিল সুরগুলো হুবহু স্মৃতিতে গেঁথে নেন। এই ধারায় নিজের মতো সুর বানিয়ে ইমপ্রোভাইজেশন করার চেয়ে ওস্তাদের শেখানো মূল সুরটিকে নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তোলার ওপরই সবচেয়ে বেশি জোর দেওয়া হয়।
বিংশ শতাব্দীর শেষভাগে খেমার রুজ শাসনের সেই ভয়াল কালো অধ্যায়ে কম্বোডিয়ার বহু গুণী শিল্পী নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছিলেন এবং তাঁদের বহু সাঙ্গীতিক সম্পদ চিরতরে ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। তবে আশার কথা হলো, বর্তমান সময়ে নতুন প্রজন্মের একনিষ্ঠ চেষ্টায় পিনপিয়েট ও চ্যাপেই-এর মতো প্রাচীন ঐতিহ্যগুলো ধ্বংসস্তূপ থেকে জেগে উঠে আবারও বিশ্বমঞ্চে মাথা তুলে দাঁড়াচ্ছে। এই সুর খেমার জাতির কাছে কেবল কিছু শব্দের সমষ্টি নয়, বরং এটি তাঁদের শত প্রতিকূলতার মাঝেও মাথা উঁচু করে বেঁচে থাকার এক অবিনশ্বর আত্মপরিচয়।
আরও দেখুন:
