ইন্দোনেশিয়ান সঙ্গীত | অসুরের সুরলোকযাত্রা সিরিজ

ইন্দোনেশিয়ার সঙ্গীত তার ভৌগোলিক বৈচিত্র্যের মতোই বিশাল এবং বর্ণিল। সতেরো হাজারেরও বেশি দ্বীপের এই দেশে সুরের বিন্যাস যেমন জটিল, তেমনি এর সাংস্কৃতিক শিকড় অত্যন্ত গভীর। “অসুরের সুরলোকযাত্রা” সিরিজের এই পর্বে আমরা জাভা এবং বালির দ্বীপপুঞ্জ থেকে উঠে আসা সেই ঐতিহ্যবাহী সঙ্গীত নিয়ে আলোচনা করব, যা যুগপৎ ধাতব ঐকতান এবং দ্বীপান্তরের আদিম স্পন্দনকে ধারণ করে বিকশিত হয়েছে।

ইন্দোনেশিয়ার সঙ্গীতের কথা বললে প্রথমেই যে ধারাটি মনে আসে, তা হলো গামেলান। এটি কেবল একটি সাঙ্গীতিক ঘরানা নয়, বরং এটি ইন্দোনেশিয়ার জাতীয় পরিচয়ের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ।

গামেলান: শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের প্রাণ

গামেলান হলো ইন্দোনেশিয়ার ঐতিহ্যবাহী শাস্ত্রীয় অর্কেস্ট্রা। ‘গামেল’ শব্দ থেকে এর উৎপত্তি, যার আক্ষরিক অর্থ হাতুড়ি দিয়ে আঘাত করা। এই অর্কেস্ট্রা মূলত ব্রোঞ্জ, লোহা বা বাঁশের তৈরি একদল ঘাতযন্ত্র বা পারকাশনের সমন্বয়ে গঠিত হয়। হিন্দু-বৌদ্ধ আমল থেকেই রাজদরবারে গামেলান অত্যন্ত মর্যাদার সাথে বাজানো হতো। বিশেষ করে রাজকীয় অনুষ্ঠান এবং ঐতিহ্যবাহী ছায়াপুতুল নাচের প্রধান আবহ হিসেবে এই অর্কেস্ট্রার ব্যবহার চলে আসছে।

ভৌগোলিক কারণে গামেলানের দুটি প্রধান রূপ দেখা যায়। জাভানিজ গামেলান সাধারণত বেশ ধীর, গম্ভীর এবং কিছুটা আধ্যাত্মিক মেজাজের হয়। এর বিপরীতে বালিনিজ গামেলান অত্যন্ত দ্রুত, উজ্জ্বল এবং গতিশীল চরিত্রের, যা শুনলেই মনের ভেতর এক ধরণের চঞ্চলতা তৈরি হয়।

পুতুল নাচ থেকে ড্যাংডুটের রঙ

গামেলান অর্কেস্ট্রা ছাড়াও ইন্দোনেশিয়ার লোকালয়ে আরও কিছু চমৎকার সাঙ্গীতিক ধারা জনপ্রিয়। এর মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত হলো ‘ওয়ায়াং কুলিত’ বা ঐতিহ্যবাহী ছায়াপুতুল নাচ। এখানে ‘ডালং’ নামে পরিচিত একজন পুতুল নাচিয়ে পর্দার পেছন থেকে মূল গল্পটি বলেন এবং ব্যাকগ্রাউন্ডে পুরো গামেলান দলটি সুরের নিখুঁত ওঠানামার মাধ্যমে নাটকের আবহ তৈরি করে। এর পাশাপাশি রয়েছে জাভানিজ উচ্চাঙ্গ কবিতার গান ‘তেমবাং’। এটি মূলত কণ্ঠসঙ্গীত প্রধান একটি রূপ, যেখানে সুরের মোচড় ও অলঙ্করণ অত্যন্ত মার্জিতভাবে প্রকাশ পায়। আবার সঙ্গীতের মাধ্যমে যখন ঐতিহাসিক বীরগাথা বা লোককাহিনী মঞ্চে অভিনয় করে দেখানো হয়, তখন জাভানিজ লোকনাট্যের সেই ধারাকে বলা হয় ‘কেটোপরাক’।

শহুরে সাধারণ মানুষের জীবনের খুব কাছের একটি ধারা হলো ‘ড্যাংডুট’। এটি ইন্দোনেশিয়ার সবচেয়ে জনপ্রিয় আধুনিক-লোকজ সঙ্গীত। মজার ব্যাপার হলো, এই ধারার গানে ভারতীয় চলচ্চিত্রের সঙ্গীত এবং আরবি সুরের এক অপূর্ব সংমিশ্রণ লক্ষ্য করা যায়। এর তালের প্রধান উৎস হলো আমাদের তবলা জাতীয় এক ধরণের ড্রাম। এছাড়া পর্তুগিজ নাবিকদের প্রভাবে তৈরি হওয়া আরেকটি পুরনো ধারা হলো ‘কেরোচং’, যেখানে ইউকুলেলে এবং ভায়োলিনের মেলোডি প্রধান ভূমিকা পালন করে।

ধাতব পাতের জটিল বাদ্যযন্ত্রসমূহ

গামেলান অর্কেস্ট্রার যন্ত্রগুলোর গঠন এবং কারিগরি রূপ বেশ অনন্য। এর প্রধান যন্ত্রগুলোর মধ্যে একটি হলো ‘বোনং’। এটি মূলত ব্রোঞ্জের তৈরি ছোট ছোট কিছু গং-এর সেট, যা একটি সুনির্দিষ্ট কাঠের তাকের ওপর সাজিয়ে হাতুড়ি দিয়ে বাজানো হয়। জাইলোফোনের মতো দেখতে আরেকটি যন্ত্র হলো ‘গেন্ডার’। এটি ধাতব পাতের তৈরি একটি যন্ত্র, যার প্রতিটি পাতের নিচে অনুরণন বা ইকো তৈরি করার জন্য বাঁশের ফাঁপা নল লাগানো থাকে।

পুরো অর্কেস্ট্রার সবচেয়ে পবিত্র এবং বড় যন্ত্র মনে করা হয় ‘গং আগেং’-কে। এই বিশাল গংটির গম্ভীর আওয়াজ মূলত একটি সম্পূর্ণ সাঙ্গীতিক চক্রের সমাপ্তি নির্দেশ করে। আর পুরো দলের সুরের গতি ও লয় নিয়ন্ত্রণ করার পেছনে থাকে ‘কেন্দাং’ নামের একটি দুই পাশের চামড়ার ড্রাম, যা বাদক নিজের হাতের তালু দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করেন।

পেলোগ ও সলেন্দ্রোর সুরগ্রাম

কারিগরি দিক থেকে গামেলানের টিউনিং সিস্টেম পশ্চিমা সঙ্গীতের চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা। এখানে মূলত দুটি ভিন্ন স্কেল বা স্বরগ্রাম ব্যবহার করা হয়:

  • সলেন্দ্রো (Slendro): এটি একটি পাঁচ স্বরের স্কেল, যা বাজানোর সাথে সাথে চারপাশের আবহে অত্যন্ত উজ্জ্বল ও উৎসবমুখর অনুভূতি তৈরি করে।
  • পেলোগ (Pelog): এটি সাত স্বরের একটি স্কেল, যা চরিত্রগতভাবে কিছুটা গম্ভীর এবং বিষণ্ণ রেশ তৈরি করতে পারে।

গামেলানের সবচেয়ে আকর্ষণীয় বাস্তব সত্য হলো, প্রতিটি গামেলান সেটের টিউনিং বা স্বরের পরিমাপ সম্পূর্ণ আলাদাভাবে করা হয়। কোনো একটি নির্দিষ্ট দল যেভাবে তাদের যন্ত্রগুলোর সুর বাঁধে, অন্য দলটির সুর তার থেকে কিছুটা আলাদা হবেই। আর এই কারণে দুটি সম্পূর্ণ আলাদা গামেলান দলের বাদ্যযন্ত্র কখনো একসাথে মিলিয়ে বাজানো সম্ভব নয়।

ইন্দোনেশিয়ার এই ঐতিহ্যবাহী সঙ্গীত তার ধাতব শব্দের ঝংকারে এক অতীন্দ্রিয় পরিবেশ তৈরি করে। গামেলানের প্রতিটি নিখুঁত আঘাত যেন মানুষের মনকে দৈনন্দিন কোলাহল থেকে দূরে, দ্বীপান্তরের কোনো এক আদিম প্রকৃতির স্পন্দনের কাছে নিয়ে যায়।

আরও দেখুন: