জাপানি শাস্ত্রীয় সঙ্গীত | অসুরের সুরলোকযাত্রা সিরিজ

বিশ্ব সঙ্গীতের ইতিহাসে জাপানি রাজদরবারের প্রাচীন সঙ্গীত এক অনন্য ও নিরিবিলি অধ্যায়। পশ্চিমা শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে যেখানে অনেকগুলো সুরের স্তর বা ‘হারমনি’ প্রধান, জাপানি সঙ্গীতে সেখানে প্রাধান্য পায় শব্দের নিজস্ব চরিত্র বা ‘টিমব্রা’। এর চেয়েও বড় বৈশিষ্ট্য হলো সুরের মাঝখানের শূন্যতা বা নির্জনতা, যাকে জাপানি নান্দনিকতায় বলা হয় ‘মা’ (Ma)। জাপানিদের মতে, দুটি সুরের মাঝখানের এই নীরবতা স্রেফ খালি জায়গা নয়, বরং সেটিও সুরের মতোই অর্থবহ। “অসুরের সুরলোকযাত্রা” সিরিজের এই বিশেষ পর্বে আমরা জাপানি রাজদরবারের সেই প্রাচীন ও শান্ত সুরশৈলী নিয়ে আলোচনা করব।

জাপানি শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের মূল চরিত্রটি গড়ে উঠেছে বৌদ্ধ ধর্মতত্ত্ব, শিন্তো আচার এবং প্রাচীন চীনা ও ভারতীয় সাঙ্গীতিক ভাবধারার মেলবন্ধনে। এর সুর অত্যন্ত ধীর ও গম্ভীর, যা শ্রোতাকে এক ধরণের ধ্যানমগ্ন অবস্থায় নিয়ে যায়।

গাগাকু অর্কেস্ট্রা - জাপানি শাস্ত্রীয় সঙ্গীত
গাগাকু অর্কেস্ট্রা

 

জাপানি শাস্ত্রীয় সঙ্গীত: রাজ দরবারের প্রশান্তি ও আধ্যাত্মিকতা

 

গাগাকু: বিশ্বের প্রাচীনতম জীবন্ত অর্কেস্ট্রা

জাপানি রাজদরবারের সঙ্গীতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং প্রধান ধারা হলো ‘গাগাকু’, যার আক্ষরিক অর্থ মার্জিত সঙ্গীত। সপ্তম শতাব্দী থেকে আজ পর্যন্ত জাপানি রাজপরিবারে (Imperial Court) এই সঙ্গীতধারাটি কোনো রকম ছেদ ছাড়াই বংশপরম্পরায় পরিবেশিত হয়ে আসছে। এই দীর্ঘ ইতিহাসের কারণে একে বিশ্বের প্রাচীনতম জীবন্ত অর্কেস্ট্রা বলা হয়।

এই দরবারি পরিবেশনাকে প্রধানত তিনটি রূপের মধ্যে দেখা যায়। প্রথমটি হলো ‘কাঙ্গেন’, যা কোনো কণ্ঠস্বর ছাড়া কেবল বাদ্যযন্ত্রের সমন্বয়ে গঠিত এক ধরণের পিওর ইন্সট্রুমেন্টাল মিউজিক। এতে সাধারণত বিভিন্ন বাঁশি, তারযুক্ত যন্ত্র এবং ড্রাম ব্যবহৃত হয়। দ্বিতীয় রূপটি হলো ‘বুগাকু’, যেখানে এই মার্জিত সুরের সাথে রাজকীয় কোরিওগ্রাফিতে নৃত্য পরিবেশন করা হয়। আর শেষ রূপটি হলো ‘উৎসামাই’, যা মূলত জাপানের নিজস্ব লোকজ সুরের ওপর ভিত্তি করে তৈরি গান ও নাচের এক চমৎকার কোলাজ।

গাগাকু অর্কেস্ট্রা - জাপানি শাস্ত্রীয় সঙ্গীত
গাগাকু অর্কেস্ট্রা

স্বর্গ ও পৃথিবীর সুরবাহী বাদ্যযন্ত্র

গাগাকু অর্কেস্ট্রায় ব্যবহৃত বাদ্যযন্ত্রগুলোর পেছনে গভীর প্রতীকী ও প্রাকৃতিক অর্থ লুকিয়ে আছে। এর মধ্যে সবচেয়ে অদ্ভুত যন্ত্রটি হলো ‘শো’। এটি সতেরোটি বাঁশের পাইপ দিয়ে তৈরি একটি ছোট মাউথ-অর্গান। যন্ত্রটির অবয়ব দেখতে অনেকটা ডানা মেলা ফিনিক্স পাখির মতো এবং এর থেকে বের হওয়া চিকন সুরকে জাপানি ঐতিহ্যে ‘স্বর্গের আলো’ বলে গণ্য করা হয়। এই স্বর্গের সুরের বিপরীতে মাটির পৃথিবীর মানুষের কণ্ঠস্বরের প্রতিনিধিত্ব করে ‘হিচিরিকি’ নামের একটি ছোট বাঁশি। এর ডাবল-রীডের তীব্র ও বিলাপের মতো শব্দ শ্রোতার মনে এক ধরণের বৈরাগ্য তৈরি করে।

এর পাশাপাশি রয়েছে জাপানের জাতীয় বাদ্যযন্ত্র ‘কোতো’। এটি তেরোটি তারবিশিষ্ট একটি অনুভূমিক টেবিল-জিথার, যার সুর অত্যন্ত লিরিক্যাল ও মিষ্টি। আর বীরগাথা বা লোকজ কাহিনী বর্ণনা করার সময় জাপানি চারণকবিরা বাজাতেন ‘বিওয়া’ নামের চার বা পাঁচ তারের এক বিশেষ লিউট।

মঠের স্তোত্র থেকে মঞ্চের নাট্যগীতি

জাপানি কণ্ঠসঙ্গীতের দিকে তাকালে এর আদি ধর্মীয় ও নাট্যরূপ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এর মধ্যে প্রাচীনতম হলো ‘শোমীয়ো’, যা মূলত জাপানি বৌদ্ধ সংগীতের একটি রূপ। কোনো বাদ্যযন্ত্রের সাহায্য ছাড়া, কেবল বৌদ্ধ সন্ন্যাসীদের সমবেত কণ্ঠের ওঠানামার (Melismatic Style) মাধ্যমে এই মন্ত্রপাঠ বা স্তোত্রগান করা হয়। এই সমবেত সুরের গাম্ভীর্য মন্দিরের ভেতরে এক অলৌকিক আধ্যাত্মিক পরিবেশ তৈরি করে।

মঞ্চের গানের মধ্যে প্রধান হলো ‘জোরুরি’। এটি মূলত ঐতিহ্যবাহী পুতুলনাচ (Bunraku) বা নাটকের সাথে পরিবেশিত এক ধরণের কাহিনীমূলক গান। এখানে ‘শামিসেন’ নামের তিন তারের একটি যন্ত্র বাজিয়ে অত্যন্ত চড়া ও আবেগপ্রবণ গলায় গল্পের চরিত্রগুলোকে ফুটিয়ে তোলা হয়। এর বাইরে রয়েছে বিশ্ববিখ্যাত ‘নোহ’ (Noh) নাটকের সঙ্গীত, যাকে বলা হয় ‘নোহগাকু’। এখানে একটি গায়কদল এবং বাঁশি ও ড্রামের সমন্বয়ে তৈরি একটি বাদকদল একসঙ্গে কাজ করে। এই নাটকের সুর ও বাচনভঙ্গি অত্যন্ত মন্থর ও প্রতীকী।

গাগাকু অর্কেস্ট্রা - জাপানি শাস্ত্রীয় সঙ্গীত
গাগাকু অর্কেস্ট্রা

হারমনি নয়, সুরের মায়াবী ছায়া

কারিগরি দিক থেকে জাপানি শাস্ত্রীয় সঙ্গীত পশ্চিমা সঙ্গীতের চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন। পশ্চিমা মিউজিকের মতো এখানে আলাদা আলাদা কর্ড বা হারমনি তৈরি করা হয় না, বরং এর মূল কৌশলটি হলো ‘হেটেরোফোনি’।

এখানে অর্কেস্ট্রার সব বাদ্যযন্ত্র মূলত একই প্রধান সুর বা মেলডি বাজায়। কিন্তু প্রতিটি যন্ত্রের বাদক তাঁর নিজস্ব ঢঙে, নিশ্বাসের মাপে কিংবা টাইমিংয়ে সামান্য একটু এদিক-ওদিক করে সেই সুরটি উপস্থাপন করেন। এর ফলে মূল সুরটির পেছনে অনেকগুলো সূক্ষ্ম ‘ছায়া’ তৈরি হয়, যা পুরো আবহটিকে অত্যন্ত রহস্যময় ও গভীর করে তোলে।

একইভাবে এদের সুরের গতিপ্রকৃতিও চলে একটি বিশেষ তাত্ত্বিক কাঠামো মেনে, যার নাম ‘জো-হা-কিউ’:

  • জো: পরিবেশনার শুরুটা হয় অত্যন্ত ধীর, লয়হীন এবং অগোছালোভাবে, যা শ্রোতার মনোযোগ আকর্ষণ করে।
  • হা: এই পর্বে এসে সুরের গতি কিছুটা বাড়ে এবং গানের মূল অবয়বটি স্পষ্ট হয়ে ডানা মেলতে শুরু করে।
  • কিউ: এটি হলো চূড়ান্ত পর্ব, যেখানে দ্রুত গতিতে সুরের চরম বিকাশ ঘটিয়ে হঠাৎ করেই পরিবেশনা শেষ হয়।

জাপানি রাজদরবারের এই প্রাচীন সঙ্গীত স্রেফ আমোদ-প্রমোদের মাধ্যম নয়, এটি মূলত একটি গভীর আত্মিক আচারের অংশ। সুরের ফাঁকে ফাঁকে লুকিয়ে থাকা নীরবতার মুহূর্তগুলো শ্রোতাকে নিজের অন্তরের দিকে তাকাতে সাহায্য করে। আধুনিক জে-পপ (J-pop) বা ইলেকট্রনিক মিউজিকের যুগেও এই প্রাচীন ‘গাগাকু’ বা ‘শোমীয়ো’ জাপানি সংস্কৃতির আভিজাত্য ও আধ্যাত্মিক শেকড়কে অত্যন্ত সগৌরবে টিকিয়ে রেখেছে।

আরও দেখুন: