১৯৪৭-এর দেশভাগের পটভূমিতে মুসলিম কউম হিসেবে আমরা রাজনীতি, শিক্ষা ও সংস্কৃতিতে এক সুগভীর ও দীর্ঘমেয়াদি পঙ্গুত্ব নিয়ে যাত্রা শুরু করেছিলাম। মেধানুশীলন ছাড়িয়ে প্রাতিষ্ঠানিক প্রজ্ঞা ও ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায় তৎকালীন মুসলিম সমাজের প্রথম সারির মানুষ ছিলেন যাঁরা, তাঁদের সিংহভাগই ভারতেই থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।
বিশেষ করে যেসব মনীষী ও রাজনীতিবিদের সেই প্রবল আত্মবিশ্বাস ছিল যে হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ ভূখণ্ডেও তাঁরা নিজেদের প্রজ্ঞা ও প্রাক্সিসে শীর্ষস্থান অর্জন করতে পারবেন, তাঁরা উদীয়মান পাকিস্তানের প্রলোভন কিংবা ধর্মভিত্তিক আশ্বাসে বিশ্বাস রেখে নিজ ভিটেমাটি ছাড়েননি।
রাজনীতির কাঠামোর কথাই যদি ধরা হয়—ভারত পেয়েছিল মাওলানা আবুল কালাম আজাদের মতো ঋষিতুল্য চিন্তাবিদ, ড. জাকির হুসেইনের মতো প্রজ্ঞাবান শিক্ষাবিদ কিংবা হুমায়ুন কবিরের মতো মননশীল প্রাবন্ধিককে।

আর তার বিপরীতে নবগঠিত পাকিস্তান নামক ভূখণ্ডটির মাথায় এসে বসলেন মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ ও লিয়াকত আলী খানের মতো মূলত আইনি-আমলাতান্ত্রিক মানসিকতার ব্যক্তিবর্গ—যাঁরা জীবনে একটি মৌলিক চিন্তার বই তো দূরের কথা, গভীর কোনো সাময়িকীতে রাজনৈতিক প্রজ্ঞার প্রকাশ ঘটানো তত্ত্বীয় প্রবন্ধ লেখার সক্ষমতাও দেখাননি।

শিক্ষা, দর্শন, সঙ্গীত ও সাহিত্যের মতো স্পর্শকাতর জায়গায় যাঁদের ব্যক্তিত্বের ওজন ও মননশীল প্রজ্ঞা ছিল গভীর, তাঁদের বড় অংশটি রয়ে গেলেন ভারতেই। পাকিস্তান ভাগে পেল হাতে গোনা কয়েকটি সুবিধাবাদী অভিজাত পরিবার আর অল্প কিছু রাজনৈতিক অনুগত ব্যক্তি।

এমনকি পাকিস্তান রাষ্ট্রটি গঠিত হওয়ার পর সেখানকার সংকুচিত ও প্রতিক্রিয়াশীল পরিবেশ সহ্য করতে না পেরে অনেক বড় মাপের শিল্পী-সাহিত্যিক উল্টো পাকিস্তান ছেড়ে ভারতে পাড়ি দিলেন—যাকে পাকিস্তানের ‘দ্বিতীয় প্রজ্ঞা-প্রস্থান’ বা ‘দি সেকেন্ড এক্সোডাস’ বলা যায়।
কাসুর-পাতিয়ালা ঘরানার শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের অনন্য দিকপাল উস্তাদ বড়ে গোলাম আলী খান পাকিস্তানে গিয়ে সেখানকার সাংস্কৃতিক অনাদর ও ধর্মান্ধ সংকীর্ণতায় ক্ষুব্ধ হয়ে নিজ ভিটেমাটি ছেড়ে ভারতের নাগরিকত্ব গ্রহণ করেন।
একইভাবে প্রখ্যাত চলচ্চিত্র নির্মাতা মেহবুব খান, আবদুর রশীদ কারদার এবং অভিনেতা নাসির খান পাকিস্তানের রুদ্ধকর পরিবেশ ছেড়ে বোম্বে চলচ্চিত্রে স্থায়ী আসন গেড়েছিলেন।

সাহিত্য অঙ্গনেও একই বিপর্যয় ঘটেছিল; ‘আগ কা দরিয়া’-র মহাকাব্যিক রচয়িতা কুররাতুলআইন হায়দার রাষ্ট্রীয় নজরদারি ও হয়রানির শিকার হয়ে ভারতমুখী হন, আর প্রগতিশীল চিন্তার কবি সাহির লুধিয়ানভি রাজনৈতিক পরোয়ানামূলক দমনপীড়নের মুখে লাহোর ছেড়ে ভারতে পাড়ি জমান।

আর যেসব স্বাধীনচেতা বুদ্ধিজীবী ও প্রজ্ঞাবান ব্যক্তিবর্গ পাকিস্তানে রয়ে গিয়েছিলেন—সাদাত হাসান মান্টো, ফয়েজ আহমেদ ফয়েজ, সাজ্জাদ জহির, আহমেদ নদীম কাসমি কিংবা জোশ মালিহাবাদি—রাষ্ট্র তাঁদের সঙ্গে পৃষ্ঠপোষকের মতো নয়, বরং চরম বৈরী আচরণ করেছে। মান্টোকে ঘোরানো হলো একের পর এক অশ্লীলতার মামলার বিচারে আদালতের বারান্দায়, ফয়েজকে ‘রাওয়ালপিন্ডি ষড়যন্ত্র মামলায়’ বছরের পর বছর বন্দি রাখা হলো জেলে, আর সাজ্জাদ জহিরকে ঠেলে দেওয়া হলো নির্বাসনে।
সঙ্গীতের ঐতিহ্যিক ঘরানাগুলোর দিকে তাকালে এই প্রজ্ঞানাশের বীভৎসতা আরও করুণভাবে ফুটে ওঠে। কাসুর-পাতিয়ালা, শাম চৌরাশি, দিল্লি ও কাওয়াল বাচ্চা, তালওয়ান্ডি, কিরানা, গোয়ালিয়র কিংবা পাঞ্জাব তবলার মতো বিশ্বখ্যাত ঘরানার বহু ওস্তাদ পাকিস্তানে হিজরত করেছিলেন। কিন্তু রাষ্ট্র তাঁদের শিল্প ও প্রজ্ঞাকে বিকশিত করার মতো ন্যূনতম পরিবেশ দিতে চরমভাবে ব্যর্থ হয়। মেহেদি হাসানের মতো বংশানুক্রমিক কালাবান্দ ও প্রজ্ঞাবান সুরসাধককে জীবনের দীর্ঘ সময় সাইকেলের ও মোটরের মেকানিক হিসেবে কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করতে হয়েছে এবং একটু সুস্থ পরিবেশ পাওয়ার আশায় প্রহর গুনতে হয়েছে। আজ তাকিয়ে দেখুন—ভারত বা বিদেশের স্বীকৃতি ছাড়া এই ঘরানাগুলোর আর কয়টি প্রজ্ঞার দীপশিখা পাকিস্তানে টিকে রয়েছে? মোটকথা, চিন্তা, শিল্প ও প্রজ্ঞাচর্চায় পাকিস্তান আমলে একটি সমাজ হিসেবে আমরা প্রতিদিন অলক্ষ্যে আরও দেউলিয়া হয়েছি।

এই দেউলিয়াত্বের নেপথ্যে সবচেয়ে বড় ঐতিহাসিক কারণ ছিল বর্জনের সংস্কৃতি এবং রাজনৈতিক শত্রুতাবশত নিজেদেরই সাংস্কৃতিক শেকড় কেটে ফেলার অন্ধ প্রবণতা। পাকিস্তান যেহেতু ভারতের বিপরীতে একটি পৃথক রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছিল, তাই রাষ্ট্রটির মনস্তাত্ত্বিক গোঁড়ামি হয়ে দাঁড়াল—সাংস্কৃতিক পরিচয়কেও হতে হবে ভারতের সম্পূর্ণ বিপরীত। অর্থাৎ, ভারত যা করবে, তার ঠিক উল্টোটি করাই হয়ে উঠল পাকিস্তানের তথাকথিত জাতীয় পরিচয়। কিন্তু প্রজ্ঞা ও বুদ্ধিবৃত্তিক ঐতিহ্য তো আর রাজনৈতিক বা ভৌগোলিক সীমানার মতো রাতারাতি কাটাতারের বেড়া দিয়ে তৈরি করা যায় না।
যেকোনো প্রজ্ঞাবান ও উন্নত সমাজ গড়ে তোলার জন্য প্রয়োজন পড়ে শক্তিশালী অনুকরণীয় বাতিঘর এবং একটি নিরবচ্ছিন্ন ঐতিহাসিক ‘সিলসিলা’ বা জ্ঞানানুশীলনের ঐতিহ্যিক ধারা। ভারতের হাজার বছরের যৌথ বুদ্ধিবৃত্তিক ও সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার থেকে নিজেদের প্রাক্সিস ও ন্যায্য হিস্যা বুঝে নিয়ে আত্মপরিচয়কে সমৃদ্ধ করার বদলে, পাকিস্তান রাষ্ট্রযন্ত্র নিজের প্রজ্ঞার শেকড় কেটে রাতারাতি এক কৃত্রিম অপসংস্কৃতি নির্মাণের চেষ্টা করল।
বলা বাহুল্য, সেই চেষ্টা জন্ম দিল এক বিকলাঙ্গ ও পঙ্গু ব্যবস্থার। জাতীয় কবি হিসেবে আল্লামা ইকবালকে রাষ্ট্রীয়ভাবে সামনে রাখার বাহ্যিক মহড়া থাকলেও, পাকিস্তানে তাঁর মূল দার্শনিক চিন্তার সিলসিলা বিন্দুমাত্র এগোয়নি।
ইকবালের পরবর্তী প্রধান কবি ফয়েজ আহমেদ ফয়েজ চিন্তায় ও কাব্যশৈলীতে ছিলেন সম্পূর্ণ ভিন্ন ধারার—বামপন্থী ও প্রগতিশীল; ইকবালের প্যান-ইসলামিক পুনর্গঠনবাদের সাথে তাঁর কাব্যিক ঐতিহ্যিক যোগসূত্র প্রায় অনুপস্থিত। মোটকথা, অন্ধ ও নেতিবাচক স্বাতন্ত্র্য খুঁজতে গিয়ে রাষ্ট্রীয়ভাবে নিজের শেকড় কেটে ফেলায় সাংস্কৃতিক মহীরুহটি গোড়া থেকেই শুকিয়ে গেল।

পূর্ববঙ্গের বা আজকের বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এই বুদ্ধিবৃত্তিক বিপর্যয়টি ছিল আরও জটিল, বহুমুখী ও ধ্বংসাত্মক। আমরা মূলত তিনটি ঐতিহাসিক ধাক্কায় নিজেদের প্রজ্ঞার সোপানগুলো হারিয়েছি।
প্রথমত, ১৯৪৭-এর আগে পূর্ববঙ্গের মুসলিম সমাজের উচ্চতর বুদ্ধিবৃত্তিক ও সাহিত্যিক চর্চা ছিল মূলত উর্দু, ফারসি ও ব্রজভাষাকেন্দ্রিক। পাকিস্তানের রাজনীতিবিদদের প্রজ্ঞাহীনতার কারণে ৫২-র ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমে সেই চর্চা অপ্রাসঙ্গিক হয়ে গেল। পাকিস্তান আমাদের ঠেলে দিল উর্দু-ফার্সি বর্জনের দিকে। আর ১৯৭১-এ বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর এই ধারাটি স্বাভাবিকভাবেই তার সামাজিক তাৎপর্য ও প্রয়োজনীয়তা হারিয়ে অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়ল।

দ্বিতীয়ত, ১৯২০ ও ৩০-এর দশকে কলকাতা ও ঢাকাকে কেন্দ্র করে বাঙালি মুসলিম সমাজে এক অনন্য প্রাতিষ্ঠানিক প্রজ্ঞার স্ফুরণ ঘটেছিল। একদিকে কাজী নজরুল ইসলামের প্রথাবিরোধী ও অসাম্প্রদায়িক কাব্যভাবনা মুসলিম মননকে শতাব্দীর সামাজিক স্থবিরতা থেকে টেনে তুলে আধুনিক মানসলোকের আলো দেখায়। অন্যদিকে ১৯২৬ সালে ঢাকায় প্রতিষ্ঠিত ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ’ এবং তাদের ঐতিহাসিক মুখপত্র ‘শিখা’-কে ঘিরে সূচনা হয় বিখ্যাত ‘বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলন’। কাজী আবদুল ওদুদ, আবুল হোসেন, কাজী মোতাহার হোসেন, আবুল ফজল কিংবা মোতাহের হোসেন চৌধুরীর মতো তরুণ প্রজ্ঞাবান ব্যক্তিত্বরা উচ্চকণ্ঠে ঘোষণা করেছিলেন—“জ্ঞান যেখানে সীমাবদ্ধ, বুদ্ধি সেখানে আড়ষ্ট, মুক্তি সেখানে অসম্ভব।”
এগুলো নিছক কোনো আড্ডাধর্মী বা প্রাতিষ্ঠানিক সাহিত্য সমিতি ছিল না; এটি ছিল আধুনিক বাংলা ভাষায় মুসলিম প্রজ্ঞাচর্চার প্রথম স্বাবলম্বী ও বিপ্লবী ভিত্তিপ্রস্তর। তৎকালীন ধর্মান্ধ সমাজের তীব্র মানসিক বাধা ও রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে তাঁরা প্রথাগত কুসংস্কার, গোঁড়ামি ও অন্ধ অনুকরণপ্রিয়তার বিরুদ্ধে মুক্তচিন্তা, যুক্তিবাদ ও ধর্মনিরপেক্ষ মানবতাবাদের স্তম্ভ নির্মাণ করছিলেন। কলকাতা ও ঢাকার মননশীল সাংস্কৃতিক যোগাযোগের কারণে বাংলা ভাষায় মুসলিম চিন্তার এমন এক সার্বভৌম ‘সিলসিলা’ বা ঐতিহ্য তৈরি হচ্ছিল, যা ইউরোপীয় রেনেসাঁসের মতোই স্বকীয় আত্মবীক্ষণের শক্তিতে বলীয়ান ছিল।
কিন্তু ১৯৪৭-এর ধর্মভিত্তিক ত্বরান্বিত দেশভাগ ও রাজনৈতিক সীমান্তে কাটাতারের রেখা এই সম্ভাবনাময় প্রজ্ঞা-পরম্পরার ওপর প্রথম ও সবচেয়ে মারাত্মক আঘাতটি হানে। দেশভাগের ফলে এই প্রজ্ঞাচর্চার মূল কেন্দ্র কলকাতা থেকে পূর্ববঙ্গ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। চিন্তাবিদ ও প্রজ্ঞাবান ব্যক্তিত্বরা ভৌগোলিক ও সামাজিকভাবে দ্বিখণ্ডিত হয়ে যান; একটি বড় অংশ কলকাতায় থেকে গেলেন, আর একটি অংশ চরম অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে তৎকালীন প্রাদেশিক ঢাকায় ছিটকে এলেন।
ফলাফল দাঁড়াল ভয়াবহ। কয়েক দশকের নীরব সাধনায় গড়ে উঠতে থাকা এই স্বাধীনচেতা বাঙালি-মুসলিম বুদ্ধিবৃত্তিক ধারাটি পূর্ণাঙ্গ বিকশিত হওয়ার আগেই তার মূল উৎস ও ঐতিহাসিক সংযোগ হারিয়ে ফেলল। যে আন্দোলনটি মুক্তচিন্তা ও মননশীল প্রজ্ঞায় বাঙালি মুসলিম সমাজকে আত্মমর্যাদাশীল করে তুলছিল, ৪৭-এর দেশভাগ তার প্রাতিষ্ঠানিক সলিলসমাধি ঘটাল। আর সেই শূন্যস্থানে রাষ্ট্রীয়ভাবে চাপিয়ে দেওয়া হলো শেকড়হীন, কৃত্রিম ও অন্ধ এক পাকিস্তানীয় ভাবাদর্শ।

তৃতীয়ত এবং সবচেয়ে ভয়াবহ ও মর্মান্তিক আঘাতটি আসে ১৯৭১ সালে। ১৯৫২-এর ঐতিহাসিক ভাষা আন্দোলনের পর তৎকালীন পূর্ববঙ্গের বুদ্ধিজীবীরা বুঝতে পেরেছিলেন—কেবল রাজনৈতিক স্বাধিকার দিয়ে এই কউমের আত্মপরিচয়ের সংকট কাটবে না। প্রয়োজন ছিল রাষ্ট্রীয়ভাবে কেটে ফেলা সাংস্কৃতিক শেকড় এবং হাজার বছরের প্রাচীন বাঙালি প্রজ্ঞার সাথে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া আত্মিক সংযোগটি নতুন করে পুনর্প্রতিষ্ঠা করা।
আর সেই মহাজাগতিক সংযোগের সবচেয়ে শক্তিশালী প্রজ্ঞার সেতু হয়ে উঠেছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। পাকিস্তানি রাষ্ট্রযন্ত্র যখন বাঙালিকে ধর্মীয় জুজুর ভয় দেখিয়ে উর্দু-ফারসির কৃত্রিম খোপে বন্দি করতে চেয়েছিল, ঠিক তখন ঢাকার প্রজ্ঞাবান সমাজ রবীন্দ্রনাথের দর্শন, সাহিত্য ও নন্দনতত্ত্বের মধ্য দিয়ে চর্যাপদ, বৈষ্ণব পদাবলী, বাউল ঐতিহ্য এবং প্রাচীন বাংলা সাহিত্যের আদি প্রজ্ঞার মূলধারার সাথে নিজেদের পুনরায় যুক্ত করেন।
১৯৬১ সালে প্রবল সরকারি নিষেধাজ্ঞা ও রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে ঢাকায় ‘রবীন্দ্র-শতবার্ষিকী’ উদযাপন কিংবা ছায়ানটের সূচনা কেবল গান গাওয়ার সাধারণ আয়োজন ছিল না। ওটি ছিল পাকিস্তানি প্রজ্ঞাহীনতার অন্ধ প্রাচীর ভেঙে হাজার বছরের বাঙালি মনন ও প্রজ্ঞার ‘সিলসিলা’ বা ধারাবাহিকতাকে পুনরুজ্জীবিত করার এক ঐতিহাসিক বুদ্ধিবৃত্তিক বিপ্লব।
আর ঠিক এই কারণেই ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি দখলদার বাহিনী ও তাদের স্থানীয় দোসরদের সবচেয়ে বিষাক্ত আক্রোশ ছিল এই প্রজ্ঞাবানদের ওপর। তারা স্পষ্ট বুঝতে পেরেছিল, এই চিন্তাবিদেরা বাঙালিকে কেবল রাজনৈতিকভাবে প্রস্তুত করেননি; বরং রবীন্দ্রনাথ ও আদি প্রজ্ঞার যৌথ উত্তরাধিকারের সাথে যুক্ত করে তাদের জাতীয় মেরুদণ্ড সোজা করে দিয়েছেন।
তাই বিজয়ের ঠিক প্রাক্কালে, ১৪ই ডিসেম্বরের সুপরিকল্পিত ‘বুদ্ধিজীবী গণহত্যা’-র মূল লক্ষ্যই ছিল রবীন্দ্রনাথ ও প্রাচীন ঐতিহ্যের সাথে গড়ে ওঠা এই নবীন প্রজ্ঞা-পরম্পরাকে চিরতরে কেটে ফেলা। কয়েক শত বছরের পথ পরিক্রমায় অর্জিত যে জ্যেষ্ঠ প্রজ্ঞাবানরা পরবর্তী প্রজন্মের হাতে এই প্রাচীন প্রজ্ঞার আলোকবর্তিকা তুলে দিতেন, তাঁদের এক লহমায় নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া হলো।
বাংলাদেশ জন্ম নিল তার আড়াই হাজার বছরের আদি প্রজ্ঞার সাথে সদ্য পুনঃসংযুক্ত হওয়া আধুনিক সেতুটিকে হারিয়ে এক চরম, ভয়াবহ ও অকল্পনীয় প্রজ্ঞাশূন্যতার ওপর। স্বাধীনতার পর রাষ্ট্র গঠনের প্রাথমিক দিনগুলোতে তাই দেখা গেল এক দিশাহীন পঙ্গুত্ব—কারণ যাদের প্রজ্ঞার ছায়ায় সংবিধান, শিক্ষা ও সংস্কৃতি রূপ পাওয়ার কথা ছিল, সেই পথপ্রদর্শকদের আসনগুলো একদিনেই পুরোপুরি ফাঁকা হয়ে গিয়েছিল।

একটি রক্তাক্ত যুদ্ধের পর সদ্য স্বাধীন দেশ যখন সেই অভাবনীয় প্রজ্ঞা-শূন্যতা কোনোমতে সামলে ওঠার চেষ্টা করছিল, তখনই ১৯৭৫-এর রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও সামরিক শাসনের পদধ্বনি শোনা গেল। সামরিক শাসক ও তাদের প্রতিক্রিয়াশীল রাষ্ট্রযন্ত্রের মনস্তাত্ত্বে স্বাধীনচেতা বাঙালি বুদ্ধিজীবীরা ছিলেন আশঙ্কাজনক ‘ভিলেন’। ফলে তাঁদের মেধা ও প্রজ্ঞাকে রাষ্ট্র গঠনে কাজে না লাগিয়ে সমাজ ও নীতি-নির্ধারণী জায়গা থেকে বিচ্ছিন্ন করে রাখা হলো।

আর সেই ফাঁকা শূন্যতার সুযোগে অযোগ্য, অনুগত ও অথর্ব কিছু লোককে আমলাতন্ত্র, রাজনীতি, বিচার বিভাগ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শীর্ষ পদগুলোতে বসিয়ে দেশের বুদ্ধিবৃত্তিক দিকনির্দেশনা ঠিক করার দায়িত্ব দেওয়া হলো। এভাবে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে লালন করা হলো প্রজ্ঞাহীন মধ্যমেধাকে।
বুদ্ধিবৃত্তিক প্রজ্ঞা কোনো আকস্মিক বিষয় নয়; তা একদিনে বা এক প্রজন্মে তৈরি হয় না। দাদা থেকে বাবা, বাবা থেকে সন্তান—এভাবে কয়েক প্রজন্মের নীরব, গভীর ও ধারাবাহিক সাধনায় একটি সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রজ্ঞার ভিত্তি তৈরি হয়।
কিন্তু আমাদের ইতিহাস হলো প্রতি ২০-২৫ বছর পর পর সেই প্রজ্ঞার শেকড় কেটে ফেলার ইতিহাস। যার করুণ পরিণতি আজ আমরা সমাজের প্রতিটি ক্ষেত্রে হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছি।
আমাদের রাজনীতি, সাহিত্য, প্রশাসন, বিচার বিভাগ, সামরিক বাহিনী কিংবা শিক্ষাঙ্গন—যাঁরাই আজ সমাজের নীতি-নির্ধারণী আসনে বসে আছেন, তাঁদের বড় অংশের প্রজ্ঞাগত সক্ষমতা অত্যন্ত মাঝারি বা নিম্ন স্তরের।
আর এই মধ্যমেধাদের সবচেয়ে বড় মনস্তাত্ত্বিক ট্র্যাজেডি হলো—তারা প্রকৃত মেধা ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রজ্ঞাকে চরম ভয় পায়। প্রজ্ঞাবান চিন্তার মুখোমুখি হলে নিজেদের ক্ষুদ্রতা ও পঙ্গুত্ব প্রকাশ পেয়ে যাওয়ার ভয়ে তারা পদে পদে তোষামোদকারী ও অযোগ্যদের পুনর্বাসন করে।
এই দীর্ঘমেয়াদি ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রজ্ঞাহীনতা থেকেই জন্ম নিয়েছে আমাদের জাতীয় হীনমন্যতা। এই হীনমন্যতা আমাদের নিজেকে প্রজ্ঞাবান করে গড়ে তোলার প্রেরণা দেয় না; বরং অন্যকে টেনে নিচে নামিয়ে নিজের নিচু স্তরে মিলিয়ে নেওয়ার আত্মঘাতী উন্মাদনা যোগায়।
এটি নিজেদের ভুল শুধরে প্রজ্ঞার পথে এগিয়ে যাওয়ার উদ্দীপনা তৈরি করে না; বরং অন্যের কাল্পনিক দোষ বা ত্রুটি খুঁজে নিজেদের অক্ষয় অক্ষমতাকে ঢাকার এক বিকৃত মানসিক তৃপ্তি দেয়।
যে সমাজ প্রজ্ঞানুশীলনের দীর্ঘ পরম্পরা হারিয়ে মধ্যমেধার শাসন মেনে নেয়, হীনমন্যতাই শেষ পর্যন্ত সেই সমাজের মূল জাতীয় ও মানসিক পরিচয় হয়ে দাঁড়ায়।
