আমার ভাষা | আমার সংস্কৃতি সিরিজ

সংস্কৃতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ হলো ভাষা। তাই এই সিরিজে এটা অত্যন্ত গুরুত্বপুর্ন একটি বিষয়।

আমি জন্মেছি কুষ্টিয়া জেলার কুমারখালী উপজেলার একটি গ্রামে। সেই জন্মসূত্রে আমি পুরনো নদীয়ার মানুষ। উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছি নদীয়ার সেই আদি ভাষা। আমাদের এই অঞ্চলের ভাষা প্রমিত বাংলার সবচেয়ে কাছাকাছি বলে মনে মনে এক ধরণের গর্বও ছিল। কিন্তু আমরা যুবক হওয়ার পর দেখলাম, কোথা থেকে একদল মানুষ নতুন দাবি নিয়ে এলেন—প্রমিত বাংলা নাকি এদেশের মানুষের ভাষা নয়! তাদের মতে, প্রমিত বাংলা আসলে ভারতীয় বা কলকাতার ‘হেজিমনি’ (আধিপত্য)। তাই প্রমিত বাংলার চর্চা মানে নাকি বাঙালি সংস্কৃতি নয়, বরং কলকাতার ‘হিন্দুয়ানি’ ভাষার চর্চা। তাদের দাবি অনুযায়ী, আমাদের নাকি ‘খাইছস, গেছস, দেখসস’—মার্কা একটি কৃত্রিম ভাষা আঁকড়ে ধরে ‘নেটিভ’ বা সাচ্চা বাংলাদেশি হতে হবে।

আমি অবাক হয়ে তাদের দিকে চেয়ে থাকি। দেশভাগের সময় নদীয়ার ৬২ শতাংশ ভূখণ্ড নিয়ে আমরা বাংলাদেশে এলাম, অথচ সেই অঞ্চলের ভাষা বাংলাদেশের হলো না, হয়ে গেল ভারতের? তাদের সেই উদ্ভাবিত ‘অপভাষা’ আঁকড়ে ধরে আমাকে আমার নিজের ভাষাকেই ‘বিদেশি’ ভাবতে হবে? তাদের মাথায় একবারও কাজ করে না যে, তাদের চাপিয়ে দেওয়া সেই বুলি বরং আমার কাছে অনেক বেশি অচেনা বা ‘ফরেন’।

আবার তাদের পছন্দ যদি হতো চাটগাঁইয়া বা সিলেটির মতো কোনো সমৃদ্ধ আঞ্চলিক ভাষা, তবুও একটি কথা ছিল। কিন্তু যে ভাষাটি তারা আমাদের ওপর চাপাতে চায়, সেই ভাষার ভিত্তি কোথায়? তার কি কোনো সুগঠিত রূপ আছে? পাতে দেওয়ার মতো কোনো সাহিত্য, গান-বাজনা, ছড়া বা প্রবাদ-বচন আছে কি?

ভাষা কিংবা যেকোনো শিল্প-সাহিত্যের ধর্ম হলো সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়া। প্রতিটি প্রজন্ম একটি মান (Standard) তৈরি করে দিয়ে যায়, পরবর্তী প্রজন্ম তাকে আরও ঘষে-মেজে উন্নত করে। প্রশ্ন হলো, তাদের প্রস্তাবিত ওই অপভাষার মানদণ্ডটা কী? সেখান থেকে আমরা কোন দিকে এগোব?

এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজলে হয়তো ভাষা বিষয়ক প্রাথমিক বিভ্রান্তি কিছুটা হলেও কাটবে।

এবার আসি বিদেশি ভাষার প্রসঙ্গে। একজন মানুষকে যদি পৃথিবীর বিভিন্ন সভ্যতা, শিল্প ও সংস্কৃতির রূপ-রস আস্বাদন করতে হয়, তবে তাকে অন্য কিছু ভাষা শিখতেই হয়—অন্তত সেই ভাষার কিছু শব্দ বা বিশেষ প্রকাশভঙ্গি (Expression)। পৃথিবীর সব ভাষার সাহিত্যই আপনাকে নতুন কোনো উপাদান দিতে সক্ষম, যা হয়তো আপনার নিজের সাহিত্যে নেই। সেই অভিজ্ঞতা নিলে কেবল নিজের আনন্দই বাড়বে না, আপনি যদি আপনার ভাষায় তা ধারণ করতে পারেন, তবে আপনার প্রিয় মাতৃভাষাটিও সমৃদ্ধ হবে।

আপনি যদি মনে করেন এসবের আপনার কোনো প্রয়োজন নেই, তবে পড়া এখানেই শেষ করতে পারেন। আর যদি এই প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন, তবে চলুন সামনে আগানো যাক।

ইংরেজি বা পশ্চিমা ভাষা শিক্ষা নিয়ে এদেশে বিশেষ বিতর্ক নেই, তাই তা নিয়ে আলাপের প্রয়োজনও সামান্য। তবে উর্দু-ফারসি নিয়ে আমি এক বিরাট সাংস্কৃতিক টানাপোড়েন লক্ষ্য করি। বিশেষ করে যারা নিজেদের প্রগতিশীল বা স্বাধীনতার পক্ষের শক্তি মনে করেন, এখানে এসে তাদের সাংস্কৃতিক চিন্তা কিছুটা টলমলে হয়ে যায়। কারণ, আমাদের ভাষা আন্দোলনের সাথে একটি তীব্র আবেগ জড়িয়ে আছে (যদিও আমাদের লড়াই ছিল বাংলার অধিকারের জন্য, উর্দুর বিরুদ্ধে নয়। উর্দুর বদলে যদি পাঞ্জাবি, সিন্ধি বা বেলুচি আমাদের ওপর চাপাতে চাওয়া হতো, আমাদের প্রতিক্রিয়া একই হতো। এটি নিয়ে আমার ভিন্ন লেখা আছে)। তাই বিষয়টি নিয়ে কিছুটা আলোকপাত করা প্রয়োজন।

আমি মনে করি, অবিভক্ত ভারতবর্ষের সঙ্গীত, সাহিত্য ও শিল্পকলার (যা অন্তত দেশভাগের আগে সৃষ্টি হয়েছে) ওপর আমার পূর্ণ অধিকার আছে। এই অধিকার উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত। কারণ আমার পূর্বপুরুষরা সম্মিলিত শ্রমে-ঘামে এসব তিল তিল করে গড়ে তুলেছিলেন। তবে সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার তো আর পৈতৃক সম্পত্তির মতো নয় যে, ভাগ করে পকেটে নিলেই অধিকার প্রতিষ্ঠা হয়ে গেল। সাংস্কৃতিক অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে হলে তাকে হৃদয়ে ধারণ করতে হয়।

পিতার দিক থেকে আমি এক অত্যন্ত ধার্মিক মুসলিম পরিবারে জন্মেছি। শৈশবে কয়েক বছর মাদ্রাসাতেও পড়েছি। সেই সুবাদে আরবি-ফারসি-উর্দুর সাথে পরিচয় হয়েছে ঠিকই, কিন্তু সেই পরিচয়ে এই ভাষাগুলোর প্রতি আমার নাড়ির টান বা উত্তরাধিকারের দাবি জন্মায়নি।

আমি যখন বড় হয়ে উর্দু সাহিত্যের কাছাকাছি হলাম, দূর থেকে ফারসি সাহিত্যে উঁকি দিলাম এবং উর্দু ভাষার জন্ম ও বেড়ে ওঠার ইতিহাস জানলাম—তখনই কেবল আমার মধ্যে এই ভাষার প্রতি অধিকারবোধ জন্মালো। নাদির শাহের লুটপাটের পর বিধ্বস্ত দিল্লি থেকে যখন কবি-সাহিত্যিকরা লখনউতে হিজরত করছিলেন, আমার মনে হয়েছে—আমিও তখন সেখানে ছিলাম। আমি মীর তাকি মীরের সেই বিষাদ, সেই মেজাজ আর হতাশা খুব কাছ থেকে দেখেছি। হয়তো আমি তাদের ছায়াসঙ্গী, সফরসঙ্গী কিংবা নিছক একজন টাঙ্গাওয়ালাই ছিলাম। ‘চাচা গালিব’ তো তার প্রতিটি শে’রে যেন আমারই মনের কথা বলে গেছেন। আর প্রগতিশীল লেখক আন্দোলনের সাথে যুক্ত সাহিত্যিকরা যত স্পষ্টভাবে আমার মনের অব্যক্ত কথাগুলো তুলে ধরেছেন, তাতে তাদের আর ‘অজাতীয়’ বা ‘অনাত্মীয়’ ভাবার কোনো অবকাশ নেই।

আজ এটুকুই থাক। পরে আরও যোগ করবো।

আরও দেখুন: