আমি বড় বড় একাডেমিক ডিগ্রি বা সার্টিফিকেট থাকা মানেই কাউকে শিক্ষিত মনে করি না। একজন মানুষ হয়তো তার পেশায় অত্যন্ত দক্ষ—তিনি একজন বিশেষজ্ঞ, টেকনিশিয়ান বা কনসাল্টেন্ট হিসেবে সম্মানের যোগ্য—কিন্তু তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে তাকে “শিক্ষিত মানুষ” বানায় না। বাস্তবে আমরা বহু মানুষ দেখি যাদের উচ্চ ডিগ্রি আছে, অথচ সাধারণ মানবিক বোধ, সাংস্কৃতিক সংবেদনশীলতা, অন্যকে বোঝার ক্ষমতা কিংবা ভিন্ন মতের প্রতি শ্রদ্ধা নেই। শিক্ষা যদি মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি প্রসারিত না করে, তাকে বিনয়ী না করে, অন্যের প্রতি সহমর্মী না করে—তবে সেই শিক্ষা কেবল তথ্য বা দক্ষতার সংগ্রহ, প্রকৃত শিক্ষা নয়।
আমার কাছে শিক্ষিত মানুষ মানে প্রথমত এমন একজন ব্যক্তি, যিনি নিজের মাতৃভাষা জানেন এবং সেই ভাষার সাহিত্য, সংস্কৃতি ও ইতিহাস সম্পর্কে অন্তত মৌলিক ধারণা রাখেন। ভাষা কেবল যোগাযোগের মাধ্যম নয়; এটি একটি জাতির স্মৃতি, অভিজ্ঞতা ও আত্মপরিচয়ের ধারক। যে ব্যক্তি নিজের ভাষা ও সংস্কৃতিকে জানে না, সে নিজের শেকড় সম্পর্কে অজ্ঞ থেকে যায়। একই সঙ্গে একজন শিক্ষিত মানুষ কেবল নিজের সংস্কৃতি নয়, পৃথিবীর অন্য জাতিগোষ্ঠীর ইতিহাস, বিশ্বাস, পছন্দ-অপছন্দ ও জীবনদৃষ্টিও জানার চেষ্টা করেন এবং সেগুলোর প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকেন।
শিক্ষা মূলত আচরণের ইতিবাচক পরিবর্তন। একজন সত্যিকারের শিক্ষিত মানুষের আচরণে বিনয়, ভদ্রতা ও মানবিকতা প্রকাশ পায়। তিনি সমাজের যেকোনো স্তরের মানুষের সঙ্গে—রিকশাচালক থেকে শুরু করে সহকর্মী কিংবা অধীনস্থ কর্মচারী—সম্মানের সঙ্গে কথা বলেন। তার মধ্যে নৈতিক বোধ থাকে; তিনি সত্য-মিথ্যা, ন্যায়-অন্যায়ের পার্থক্য বোঝেন এবং সচেতনভাবে অন্যায় থেকে দূরে থাকার চেষ্টা করেন।
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো পরমতসহিষ্ণুতা। শিক্ষিত মানুষ জানেন যে একটি বিষয়ের একাধিক ব্যাখ্যা থাকতে পারে, তাই তিনি ভিন্ন মতকে শত্রুতা মনে করেন না। তিনি যুক্তি দিয়ে মত প্রকাশ করেন, কিন্তু অবজ্ঞা বা বিদ্বেষে বিশ্বাস করেন না। একই সঙ্গে তার মধ্যে থাকে বিচার-বিবেচনার ক্ষমতা—কোনো খবর বা মতামত শুনেই আবেগের বশে সিদ্ধান্ত না নিয়ে তিনি তথ্য ও যুক্তির ভিত্তিতে সত্য যাচাই করার চেষ্টা করেন।
প্রকৃত শিক্ষা মানুষকে নিজের সংস্কৃতির ভালো দিকগুলো ধারণ করতে এবং ক্ষতিকর কুসংস্কার বর্জন করতে শেখায়। শিক্ষিত ব্যক্তি জানেন, ঐতিহ্যকে অন্ধভাবে আঁকড়ে থাকা যেমন ভুল, তেমনি সব পুরোনোকে অস্বীকার করাও অজ্ঞতার লক্ষণ। তিনি শেকড়কে সম্মান করেন, কিন্তু মানবিক মূল্যবোধের আলোকে তাকে পরিশুদ্ধ করার সাহসও রাখেন।
সবচেয়ে বড় কথা, শিক্ষিত মানুষ নিজেকে কখনো সম্পূর্ণ জ্ঞানী মনে করেন না। তিনি আজীবন শেখার মধ্যে থাকতে চান। নতুন বই, নতুন ধারণা, নতুন অভিজ্ঞতা—সবকিছুর প্রতি তার কৌতূহল থাকে। তার মন বদ্ধ পুকুরের মতো স্থির নয়, বরং প্রবহমান নদীর মতো—যেখানে প্রতিনিয়ত নতুন জ্ঞানের স্রোত এসে তাকে সমৃদ্ধ করে।
আমি নিজে শিক্ষিত নই, কিন্তু শিক্ষা সম্পর্কে আমার দৃষ্টিভঙ্গি স্পষ্ট: শিক্ষা হলো মানুষের দৃষ্টিকে প্রসারিত করা, হৃদয়কে সংবেদনশীল করা এবং চিন্তাকে স্বাধীন করা। যে মানুষের উপস্থিতিতে অন্য মানুষ নিরাপদ বোধ করে, যে অন্যের কষ্ট বুঝতে পারে, যে নিজের সীমাবদ্ধতা স্বীকার করে প্রতিনিয়ত শিখতে চায়—আমার কাছে তিনিই সত্যিকার অর্থে শিক্ষিত।