রাগ মেঘ-মালহার বা মেঘ মালহার বা মেঘমল্লার বা মেঘ মল্লার । অসুরের সুরলোকযাত্রা সিরিজ

ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের বিশাল আকাশে মেঘ এবং বরষার সুর নিয়ে যতগুলো রাগ রয়েছে, তাদের মধ্যে অন্যতম গম্ভীর, মহিমান্বিত এবং প্রাণবন্ত একটি সৃষ্টি হলো ‘রাগ মেঘ-মালহার’। শ্রাবণ-ভাদ্রের কালো মেঘ, মুষলধারে বৃষ্টি এবং প্রকৃতির স্নিগ্ধ রূপকে সাঙ্গীতিক ভাষায় রূপ দেওয়ার ক্ষেত্রে এই রাগের ভূমিকা অনন্য। মূলত ‘রাগ মেঘ’ এবং ‘রাগ মালহার’—এই দুই ধ্রুপদী রূপের অপূর্ব মেলবন্ধনে এই মিশ্র রাগটি গড়ে উঠেছে। প্রাচীন কাল থেকেই মল্লার বা মালহার অঙ্গের রাগগুলোকে বর্ষাকালে প্রকৃতির সাথে মন ও আত্মাকে একসূত্রে বাঁধার মাধ্যম হিসেবে দেখা হয়। কিংবদন্তি রয়েছে, তানসেন যখন দরবারে দীপক রাগ গেয়ে অগ্নুৎপাত ঘটিয়েছিলেন, তখন এই মালহার অঙ্গের সুরের প্রভাবেই নাকি প্রচ্ছন্ন বৃষ্টি নেমে এসে সেই উত্তাপ প্রশমিত করেছিল। রাগ মেঘ-মালহার তার গম্ভীর মেজাজ এবং বিলম্বিত গায়কি বা বাজনার মাধ্যমে শ্রোতার মনে ঠিক তেমনই এক স্নিগ্ধ, সজল ও অপার্থিব আবহ তৈরি করে।

সঙ্গীত শাস্ত্রে অনেক সময় একে সংক্ষেপে ‘রাগ মেঘ মল্লার’, ‘রাগ মেঘমল্লার’ কিংবা কেবল ‘মেঘ-মালহার’ নামেও ডাকা হয়।

এই রাগটির রাগ মেঘ মিলিয়ে ফেলবেন না। মেঘ রাগটি মূল ‘সারং’ অঙ্গ এবং মেঘ অঙ্গের সমন্বয়ে গঠিত একটি প্রাচীন রাগ।

রাগের শাস্ত্র

  • ঠাট: কাফী ঠাট (কিছু মতানুসারে এটি খামাজ বা কল্যাণ অঙ্গের প্রভাবেও বিশ্লেষিত হয়, তবে আধুনিক ব্যাকরণে একে কাফী ঠাটের অন্তর্গতই গণ্য করা হয়)।
  • জাতি: ঔড়ব-ঔড়ব (আরোহ এবং অবরোহ—উভয় ক্ষেত্রেই পাঁচটি করে স্বর ব্যবহৃত হয়)।
  • আরোহ: সা রে মা পা না(কোমল) সা
  • অবরোহ: সা না(কোমল) পা মা রে, মা রে সা
  • বাদী স্বর: সা (ষড়্‌জ)
  • সমবাদী স্বর: পা (পঞ্চম)
  • বর্জিত স্বর: গান্ধার (গা) এবং ধৈবত (ধা) স্বর দুটি আরোহ ও অবরোহ উভয় ক্ষেত্রেই সম্পূর্ণ বর্জিত।
  • ব্যবহৃত স্বর: ঋষভ (রে), মধ্যম (মা), পঞ্চম (পা), কোমল নিখাদ (না) এবং ষড়্‌জ (সা)।
  • সময়: বর্ষাকাল (যেকোনো সময় গাওয়া বা বাজানো যায়)। এছাড়া সাধারণ সময়ে এটি গভীর রাতে (রাত্রির দ্বিতীয় বা তৃতীয় প্রহর) পরিবেশন করা হয়।
  • প্রকৃতি: গম্ভীর, বর্ষণমুখর, আকুলতা এবং একাত্নতার অনুভূতিতে ভরা।

সুর চিকিৎসায় ব্যবহার

সঙ্গীত চিকিৎসা (Music Therapy)-র বিভিন্ন প্রাচীন ও আধুনিক গবেষণায় দেখা গেছে যে, মেঘ এবং মালহার অঙ্গের রাগগুলো মানুষের মস্তিষ্কে এক গভীর শিথিলতা (relaxation) নিয়ে আসে। বিশেষ করে মানসিক দুশ্চিন্তা (Anxiety), অনিদ্রা (Insomnia) এবং অতিরিক্ত মানসিক চাপ কমাতে এই রাগের ধীরগতির বিস্তার ও মন্দ্র সপ্তকের স্বরচলন দারুণ কাজ করে। এর গম্ভীর ও সজল ধ্বনি মস্তিষ্কের আলফা ওয়েভ সক্রিয় করতে সাহায্য করে, যা মনকে শান্ত ও স্থির রাখে।

সম্পর্কিত রাগের তালিকা

  • রাগ মেঘ: এটি রাগ মেঘ-মালহারের অন্যতম মূল ভিত্তি, যেখানে মালহারের দোলা বা আন্দোলন বাদ দিয়ে কেবল মেঘের সরল ও গম্ভীর রূপটি প্রকাশ পায়।
  • রাগ মিঞা কি মল্লার: তানসেনের সৃষ্ট বর্ষার অন্যতম প্রধান রাগ, যেখানে কোমল ও শুদ্ধ উভয় নিখাদ এবং গান্ধারের বিশেষ প্রয়োগ দেখা যায়।
  • রাগ গৌড় মল্লার: মালহার অঙ্গের আরেকটি জনপ্রিয় রাগ, যেখানে শুদ্ধ গান্ধার এবং মধ্যমের মিষ্টি প্রয়োগে বর্ষার আনন্দময় দিকটি ফুটে ওঠে।
  • রাগ সুর মল্লার: বর্ষার রাগ পরিবারের সদস্য, যেখানে নিখাদ ও পঞ্চমের বিশেষ চলন দেখা যায়।
  • রাগ দেশ: খামাজ ঠাটের রাগ হলেও এর অবরোহে ‘মা রে সা’ বা ‘রে মা পা’ চলনের কারণে কখনো কখনো মেঘ-মালহারের সাথে সুরের মিষ্টি সাদৃশ্য অনুভূত হয়।

 

 

রাগ মেঘ-মালহার

 

শুরু করা যেতে পারে কাজী নজরুল ইসলামের গান দিয়ে:

নজরুলের অনেক গান রাগাশ্রয়ী। নির্দিষ্ট রাগের আশ্রয়ে যে গানগুলোতে সুর করা হয়েছে, সেগুলোর পুরো সুরে রাগের অবয়ব বজায় রাখার চেষ্টা থেকেছে; খুব বেশি রাগভ্রষ্ট হয়নি। তাই নজরুলের গানগুলো কান তৈরিতে বেশি উপযোগী বলে আমার কাছে মনে হয়।

১. বরষা ওই এল বরষা

.

মেঘ মালহারে কিছু রবীন্দ্রসঙ্গীত:

কবিগুরু তার অনেক কম্পোজিশনে প্রচলিত রাগের আশ্রয় নিলেও অনেক সময় রাগের কাঠামোতে তিনি আটকে থাকতে চাননি। তাঁর সুরের পথ রাগের বাইরে চলে গেছে প্রায়শই। আমার কাঁচা কান যা বলে, তাতে বিশুদ্ধ রাগাশ্রয়ী গান হিসেবে তাঁর গান অনেক ক্ষেত্রেই খুব ভালো উদাহরণ নয়।

১. দেখা না-দেখায় মেশা হে বিদ্যুৎলতা

২. গহন ঘন ছাইল গগন ঘনাইয়া।

৩. নিলো আঞ্জন ঘন পুঞ্জ ছায়ে

৪. পিনাকেতে লাগে টঙ্কার

৪. শ্রাবণের গগনের গায়

৫. স্বপ্নমদির নেশায় মেশা এ উন্মত্ততা

৬. Sawan gagane ghor ghanaghata – Pt. Jasraj

.

গজলে মেঘ মালহার:

১.১ Sample1

.

মেঘ মালহার নিয়ে প্লেব্যাক:

১. Barso re () – Tanseen (1942) – Khurshid

.

ইচ্ছে আছে মেঘ মালহারে যেসব আধুনিক, টাপ্পা, হরি, কাজরি, চৈতি আছে সেগুলোর লিংক যুক্ত করবো। কেউ এরকম লিংক পেলে কমেন্টে যুক্ত করে সহায়তা করলে কৃতজ্ঞ থাকব।

.

যন্ত্রে মেঘ মালহার: আমরা কণ্ঠে আরও ভারি গানে যাবার আগে একটু শুনে আসব যন্ত্রসঙ্গীতে মেঘ মালহার। বিভিন্ন শিল্পী বিভিন্ন যন্ত্রে বাজিয়েছেন এ রাগ। তার কিছু লিংক যুক্ত করলাম।

* যেসব যায়গা থেকে সাহায্য পেয়েছি তা নোটের শেষে যুক্ত করা হয়েছে।

 

রাগ মেঘ-মালহার

 

 

শাস্ত্র:

রাগ মেঘ বা মেঘ মালহারের সাথে অন্য মালহারের পার্থক্য:

 

রাগ মেঘ-মালহার ভারতীয় উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের ব্যাকরণ এবং প্রাকৃতিক আবেগের এক অনবদ্য সৃষ্টি। বর্ষার মেঘলা আকাশ, গুরুগুরু মেঘের ডাক এবং বৃষ্টিভেজা প্রকৃতির যে চিরায়ত রূপ, তাকে এই রাগের পাঁচটি স্বর যেভাবে ফুটিয়ে তোলে, তা সত্যি অবিশ্বাস্য। ধ্রুপদ, খেয়াল, সেতার বা সারোদ—যেকোনো মাধ্যমেই যখন মেঘ-মালহার ডানা মেলে, তখন তা শ্রোতাকে জাগতিক ব্যস্ততা থেকে এক লহমায় নিয়ে যায় প্রকৃতির আদিম ও স্নিগ্ধ এক সুরলোকে।

 

সোর্স ও প্রামাণ্য রেফারেন্স

১. রাগ সঙ্গীত সংকলন ও শাস্ত্র বিশ্লেষণ — পণ্ডিত বিষ্ণুনারায়ণ ভাতখণ্ডে (ভাতখণ্ডে সঙ্গীত শাস্ত্র)।
২. রাগ প্রবীণ ও রাগ বিজ্ঞান — পণ্ডিত বিনায়ক রাও পটবর্ধন।
৩. ভারতীয় উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত ও রাগ অভিধান — ড. কানন সেনগুপ্ত।
৪. মিউজিক থেরাপি অ্যান্ড রাগ কেয়ার — সাঙ্গীতিক গবেষণা প্রবন্ধ (প্রথাগত ও ভারতীয় সুফি-সঙ্গীত চিকিৎসা সংগ্রহ)।

 

আরও দেখুন:

মন্তব্য করুন