ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের বিশাল মল্লার পরিবারে বর্ষাকালের মেঘলা আকাশ, বৃষ্টিভেজা বাতাস আর অঝোর ধারার রূপকে ধরে রাখার জন্য যতগুলো রাগ সৃষ্টি হয়েছে, তার মধ্যে অন্যতম উজ্জ্বল, মিষ্টি এবং শ্রুতিমধুর রূপ হলো ‘রাগ সুর মালহার’ (বা সংক্ষেপে সুর দাসী মালহার)। প্রাচীন ঐতিহ্য অনুযায়ী, ভক্ত সাধক সূরদাসের পরম ভক্তি এবং সুরসাধনার নামানুসারেই এই রাগের নামকরণ ও রূপদান হয়েছিল বলে মনে করা হয়। মল্লার অঙ্গের অন্যান্য গভীর ও ভারী রাগগুলোর (যেমন মিঞাঁ কি মল্লার) মন্দ্র গাম্ভীর্যের বিপরীতে সুর মালহার এক অনন্য প্রাঞ্জলতা, ব্যাকুলতা এবং বর্ষার সজল আনন্দ ফুটিয়ে তোলে।
সঙ্গীত শাস্ত্রে অঞ্চল ও ঘরানাভেদে এটি ‘সুর মালহার’, ‘সুরদাসী মালহার’ বা কেবল ‘সুরদাসী’ নামেও বহুল সমাদৃত।
ইতিহাস ও রাগের পরিচয়
শাস্ত্রীয় সঙ্গীত গবেষকদের মতে, রাগ সুর মালহার মূলত ‘মল্লার’ অঙ্গের সাথে ‘সারং’ বা ‘মেঘ’ অঙ্গের এক অপূর্ব এবং ভারসাম্যপূর্ণ মিলন। খামাজ বা কাফী ঠাটের অধীনে বিভক্ত হলেও এতে বিলাবল বা সারং অঙ্গের মতো অল-শুদ্ধ স্বরের প্রফুল্লতা স্পষ্ট ফুটে ওঠে।
পৌরাণিক ও লোকায়ত তথ্য অনুযায়ী, মহাত্মা সূরদাস শ্রীকৃষ্ণের চরণে এই রাগে ভজন গাইতেন। এর মূল রস হলো শৃঙ্গার (প্রেম ও প্রতীক্ষা), ভক্তিরস এবং করুণ রস। শ্রাবণ বা ভাদ্র মাসের দিনে যখন বাইরে একটানা বৃষ্টির ঝরঝর ধ্বনি বাজে, তখন সুর মালহারের স্বরপ্রক্ষেপণ মেহফিলে এক অপূর্ব স্নিগ্ধ আবহের জন্ম দেয়।
রাগের শাস্ত্রীয় কাঠামো
- ঠাট: কাফী ঠাট (তবে বহু প্রথা ও ঘরানায় একে খামাজ বা বিলাবল ঠাটের আশ্রয়েও বিশ্লেষণ করা হয়)।
- জাতি: ষাড়ব-সম্পূর্ণ (আরোহণে গান্ধার স্বরটি বর্জিত বা বক্র এবং অবরোহণে সাতটি স্বরই ব্যবহৃত হয়)।
- বাদী স্বর: ম (মধ্যম)।
- সমবাদী স্বর: স (ষড়্জ)।
- বর্জিত স্বর: আরোহণে প্রথানুসারে গান্ধার (গ) সম্পূর্ণ বর্জিত।
- ব্যবহৃত স্বর: শুদ্ধ ঋষভ (র), শুদ্ধ মধ্যম (ম), শুদ্ধ পঞ্চম (প), শুদ্ধ ধৈবত (দ), শুদ্ধ নিখাদ (ন – আরোহে), কোমল নিখাদ (ণ – অবরোহে) এবং ষড়্জ (স)। (কোমল গান্ধারের প্রয়োগ অত্যন্ত বক্র ও বিরল)।
- সময়: বর্ষাকাল (যেকোনো সময়) অথবা রাত্রির দ্বিতীয় প্রহর।
- প্রকৃতি: প্রফুল্ল, মিষ্টি, ব্যাকুল এবং সজল শান্তিতে ভরা।
স র ম প, ম প ণ দ প, ম র, স | র ম প, র্স নি ধ প, ম র, সগায়কি ও কারিগরি বৈশিষ্ট্য
সুর মালহারের আসল কারিগরি দক্ষতা ও মাধুর্য লুকিয়ে রয়েছে সারং অঙ্গের সরলতার সাথে মল্লার অঙ্গের অনবদ্য সংমিশ্রণে।
১. মল্লার অঙ্গের বিশেষ তান: এই রাগে ম প ণ দ প (মধ্যম-পঞ্চম-কোমল নিখাদ-ধৈবত-পঞ্চম) চালটি হলো মল্লার পরিবারের প্রধান চাবিকাঠি, যা মেঘের ডাক ও বৃষ্টির রিমঝিম শব্দকে সুরের ছন্দে অনুবাদ করে।
২. দুই নিখাদের প্রয়োগ: আরোহণে শুদ্ধ নিখাদ (নি র্স) ব্যবহার করে তারা সপ্তকে ওঠা হলেও অবরোহণে স্পষ্ট কোমল নিখাদের স্পর্শ দিয়ে পঞ্চমে নামা হয় (র্স ণ দ প)।
৩. ঋষভ ও মধ্যমের মাধুর্য: বাদী স্বর মধ্যম হওয়ায় স র ম বা ম র স বাক্যাংশে মধ্যম ও ঋষভ স্বরের ওপর মিষ্টি মিড় দেওয়া হয়, যা শ্রাবণের ব্যাকুলতাকে শতগুণ বাড়িয়ে দেয়।
ধ্রুপদ, ধামার, ঐতিহ্যবাহী খেয়াল বন্দিশ এবং বর্ষার কজরী বা ভজনে সুর মালহারের গায়কি চমৎকারভাবে প্রকাশ পায়। সেতার, সরোদ বা বাঁশিতে এই রাগের বিস্তার শুনলে মনে হয় যেন শুকনো ধরণী বৃষ্টির প্রথম ছোঁয়ায় মেতে উঠেছে।
সুর চিকিৎসায় ব্যবহার
সঙ্গীত চিকিৎসা (Music Therapy)-র দৃষ্টিকোণ থেকে, বর্ষাকালের সুর মালহার রাগের সুর মানুষের অবসাদ ও মানসিক চাপ কমাতে অত্যন্ত কার্যকরী। বৃষ্টির শব্দে কিংবা শান্ত পরিবেশে এই রাগের ‘ম-স’ স্বরসংগতি এবং দুই নিখাদের অনবদ্য মেলবন্ধন মস্তিষ্কের ধকল দূর করে মানসিক প্রশান্তি ও সতেজ ভাব ফিরিয়ে আনে।
সম্পর্কিত রাগের তালিকা
- রাগ মিঞাঁ কি মল্লার: তানসেন প্রবর্তিত মল্লার পরিবারের সম্রাট রূপ; সুর মালহারের চেয়ে মিঞাঁ কি মল্লার অনেক বেশি ভারী, ধীরগতির ও গম্ভীর।
- রাগ মেঘ মালহার: রাগ মেঘ এবং মল্লার অঙ্গের সংমিশ্রণ; এতে কোমল স্বরের কাজ আরও বেশি গম্ভীর রূপ নেয়।
- রাগ গৌড় মল্লার: মল্লার পরিবারের আরেকটি মিষ্টি রূপ; তবে গৌড় মল্লারে গান্ধার ও মধ্যমের পেঁচালো রূপ সুর মালহার থেকে ভিন্ন।
- রাগ বৃন্দাবনী সারং: সারং অঙ্গের রাগ; যার আরোহণের স্বরচলনের সাথে সুর মালহারের কিছুটা মিল রয়েছে।