আমি কেবল মুসলিম মৌলবাদ বা ধর্মান্ধতা নিয়ে আলোচনা করি, অন্য কোনো ধর্মের মৌলবাদের সমালোচনা করি না—এই বিষয়টি নিয়ে অনেকের মনে ক্ষোভ বা প্রশ্ন জাগা স্বাভাবিক। তবে এই ক্ষোভ কতটুকু যুক্তিগ্রাহ্য, তা একটি নিরপেক্ষভাবে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
আমি জন্ম ও পরিচয়ে মুসলিম হলেও রাষ্ট্র ও সমাজচিন্তায় একজন সেক্যুলার বা ধর্মনিরপেক্ষ মানুষ। সেক্যুলারিজমের মূল চেতনা হলো নিজ নিজ অবস্থান থেকে সামাজিক ন্যায়বিচার ও অন্ধবিশ্বাসের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া। অন্য ধর্মের মৌলবাদ ছেড়ে আমার নিজের ধর্মের মৌলবাদকেই সমালোচনার পেছনে আমার স্পষ্ট যুক্তি আছে।
১. নৈতিক দায়িত্ব ও আত্মসংস্কারের নীতি:
যেকোনো সমাজ বা ধর্মের ভেতরে জমে থাকা গোড়ামি, অন্ধত্ব এবং মৌলবাদের বিরুদ্ধে কথা বলার প্রাথমিক ও প্রধান দায়িত্ব সেই সমাজ বা ধর্মের সচেতন মানুষদেরই। আমি নিজে মুসলিম পরিবারে বড় হয়েছি; ইসলামের মূলনীতি ও সংস্কৃতি সম্পর্কে আমার বোঝাপড়া ও পড়াশোনা রয়েছে। ফলে এই ঐতিহ্যের ভেতর থেকেই সংস্কারের কথা বলার একটি স্বাভাবিক অধিকার ও নৈতিক অথরিটি (Authority) আমার রয়েছে।
আমি মনে করি, অন্য ধর্মের সচেতন ও বুদ্ধিমান মানুষেরা তাঁদের নিজস্ব ধর্মের খারাপ দিকগুলোর সমালোচনা করবেন। হিন্দু সমাজের গোড়ামি নিয়ে যেমন একজন সচেতন হিন্দু চিন্তাবিদ বেশি প্রভাবশালীভাবে লিখতে পারেন, তেমনি মুসলিম সমাজের মৌলবাদ দূর করার দায়িত্ব প্রধানত সচেতন মুসলিমদেরই নিতে হবে।
আমি যাদের আদর্শ মানি—যেমন বেগম রোকেয়া বা কাজী নজরুল ইসলাম—তারা অন্য ধর্মের সমালোচনা করে সময় নষ্ট করেননি। তাঁরা মুসলিম সমাজের ভেতরের অন্ধত্ব, নারী অবহেলা ও ধর্মান্ধতার বিরুদ্ধে কঠোর কলম ধরেছিলেন। রোকেয়া জানতেন, নিজ সমাজের অজ্ঞতা দূর না হলে কোনো আত্মউন্নয়ন সম্ভব নয়।
বাঙালির দর্শন মানতে কষ্ট হলে চলুন পশ্চিমে যাই। বিখ্যাত মার্কিন চিন্তাবিদ নোআম চমস্কি তাঁর ‘Responsibility of Intellectuals’ ধারণায় সুস্পষ্টভাবে বলেছেন, একজন বুদ্ধিভিত্তিক মানুষের প্রথম ও প্রধান নৈতিক দায়িত্ব হলো নিজ সমাজ, রাষ্ট্র বা গোষ্ঠীর অন্যায় ও ত্রুটির সমালোচনা করা। কারণ, নিজের গোষ্ঠীর ওপরই মানুষের প্রভাব থাকে এবং সেখানে কথা বললে বাস্তব পরিবর্তনের সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি তৈরি হয়। অন্যের ত্রুটি তুলে ধরা সহজ, কিন্তু নিজের সমাজের ত্রুটি সংশোধন করাই আসল সাহসিকতা।
২. আমি মৌলবাদীদের মাউথপিস হব না:
আমাদের সমাজে ইসলামী মৌলবাদীরা প্রতিদিন সকাল থেকে রাত পর্যন্ত হিন্দু, ইহুদি, খ্রিস্টান কিংবা অন্য ধর্মাবলম্বীদের ঢালাও সমালোচনা ও গালাগাল করে চলেছে। অন্য ধর্মের মৌলবাদের সমালোচনা করতে গিয়ে যদি আমি সরব হই, তবে অজান্তেই আমি স্থানীয় মুসলিম মৌলবাদীদের সেই হিংসাত্মক এজেন্ডার সাথেই হাত মেলাব। আমার কণ্ঠ তাদের সেই গালাগাল ও বিদ্বেষ ছড়ানোর প্রক্রিয়াকে একধরনের বৈধতা বা ‘কমপ্লিমেন্ট’ দেবে। আমি কোনো অবস্থাতেই মৌলবাদীদের তৈরি করা এই চক্রের অংশ হতে চাই না।
৩. সাম্প্রদায়িকতার সীমানা এড়িয়ে চলি:
নিজের ধর্মের বা নিজ সমাজের ত্রুটি-বিচ্যুতির সমালোচনা করা একটি সভ্য ও প্রগতিশীল চর্চা। এটি সমাজকে ভেতর থেকে পরিশুদ্ধ করে। কিন্তু কেউ যখন অন্য ধর্মের ওপর দাঁড়িয়ে সেই ধর্মের ত্রুটি নিয়ে ক্রমাগত আক্রমণ করে, তখন তা আর ‘গঠনমূলক সমালোচনা’ থাকে না; তা দ্রুতই সাম্প্রদায়িকতা (Communalism) ও জাতিগত বিদ্বেষে রূপ নেয়।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রবন্ধে বারবার বলেছেন, নিজের দোষ ঢেকে অন্যের ঘাড়ে দোষ চাপানো সভ্যতার লক্ষণ নয়। সমাজকে শক্তিশালী করতে হলে আত্মপরীক্ষা ও আত্মসমালোচনার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে।
শেষ কথা
আমি কেন শুধু মুসলিম মৌলবাদীদের নিয়ে লিখি?
কারণ আমি মুসলমান, ইসলাম সম্পর্কে আমার পড়াশোনা ও নিজস্ব উপলব্ধি রয়েছে, এবং আমার সমাজের ভেতরে ধর্মের নামে প্রচারিত গোঁড়ামি, অসহিষ্ণুতা ও কর্তৃত্ববাদের বিরুদ্ধে কথা বলাকে আমি একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব মনে করি।
কারণ, অন্য ধর্মের অনুসারীদের গালাগাল করার প্রতিযোগিতায় যোগ দিয়ে আমি মৌলবাদীদের মতো একই পথে হাঁটতে চাই না।
কারণ, আমার কাছে ধর্মীয় পরিচয়ের চেয়ে মানুষের সমান অধিকার, স্বাধীন চিন্তা, যুক্তি ও ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রব্যবস্থা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
আরও একটি কারণ আছে। আমি চাই, প্রত্যেক ধর্মের সচেতন মানুষ নিজের ধর্মীয় পরিসরের অন্যায়কে প্রশ্ন করার সাহস অর্জন করুন। মুসলমান মুসলিম মৌলবাদের সমালোচনা করুন, হিন্দু হিন্দু মৌলবাদের, খ্রিষ্টান খ্রিষ্টীয় মৌলবাদের—এবং সবাই অন্যের সমান অধিকার রক্ষায় একসঙ্গে দাঁড়ান।
