১৫ ডিসেম্বর ১৯৭১: আমেরিকার সপ্তম নৌবহরের পিছু হটা । ইতিহাস ও রাজনীতি সিরিজ

১৯৭১ সালের ১৫ ডিসেম্বর—বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামের ইতিহাসে এটি ছিল এক চরম নাটকীয় ও রোমাঞ্চকর দিন। এদিন পাকিস্তানি সেনারা চারদিক থেকে মার খেয়ে পুরোপুরি কোণঠাসা হয়ে পড়ে। তারা বুঝে গিয়েছিল যে তাদের পরাজয় এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র। তাদের পুরো মনোযোগ তখন শুধু একটা বিষয়েই ছিল—যেকোনো উপায়ে প্রাণ বাঁচানো এবং আত্মসমর্পণের পর যেন বাঙালিদের ক্ষোভের মুখে পড়ে কোনো প্রতিশোধমূলক হত্যাযজ্ঞের শিকার হতে না হয়, তা নিশ্চিত করা।

বাংলাদেশের জন্য আমেরিকা, ভারত, রাশিয়া লড়াই ১৯৭১
বাংলাদেশের জন্য আমেরিকা, ভারত, রাশিয়া লড়াই ১৯৭১

 

সপ্তম নৌবহর ও শীতল যুদ্ধের স্নায়ুযুদ্ধ

যুদ্ধের শেষ দিনগুলোতে পাকিস্তানের সবচেয়ে বড় ভরসা ছিল আমেরিকার ‘সপ্তম নৌবহর’। ৯ ডিসেম্বর মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন এবং হেনরি কিসিঞ্জারের নির্দেশে পরমাণু শক্তিচালিত বিশ্বের বৃহত্তম যুদ্ধজাহাজ USS Enterprise-এর নেতৃত্বে ‘টাস্ক ফোর্স ৭৪’ (সপ্তম নৌবহর) বঙ্গোপসাগরের দিকে রওনা দেয়। মুখে তারা বলেছিল—”সেখানে আটকে পড়া মার্কিন নাগরিকদের উদ্ধার করতে” এই ফ্ল্যাশকার্ড মিশন, কিন্তু আসল উদ্দেশ্য ছিল ভিন্ন। ওয়াশিংটন চেয়েছিল পাকিস্তানকে সরাসরি সামরিক ও মনস্তাত্ত্বিক ব্যাকআপ দিতে এবং ভারতের ওপর চরম চাপ তৈরি করতে।

 

আমেরিকার সপ্তম নৌবহরের একটি জাহাজ
আমেরিকার সপ্তম নৌবহরের একটি জাহাজ

 

কিন্তু ১৫ ডিসেম্বর বঙ্গোপসাগরের প্রবেশদ্বারে তৈরি হলো বিশ্ব ইতিহাসের অন্যতম শ্বাসরুদ্ধকর ও অভাবনীয় এক দৃশ্য। ভারতের সাথে সম্পাদিত মৈত্রী চুক্তির বাধ্যবাধকতা থেকে সোভিয়েত ইউনিয়ন (রাশিয়া) মার্কিন এই চাল আগে থেকেই ধরে ফেলেছিল। রাশিয়ার দূরপ্রাচ্যের ভ্লাদিভোস্তক বন্দর থেকে অ্যাডমিরাল ভ্লাদিমির ক্রুগ্লিয়াকভ (Vladimir Kruglyakov)-এর কমান্ডে রওনা হওয়া সোভিয়েত ‘প্যাসিফিক ফ্লিট’ (Pacific Fleet) বা প্রশান্ত মহাসাগরীয় নৌবহরের প্রায় ২০টিরও বেশি যুদ্ধজাহাজ মার্কিন বহরটি পৌঁছানোর আগেই বঙ্গোপসাগরে পজিশন নিয়ে নেয়। এর মধ্যে ছিল পরমাণু অস্ত্রবাহী ক্রুজার, ডেস্ট্রয়ার এবং মারাত্মক সব সাবমেরিন।

সবচেয়ে নাটকীয় মোড়টি এল যখন মার্কিন যুদ্ধজাহাজগুলো ভারতীয় সীমান্তের কাছাকাছি এসে তাদের যুদ্ধবিমান ওড়ানোর প্রস্তুতি নিচ্ছিল। ঠিক তখন সোভিয়েত কমান্ডার ক্রুগ্লিয়াকভ এক অবিশ্বাস্য চাল চালেন। মার্কিন নজরদারি এড়াতে সাগরের গভীরে লুকিয়ে থাকা সোভিয়েত পারমাণবিক সাবমেরিনগুলোকে তিনি একযোগে পানির ওপরে ভেসে ওঠার (Surface করার) নির্দেশ দেন। মার্কিন স্যাটেলাইট এবং রণতরীগুলো আকস্মিকভাবে দেখতে পায় যে তাদের ঠিক সামনেই দানবাকৃতির সোভিয়েত নিউক্লিয়ার সাবমেরিনগুলো ভেসে উঠেছে এবং সেগুলোর নিখুঁত মিসাইল লাঞ্চারগুলো সরাসরি মার্কিন সপ্তম নৌবহরের বুক লক্ষ্য করে তাক করা!

অ্যাডমিরাল ভ্লাদিমির সের্গেয়েভিচ ক্রুগ্লিয়াকভ
অ্যাডমিরাল ভ্লাদিমির সের্গেয়েভিচ ক্রুগ্লিয়াকভ

সোভিয়েত সাবমেরিনগুলোর এই আকস্মিক ও আক্রমণাত্মক উপস্থিতি দেখে ওয়াশিংটনে রীতিমতো হইচই পড়ে যায়। মার্কিন কমান্ডাররা বুঝতে পারেন, ভারতের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে গিয়ে তারা উল্টো সরাসরি সোভিয়েতদের সাথে একটি পারমাণবিক যুদ্ধের মুখে দাঁড়িয়ে গেছেন। এই অকাট্য ও শক্ত দেয়ালের মুখে মার্কিন সপ্তম নৌবহর আর এক চুলও সামনে এগোনোর সাহস পায়নি। তারা শ্রীলঙ্কার দক্ষিণে ভারত মহাসাগরেই নিজেদের গুটিয়ে নিতে এবং শেষ পর্যন্ত পিছু হটতে বাধ্য হয়। আর এর সাথেই পাকিস্তানিদের শেষ আশা—আমেরিকান লাইফলাইন—একেবারে ধুলোয় মিশে যায়।

এটি ছিল বিশ্ব রাজনীতির এক ঐতিহাসিক ও চূড়ান্ত মোড়। একদিকে ছিল বাংলাদেশ, ভারত ও সোভিয়েত ইউনিয়নের অটুট কৌশলগত বন্ধুত্ব; অন্যদিকে পাকিস্তান, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের অক্ষশক্তি। ১৫ ডিসেম্বর সাগরের বুকে সোভিয়েতের এই অনড় ও সাহসী অবস্থানের পর পাকিস্তান আন্তর্জাতিক ও সামরিকভাবে সম্পূর্ণ একা এবং অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে।

 

রণাঙ্গনের পরিস্থিতি: অবরুদ্ধ ঢাকা

একাত্তরের এই দিনে ঢাকার বাইরে দেশের প্রায় প্রতিটি কোণায় বিজয়ের সুবাতাস বইছিল। মুক্তিবাহিনী ও ভারতীয় মিত্রবাহিনীর যৌথ সাঁড়াশি আক্রমণে রাজধানী ঢাকা তখন চারদিক থেকে অবরুদ্ধ।

  • স্থলে: মিত্রবাহিনীর আর্টিলারির গর্জন আর মুক্তিবাহিনীর গেরিলা হামলায় পাকিস্তানি ঘাঁটিগুলো তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ছিল।
  • আকাশে: ভারতীয় মিগ (MiG) যুদ্ধবিমানগুলো ঢাকার আকাশে একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করে পাকিস্তানি সামরিক স্থাপনাগুলোতে একের পর এক নিখুঁত বোমাবর্ষণ করছিল।
  • জলে: নদীমাতৃক বাংলার জালের মতো ছড়িয়ে থাকা নদীগুলোর বাধা পেরিয়ে মুক্তিযোদ্ধারা নৌকায় করে ঝড়ের গতিতে ঢাকার দিকে ধেয়ে আসছিল।

চারদিকের এই মহাপ্রলয় দেখে পাকিস্তানি জেনারেল নিয়াজি নিরুপায় হয়ে যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব পাঠান। কিন্তু ভারতীয় সেনাপ্রধান জেনারেল স্যাম মানেকশ’ তাঁকে সাফ জানিয়ে দেন—কোনো যুদ্ধবিরতি বা আলোচনা নয়, একমাত্র পথ হলো ‘শর্তহীন আত্মসমর্পণ’।

 

 

SufiFaruq.com Logo 252x68 2 ১৫ ডিসেম্বর ১৯৭১: আমেরিকার সপ্তম নৌবহরের পিছু হটা । ইতিহাস ও রাজনীতি সিরিজ

 

যুদ্ধবিরতির সময়সীমা ও সদিচ্ছা

১৫ ডিসেম্বর বিকেলে মিত্রবাহিনী বড় মনের পরিচয় দিয়ে এবং একটি রক্তক্ষয়ী লড়াই এড়াতে সদিচ্ছার নিদর্শন হিসেবে ঘোষণা করে: ১. আজ বিকেল ৫টা থেকে পরদিন (১৬ ডিসেম্বর) সকাল ৯টা পর্যন্ত ঢাকার ওপর সব ধরণের বিমান হামলা বন্ধ রাখা হবে। ২. পাকিস্তানি সেনারা যদি আত্মসমর্পণ করে, তবে জেনেভা কনভেনশন অনুযায়ী তাদের পূর্ণ নিরাপত্তা দেওয়া হবে এবং কোনো প্রতিশোধমূলক আচরণ করা হবে না।

তবে এর সাথে একটি কড়া হুঁশিয়ারিও জুড়ে দেওয়া হয়েছিল—যদি ১৬ ডিসেম্বর সকাল ৯টার মধ্যে তারা আত্মসমর্পণ না করে, তবে সর্বশক্তি নিয়ে ঢাকার ওপর চূড়ান্ত আঘাত হানা হবে।

ইয়াহিয়ার গ্রিন সিগন্যাল ও নিয়াজির আত্মসমর্পণ

নিয়াজি ঢাকার এই ভয়াবহ পরিস্থিতির কথা তৎক্ষণাৎ ওয়ারলেসে ইসলামাবাদের সদর দপ্তরে জানান। পরিস্থিতির ভয়াবহতা এবং আমেরিকার ডাহা ফেল মেরে যাওয়া দেখে পাকিস্তানের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জেনারেল ইয়াহিয়া খান রাতে এক বার্তা পাঠান। তিনি নিয়াজিকে স্পষ্ট নির্দেশ দেন—”আর কোনো উপায় নেই, ভারতের দেওয়া আত্মসমর্পণের শর্ত মেনে নাও।” গ্রিন সিগন্যাল পেয়ে নিয়াজি গভীর রাতেই জেনারেল মানেকশ’-কে বার্তা পাঠিয়ে জানান যে তারা আত্মসমর্পণ করতে রাজি।

ফলে, ১৫ ডিসেম্বর দিনটি কেটেছিল মূলত একটি ঐতিহাসিক আত্মসমর্পণের খসড়া তৈরি এবং তার সময়-ক্ষণ নির্ধারণের ব্যাকস্টেজ প্রস্তুতির মধ্য দিয়ে।

সাভার থেকে ঢাকা: শেষ রাতের তুমুল যুদ্ধ

রাজনীতি আর কূটনীতিতে যখন আত্মসমর্পণের কাগজ গোছানো হচ্ছিল, রণাঙ্গনে তখনো শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে লড়ছিলেন মুক্তিযোদ্ধারা। রাতে যৌথ বাহিনী সাভার পেরিয়ে ঢাকার দিকে ধেয়ে আসছিল। পথেই তাদের সাথে যোগ দেয় বীর বিক্রম কাদের সিদ্দিকীর নেতৃত্বাধীন কিংবদন্তি ‘কাদেরিয়া বাহিনী’।

রাত তখন আনুমানিক ২টা। ঢাকার প্রবেশমুখে পাকিস্তানি বাহিনীর মুখোমুখি হয় যৌথ বাহিনী।

  • প্রথমে কমান্ডো কায়দায় আকস্মিক আক্রমণ চালানো হয়।
  • পাকিস্তানি সেনারাও মরিয়া হয়ে ব্রিজের ওপার থেকে তীব্র গোলাবর্ষণ শুরু করে।
  • ঠিক তখনই যৌথ বাহিনীর আরেকটি দল কৌশল বদলে নদীর পশ্চিম পাড় দিয়ে ঘুরে গিয়ে পেছন থেকে পাকিস্তানি লাইনে আঘাত হানে।

সারা রাত ধরে চলল দুপক্ষের তুমুল গোলাগুলি আর যুদ্ধ। কিন্তু ততক্ষণে ঢাকার পতন নিশ্চিত হয়ে গেছে।

ঐতিহাসিক তাৎপর্য

১৫ ডিসেম্বর দিনটি শুধু যুদ্ধক্ষেত্রের জয় ছিল না, এটি ছিল আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে বাংলাদেশের এক বিশাল বিজয়। মার্কিন সপ্তম নৌবহরের পিছু হটা আর সোভিয়েত ইউনিয়নের পাশে এসে দাঁড়ানো—এই দুই ঘটনা পাকিস্তানের মনস্তাত্ত্বিক মেরুদণ্ড চিরতরে ভেঙে দিয়েছিল। আর এই চরম নাটকীয় রাতের পরেই আসে বাঙালির ইতিহাসের সেই মহেন্দ্রক্ষণ—১৬ ডিসেম্বর, আমাদের পরম কাঙ্ক্ষিত বিজয়ের দিন!

আরও দেখুন: