যদি কখনো গোধূলিলগ্নে তাঁর ‘কজ্জাক’ গল্পটার পাতা উল্টে বসেন কিংবা ‘মেলা গুমানী’র ধুলোওড়া গ্রাম্য মেলার মাঝখানে গিয়ে দাঁড়ান, তবে টের পাবেন ভিজে মাটির তিতা সুবাস আর পলি ভূখণ্ডের মানুষের আসল রক্তমাংসের রূপটা কেমন হয়। বিধাতা আলী আব্বাস হোসাইনীকে আয়ু দিয়েছিলেন প্রায় ৭২ বছর (১৮৯৭ – ১৯৬৯)। সেই সাত দশকের দীর্ঘ পথচলায় তিনি উর্দু আফসানায় কোনো রাজপ্রাসাদের অলিক জাঁকজমক ফুটিয়ে তোলেননি; বরং ফুটিয়ে তুলেছিলেন উত্তরপ্রদেশের প্রত্যন্ত গ্রামের কাদা-মাখা মেঠো পথ, শোষিত কৃষকের ঘাম, আর গ্রামীণ জীবনের করুণ অথচ নির্মম বাস্তবতাকে।
মুন্সী প্রেমচন্দ যেমন ভারতীয় গ্রামীণ জীবনের বিশাল ক্যানভাস গড়ে তুলেছিলেন, আলী আব্বাস হোসাইনী ছিলেন সেই একই ধারার এক পরম খাঁটি ও প্রজ্ঞাবান অনুসারী। তবে প্রেমচন্দের ভেতরে যেখানে এক ধরণের ভাববাদী সংস্কারক মন বাস করত, হোসাইনী সেখানে ছিলেন একজন নিখাদ ও নিরপেক্ষ পর্যবেক্ষক। সমাজকে তিনি যেভাবে দেখেছেন—তার কুসংস্কার, মেলোড্রামা ও প্রান্তিক মানুষের বাঁচার আকুতিসহ—ঠিক সেভাবেই নিজের সাহিত্যে তুলে ধরেছেন।
আজ উর্দু কথাসাহিত্যের এই মাটির গন্ধমাখা রূপকারের স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে এবং তাঁর প্রতি অবদমিত ঋণ স্বীকার করেই আমাদের এই আয়োজন।
“Dehat ki zindagi sirf khet aur khalihan nahi, yeh insani jazbaat, jhagre, muhabbat aur ghurbat ka ek aisa samandar hai jise samajhne ke liye aapko us mitti mein apna khoon aur paseena milana padega… Adab wahi sachha hai jo mitti ki khushboo laye.”
“গ্রামের জীবন মানে স্রেফ খেত আর খামার নয়; এটি মানুষের আবেগ, কোন্দল, ভালোবাসা আর চরম দারিদ্র্যের এমন এক মহাসমুদ্র—যাকে বুঝতে হলে আপনাকে সেই মাটিতে নিজের রক্ত আর ঘাম মেশাতে হবে… সাহিত্য কেবল সেটাই খাঁটি, যা মাটির সুবাস নিয়ে আসে।”
হোসাইনীর শৈশব ও মাটির টান
১৮৯৭ সালের ৩ মার্চ উত্তরপ্রদেশের গাজীপুর জেলার পচ্চোর গ্রামে এক ঐতিহ্যবাহী সম্ভ্রান্ত পরিবারে আলী আব্বাস হোসাইনীর জন্ম। শৈশব থেকেই গ্রামের খেত-খামার, সাধারণ কৃষকের সুখ-দুঃখ এবং গ্রামীণ সংস্কৃতির সাথে তাঁর গড়ে উঠেছিল গভীর ও অকৃত্রিম আত্মিক টান।
পরবর্তীকালে উচ্চশিক্ষার জন্য তিনি এলাহাবাদে আসেন এবং এলাহাবাদ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইতিহাস ও সাহিত্যে ডিগ্রি অর্জন করেন। পেশাগত জীবনে তিনি এলাহাবাদের বিখ্যাত গভর্মেন্ট ইন্টারমিডিয়েট কলেজের শিক্ষক ও পরবর্তীতে অধ্যক্ষ হিসেবে দীর্ঘ সময় দায়িত্ব পালন করেন। কিন্তু এলাহাবাদ শহরের বুদ্ধিবৃত্তিক আড্ডায় বসেও তাঁর মন পড়ে থাকত পূর্ব উত্তরপ্রদেশের সেই ধূলিমলিন গ্রামে, যাঁর প্রতিধ্বনি ফুটে উঠেছে তাঁর শত শত ছোটগল্পে।
প্রেমচন্দোত্তর বাস্তবতাবাদ ও গ্রামীণ সমাজ
উর্দু আফসানার ইতিহাসে হোসাইনীকে প্রায়শই মুন্সী প্রেমচন্দের সবচেয়ে যোগ্য উত্তরসূরি হিসেবে গণ্য করা হয়। কিন্তু তিনি কখনোই প্রেমচন্দের অন্ধ অনুকরণ করেননি।
হোসাইনীর গল্পের বিশেষত্ব ছিল:
- ফটোগ্রাফিক বাস্তবতা: তিনি গ্রামকে আদর্শায়িত করতেন না। গ্রামের সরলতার পাশাপাশি সেখানকার হিংসা, কুসংস্কার, জাতপাতের বিষ আর মহাজনী শোষণের রূপ তিনি হুবহু তুলে আনতেন।
- সংলাপের নিজস্বতা: পূর্ব উত্তরপ্রদেশের অবধ ও ভোজপুরি অঞ্চলের লোকজ ভাষা ও বাকভঙ্গিকে তিনি উর্দু গদ্যে চমৎকারভাবে স্থান দিয়েছিলেন।
- প্রান্তিক চরিত্রের সমাহার: তাঁর গল্পের নায়ক ছিল গ্রামের কামার, কুমার, কুলি, ছোট চাষী, ডাকাত কিংবা অবহেলিত গৃহবধূ।
হোসাইনীর গল্প: আফসানায় মেঠো পথ ও রক্তমাংসের মানুষ
‘কজ্জাক’ (Kazaq):
‘মেলা গুমানী’ (Mela Ghumani):
‘এক অওরত কী জিন্দেগী’ (Ek Aurat Ki Zindagi) ও সামাজিক চিত্র:
শিক্ষকতা, গবেষণা ও সাহিত্যের শেষ অধ্যায়
আলী আব্বাস হোসাইনী কেবল ছোটগল্পকার ছিলেন না; তিনি ছিলেন উর্দু আফসানার একজন অত্যন্ত গম্ভীর গবেষক ও সমালোচক। তাঁর রচিত বিখ্যাত গবেষণা গ্রন্থ ‘উর্দু আফসানা: রিওয়ায়াত অওর তানকীদ’ (Urdu Afsana: Riwayat Aur Tanqeed) আজও উর্দু ছোটগল্পের ইতিহাস ও মূল্যায়নের ক্ষেত্রে এক অন্যতম আকর গ্রন্থ হিসেবে বিবেচিত হয়।
তিনি সাহিত্যকে রাজনৈতিক স্লোগানে পরিণত করতে চাননি, কিন্তু প্রগতিশীল ভাবধারাকে হৃদয়ে ধারণ করে আজীবন নিপীড়িত মানুষের পক্ষেই লিখে গেছেন। ১৯৬৯ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর এলাহাবাদে এই প্রজ্ঞাবান শিক্ষক ও সাহিত্যসাধক চিরতরে বিদায় নেন।
