আমাদের সমাজে একটা কথা খুব চড়া সুরে বলা হয়—হাতে একটা বড় ডিগ্রি থাকা মানেই জীবনে মস্ত বড় এক সাফল্য পেয়ে যাওয়া। কিন্তু বুক চাপড়ে বলা এই কথার পেছনের আসল ছবিটা কি সত্যিই তাই? প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনার যে একটা দরকার আছে, তা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। তবে জীবনের এই বিশাল আর কঠিন ময়দানে সত্যিকারের বাজি জিততে গেলে স্রেফ ওই ক্লাসরুমের শিক্ষার চেয়েও অনেক বেশি জরুরি কিছু জিনিস দরকার হয়। সম্প্রতি এক ভিডিও বার্তায় সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর এই জরুরি বিষয়টি নিয়েই বেশ কিছু চোখ খুলে দেওয়ার মতো কথা বলেছেন।
আমরা তো সেই ছোটবেলা থেকেই মুখস্থ করে আসছি—”শিক্ষা জাতির মেরুদণ্ড”। কিন্তু কখনো কি ঠান্ডা মাথায় ভেবে দেখেছি, এই ‘শিক্ষা’ বলতে আমরা আসলে ঠিক কী বুঝি? এটা কি কেবল ঘরের দেয়ালে ঝুলিয়ে রাখা ফ্রেমবাঁধানো এক টুকরো কাগজের সার্টিফিকেট? নাকি কর্মজীবনের রুক্ষ বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে যেকোনো কঠিন সমস্যার চটজলদি সমাধান বের করার আসল যোগ্যতা?
আজকাল আমাদের দেশে সিভিতে একটা বড় ডিগ্রির চকমকে নাম থাকার কদর অনেক বেশি। কিন্তু এই প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনা কি আমাদের তরুণদের ভবিষ্যৎকে আসলেই সুরক্ষিত করতে পারছে? বাংলাদেশের যেকোনো নামী-দামী উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের দিকে তাকালেই একটা তেতো সত্য চোখের সামনে ভেসে ওঠে—আজকের দিনে এমন একটা বিশ্ববিদ্যালয়ও খুঁজে পাওয়া যাবে না, যারা বুক ফুলিয়ে শতভাগ গ্যারান্টি দিয়ে বলতে পারবে যে, তাদের ক্যাম্পাস থেকে পাস করে বের হওয়া প্রতিটি ছেলে-মেয়ে কর্পোরেট বা প্রফেশনাল দুনিয়ায় কাজ করার জন্য একদম রেডি!
খুব সোজা ভাষায় বললে, একটা একাডেমিক ডিগ্রি বড়জোর আপনাকে কোনো ভালো কোম্পানির ইন্টারভিউ বোর্ডে বসার বা চাকরির জন্য অ্যাপ্লাই করার একটা টিকিট এনে দেবে। কিন্তু সেই টিকিটটাকে আসল সফলতায় রূপান্তর করার পুরো দায়িত্বটা একান্তই আপনার নিজের। যারা পড়াশোনা করার সময়ই নিজের উদ্যোগে একটু বাড়তি খাটুনি খেটে নিজেদের কাজের উপযোগী বা ‘এমপ্লয়েবল’ (Employable) করে গড়ে তোলে, কর্মক্ষেত্রে দিনশেষে তারাই রেসে এগিয়ে থাকে। আর যারা স্রেফ বইয়ের পাতা মুখস্থ করে জিপিএ-৫ বা সিজিপিএ ফোর-আউট-অফ-ফোর পাওয়ার পেছনে ছুটেছে, তাদের চাকরি জীবনের শুরুতে এসে একদম থতমত খেয়ে যেতে হয়; সব কিছু আবার নতুন করে লড়তে হয়।
ইতিহাসের পাতা ওল্টালে এমন বহু মানুষের নাম পাওয়া যাবে, যাঁদের ঝুড়িতে হয়তো কোনো বড় প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রি ছিল না, অথচ তাঁরা নিজেদের কাজ দিয়ে দুনিয়া কাঁপিয়ে গেছেন। এর আসল কারণটা হলো—মানুষের শেখার পরিধি স্রেফ স্কুল-কলেজের ওই চার দেয়ালে আটকে থাকে না। সুনির্মল বসুর সেই চেনা কবিতার মতোই—“বিশ্বজোড়া পাঠশালা মোর, সবার আমি ছাত্র”। জীবন চলার পথে ধাক্কা খেয়ে শেখা, নানা পদের মানুষের সাথে মিশে চেনা আর চারপাশের অভিজ্ঞতা থেকে পাওয়া জ্ঞান অনেক সময় ক্লাসরুমের মোটা মোটা তাত্ত্বিক বইয়ের চেয়ে হাজার গুণ বেশি কাজে দেয়।
তবে এর মানে কিন্তু এই নয় যে প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনার কোনো দামই নেই। স্কুল, কলেজ বা ইউনিভার্সিটির একটা সুশৃঙ্খল পরিবেশ আপনাকে জীবনের একটা শক্ত তাত্ত্বিক ভিত্তি বা ফাউন্ডেশন তৈরি করে দেয়। কিন্তু সেই ফাউন্ডেশন তখনই কাজে লাগবে, যখন আপনি শিক্ষার আসল উদ্দেশ্যটা নিজের ভেতর ধারণ করতে পারবেন।
সুফি ফারুকের মূল বার্তাটি আসলে খুবই পরিষ্কার: প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রিকে স্রেফ পথ চলার একটা মাইলফলক হিসেবে দেখুন, জীবনের শেষ গন্তব্য হিসেবে নয়। ডিগ্রির খোলস থেকে বেরিয়ে নিজের ভেতর শিক্ষার আসল আলোটা জ্বালুন এবং প্রতিদিন নিজেকে নতুন নতুন দক্ষতায় আপগ্রেড করুন। তবেই আপনার এত বছরের পড়াশোনা সার্থক হবে, জীবনটাও সুন্দর দিকে মোড় নেবে।
আরও দেখুন:
