যদি কখনো কোনো একাকী নিঃসঙ্গ রাতে তাঁর ‘বস্তি’ উপন্যাসের পাতা খুলে জাকিরের সাথে রূপনগরের মেঠো পথ আর পুরোনো কসবার স্মৃতির অলিতে-গলিতে হাঁটেন, কিংবা ‘আখরী আদমী’র রূপক-গল্পে নৈতিক অবক্ষয়ের মুখে মানুষের পশুতে রূপান্তরিত হওয়ার দৃশ্যটি প্রত্যক্ষ করেন—তবে আপনি বুঝতে পারবেন উর্দু আফসানায় তিনি কতটা অসামান্য ও স্বতন্ত্র এক জগত নির্মাণ করেছিলেন। বিধাতা ইন্তিজার হোসাইনকে দীর্ঘ আয়ু দিয়েছিলেন। তিনি আমাদের মধ্যে ছিলেন প্রায় ৯২ বছর, ১ মাস এবং ২৬ দিন (১৯২৩ – ২০১৬)। সেই দীর্ঘ নটি দশকের জীবনযাত্রায় তিনি দেশভাগ আর রাজনীতিকে স্রেফ দাঙ্গা বা রক্তের দাগে মেপে ক্ষান্ত হননি; বরং তাকে রূপ দিয়েছিলেন মহাকাব্যিক ‘হিজরত’, আত্মিক নির্বাসন এবং সংস্কৃতির চিরন্তন বেদনায়।
সাদাত হাসান মান্টো কিংবা কৃষণ চন্দর যেখানে বাস্তবতার নগ্ন চাবুক দিয়ে সমাজকে আঘাত করছিলেন, ইন্তিজার হোসাইন সেখানে ফিরে গিয়েছিলেন প্রাচ্যের প্রাচীন গল্প বলার শৈলীতে—দাস্তান, জাতকের গল্প, উপনিষদ, রামায়ণ-মহাভারত এবং ইসলামিক ঐতিহ্যের রূপকে। আধুনিক উর্দু কথাসাহিত্যে ঐতিহ্যগত রূপকথা ও মিথোলজিকে পুনর্জীবিত করে আধুনিক মানুষের নৈরাশ্যের প্রতিচ্ছবি ফুটিয়ে তোলার ক্ষেত্রে তাঁর কোনো দ্বিতীয় বিকল্প ছিল না।
আজ এই মহাকাব্যিক রূপককার ও শব্দশিল্পীর স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে এবং তাঁর ভাবধারার প্রতি আমাদের অকৃত্রিম ঋণ স্বীকার করেই আজকের এই আয়োজন।
ইন্তিজার হোসাইন
“Hijrat sirf ek jagah se dusri jagah jaana nahi, yeh insani tehzeeb aur yaadon ke ek poore samandar ko apne andar samote hue aage badhna hai… Jab aadam-zad apni tehzeeb bhool jaata hai, toh woh insan se hewan ban jaata hai.”
উর্দু আফসানা ও উপন্যাস জগতের এই দিকপাল চিকিৎসকের মতো তীক্ষ্ণ ভাবনার বাংলা ভাবান্তর করলে দাঁড়ায়—
“হিজরত কেবল এক ভৌগোলিক সীমান্ত থেকে অন্য সীমান্তে যাওয়া নয়; এটি মানুষের সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও স্মৃতির পুরো এক মহাসমুদ্রকে বুকের ভেতর পুষে নিয়ে সামনে এগিয়ে চলা… মানুষ যখন তার নিজের শেকড় ও ঐতিহ্যকে ভুলে যায়, তখন সে মানুষ থেকে পশুতে পরিণত হয়।”
আজ থেকে বহু বছর আগে আধুনিকতার তোড়ে গা ভাসিয়ে দেওয়া সমাজকে নিজের শেকড়ের আয়না দেখিয়েছিলেন ইন্তিজার হোসাইন। যিনি অতীতকে কেবল মরা ইতিহাস মনে করতেন না; বরং অতীতকে দেখতেন বর্তমানের জটিল প্রশ্নের উত্তর খোঁজার এক অবিনাশী প্রদীপ হিসেবে।
কসবা, আলিগড় ও হিজরতের স্মৃতিপট
১৯২৩ সালের ৭ ডিসেম্বর উত্তরপ্রদেশের বুলন্দশহর জেলার দিবাই নামের এক ছোট্ট কসবায় (উপশহর) ইন্তিজার হোসাইনের জন্ম। তাঁর শৈশব ও কৈশোর কেটেছিল ঐতিহ্যবাহী ভারতীয় কসবার আবহাওয়ায়—যেখানে হিন্দু-মুসলিম সংস্কৃতির এক অপরূপ মেলবন্ধন ছিল, ছিল রামলীলার গান, মহররমের মাতম এবং বয়োজ্যেষ্ঠদের মুখে মুখে ছড়িয়ে থাকা রূপকথা ও কিসসা-কাহিনী। মিরাট কলেজ থেকে ফারসি ও উর্দু সাহিত্যে স্নাতকোত্তর করার পর ১৯৪৭ সালের দেশভাগ তাঁর জীবনের গতিপথ পুরোপুরি বদলে দেয়। তিনি ভিটেমাটি ছেড়ে সীমান্ত পেরিয়ে লাহোরে চলে আসেন। কিন্তু লাহোরের আধুনিক জীবনের গোলকধাঁধায় এসেও তাঁর মন চিরকাল পড়ে রইল ভারতের সেই স্মৃতিবিজড়িত কসবায়। এই যে হারিয়ে যাওয়া জান্নাত বা ‘লস্ট প্যারাডাইস’-এর বেদনা, সেটাই ইন্তিজার হোসাইনের সাহিত্যজীবনের সবচেয়ে বড় আত্মিক প্রেরণা হয়ে দাঁড়ায়।
স্মৃতিকাতরতা, দস্তান ও রূপক সাহিত্যের বিনির্মাণ
ইন্তিজার হোসাইন যখন আফসানা লিখতে শুরু করেন, তখন উর্দু সাহিত্যে বাস্তবতাবাদী ও সাম্যবাদী প্রগতিশীল ধারার চরম জয়জয়কার। কিন্তু তিনি সেই চেনা রাজনৈতিক স্লোগানের পথ হাঁটেননি।
তিনি সাহিত্যজগতে নিয়ে এলেন এক অভূতপূর্ব শৈলী:
- দাস্তানগোই ও পৌরাণিক আঙ্গিক: তিনি প্রাচীন আরবি-ফারসি দাস্তান, বুদ্ধদেব জাতকের গল্প এবং মহাকাব্যের রূপক ব্যবহার করে আধুনিক রাজনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক গল্প লিখতে শুরু করেন।
- পশুপাখির চরিত্র: মানুষের নৈতিক পতন বোঝাতে তিনি পশুপাখিদের চরিত্র হিসেবে এনে সমাজ ও রাজনীতির গালে চরম স্যাটায়ার করেছেন।
- স্মৃতি ও সময়: অতীতের স্মৃতিকে তিনি কেবল অতীত হিসেবে দেখেননি; বরং দেখিয়েছেন স্মৃতি কীভাবে একজন মানুষের বর্তমানে বেঁচে থাকার শেষ সম্বল হয়।
ইন্তিজারের কথা ও আফসানা: শতাব্দীর বিষাদ ও আত্মজিজ্ঞাসা
‘বস্তি’ (Basti):
‘আখরী আদমী’ (Aakhri Aadmi):
‘কচ্ছপ’ (Kachhwe) ও ‘শহর-এ-আফসোস’ (Shehr-e-Afsos):
সাংবাদিকতা, বিশ্বজোড়া স্বীকৃতি ও শেষ অধ্যায়
ইন্তিজার হোসাইন কেবল গল্পকার ছিলেন না; তিনি ছিলেন একজন প্রথম সারির কলামিস্ট ও প্রাবন্ধিক। লাহোরের দৈনিক ‘ইমরোজ’, ‘মাশরিক’ এবং পরবর্তীতে বিখ্যাত ইংরেজি দৈনিক ‘ডন’ (Dawn)-এ তাঁর নিয়মিত কলাম ‘লাহোর নামা’ সাহিত্যপ্রেমীদের কাছে অত্যন্ত সমাদৃত ছিল।
তিনি ২০১৩ সালে বিশ্বসাহিত্যের অন্যতম সম্মানজনক ‘ম্যান বুকার আন্তর্জাতিক পুরস্কার’ (Man Booker International Prize)-এর সংক্ষিপ্ত তালিকায় মনোনীত হন—যা ছিল উর্দু সাহিত্যের জন্য এক ঐতিহাসিক গৌরব। এ ছাড়া তিনি ফ্রান্স সরকারের সম্মানজনক ‘অর্ডার অব আর্টস অ্যান্ড লেটার্স’ এবং পাকিস্তানের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা লাভ করেন।
২০১৬ সালের ২ ফেব্রুয়ারি, ৯২ বছর বয়সে লাহোরের এক হাসপাতালে এই মহান সাহিত্যসাধক ও স্মৃতিবিদ্যার কারিগর চিরতরে নিভে যান।
ইন্তিজারের প্রাসঙ্গিকতা এবং ইতিহাসের জয়
আজকের যুগে, যখন মানুষ দ্রুত তার ইতিহাস, ঐতিহ্য ও শিকড় ভুলে যাচ্ছে, তখন ইন্তিজার হোসাইনের সাহিত্য আমাদের বারবার আমাদের শেকড়ের কাছে ফিরিয়ে নিয়ে যায়। তিনি আমাদের শিখিয়েছেন—যে জাতি নিজের অতীত ও সংস্কৃতিকে ভুলে যায়, সে জাতি নিজের মানবিক সত্তাই হারিয়ে ফেলে।
