কৃষণ চন্দর : প্রগতিশীল ভাবধারা ও শোষিত মানুষের অবিনাশী স্বর | রেখতা-উর্দু সাহিরেখতা-উর্দু সাহিত্যত্য । আমার সংস্কৃতি সিরিজ

যদি কখনো ১৯৪৩ সালের চরম দুর্ভিক্ষের প্রেক্ষাপটে লেখা ‘আন্নদাতা’ গল্পটির পাতা উল্টে দেখেন, আর আবিষ্কার করেন আহারহীন কঙ্কালসার মানুষের ছটফটানির পাশে কীভাবে সাম্রাজ্যবাদী শাসক ও পুঁজিপতিদের ধুমধাম ভোজসভা বসছিল; কিংবা ‘পেশোয়ার এক্সপ্রেস’-এর রক্তের দাগে ভেজা ট্রেনের জবানবন্দিতে দেশভাগের নারকীয় বিভীষিকা প্রত্যক্ষ করেন—তবে বুঝতে পারবেন রাজনৈতিক ও প্রগতিশীল সাহিত্য আসলে কাকে বলে। বিধাতা কৃষণ চন্দরকে আয়ু দিয়েছিলেন ৬২ বছর, ৩ মাস এবং ১৩ দিন (১৯১৪ – ১৯৭৭)। সেই সংক্ষিপ্ত জীবনের মধ্যে তিনি উর্দু কথাসাহিত্যকে সস্তা রোমান্স বা ড্রয়িংরুমের আভিজাত্য থেকে টেনে বের করে এনে সোজা দাঁড় করিয়েছিলেন গণমানুষের অধিকার আদায়ের লড়াকু ময়দানে।

তাঁকে বলা হয় উর্দু প্রগতিশীল সাহিত্য আন্দোলনের সবচেয়ে শক্তিশালী ও উর্বর স্তম্ভ। সাহিত্যকে কীভাবে সরাসরি সামাজিক বিপ্লব, শ্রেণি সংগ্রাম ও মানবতাবাদের মশাল হিসেবে ব্যবহার করা যায়, কৃষণ চন্দর নিজের চার দশকের সাহিত্যজীবনে তা বিশ্বস্ততার সাথে প্রমাণ করে গেছেন।

আজ এই বিপ্লবমুখী ও দরদী সাহিত্যসাধকের স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে এবং তাঁর ভাবধারার প্রতি আমাদের অকৃত্রিম ঋণ স্বীকার করেই এই আয়োজন।

কৃষণ চন্দর

“Zindagi sirf phoolon ki sej nahi hai, yeh bhookh, ghurbat aur sangharsh ki ek aisi haqeeqat hai jise adab mein jaga deni hi hogi… Adab ka farz hai ki woh mazloom ke haath mein aawaz ban kar uthe aur zaalim ke garibaan par haath daale.”

উর্দু প্রগতিশীল কথাসাহিত্যের এই মহান রূপকারের অমোঘ বানীর বাংলা অনুবাদ করলে দাঁড়ায়—

“জীবন কেবল ফুলশয্যা নয়; এটি ক্ষুধা, দারিদ্র্য ও সংগ্রামের এমন এক বাস্তব সত্য—যাকে সাহিত্যে প্রধান স্থান দিতেই হবে… সাহিত্যের আসল দায়িত্ব হলো শোষিতের হাতের কণ্ঠস্বর হয়ে ওঠা এবং শোষকের কলার চেপে ধরা।”

আজ থেকে বহু বছর আগে নিজের প্রতিটি গল্প ও উপন্যাসে এই আদর্শকেই বাস্তব রূপ দিয়েছিলেন কৃষণ চন্দর। যিনি কলমকে স্রেফ বিনোদনের অনুষঙ্গ মনে করতেন না, মনে করতেন শোষকের বিরুদ্ধে দাগানো এক রাজনৈতিক মশাল।

কাশ্মীরের শান্ত উপত্যকা ও লাহোরের প্রগতিশীল চেতনা

১৯১৪ সালের ২৩ নভেম্বর রাজস্থানের ভরতপুরে কৃষণ চন্দরের জন্ম হলেও তাঁর শৈশব ও কৈশোর কেটেছিল কাশ্মীরের পুঞ্চ অঞ্চলে। কাশ্মীরের চোখধাঁধানো প্রাকৃতিক সৌন্দর্য এবং অন্যদিকে সাধারণ কৃষক-প্রজাদের চরম দারিদ্র্য ও শোষণের বৈপরীত্য তাঁর কোমল শিশুমনে গভীর আঘাত হেনেছিল।

উচ্চশিক্ষার জন্য তিনি লাহোরে আসেন এবং সেখানকার বিখ্যাত ফোরম্যান ক্রিশ্চিয়ান কলেজ থেকে ইংরেজি সাহিত্যে এমএ এবং পরবর্তীতে আইন পাশ করেন। ১৯৩০-এর দশকে লাহোরের প্রগতিশীল রাজনৈতিক পরিবেশ, শ্রমিক আন্দোলন এবং পরাধীন ভারতের তীব্র স্বাধীনতা সংগ্রাম কৃষণ চন্দরের সাহিত্যিক মানসিকতাকে পুরোপুরি তৈরি করে দেয়।

প্রগতিশীল লেখক সংঘ ও সমাজ পরিবর্তনের কারিগর

১৯৩৬ সালে গড়ে ওঠা ‘প্রগতিশীল লেখক সংঘ’ (Progressive Writers’ Association)-এর সাথে কৃষণ চন্দর শুরু থেকেই গভীরভাবে যুক্ত ছিলেন এবং পরবর্তীতে দীর্ঘ সময় এই ঐতিহাসিক সংগঠনের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন।

প্রেমচন্দ, সাদাত হাসান মান্টো, ইসমত চুগতাই এবং রাজিন্দর সিং বেদীর মতো সহযোদ্ধাদের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে তিনি উর্দু আফসানাকে সাম্রাজ্যবাদ, পুঁজিবাদ, সামন্তবাদ ও সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে এক অপ্রতিরোধ্য হাতিয়ারে পরিণত করেন। কৃষণ চন্দরের গদ্য ছিল অত্যন্ত প্রাঞ্জল, আবেগময়, চিত্রল ও তীক্ষ্ণ স্যাটায়ারে পরিপূর্ণ।

কৃষণ চন্দরের গল্প ও উপন্যাস: শোষিতের আর্তনাদ ও ব্যঙ্গের রাজনৈতিক আঘাত

কৃষণ চন্দরের সাহিত্যসম্ভার অত্যন্ত বিশাল। তিনি শতাধিক ছোটগল্প এবং বহু কালজয়ী উপন্যাস রচনা করেছেন, যেখানে শোষিত মানুষের চিৎকার আর ব্যঙ্গাত্মক তীক্ষ্ণতা ফুটে উঠেছে।
‘আন্নদাতা’ (Anndata):
১৯৪৩ সালের ভয়াবহ ‘পঞ্চাশের মন্বন্তর’ বা বাংলা দুর্ভিক্ষের পটভূমিতে রচিত এক কালজয়ী রাজনৈতিক অ্যালেগরি বা রূপক গল্প। কৃষণ চন্দর এখানে সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটিশ শাসক, মজুতদার ও তৎকালীন ধনিক শ্রেণীর চরম অমানবিকতাকে নগ্নভাবে উন্মোচিত করেছেন। একদিকে কলকাতার রাজপথে লাখ লাখ ক্ষুধার্ত মানুষ কঙ্কালসার হয়ে মারা যাচ্ছে, আর অন্যদিকে ফাইভ স্টার হোটেলে সাহেব ও দেশীয় আমলারা ধুমধাম করে ভোজ সারছে। শোষণের এই চিত্র পাঠককে স্তম্ভিত করে দেয়।
‘এক গাধে কি আত্মকথা’ (Ek Gadhe Ki Aatmakatha):
এটি উর্দু ও হিন্দি সাহিত্যের এক অনন্য ব্যঙ্গাত্মক উপন্যাস। একটি সাধারণ গাধার জবানবন্দিতে তৎকালীন রাজনৈতিক নেতা, আমলাতন্ত্র এবং সমাজের কৃত্রিম ভদ্রতার নগ্ন রূপকে অত্যন্ত রসাত্মক কিন্তু মারাত্মক চাবুক মেরে তুলে ধরা হয়েছে। পশুকৈন্দ্রিক এমন রাজনৈতিক স্যাটায়ার উপমহাদেশীয় সাহিত্যে বিরল।
‘পেশোয়ার এক্সপ্রেস’ (Peshawar Express):
দেশভাগের দাঙ্গার ওপর রচিত বিশ্বসাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ মর্মান্তিক গল্প। এখানে কোনো মানুষ গল্প বলছে না; গল্প বলছে স্বয়ং ‘পেশোয়ার এক্সপ্রেস’ নামের ট্রেনটি, যা দেশভাগের সময় সীমান্তে রক্ত ও লাশের বোঝা বয়ে নিয়ে গিয়েছিল। দুই ধর্মের উন্মাদ মানুষ কীভাবে একে অপরের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিল, ট্রেনের নির্জীব কাঠের কামরাগুলো যেন সেই রক্তের ইতিহাস বহন করে কেঁদে উঠেছে।
‘মহালক্ষ্মী কা পুল’ (Mahalaxmi Ka Pool):
বোম্বাই শহরের তীব্র শ্রেণিবৈষম্যের এক হৃদয়বিদারক দলিল। মহালক্ষ্মী ব্রিজের ওপর দিয়ে যখন ধনীদের ঝলমলে গাড়ি ছুটে যায়, তখন ব্রিজের নিচে ড্রেনের পাশে পড়ে থাকা ছাগল আর গৃহহীন মানুষের জীবনের মধ্যে কোনো তফাৎ থাকে না।

বোম্বাইয়ের রূপালী জগত ও রাজকীয় প্রয়াণ

পরবর্তীকালে কৃষণ চন্দর বোম্বাইয়ে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন এবং ভারতীয় চলচ্চিত্র শিল্পে চিত্রনাট্যকার ও সংলাপ লেখক হিসেবে সুখ্যাতি অর্জন করেন। ‘দো আঁখে বারাহ হাথ’, ‘ধর্তী কে লাল’ সহ বেশ কিছু কালজয়ী চলচ্চিত্রের সাথে তাঁর নাম যুক্ত ছিল।

সাহিত্যে অসামান্য অবদানের জন্য ১৯৬৯ সালে তিনি ভারত সরকারের অন্যতম সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা ‘পদ্মভূষণ’-এ ভূষিত হন। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি শোষিত ও মেহনতি মানুষের অধিকারের কথা লিখে গেছেন। ১৯৭৭ সালের ৮ মার্চ বোম্বাইয়ে টেবিলে বসে লেখার কাজ করার সময়ই হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে এই প্রজ্ঞাবান গল্পকার ও সমাজ পরিবর্তনকারী সাহিত্যিক চিরতরে বিদায় নেন।

কৃষণ চন্দরের প্রাসঙ্গিকতা এবং ইতিহাসের জয়

আজও যখন বিশ্বজুড়ে শোষণের মাত্রা বাড়ে, যখন ক্ষুধা ও সামাজিক বৈষম্য মানুষকে পিষে ফেলে, তখন কৃষণ চন্দরের লেখাগুলো আমাদের বিবেককে নতুন করে জাগিয়ে তোলে। তিনি আমাদের শিখিয়েছেন সাহিত্য স্রেফ সুকোমল কল্পনা নয়; সাহিত্য হলো ন্যায়বিচার ও মানুষের মুক্তিসংগ্রামের অবিচ্ছেদ্য দলিল।